শ্রীমঙ্গলে ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখলের অভিযোগ: জমি ছাড়তে ৫ লাখ টাকা দাবি
বিশেষ সংবাদদাতা: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার সদর ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে জমির দখল ও অর্থ লেনদেন নিয়ে বিরোধের জেরে সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী ইউপি সদস্য মালেকা বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। জমি দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়ার পর এক হিন্দু পরিবারের জমির ওপর নিজের অধিকার দাবি এবং পাঁচ লাখ টাকা না দিলে জমি ছেড়ে না দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন পার্থ চক্রবর্তী নামের এক ব্যক্তি। এ ঘটনায় তিনি শ্রীমঙ্গল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, জীবিকার প্রয়োজনে প্রায় চার বছর আগে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সিলেট শহরে বসবাস শুরু করেন ফ্রিল্যান্সার পার্থ চক্রবর্তী। সিলেটে যাওয়ার সময় প্রতিবেশী মালেকা বেগমকে নিজের জমিজমা দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে যান তিনি। এরপর থেকে ওই জমিতে চাষাবাদ করতেন মালেকা বেগম।
পার্থ চক্রবর্তীর দাবি, জমি দেখাশোনার সুযোগ নিয়ে একপর্যায়ে মালেকা বেগম জমির ওপর নিজের অধিকার দাবি করতে শুরু করেন। বর্তমানে তাঁরা নিজেদের জমিতে যেতে পারছেন না। জমি বন্ধক ও বিক্রির বায়না বাবদ পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার দাবি তুলে মালেকা বেগম জমি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন বলেও অভিযোগ তাঁর।
সম্প্রতি পার্থ চক্রবর্তী বলেন, “আমরা এখন নিজেদের জমিতে যেতে পারছি না। মালেকা বেগম দাবি করছেন, তাঁর কাছে জমি বন্ধক ও বিক্রির বায়না দিয়ে পাঁচ লাখ টাকা নিয়েছি। টাকা না দিলে জমি ছাড়বেন না বলে হুমকি দিচ্ছেন।”
নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে এ ঘটনায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন পার্থ।
অভিযোগকারী পক্ষ জানিয়েছে, পার্থ চক্রবর্তীর পাশাপাশি তাঁর কাকাতো ভাই রাজীব চক্রবর্তীর জমি নিয়েও বিরোধ রয়েছে। জমির দখল ও অর্থ লেনদেনসংক্রান্ত এসব অভিযোগের তদন্ত করছে পুলিশ বলে তাদের দাবি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মালেকা বেগম। গণমাধ্যমকর্মীদের তিনি বলেন, পার্থ চক্রবর্তী ও তাঁর কাকাতো ভাই রাজীব চক্রবর্তীর কাছ থেকে পৃথক দুটি লিখিত চুক্তির মাধ্যমে জমি বন্ধক ও বিক্রির বায়না বাবদ মোট পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছেন তিনি।
মালেকা বেগমের ভাষ্য, ২০২৩ সালের ২৮ মে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে ৩১ শতাংশ কৃষিজমি বন্ধক নেন তিনি। পরে ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তিন লাখ টাকায় আট শতাংশ জমি বিক্রির বায়না চুক্তি হয়। তিন মাসের মধ্যে জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার কথা থাকলেও এখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করছেন বলে দাবি করেন তিনি।
জমিসংক্রান্ত অভিযোগের তদন্তকারী শ্রীমঙ্গল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তামিম হোসেন গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, বিষয়টির সমাধানের লক্ষ্যে উভয় পক্ষকে থানায় তলব করা হয়েছে। দুই পক্ষের বক্তব্য শোনা এবং অভিযোগপত্র ও ইউপি সদস্যের দাখিল করা কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মালেকা বেগম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অতীতেও জমি দখল, চাঁদা দাবি, হয়রানি এবং অনুমতি ছাড়া জমি থেকে মাটি কাটার অভিযোগ উঠেছিল। এসব অভিযোগের কিছু বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
দৈনিক যুগান্তরে ২০২১ সালের ৪ আগস্ট প্রকাশিত ‘শ্রীমঙ্গলে এক নারী ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে মালেকা বেগমের বিরুদ্ধে বাড়ি দখল, চাঁদা দাবি, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের যুবলীগকর্মী আজমির আলী এলাকাবাসীর পক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, ইউপি নির্বাচনের পর মালেকা বেগমের ধারণা হয়েছিল, নোয়াগাঁও এলাকার শতাধিক সংখ্যালঘু পরিবার তাঁকে ভোট দেয়নি। এ কারণে স্থানীয় লোকজনকে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলা হয়।
গ্রামবাসীর অভিযোগের পর তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মালেকা বেগমকে সতর্ক করেছিলেন বলেও ওই সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
এ ছাড়া বিশ্বজিৎ গোস্বামী নামের এক ব্যক্তির কাছে মার্কেট নির্মাণের ঘটনায় ৫০ হাজার টাকা দাবি এবং টাকা না পেয়ে তাঁর দোকানঘরে তালা লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। প্রয়াত আছাদ মিয়ার একটি বাড়ি দখলের অভিযোগও ওই সংবাদ সম্মেলনে তোলা হয়েছিল। আছাদ মিয়ার ছেলে দুলনও সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন।
২০২৩ সালের ৪ মে মালেকা বেগমের স্বামী নান্নু মিয়ার বিরুদ্ধে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর জমি থেকে অনুমতি ছাড়া শ্রমিক দিয়ে জোরপূর্বক মাটি কাটার অভিযোগ ওঠে।
জানা গেছে, ওই সময় সাবেক চেয়ারম্যানের বড় ছেলে ঘটনাস্থলে গিয়ে মাটি কাটার কাজে বাধা দেন এবং তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান দুদু মিয়াকে ফোনে বিষয়টি জানান। পরে দুদু মিয়া ফোনে মাটি কাটা বন্ধের নির্দেশ দেন।
ওই ঘটনার পর একই জমির ওপর দিয়ে মালেকা বেগমের মেয়ে সোমা আক্তারের বিদ্যুৎ-সংযোগ নেওয়া নিয়েও বিরোধ তৈরি হয়। জমির মালিকপক্ষের অভিযোগ, সোমা আক্তার গোপনে, মালিকের অজ্ঞাতে ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে ওই সংযোগ নিয়েছেন।
জমির মালিকের অভিযোগ পাওয়ার পর মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পায় বলে জানা গেছে। এরপর ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সোমা আক্তারকে ১২ অক্টোবর ২০২৬-এর মধ্যে বিষয়টি সমাধানের জন্য একটি নোটিশ পাঠানো হয়। বর্তমানে বিষয়টি মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রশাসনিক প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, নোয়াগাঁও গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধ ও হয়রানির কারণে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কিছু পরিবার আর্থিক ও সামাজিক চাপে পড়েছে বলে অতীতে প্রকাশিত বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব পরিবারের কেউ কেউ জমি হারিয়েছেন, কেউ কম দামে জমি বিক্রি করে অন্যত্র চলে গেছেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়।
এর আগে একটি পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর বা টিপসই নিয়ে জমি আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে থানা-পুলিশ ও আদালতে মামলা-মোকদ্দমাও হয়েছিল ।
এ ছাড়া ২০০৫ সালে জমি নিয়ে বিরোধের ঘটনায় তৎকালীন এক সাবেক চেয়ারম্যান মালেকা বেগমের বিরুদ্ধে থানা ও আদালতে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
অতীতে জমি নিয়ে বিরোধ ও বিভিন্ন ধরনের হয়রানির কারণে নোয়াগাঁও গ্রামের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন বলে জানা গেছে। কেউ কম দামে জমি বিক্রি করেছেন, আবার কেউ হয়রানির মুখে জমি ফেলে চলে গেছেন। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে অতীতের অভিযোগের কিছু মিল রয়েছে বলেও জানা গেছে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন মহলের প্রতিনিধিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন পরিসরে ইউপি সদস্য মালেকা বেগম ও তাঁর মেয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।



















