এইচএসসি ফলাফলে সিলেট বোর্ডে ২০ বছরের সর্বনিম্ন পাসের হার, পিছিয়ে মৌলভীবাজার
সংগ্রাম দত্ত: সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হার ও জিপিএ-৫—দুই সূচকেই গত বছরের তুলনায় পিছিয়েছে শিক্ষার্থীরা। বোর্ডে এবার গড় পাসের হার ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ হাজার ২০৪ জন শিক্ষার্থী। গত বছর পাসের হার ছিল ৫১ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ হাজার ৬০২ জন।
বোর্ডের জেলাভিত্তিক ফলাফলে পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে সিলেট জেলা। অন্যদিকে, সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে মৌলভীবাজার। তবে জেলাটিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৫১ জন শিক্ষার্থী। জেলার ফলাফলে ছাত্রীদের পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা—দুটিই ছাত্রদের চেয়ে বেশি।
এদিকে, জেলার সামগ্রিক ফলাফলের তুলনায় মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজেও বোর্ডের গড়ের চেয়ে ভালো ফল হয়েছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত ফলাফলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সিলেট জেলায় পাসের হার সর্বোচ্চ, মৌলভীবাজারে সর্বনিম্ন
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চার জেলার ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে সিলেট জেলা। এ জেলায় পাসের হার ৫৭ দশমিক ৬২ শতাংশ। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩০ হাজার ৯৫৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১৭ হাজার ৮৩৭ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯০৩ জন।
হবিগঞ্জে পাসের হার ৪৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। এ জেলার ১২ হাজার ৬৯৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৬ হাজার ৮৯ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১০৪ জন।
সুনামগঞ্জে পাসের হার ৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এ জেলা থেকে ১৩ হাজার ৬৬৭ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ৬ হাজার ২৮৪ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪৬ জন।
অন্যদিকে, মৌলভীবাজারে পাসের হার ৪৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এ জেলার ১৪ হাজার ৫৭০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৬ হাজার ৩৮৭ জন। তবে জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে জেলার অবস্থান দ্বিতীয়। এখানে ১৫১ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে।
চার জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন পাসের হারের ব্যবধান ১৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ পয়েন্ট। পাসের হারে পিছিয়ে থাকলেও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যায় মৌলভীবাজার হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
মৌলভীবাজারে পাসের হার ও জিপিএ-৫—দুই ক্ষেত্রেই এগিয়ে মেয়েরা
মৌলভীবাজার জেলার এইচএসসি ফলাফলে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সাফল্য বেশি। জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৪ হাজার ৫৭০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৬ হাজার ৩৮৭ জন। সামগ্রিক পাসের হার ৪৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র ছিল ৫ হাজার ৪৯৪ জন এবং ছাত্রী ৯ হাজার ৭৬ জন। উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র ২ হাজার ২৬৯ জন এবং ছাত্রী ৪ হাজার ১১৮ জন।
ছাত্রদের পাসের হার ৪১ দশমিক ৩০ শতাংশ। অন্যদিকে, ছাত্রীদের পাসের হার ৪৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ৪ দশমিক ০৭ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে।
জেলায় মোট ১৫১ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাদের মধ্যে ছাত্র ৬৮ জন এবং ছাত্রী ৮৩ জন। সর্বোচ্চ ফল অর্জনেও মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে।
ফলাফলের পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, জেলায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ছাত্রীদের সংখ্যা ছাত্রদের তুলনায় বেশি। উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যাতেও মেয়েরা এগিয়ে। ফলে অংশগ্রহণ ও সাফল্য—দুই ক্ষেত্রেই জেলার ফলাফলে মেয়েদের অবস্থান উল্লেখযোগ্য।
সিলেট বোর্ডে ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার
এবারের ফলাফলে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের সামগ্রিক চিত্র উদ্বেগজনক। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে বোর্ড প্রতিষ্ঠার পর থেকে এবারই সর্বনিম্ন পাসের হার রেকর্ড করা হয়েছে।
এ বছর বোর্ডের অধীনে মোট ৭১ হাজার ৮৯৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩৬ হাজার ৫৯৭ জন। পাসের হার ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ।
গত বছর পাসের হার ছিল ৫১ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে তা কমেছে শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ পয়েন্ট।
জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও কমেছে। গত বছর ১ হাজার ৬০২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেলেও এবার পেয়েছে ১ হাজার ২০৪ জন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার ৩৯৮ জন কম শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ফল অর্জন করেছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর ) সকাল ১১টায় সিলেট শিক্ষা বোর্ডের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াসমিন।
বোর্ডের ফলে পাসের হারে মেয়েরা এগিয়ে
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের সামগ্রিক ফলাফলেও ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের পাসের হার বেশি। এ বছর পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৪২ হাজার ৯৫৮ জন ছাত্রীর মধ্যে পাস করেছে ২২ হাজার ৫০১ জন। ছাত্রীদের পাসের হার ৫২ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
অন্যদিকে, ২৮ হাজার ৯৩৫ জন ছাত্রের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১৪ হাজার ৯৬ জন। তাদের পাসের হার ৪৮ দশমিক ৭২ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে।
তবে জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে ছেলেরা সামান্য এগিয়ে। এবার ৬১৩ জন ছাত্র জিপিএ-৫ পেয়েছে। ছাত্রীদের মধ্যে এ সংখ্যা ৫৯১।
বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার সর্বোচ্চ
বিভাগভিত্তিক ফলাফলে সিলেট বোর্ডে বিজ্ঞান বিভাগ এগিয়ে রয়েছে। এ বিভাগে ১৪ হাজার ৩৫৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৯ হাজার ৮৩৮ জন। পাসের হার ৬৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
মানবিক বিভাগে ৪৯ হাজার ৩৫৯ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছে ২২ হাজার ৮৪৮ জন। এ বিভাগে পাসের হার ৪৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।
অন্যদিকে, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৮ হাজার ১৮১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩ হাজার ৯১১ জন। এ বিভাগে পাসের হার ৪৭ দশমিক ৮১ শতাংশ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি মানবিক বিভাগে হলেও পাসের হারে বিজ্ঞান বিভাগের অবস্থান শীর্ষে। মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা—দুই বিভাগেই পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে।
শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজে পাসের হার ৫৯.১৭ শতাংশ
সিলেট বোর্ডের সামগ্রিক ফলাফলের তুলনায় শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজে পাসের হার বেশি। ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় কলেজটির পাসের হার ৫৯ দশমিক ১৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৪ জন শিক্ষার্থী।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, এ বছর প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১ হাজার ২৭৩ জন পরীক্ষার্থী নিবন্ধিত হয়েছিল। পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ হাজার ২৫৯ জন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৭৪৫ জন।
বিভাগভিত্তিক জিপিএ-৫ প্রাপ্তির হিসাবে বিজ্ঞান বিভাগ এগিয়ে। এ বিভাগ থেকে ৩২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে পেয়েছে দুজন।
কলেজটির সামগ্রিক পাসের হার বোর্ডের গড়ের চেয়ে ৮ দশমিক ২৭ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। ফলে বোর্ডের সামগ্রিক ফলাফলের তুলনায় শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের ফলাফল ভালো অবস্থানে রয়েছে।
মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে পাসের হার ৭৪.৭৫ শতাংশ
মৌলভীবাজার জেলার সামগ্রিক পাসের হার ৪৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ হলেও মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের ফলাফল তুলনামূলকভাবে ভালো। এ বছর কলেজটির পাসের হার ৭৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬০ জন শিক্ষার্থী।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, এ বছর প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১ হাজার ২২৮ জন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছিল। পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ হাজার ২১২ জন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৯০৬ জন।
বিভাগভিত্তিক ফলাফলে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২৭৬ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে। এ বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫০ জন। মানবিক বিভাগ থেকে পাস করেছে ৩৫৩ জন; জিপিএ-৫ পেয়েছে সাতজন। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাস করেছে ২৭৭ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে তিনজন।
কলেজটির মোট ৬০ জন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫০ জনই বিজ্ঞান বিভাগের। অন্যদিকে, উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যায় এগিয়ে রয়েছে মানবিক বিভাগ।
জেলার সামগ্রিক ফলাফলের তুলনায় কলেজটির পাসের হার ৩০ দশমিক ৯১ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। বোর্ডের গড় পাসের হারের সঙ্গেও কলেজটির ফলাফলে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।
শতভাগ পাসের প্রতিষ্ঠান ছয়টি, তিনটিতে কেউ পাস করেনি
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার মোট ৩৩৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ৯৬টি কেন্দ্রে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী পাস করেছে। অন্যদিকে, তিনটি প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
এ ছাড়া অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে বোর্ডের অধীনে ২২ জন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ফলাফলে ভিন্ন চিত্র, সামনে শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রশ্ন
এবারের এইচএসসি ফলাফলে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের সামগ্রিক পাসের হার কমেছে। একই সঙ্গে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা। চার জেলার ফলাফলে সিলেট এগিয়ে থাকলেও মৌলভীবাজারে পাসের হার সবচেয়ে কম। তবে জেলার জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা এবং ছাত্রীদের সাফল্য ফলাফলের আরেকটি দিক তুলে ধরেছে।
শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের ফলাফলও দেখিয়েছে, বোর্ড ও জেলার সামগ্রিক ফলাফলের সঙ্গে পৃথক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য এক রকম নয়। বিশেষ করে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজের পাসের হার জেলার গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
সামগ্রিক ফলাফল তাই একদিকে যেমন সিলেট বোর্ডের শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে, অন্যদিকে জেলা ও প্রতিষ্ঠানভেদে ফলাফলের পার্থক্যও সামনে এনেছে। শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, বিভাগভিত্তিক সাফল্য এবং পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ফল উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ।



















