আগস্টে শ্রীমঙ্গলে ১৭টি সাপসহ ২০ বন্যপ্রাণী উদ্ধার, এক দিনেই তিন প্রজাতির সাপ
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে গত আগস্ট মাসে ২০টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। ১ থেকে ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত উদ্ধার করা এসব প্রাণীর মধ্যে ১৭টিই বিভিন্ন প্রজাতির সাপ। এর বাইরে রয়েছে একটি শঙ্খচিল ও দুটি বানর।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের উদ্ধার তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পুরো মাসে সবচেয়ে বেশি উদ্ধার করা হয়েছে অজগর। মোট নয়টি অজগর উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ আগস্ট হাইল হাওর থেকে উদ্ধার করা একটি অজগর ছিল মৃত। অর্থাৎ জীবিত অজগর উদ্ধার হয়েছে আটটি।
অন্যদিকে, এক দিনে সবচেয়ে বেশি সাপ উদ্ধার করা হয়েছে ১৫ আগস্ট। ওই দিন শ্রীমঙ্গলের তিনটি পৃথক এলাকা থেকে তিন প্রজাতির তিনটি সাপ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে কৃপণপুর থেকে একটি তক্ষক, লোয়াগাঁও থেকে একটি দাঁড়াশ সাপ এবং বারিধারা আবাসিক এলাকা থেকে একটি বিরল সাপ উদ্ধার করা হয়। একই দিনে উত্তর ভাড়াউড়া এলাকার মেং বস্তি থেকে একটি লজ্জাবতী বানরও উদ্ধার করে ফাউন্ডেশন। ফলে ওই দিন মোট চারটি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়, যার তিনটিই ছিল সাপ।
অজগরই সবচেয়ে বেশি
ফাউন্ডেশনের তালিকা অনুযায়ী, আগস্টে উদ্ধার হওয়া ২০টি বন্যপ্রাণীর মধ্যে অজগর নয়টি, বেত আঁচড়া দুটি এবং শঙ্খিনী সাপ দুটি। এ ছাড়া তক্ষক, দাঁড়াশ সাপ, বিরল সাপ ও সাইবোল্ড ওয়াটার স্নেক একটি করে উদ্ধার করা হয়েছে। সাপের বাইরে রয়েছে একটি শঙ্খচিল, একটি লজ্জাবতী বানর ও একটি উল্টোলেজি বানর।
আগস্টের শুরুতেই সাপ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। ২ আগস্ট হাইল হাওর থেকে একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। পরদিন ৩ আগস্ট আরামবাগ থেকে একটি বেত আঁচড়া এবং উত্তর ভাড়াউড়া থেকে একটি অজগর উদ্ধার করা হয়। ৪ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে আরও একটি বেত আঁচড়া উদ্ধার করা হয়।
৬ আগস্ট হাইল হাওর থেকে একটি মৃত অজগর উদ্ধারের পর ১৩ আগস্ট ২ নম্বর পুল থেকে এবং ১৪ আগস্ট হাইল হাওর থেকে আরও দুটি অজগর উদ্ধার করা হয়।
এর মধ্যে ১২ আগস্ট শাহীভাগ থেকে একটি শঙ্খচিল উদ্ধার করা হয়। এরপর ১৫ আগস্ট তিনটি সাপ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। ১৯ আগস্ট মাধের গাঁও থেকে একটি শঙ্খিনী সাপ এবং ২১ আগস্ট শ্যামলী আবাসিক এলাকা থেকে একটি উল্টোলেজি বানর উদ্ধার করা হয়।
২৫ আগস্ট পূর্বাশা আবাসিক এলাকা থেকে আরও একটি শঙ্খিনী সাপ উদ্ধার করা হয়। পরদিন ২৬ আগস্ট ভাড়াউড়া বাগান রোড থেকে একটি অজগর এবং সিন্দুরখান কুঞ্জবন থেকে একটি সাইবোল্ড ওয়াটার স্নেক উদ্ধার করা হয়।
মাসের শেষ সপ্তাহেও অজগর উদ্ধারের ঘটনা অব্যাহত ছিল। ২৮ আগস্ট ভাড়াউড়া ৫ নম্বর বস্তির কোয়ার্টার থেকে, ২৯ আগস্ট সাতগাঁও-খিলগাঁও থেকে এবং ৩০ আগস্ট ইছবপুর থেকে একটি করে অজগর উদ্ধার করা হয়।
আগস্টে উদ্ধার ২০ বন্যপ্রাণী
আগস্ট মাসে উদ্ধার হওয়া ২০টি বন্যপ্রাণীর মধ্যে অজগর নয়টি, বেত আঁচড়া দুটি, শঙ্খিনী সাপ দুটি, তক্ষক একটি, দাঁড়াশ সাপ একটি, বিরল সাপ একটি, সাইবোল্ড ওয়াটার স্নেক একটি, শঙ্খচিল একটি, লজ্জাবতী বানর একটি এবং উল্টোলেজি বানর একটি।
সব মিলিয়ে উদ্ধার হয়েছে ২০টি বন্যপ্রাণী, যার মধ্যে ১৭টি সাপ।
আবাসস্থল সংকটে লোকালয়ে বন্যপ্রাণী
হাওর, ঝোপঝাড়, লেক, উঁচু-নিচু পাহাড়-টিলা, বনাঞ্চল ও চা-বাগানবেষ্টিত শ্রীমঙ্গল বন্যপ্রাণীর বিচরণ ও বসবাসের জন্য বৈচিত্র্যময় একটি এলাকা। এর পার্শ্ববর্তী লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানও এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। বনাঞ্চল ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর বসবাস রয়েছে।
তবে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, বনাঞ্চল ও সংরক্ষিত বনের বিস্তীর্ণ এলাকা এক শ্রেণির সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী গোষ্ঠী দখল করে জনবসতি, বিভিন্ন ধরনের রিসোর্ট ও বাগান তৈরি করছে। এতে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্যের সংকটও তৈরি হচ্ছে। ফলে খাদ্যের সন্ধানে বন্যপ্রাণী বাধ্য হয়ে লোকালয়ের দিকে চলে আসছে।
শ্রীমঙ্গরের শহর ও গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে সাপ উদ্ধারের খবর এখন প্রায়ই পাওয়া যাচ্ছে। মানুষের বাসাবাড়ি ও ঘরের চালে সাপ আশ্রয় নেওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বিষধর সাপ লোকালয়ে ঢুকে পড়লে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আগস্টের উদ্ধার তালিকাতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। এক মাসে ১৭টি সাপসহ ২০টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে অজগরের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি শঙ্খিনী, তক্ষক, দাঁড়াশ, বেত আঁচড়া ও সাইবোল্ড ওয়াটার স্নেকের মতো বিভিন্ন প্রজাতির সাপও লোকালয়ের কাছাকাছি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যের জোগান কমে গেলে লোকালয়ে তাদের বিচরণ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মুখোমুখি হওয়ার ঘটনাও বাড়ে। শ্রীমঙ্গলে আগস্ট মাসে ১৭টি সাপসহ ২০টি বন্যপ্রাণী উদ্ধারের এই চিত্র তাই শুধু প্রাণী উদ্ধারের পরিসংখ্যান নয়; এটি বন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা এবং মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও সামনে আনছে।



















