img

ইরান যুদ্ধে ‘আটকে’ গেছেন ট্রাম্প: নিউইয়র্ক টাইমস’র বিশ্লেষণ

প্রকাশিত :  ১৮:১০, ২৬ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৮:৫৫, ২৬ জুলাই ২০২৬

ইরান যুদ্ধে ‘আটকে’ গেছেন ট্রাম্প: নিউইয়র্ক টাইমস’র বিশ্লেষণ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের খামখেয়ালি আচরণের জন্য সুপরিচিত। প্রথম মেয়াদের মতো দ্বিতীয় মেয়াদেও বহু কাজের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের এই বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি বিপাকে পড়েছেন ইরান যুদ্ধ নিয়ে।

১৩ মাস আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পরমাণু কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ডেল্টা ফোর্স পাঠিয়ে তুলে আনেন। ভেনেজুয়েলার ঘটনায় দিনশেষে যুক্তরাষ্ট্রের লাভ হয়। দেশটিতে নিজেদের পছন্দসই সরকার পায় তারা। একই প্রত্যাশা হয়তো ইরানের ক্ষেত্রেও ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। সেখানে শাসকের শ্রেণি পরিবর্তনের কথা একাধিকবার বলেছে তারা। তবে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি; বরং এই সংঘাত মোড় নিতে শুরু করেছে অন্তহীন যুদ্ধের দিকে।   

ইরান যুদ্ধ নিয়ে কোনো লক্ষ্যই পূরণ হয়নি ডোনাল্ড ট্রাম্পের। উল্টো আশঙ্কাজনক হারে কমতে শুরু করেছে মার্কিন অস্ত্রের মজুত, অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ছে তেলের দাম এবং প্রভাব পড়ছে শেয়ার বাজারেও। প্রথম দফায় শুধু হরমুজ প্রণালি নিয়ে সমস্যা হচ্ছিল, দ্বিতীয় দফার যুদ্ধে তা গড়িয়েছে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব পর্যন্ত। সব মিলিয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌযান চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ বলছে, এসব সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে ট্রাম্প বিরক্তবোধ করছেন। তাঁর সাম্প্রতিক চলাফেরায় এর প্রভাবও দেখা গেছে। আগের চেয়ে অনেক দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছেন তিনি। মিত্র দেশের সঙ্গে চুক্তি হোক, আর নিজ দেশের কোনো বিলে স্বাক্ষর হোক– দুই দিকেই এর প্রভাব পড়ছে। 

এই মুহূর্তে ইরান প্রশ্নে ট্রাম্পের হাতে তিনটি বিকল্প রয়েছে: সামরিক অভিযানের পরিধি বৃদ্ধি করা বা অর্থনৈতিক চাপ তৈরি অথবা জয় ঘোষণা করে বের হয়ে আসা। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তিনটি বিকল্প খতিয়ে দেখা হয়েছে এবং এসব নিয়ে তর্কবিতর্ক হয়েছে জেডি ভ্যান্স, জ্যারেড কুশনারের মতো ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন বলছে, প্রতিটি বিকল্পই নিজ নিজ জায়গা থেকে ভিন্ন ভিন্ন কারণে অপ্রীতিকর।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প বলে আসছেন, সামরিক অভিযানের পরিধি বাড়ানো হবে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত হানা হবে এবং চড়া মূল্য দিতে হবে ইরানিদের। অনেক প্রাণহানি হবে, বহু কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। তবে শুক্রবার তিনি জানালেন, ওই চিন্তা থেকে সরে এসেছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কেন সরে এলেন ট্রাম্প? তাহলে কি এত ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর চিন্তা করেই নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে? এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে নিউইয়র্ক টাইমসকে কোনো উত্তর দিতে রাজি হননি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। 

তবে নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, তাঁর এই অবস্থান পরিবর্তনের কারণ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধকের মজুত কমে যাওয়া। গত এপ্রিলেই এ বিষয়ে সতর্ক করেছে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এখন উদ্বিগ্ন যে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং হয়তো এই স্বল্পতার সুযোগ নিয়ে নিজেদের পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন। 

দ্বিতীয় বিকল্প অর্থনৈতিক চাপ তৈরি নিয়ে অগ্রসর হওয়ার খুব একটা সুযোগ নেই। কারণ, এগুলো প্রভাব ফেলতে সময় নেয়। আর এটি করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের খরচও বাড়বে। বর্তমান বাস্তবতায় সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে হবে, মাঝেমধ্যে হামলা-পাল্টা হামলাও হবে, যুক্তরাষ্ট্রের আরও সেনার প্রাণ ঝুঁকিতে পড়বে।  

তৃতীয় বিকল্প হলো, জয় ঘোষণা করা ও বাড়ি ফিরে যাওয়া। এক মাস আগে ট্রাম্প ওই পথে কিছুটা হেঁটেছিলেন। এভাবে ফিরে আসারও মূল্য রয়েছে। ট্রাম্পকে মেনে নিতে হবে ইরানের হয়তো পারমাণবিক সক্ষমতার বোমা থাকবে ও হরমুজ প্রণালি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ভবিষ্যতে যে বিকল্পই নেওয়া হোক না কেন, সেটি ট্রাম্পের নজির হিসেবে রয়ে যাবে।


আন্তর্জাতিক এর আরও খবর

img

ইরানের পাল্টা হামলায় ২০০ জনের বেশি মার্কিন সেনা নিহত: দাবি আইআরজিসি’র

প্রকাশিত :  ১৩:৩৭, ২৬ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৩:৪৬, ২৬ জুলাই ২০২৬

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা ঘিরে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। আর গত ৮ জুলাই যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার ঘোষণা প্রত্যাহার করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যার পর থেকে সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে ‘অপারেশন নাসর-২’ নামে ১৫ দিনব্যাপী পাল্টা অভিযান পরিচালনা করেছে তারা। শনিবার (২৫ জুলাই) তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইআরজিসির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেবি জানান, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে ব্যবহৃত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকেই এই অভিযানের মূল লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।

আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, এই অভিযানে অন্তত ৮টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়, যার মধ্যে একটি ঘাঁটির ২০টি হ্যাঙ্গার সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে।

সামরিক সরঞ্জাম ও বিমান ধ্বংসের খতিয়ান

আইআরজিসির মুখপাত্রের দাবি অনুযায়ী, ইরানের এই অতর্কিত ও শক্তিশালী হামলায় মার্কিন বাহিনীর বিপুল পরিমাণ সামরিক সম্পদ ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে:

যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার: ১১টি যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার, ৪টি ভারী সামরিক হেলিকপ্টার, শক্তিশালী হ্যাঙ্গারে থাকা একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, একটি পি-৮ পোসেইডন সামুদ্রিক টহল বিমান এবং একটি সি-১৭ গ্লোবমাস্টার সামরিক পরিবহন বিমান।

ড্রোন ও ট্যাংকার: ১৭টি নজরদারি ও অপারেশনাল ড্রোন এবং ৮টি আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার বিমান।

রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: ৭টি কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, ৬টি প্যাট্রিয়ট রাডার ইউনিট, ৮টি আগাম সতর্কীকরণ রাডার, ৭টি আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র রাডার, ৫টি দূরপাল্লার রাডার স্থাপনা, ৫টি এফপিএস ও এফপিএস-১১৭ রাডার, ৩টি আকাশ ও সামুদ্রিক নজরদারি রাডার এবং ৩টি স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা।

ঘাঁটির অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি

আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর অবকাঠামো এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কেন্দ্রগুলোও ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে:

হ্যাঙ্গার ও বিমান আশ্রয়কেন্দ্র: ৬টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের হ্যাঙ্গার, ৫টি যুদ্ধবিমানের হ্যাঙ্গার, ৪টি সুরক্ষিত বিমান আশ্রয়কেন্দ্র, একটি এফ-১৫ প্রস্তুতি হ্যাঙ্গার, ৮টি ড্রোনসহ একটি ড্রোন হ্যাঙ্গার, একটি পি-৮ পোসেইডন বিমান রাখার হ্যাঙ্গার এবং ৬টি বিমান পার্কিং ও ফ্লাইট র‌্যাম্প।

অস্ত্র ও জ্বালানি অবকাঠামো: ১৭টি অস্ত্রভাণ্ডার, বিমান যন্ত্রাংশ, নৌ সরঞ্জাম, ১২টি জ্বালানি ট্যাংক, একটি জ্বালানি ডক এবং একটি বিমানবাহী রণতরির জ্বালানি সরবরাহ প্ল্যাটফর্ম।

অন্যান্য স্থাপনা: ৪টি হিমার্স রকেট লঞ্চার, ৪টি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ৬টি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র বাঙ্কার, ৬টি বিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র, দুটি সিগন্যাল গোয়েন্দা যোগাযোগ কেন্দ্র, একটি ডেটা ইন্টেলিজেন্স হাব, একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রসেসিং সেন্টার, একটি অ্যামাজন ডেটা নোড এবং একটি চালকবিহীন নৌযান সংরক্ষণাগার।

‘২০০-এর বেশি মার্কিন সেনা নিহত’

মার্কিন প্রশাসন ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতাহতের সংখ্যাকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি। তার দাবি, অপারেশন নাসর-২ চলাকালীন হামলায় ২০০ জনের বেশি মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আহতের সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি।

ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের প্রকৃত চিত্র ধামাচাপা না দিয়ে তা বিশ্ববাসীর সামনে উন্মুক্ত করতে মার্কিন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মোহেবি। পাশাপাশি, নিরপেক্ষভাবে সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া মার্কিন ঘাঁটিগুলো পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে তেহরান।

তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আইআরজিসির এই দাবিগুলো বা হতাহতের কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।