img

জোর করে শিক্ষককে পদত্যাগের আইনি বৈধতা নেই, পুনর্বহালের নির্দেশ: হাইকোর্টের রায়

প্রকাশিত :  ০৮:০৭, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৮:৪৭, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জোর করে শিক্ষককে পদত্যাগের আইনি বৈধতা নেই, পুনর্বহালের নির্দেশ: হাইকোর্টের রায়

জোরপূর্বক কোনো শিক্ষকের কাছ থেকে নেওয়া পদত্যাগপত্র আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। এমনভাবে পদত্যাগে বাধ্য করা হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে দ্রুত আগের পদে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।

রায়ে আরও বলা হয়েছে, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন না করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল, সভাপতিকে অপসারণ এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমপিও বন্ধসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র মামলায় এ রায় দেওয়া হয়।

হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্তের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া শিক্ষকদের পুনর্বহালের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

গাজীপুরের কালিয়াকৈরের গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট বলপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে এ রায় দেওয়া হয়। বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলাম সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০ আগস্ট রুল নিষ্পত্তি করে এ রায় দেন। বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সম্প্রতি প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট ।

আদালতে রিটকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. জহুরুল ইসলাম মুকুল ও মানবেন্দ্র রায়। বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এস এম রেজাউল ইসলাম। রায়ে আদালত বলেন, রিটকারীর (শিক্ষকের) পদত্যাগপত্র স্বেচ্ছায় বা নিজের ইচ্ছায় দেওয়া হয়নি; বরং তার স্বাক্ষর জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছিল এবং এ ধরনের পদত্যাগের কোনো আইনগত বৈধতা নেই। আইন বা বিধি- জোরপূর্বক বা চাপের মুখে প্রাপ্ত পদত্যাগ সমর্থন করে না।

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদ গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট একদল দুষ্কৃতকারী আলকাস উদ্দিন আহমেদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোরপূর্বক একটি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরদিন এ বিষয়ে তিনি কালিয়াকৈর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে ২০ আগস্ট জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবং ২৪ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসকে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে তিনি লিখিতভাবে আবেদন করেন। এরপর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকেও বিষয়টি অবহিত করে আইনি প্রতিকার ও হস্তক্ষেপ কামনা করে আবেদন করেন তিনি। পরে এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে স্বপদে বহাল করতে নির্দেশ দেয় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। কিন্তু সেই আদেশ যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় উপযুক্ত প্রতিকার চেয়ে ২০২৪ সালে হাইকোর্টে রিট করেন আলকাছ উদ্দিন আহমেদ। ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে একই বছরে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি জোর করে নেওয়া ওই পদত্যাগপত্রের কার্যকারিতা তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন আদালত। পরে চলতি বছরের ২০ আগস্ট আগের জারি করা রুল নিষ্পত্তি করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

রায়ের পর্যবেক্ষণ

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, প্রকৃতপক্ষে রিট আবেদনকারীর পদত্যাগের আইনি কোনো বৈধতা ছিল না; রিট আবেদনকারী ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত তার এমপিও অংশ (বেতন-ভাতা) পাচ্ছিলেন। এই অবস্থায় বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ (ম্যানেজিং কমিটি) আলকাছ উদ্দিনকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনে বা চাকরিতে বহাল করতে আইনিভাবে বাধ্য এবং তিনি অবিলম্বে পুনর্বহাল হওয়ার অধিকারী ছিলেন। আদালত আরও বলেন, আইনের অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে শিক্ষা বোর্ডের এখতিয়ার রয়েছে ম্যানেজিং কমিটি কর্তৃক প্রস্তাবিত যেকোনো শৃঙ্খলামূলক বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ পর্যালোচনা, অনুমোদন, সংশোধন বা বাতিল করার। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও বোর্ডের রয়েছে। সেই অনুযায়ী বোর্ডের পক্ষ থেকে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের প্রতি জারি করা নির্দেশাবলী তাদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। ওই নির্দেশনা ইচ্ছাকৃতভাবে পালন না করা অসদুপায়, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল। এ জাতীয় আচরণ ন্যায়বিচার নীতি, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সমতার বিধানের পরিপন্থী। শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বিবাদীরা আইনগতভাবে বাধ্য। বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা, প্রশাসনিক অবহেলা ও সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা রিটকারীর বৈধ অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

পর্যবেক্ষণ আরও বলা হয়েছে, আদালত মনে করেন, একটি নির্দেশনাসহ রুলটি নিষ্পত্তি করা হলে ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য পূরণ হবে। বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে রিট আবেদনকারীকে স্বপদে পুনর্বহাল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হলো। সংশ্লিষ্ট বিবাদীরা রিটকারীকে পুনর্বহাল করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। এই নির্দেশনা পালনে ব্যর্থ হলে, শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) নির্দেশনা অমান্যকারী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এর মধ্যে- ম্যানেজিং কমিটি বাতিল, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিকে অপসারণ এবং প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের (যিনি ম্যানেজিং কমিটির সদস্য সচিব) এমপিও বন্ধের মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।


জাতীয় এর আরও খবর

img

সচল হলো আদানির বিকল ইউনিট, দুপুরের মধ্যে বিদ্যুৎ পাবে বাংলাদেশ

প্রকাশিত :  ০৮:৩৯, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১০:১৩, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি সমস্যায় বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউনিটটি আবার চালু হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ইউনিটটি পুনরায় উৎপাদনে ফেরায় বিদ্যুৎ সরবরাহে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কেন্দ্রটির দ্বিতীয় ইউনিট নির্ধারিত সময়ের আগেই বাংলাদেশ সময় রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ৫টা ১৭ মিনিটে সফলভাবে চালু করা হয়। এ দিন সকাল সাড়ে ১১টার মধ্যে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে ইউনিটটির সমন্বয় (সিঙ্ক্রোনাইজেশন) সম্পন্ন হওয়ার কথা। এতে দুপুরের মধ্যেই বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

রোববার এক বার্তায় আদানি পাওয়ার জানায়, এপিএল গোড্ডার দ্বিতীয় ইউনিট সকাল ৫টা ১৭ মিনিটে সফলভাবে চালু করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই ইউনিটটি প্রস্তুত করা সম্ভব হয়েছে। সকাল সাড়ে ১১টার মধ্যে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয় সম্পন্ন হওয়ার কথা জানানো হয় বার্তায়। ফলে দুপুরের আগেই বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালু হবে বাংলাদেশে।
এর আগে, গত ১১ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের একটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ইউনিটটির বয়লারে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সেটি বন্ধ করতে হয়।

এর ফলে কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় ও বাংলাদেশে সরবরাহও হ্রাস পায়।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ইউনিটটি বিকল হওয়ার আগে গোড্ডা কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিদ্যুৎ সরবরাহ ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে। এতে আগে থেকেই জ্বালানি সংকটের কারণে চাপের মুখে থাকা দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আরও চাপে পড়ে এবং বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়ে যায়।

বিপিডিবির কর্মকর্তারা জানান, বয়লারের ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পরপরই মেরামত কাজ শুরু করা হয়। প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল, ইউনিটটি পুনরায় চালু করতে অন্তত ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই মেরামত শেষ হওয়ায় দ্রুত উৎপাদনে ফেরা সম্ভব হয়েছে।
এর আগে, কয়লা পরিবহনে বিঘ্নের কারণে আগস্টের মাঝামাঝি সময় থেকে গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সক্ষমতার তুলনায় কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল।
আদানি কর্তৃপক্ষ রেলপথে যানজট, কয়লা পরিবহনে বিভিন্ন বিধিনিষেধ ও অতিবৃষ্টির কারণে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল। এতে কেন্দ্রটিতে প্রয়োজনীয় কয়লা মজুত নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।

তবে গত মাসের শেষ দিকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে কেন্দ্রটির উৎপাদন ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। দিনের বেলায় উৎপাদন প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় তা এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছায়।
পরে উৎপাদন আরও বাড়িয়ে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি করা সম্ভব হলেও ঠিক সে সময়ই বয়লারের ত্রুটিতে একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে গোড্ডা কেন্দ্র বর্তমানে অন্যতম বড় আমদানি উৎস। কেন্দ্রটির দুই ইউনিট থেকে মোট ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, বিকল ইউনিটটি পুনরায় সচল হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়বে ও চলমান লোডশেডিং কিছুটা কমবে।

জাতীয় এর আরও খবর