img

কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও লাউয়াছড়ায় সড়কের পাশ থেকে সেগুনগাছ চুরি

প্রকাশিত :  ১৬:৪৪, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও লাউয়াছড়ায় সড়কের পাশ থেকে সেগুনগাছ চুরি

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলাধীন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের জানকিছড়া স্টিল ব্রিজ এলাকায় শ্রীমঙ্গল–ভানুগাছ প্রধান সড়কের পাশ থেকে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ভোররাতে বিশাল একটি মৃত সেগুনগাছ চুরি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, গাছটির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় এক লাখ টাকা।

ঘটনাটি ঘটেছে বন বিভাগের ক্যাম্প ও টহল দলের সদস্যদের দায়িত্ব পালনের সময়। এ কারণে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সড়কের পাশ থেকে এত বড় একটি গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, রাতের বেলায় বন বিভাগের কিছু বন প্রহরী ও স্থানীয় বন টহল দলের সদস্যদের (সিপিজি) নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করার সুযোগেই গাছটি কেটে নিয়ে গেছে চোরচক্র।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রোববার দিবাগত রাতে জানকিছড়া ক্যাম্পের ফটকে দায়িত্বে ছিলেন বন প্রহরী বাবুল ও বন টহল দলের সিপিজি সদস্য বিজয় বাউরি। অন্যদিকে, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের প্রধান ফটকে বিট কর্মকর্তা নিজে টহল পুলিশের একটি দল নিয়ে ভোর সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত সশরীরে উপস্থিত ছিলেন।

এত কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে কীভাবে প্রধান সড়কের পাশ থেকে বিশাল গাছটি কেটে নিয়ে যাওয়া হলো, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের মৌলভীবাজার রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, মৃত একটি সেগুনগাছ চুরির বিষয়টি জানতে পেরে তিনি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, চুরি হয়ে যাওয়া মূল্যবান সেগুন কাঠ উদ্ধার এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। চুরির সঙ্গে বন বিভাগের ভেতরের কেউ জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও দাপ্তরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

লাউয়াছড়ার বনজ সম্পদ চুরি বা পাচারের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে এক শ্রেণির প্রভাবশালী গোষ্ঠী সংঘবদ্ধভাবে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে তৎকালীন ভানুগাছের পাহাড়—যা বর্তমানে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান হিসেবে সরকার ঘোষণা করেছে—এবং পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চল থেকে মূল্যবান বনজ সম্পদ লুট করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে সেগুন, করই, শ্যামলসহ বিভিন্ন প্রজাতির বড় বড় গাছ কেটে পাচারের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এভাবে বনজ সম্পদ লুট করে অনেকে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ অর্থ ও লাঠিগোষ্ঠীর প্রভাব কাজে লাগিয়ে জনপ্রতিনিধিও নির্বাচিত হয়েছেন। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সংবাদপত্রে এসব বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়ের সঙ্গে বন রক্ষায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হলেও বনাঞ্চল থেকে বড় বড় গাছ পাচার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সর্বশেষ জানকিছড়া স্টিল ব্রিজ এলাকার ঘটনা সেই পুরোনো আশঙ্কাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

শুধু গাছ পাচার নয়, বনাঞ্চলের জমি দখল নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে বনভূমির বিশাল অংশ দখল হয়ে সেখানে জনবসতি, রিসোর্ট, বিভিন্ন ধরনের বাগান ও স্থাপনা গড়ে ওঠায় বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যের সংকট তৈরি হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

এর প্রভাব পড়ছে বন্যপ্রাণীর চলাচলেও। খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে অজগর, বিষধর সাপ, শঙ্খিনীসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে। অনেক সময় সড়ক পার হতে গিয়ে যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে এসব প্রাণীর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষের হাতে ধরা পড়ে বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।

এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তি শীতেশ চন্দ্র দেবের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন এসব বিপন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধারে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ দশকে সংস্থাটি দুই হাজারের বেশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে।

লাউয়াছড়ার মতো সংরক্ষিত বনাঞ্চলে একদিকে বনজ সম্পদ পাচার, অন্যদিকে বনভূমি দখল ও অবকাঠামো নির্মাণ—দুই দিকের চাপেই বন ও বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। জানকিছড়া থেকে একটি বিশাল সেগুনগাছ উধাও হওয়ার ঘটনা তাই শুধু একটি গাছ চুরির ঘটনা নয়; এটি বন রক্ষায় বিদ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নজরদারি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

জগন্নাথপুরে কাজ না করেই অর্থ উত্তোলনের চেষ্টা, ৯ প্রধান শিক্ষককে শোকজ

প্রকাশিত :  ১১:০২, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার ৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র মেরামতের কাজ না করেই অসম্পূর্ণ ভাউচার দাখিল করে টাকা উত্তোলনের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় অভিযুক্ত ৯ প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

নোটিশপ্রাপ্ত বিদ্যালয়গুলো হলো- আশারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কুবাজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাড়গ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দিঘলবাক (খ) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জামারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মক্রমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গণেশ্বরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মিরপুর মহল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং মোহাম্মদপুর সেরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ক্ষুদ্র মেরামত কাজের জন্য উক্ত ৯টি বিদ্যালয়ের বিপরীতে মোট ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি বিদ্যালয় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ পায়, যা দিয়ে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সংস্কার কাজ সম্পন্ন করার কথা ছিল। তবে কোনো প্রকার কাজ সম্পন্ন না করেই বরাদ্দকৃত অর্থ তুলে নিতে শিক্ষকরা ভুয়া ভাউচার জমা দেন বলে তদারকিতে উঠে আসে।

গত ৩ সেপ্টেম্বর জগন্নাথপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহবুবুর আলম স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে আগামী ৫ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে কুবাজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিপেশ দাস এবং মক্রমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুরজ্জন বর্মন দাবি করেন, তারা বিদ্যালয়ে সংস্কার কাজ শেষ করার পরই ভাউচার জমা দিয়েছিলেন।

এ বিষয়ে জগন্নাথপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহবুবুর আলম বলেন, ‘সরকারি বরাদ্দের স্বচ্ছতা রক্ষায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। কাজ না করেই অফিসে ভাউচার জমা দেওয়ার বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। আগামী ৫ কার্যদিবসের মধ্যে শোকজের সন্তোষজনক জবাব পাওয়া না গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

সিলেটের খবর এর আরও খবর