img

শেখ মুজিবের মরণোত্তর বিচার হওয়া উচিত: এমপি কয়ছর

প্রকাশিত :  ০৭:৪৪, ০৮ নভেম্বর ২০২৬

 শেখ মুজিবের মরণোত্তর বিচার হওয়া উচিত: এমপি কয়ছর

সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমদ বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতার জন্য উত্তাল করে এক নেতা এ দেশ থেকে পালিয়েছিলেন। পাকিস্তানী বাহিনী ২৫ মার্চ রাতে যে গণহত্যা করেছিলো এর জন্য দায়ী সেই পালিয়ে যাওয়া নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। এজন্য তার মরণোত্তর বিচার হওয়া উচিত।

গতকাল শনিবার বিকালে ৩টায় শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন ঝিলমিল অডিটোরিয়ামে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

তিনি বলেন, সে সময় একজন সৈনিক থেকেও বুকে অসীম সাহস নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়েই তিনি ক্রান্ত হননি, বন্দুক হাতে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছেন, দেশকে লাল সবুজের পতাকা উপহার দিয়েছেন।

কয়ছর বলেনে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে ও পরে এদেশ নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছে। ১৯৭৫ সালে ষড়যন্ত্র হয়েছিলো, ১৯৯০ সালেও ষড়যন্ত্র হয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর এ দেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছে। যখনই দেশ বিরোধী চক্রান্ত হয়েছে ঠিক তখনই অর্থাৎ ‘ক্রাইসি মোমেন্ট’-এ জিয়াউর রহমান, বিএনপি এবং জিয়া পরিবার দেশের হাল ধরেছেন। এ দেশের মানুষ ১৯৭৫ সালে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উপর ভরসা রেখেছে বলেই সিপাহী জনতা মিলে তাকে মুক্ত করেছিলেন। বক্তব্যে বিপ্লব ও সংহতি দিবসের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন- শান্তিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাজি জালাল উদ্দিন। উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম-আহ্বায়ক রওশন খান সাগর ও যুগ্ম-আহ্বায়ক আবুল কাশেম নাঈমের যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন- সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি সদস্য আনছার উদ্দিন, ফারুক আহমেদ, নূর আলী, সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, এটিএম হেলাল, জেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আমিনুর রশিদ আমিন।

অন্যান্যদের মাঝে বক্তব্য দেন- শান্তিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সদস্য অজিত দাস, জয়কলস ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক ইলিয়াছ মিয়া, পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক তোফায়েল আহমেদ, পূর্ব পাগলা ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক এবাদুর রহমান এবাদ, পশ্চিম পাগলা ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক আওলাদ হোসেন, পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব মতিউর রহমান জায়গীরদার, পাথারিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব আক্কাস মিয়া, উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক রঞ্জিত সূত্রধর, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক কামাল পারভেজ স্বাজন ও উপজেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ওবায়দুল করিম মাসুম।

এসময় শান্তিগঞ্জ উপজেলা বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষকদল, ছাত্রদল, প্রজন্মদল সহ অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

সিলেটের খবর এর আরও খবর

img

সবুজের বুকে আলোর উৎসব: চা-বাগানে শ্যামা আরাধনা, দীপাবলির আনন্দ ও সম্প্রীতির মিলনমেলা

প্রকাশিত :  ০৮:২৭, ০৮ নভেম্বর ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: সবুজের ঢেউয়ে মোড়ানো পাহাড়ি টিলা, সারি সারি চা-গাছ আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা সিলেট অঞ্চল। ভোরের কুয়াশা সরিয়ে যখন রোদ এসে পড়ে চা-বাগানের পাতায়, তখন সবুজের বুকজুড়ে জেগে ওঠে এক অনন্য দৃশ্য। আর কার্তিকের অমাবস্যা এলে সেই সবুজের সঙ্গে মিশে যায় প্রদীপের আলো, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, ঢাকের বাদ্য আর দেবী বন্দনার সুর। রাতের অন্ধকারকে আলোকিত করে সিলেটের বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিকপল্লি ও মন্দির প্রাঙ্গণে শুরু হয় শ্যামাপূজা বা কালীপূজার আয়োজন।

চা-বাগানের কালীপূজা শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়; এটি শ্রমজীবী মানুষের বিশ্বাস, আশা-আকাঙ্ক্ষা, পারিবারিক বন্ধন, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক আবেগঘন প্রকাশ। প্রতিদিনের কঠোর পরিশ্রম আর সীমিত আয়ের জীবন পেরিয়ে কালীপূজা তাঁদের জীবনে নিয়ে আসে আনন্দের নতুন রং। অমাবস্যার রাতে প্রদীপ ও আলোকসজ্জায় সাজানো মন্দির, দেবী কালীর প্রতিমা এবং পূজার আনুষ্ঠানিকতা ঘিরে তৈরি হয় এক স্বতন্ত্র উৎসবের আবহ। এই আয়োজনের আবেদন স্থানীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে আকর্ষণ করে দেশি-বিদেশি পর্যটক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদেরও।

 ১৭২ বাগানের বাংলাদেশ

 বাংলাদেশের চা-শিল্প দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশ চা বোর্ডের ১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের নিবন্ধিত বাগানের তালিকা অনুযায়ী, দেশে  চা-বাগানের সংখ্যা ১৭২টি। এর মধ্যে সিলেট বিভাগের তিন জেলা—মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেটে—চা-বাগানের ঘনত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিলেট বিভাগেই রয়েছে ১৩৫টি চা-বাগান। ফলে দেশের চা-শিল্পের বিকাশ, উৎপাদন ও ঐতিহ্য রক্ষায় এ অঞ্চলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সবুজে ঘেরা এসব বাগান শুধু চা উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়, বহু শ্রমজীবী পরিবারের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যেরও আশ্রয়স্থল।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চা-শ্রমিকেরা তাঁদের শ্রমে গড়ে তুলেছেন এই শিল্পের ভিত। চা-পাতা তোলা, পরিচর্যা, প্রক্রিয়াজাতকরণসহ নানা কাজে তাঁদের নিরলস পরিশ্রমের ছাপ রয়েছে দেশের চা-শিল্পের প্রতিটি স্তরে। সেই শ্রমজীবী মানুষের জীবনেই কালীপূজা হয়ে ওঠে বছরের অন্যতম প্রতীক্ষিত ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব।

শ্রীমঙ্গলে কালীপূজার আলোর উৎসব

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ‘চায়ের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত। বিস্তীর্ণ চা-বাগান, টিলাঘেরা পথ, সবুজের সমারোহ এবং বৈচিত্র্যময় জনজীবনের কারণে এই অঞ্চল দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। কালীপূজার সময় এখানকার প্রকৃতি ও জনজীবনে যোগ হয় ভিন্ন মাত্রা।

বাগানের পথ ধরে এগোলে কোথাও দেখা যায় পূজার প্রস্তুতি, কোথাও প্রতিমা সাজানোর ব্যস্ততা, আবার কোথাও মন্দির ও পূজামণ্ডপ আলোকসজ্জায় সাজিয়ে তোলার আয়োজন। শিশু-কিশোরদের মধ্যে থাকে উৎসবের আনন্দ। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে প্রদীপের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। অমাবস্যার ঘন অন্ধকারে যখন একের পর এক প্রদীপ জ্বলে ওঠে, তখন চা-বাগানের সবুজ পরিবেশে তৈরি হয় এক অপূর্ব দৃশ্য।

ঢাকের আওয়াজ, শঙ্খধ্বনি ও মন্ত্রোচ্চারণে মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ। পরিচিত মানুষদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, আত্মীয়স্বজনের আগমন এবং একসঙ্গে পূজা উদ্‌যাপনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে উৎসবের নিজস্ব আবহ।

চা-বাগানের কালীপূজার বিশেষত্ব হলো এর আন্তরিকতা। আয়োজনের আকার বড় হোক বা ছোট—উৎসবের প্রাণ থাকে মানুষের অংশগ্রহণে, পারস্পরিক সহযোগিতায় এবং সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতায়। কোথাও প্রতিমা পূজার আয়োজন, কোথাও শ্যামাসংগীত, আবার কোথাও প্রদীপ প্রজ্বালন ও প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে পালিত হয় এই উৎসব।

শ্রমজীবী জীবনে কালীপূজার আনন্দ

বাংলাদেশের অনেক চা-বাগানের শ্রমিক পরিবারের পূর্বপুরুষেরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চা-শিল্পে কাজ করতে এসেছিলেন। সময়ের প্রবাহে তাঁদের উত্তরসূরিরা এ দেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও জনজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন। তাঁদের নিজস্ব ভাষা, লোকাচার, গান, নৃত্য ও উৎসবের ঐতিহ্য চা-বাগানের জীবনকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

চা-শ্রমিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ সনাতন ধর্মাবলম্বী। কালীপূজা তাঁদের কাছে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি পারিবারিক মিলন ও সামাজিক আনন্দের উপলক্ষ। বাগানের শ্রমিকপল্লির কাছাকাছি থাকা মন্দির বা পূজামণ্ডপকে ঘিরে শুরু হয় প্রস্তুতি। কেউ প্রতিমা ও মণ্ডপ সাজান, কেউ পূজার উপকরণ সংগ্রহ করেন, কেউ আবার আলোকসজ্জা ও অতিথি আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন।

অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও উৎসবকে ঘিরে পরিবারের জন্য নতুন পোশাক কেনার চেষ্টা থাকে। সামর্থ্য অনুযায়ী শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হয় নতুন জামাকাপড়। ঘরে ঘরে তৈরি হয় বিশেষ খাবার। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা, মন্দিরে যাওয়া, পূজায় অংশ নেওয়া এবং পরিচিতজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে উৎসবের রাত ও পরবর্তী সময় হয়ে ওঠে স্মরণীয়।

কালীপূজার অন্যতম আকর্ষণ হলো অমাবস্যার রাতে আলোকসজ্জা ও প্রদীপ প্রজ্বালন। বিশ্বাস ও ভক্তির আবহে দেবী কালীর আরাধনার পাশাপাশি অনেক পরিবারে চলে বিশেষ প্রার্থনা ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। কোথাও শ্যামাসংগীত, কোথাও ভক্তিমূলক গান, আবার কোথাও পূজা শেষে প্রসাদ বিতরণের আয়োজন থাকে।

এই আনন্দের পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও ভালোবাসা। তাই চা-শ্রমিকের কালীপূজার সৌন্দর্য শুধু প্রতিমার শৈল্পিকতা কিংবা আলোকসজ্জায় নয়; বরং সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও উৎসবকে আপন করে নেওয়ার আন্তরিকতায়।

পুরাণে দেবী কালীর আবির্ভাব ও মাহাত্ম্য

হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যে দেবী কালী শক্তি, সাহস, অশুভ বিনাশ এবং অধর্মের বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক। দেবীমাহাত্ম্য বা চণ্ডীতে দেবী কালীর আবির্ভাব ও অসুরবিনাশের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে।

পুরাণকথা অনুসারে, অসুরদের অত্যাচারে দেবতারা যখন বিপর্যস্ত, তখন দেবী দুর্গার ক্রোধ থেকে আবির্ভূত হন দেবী কালী। চণ্ড ও মুণ্ড নামের দুই অসুরকে বধ করার পর দেবী চামুণ্ডা নামেও পরিচিত হন। পরবর্তী সময়ে রক্তবীজ নামের অসুরের সঙ্গে যুদ্ধে দেবী কালী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রক্তবীজের শরীর থেকে মাটিতে রক্তের ফোঁটা পড়লেই নতুন অসুরের জন্ম হতো। দেবী কালী তাঁর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই পান করে অসুরবাহিনীকে পরাস্ত করেন—এমন বর্ণনা রয়েছে পুরাণে।

দেবী কালীর আবির্ভাব নিয়ে আরেকটি পৌরাণিক বর্ণনায় শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামের দুই অসুরের অত্যাচারের কথা পাওয়া যায়। অসুরদের হাতে দেবতারা স্বর্গরাজ্য হারালে দেবতারা আদ্যাশক্তি মহামায়ার শরণাপন্ন হন। দেবীর শরীর থেকে কৌশিকী শক্তির আবির্ভাব এবং তাঁর কৃষ্ণবর্ণ রূপ ধারণের মধ্য দিয়ে কালীর আবির্ভাবের একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এই কাহিনির বিভিন্ন পাঠ ও ব্যাখ্যা হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থ ও ঐতিহ্যে প্রচলিত।

দেবী কালীর ভয়ংকর রূপের মধ্যেও নিহিত রয়েছে গভীর দার্শনিক তাৎপর্য। তাঁর কৃষ্ণবর্ণ রূপ অসীম শক্তি ও মহাবিশ্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। গলায় মুণ্ডমালা, হাতে অস্ত্র এবং পদতলে শিবের অবস্থান—এসব প্রতীকী উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে অশুভ শক্তির বিনাশ ও শক্তির চূড়ান্ত প্রকাশ ফুটে ওঠে।

প্রচলিত প্রতিমায় দেবী কালীকে সাধারণত চতুর্ভুজা রূপে দেখা যায়। তাঁর এক হাতে থাকে খড়্গ, অন্য হাতে অসুরের ছিন্নমুণ্ড এবং বাকি দুই হাতে থাকে বর ও অভয় প্রদানের মুদ্রা। গলায় নরমুণ্ডের মালা, এলোকেশি অবয়ব, কৃষ্ণবর্ণ শরীর এবং বাইরে বেরিয়ে থাকা রক্তবর্ণ জিহ্বা তাঁর পরিচিত প্রতিমার বৈশিষ্ট্য। শিবের বুকে পদার্পণ করা দেবীর এই রূপও বহুল পরিচিত। এসব প্রতীকের মধ্য দিয়ে শক্তি, সৃষ্টি, বিনাশ, সময় ও জগতের চিরন্তন পরিবর্তনের দর্শন প্রকাশ পায়।

ধর্মীয় বিশ্বাসে দেবী কালী ভক্তদের কাছে মা শ্যামা, আদ্যাশক্তি ও জগজ্জননী হিসেবে পূজিত হন। ভক্তদের বিশ্বাস, দেবীর আরাধনায় অশুভ শক্তির বিনাশ, ভয় থেকে মুক্তি এবং জীবনে শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

কালীপূজার ইতিহাস ও বাংলায় প্রতিমা আরাধনার প্রচলন

‘কালী’ শব্দটি ‘কাল’ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ রূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কাল বলতে সময়, মহাকাল কিংবা কৃষ্ণবর্ণ—বিভিন্ন অর্থ ও দার্শনিক তাৎপর্য বোঝানো হয়। হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যে দেবী দুর্গার শক্তিরূপ হিসেবেও কালী পরিচিত। প্রাচীন ধর্মীয় সাহিত্য ও মহাভারতেও কালরাত্রি বা কালীর উল্লেখ পাওয়া যায়।

তবে বাংলায় কালীপূজার প্রচলন ঠিক কোন সময়ে এবং কার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল, সে বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে একক সিদ্ধান্ত নেই। লোকপ্রচলিত একটি বিবরণ অনুযায়ী, নবদ্বীপের তান্ত্রিক সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ বাংলায় কালীমূর্তি নির্মাণ ও প্রতিমা আরাধনার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এর আগে বিভিন্ন সাধনাপদ্ধতিতে তাম্রপট, চিত্র বা প্রতীকের মাধ্যমে দেবীর উপাসনার প্রচলন ছিল বলে বর্ণনা পাওয়া যায়।

পরবর্তী সময়ে অষ্টাদশ শতকে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলায় কালীপূজার ব্যাপক প্রসার ঘটে বলে ঐতিহাসিক গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। জমিদার ও অভিজাত পরিবারগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় উনবিংশ শতকে কালীপূজা আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে রাজবাড়ি ও জমিদারবাড়ির গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ঘর, পাড়া-মহল্লা এবং মন্দিরেও এই পূজার বিস্তার ঘটে।

ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতায় কালীপূজা একদিকে তান্ত্রিক সাধনার সঙ্গে সম্পর্কিত থেকেছে, অন্যদিকে ভক্তি, মাতৃআরাধনা ও সামাজিক উৎসবের রূপ লাভ করেছে। বর্তমানে বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে শ্যামাপূজা বা কালীপূজা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

দেবী কালীর বিভিন্ন রূপ ও আরাধনার বৈচিত্র্য

হিন্দু শাস্ত্র ও ধর্মীয় ঐতিহ্যে দেবী কালীর একাধিক রূপের বর্ণনা পাওয়া যায়। এর মধ্যে দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, রক্ষাকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী ও চামুণ্ডা বিশেষভাবে পরিচিত। বিভিন্ন মন্দির ও অঞ্চলে দেবী ভবতারিণী, আনন্দময়ী ও ব্রহ্মময়ী নামেও পূজিত হন।

প্রতিটি রূপের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আলাদা ধর্মীয় তাৎপর্য, সাধনাপদ্ধতি ও লোকবিশ্বাস। দক্ষিণাকালীকে অনেক ক্ষেত্রে গৃহস্থের আরাধ্য দেবী হিসেবে দেখা হয়। শ্মশানকালী তান্ত্রিক সাধনার সঙ্গে সম্পর্কিত। ভদ্রকালী শুভশক্তি ও কল্যাণের প্রতীক হিসেবে পূজিত হন। রক্ষাকালীর আরাধনায় ভক্তরা বিপদ-আপদ থেকে রক্ষার প্রার্থনা করেন।

তন্ত্রশাস্ত্রে কালীকে আদ্যাশক্তির অন্যতম প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তান্ত্রিক সাধকেরা নির্দিষ্ট মন্ত্র, ধ্যান ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবীর আরাধনা করেন। অন্যদিকে সাধারণ গৃহস্থ পরিবারে পুরোহিতের মাধ্যমে প্রচলিত ধর্মীয় নিয়মে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। ফলে কালীপূজার আচার ও আয়োজন সব জায়গায় একরকম নয়।

কালীপূজার সময়কাল, আচার-অনুষ্ঠান ও প্রসাদ

বাংলায় সবচেয়ে পরিচিত কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয় কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে। দুর্গাপূজার পরবর্তী এই অমাবস্যা দীপান্বিতা অমাবস্যা নামেও পরিচিত। এদিন সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপে দেবী কালীর আরাধনা চলে।

এ ছাড়া মাঘ মাসে রটন্তী কালীপূজা এবং জ্যৈষ্ঠ মাসে ফলহারিণী কালীপূজাও বিশেষভাবে পালিত হয়। অনেক মন্দির ও সাধনাপীঠে প্রতি অমাবস্যায় কিংবা নির্দিষ্ট তিথিতে দেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়। কোথাও কোথাও প্রতি শনি ও মঙ্গলবারও কালী আরাধনার প্রচলন রয়েছে।

কালীপূজার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর মন্ত্র, ধ্যান, পূজার উপকরণ এবং মধ্যরাত্রিকেন্দ্রিক আচার-অনুষ্ঠান। বিশেষ করে তান্ত্রিক পদ্ধতিতে অমাবস্যার গভীর রাতে নির্দিষ্ট মন্ত্রোচ্চারণ ও বিধি অনুসারে পূজা সম্পন্ন করা হয়। তবে সব কালীপূজায় তান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না। গৃহস্থবাড়ি ও সর্বজনীন মণ্ডপে সাধারণত পুরোহিতের মাধ্যমে প্রচলিত পূজার নিয়মে দেবীর আরাধনা করা হয়।

পূজার ভোগ হিসেবে অঞ্চল ও পারিবারিক রীতি অনুযায়ী ফলমূল, মিষ্টি, লুচি, সুজি, পায়েসসহ নানা ধরনের নিরামিষ খাবার নিবেদন করা হয়। কোথাও কোথাও বিশেষ ভোগের আয়োজন থাকে। পূজা শেষে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলার কিছু শাক্ত ও তান্ত্রিক পূজায় পশুবলির প্রচলন ছিল। বিশেষ করে ছাগবলি এবং কিছু ঐতিহ্যে মহিষবলির উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে সব মন্দিরে বা সব পরিবারে এই রীতি অনুসরণ করা হয় না। অনেক জায়গায় সম্পূর্ণ নিরামিষ উপাচারেই দেবীর পূজা সম্পন্ন হয়। বর্তমানেও অঞ্চল, মন্দির ও পারিবারিক বিশ্বাস অনুসারে পূজার পদ্ধতিতে ভিন্নতা দেখা যায়।

প্রাচীনকালের কিছু লোককাহিনি ও ঐতিহাসিক বিবরণে ডাকাতদলের নরবলির প্রসঙ্গও পাওয়া যায়। তবে এসব বর্ণনাকে সাধারণ কালীপূজার স্বীকৃত বা প্রচলিত ধর্মীয় আচার হিসেবে দেখার কোনো ভিত্তি নেই। এগুলোকে মূলত বিচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ ও লোককথার বিষয় হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।

দীপাবলি: ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালানোর ঐতিহ্য

কালীপূজার সঙ্গে দীপাবলি বা দীপান্বিতার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ‘দীপাবলি’ শব্দের অর্থ প্রদীপের সারি। কার্তিক মাসের অমাবস্যার এই রাতকে আলোর উৎসব হিসেবে পালন করেন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। বাংলায় এই অমাবস্যা তিথিতে অনেক পরিবারে দেবী কালীর আরাধনা করা হয়।

দীপাবলি পালনের পেছনে বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি ও আঞ্চলিক ঐতিহ্য রয়েছে। উত্তর ভারতের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, চৌদ্দ বছরের বনবাস শেষে রামচন্দ্র যখন সীতা ও লক্ষ্মণকে সঙ্গে নিয়ে অযোধ্যায় ফিরে আসেন, তখন নগরবাসী আনন্দে ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালিয়ে তাঁদের স্বাগত জানিয়েছিলেন। সেই ঐতিহ্য থেকেই দীপাবলিতে প্রদীপ জ্বালানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। আবার বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষ্ণের নরকাসুর বধ এবং অশুভ শক্তির বিনাশের কাহিনিও এই উৎসবের সঙ্গে যুক্ত।

দীপাবলির রাতে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ঘরের দরজা, জানালা, উঠান, বারান্দা, তুলসীতলা ও মন্দিরে মাটির প্রদীপ জ্বালান। পাশাপাশি মোমবাতি, বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জা ও বিভিন্ন রঙের বাতি দিয়ে সাজানো হয় বাড়িঘর। অনেক পরিবারে লক্ষ্মীপূজা, বিশেষ প্রার্থনা ও পারিবারিক ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার আয়োজনও থাকে। নতুন পোশাক পরা, মিষ্টি বিতরণ, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা এবং একসঙ্গে খাবার গ্রহণের মধ্য দিয়েও উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করা হয়।

প্রদীপ জ্বালানোর এই ঐতিহ্যের রয়েছে প্রতীকী তাৎপর্য। অন্ধকারের মধ্যে আলো জ্বালানো মানে অজ্ঞতার পরিবর্তে জ্ঞান, হতাশার পরিবর্তে আশা এবং অশুভের পরিবর্তে শুভশক্তির প্রতিষ্ঠার প্রার্থনা। তাই দীপাবলি শুধু বাহ্যিক আলোকসজ্জার উৎসব নয়; এটি মানুষের অন্তরের অন্ধকার দূর করে কল্যাণ ও শুভবোধ জাগ্রত করারও প্রতীক।

বাংলার চা-বাগানগুলোতেও কালীপূজার রাতে এই আলোর ঐতিহ্য বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। শ্রমিকপল্লির ছোট ছোট ঘরে জ্বলে ওঠে মাটির প্রদীপ ও মোমবাতি। মন্দিরের সামনে সাজানো হয় আলোর সারি। সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ ঘর সাজান, কেউ শিশুদের নিয়ে প্রদীপ জ্বালান, আবার কেউ পরিবারের সবার মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেন। অমাবস্যার রাতে এই সম্মিলিত আলোকসজ্জা চা-বাগানের প্রকৃতিতে তৈরি করে এক অনন্য উৎসবের আবহ।

 মধুপুরের সাফল্য, চায়ের গৌরব

 চা-শিল্পের ঐতিহ্যের পাশাপাশি উৎপাদন ও গুণগত মানেও সিলেট অঞ্চলের বাগানগুলোর অবদান উল্লেখযোগ্য। ২০২৬ সালের ২০ জুন শ্রীমঙ্গলে আয়োজিত ষষ্ঠ জাতীয় চা দিবসের অনুষ্ঠানে সর্বোচ্চ গুণগত মানের চা উৎপাদনের স্বীকৃতি পায় হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার মধুপুর চা-বাগান। একই অনুষ্ঠানে শ্রীগোবিন্দপুর চা-বাগান প্রতি একরে সর্বোচ্চ চা উৎপাদনের স্বীকৃতি লাভ করে।

 এই স্বীকৃতি শুধু একটি বাগানের অর্জন নয়; এটি চা-শ্রমিকদের শ্রম, দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতারও সম্মান। চায়ের গুণগত মান নিশ্চিত করার পেছনে যাঁরা প্রতিদিন নিরলস পরিশ্রম করেন, তাঁদের অবদানই এমন সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দেয়।

 চা-বাগানের এই অর্থনৈতিক সাফল্য আর কালীপূজার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পাশাপাশি দেখলে বোঝা যায়, বাগানগুলো কেবল উৎপাদনকেন্দ্র নয়। এগুলো মানুষের জীবন, স্মৃতি, পরিচয় ও সামাজিক সম্পর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ পরিসর।

 সম্প্রীতির মেলবন্ধনে কালীপূজা

 কালীপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব হলেও চা-বাগানের সামাজিক জীবনে এটি অনেক ক্ষেত্রেই মিলন ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের উপলক্ষ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বসবাস করেন; দৈনন্দিন কাজ, সামাজিক সম্পর্ক ও উৎসবের আনন্দে তাঁদের মধ্যে গড়ে ওঠে পরিচিতি ও সহযোগিতার বন্ধন।

 পূজার সময় পরিচিতজনদের শুভেচ্ছা জানানো, মণ্ডপে যাওয়া কিংবা উৎসবের আলোকসজ্জা উপভোগ করার মধ্য দিয়ে সেই সামাজিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও উৎসবের আনন্দে শামিল হন। তবে প্রতিটি বাগানের সামাজিক বাস্তবতা এক নয়; আয়োজন ও অংশগ্রহণের ধরনও স্থানভেদে ভিন্ন হতে পারে।

 চা-বাগানের এই বহুমাত্রিক জীবন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এখানে কালীপূজার সৌন্দর্য ফুটে ওঠে মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান এবং আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে।

 পর্যটনে নতুন আকর্ষণ: অমাবস্যার রাতে চা-বাগানে আলোর মেলা

 প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য সিলেট অঞ্চল আগে থেকেই পর্যটকদের আকর্ষণ করে। কালীপূজার সময় চা-বাগানের উৎসবমুখর পরিবেশ সেই আকর্ষণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। সবুজ টিলার পটভূমিতে মন্দির, দেবী কালীর প্রতিমা, অমাবস্যার রাতে প্রদীপের আলো এবং শ্রমজীবী মানুষের উৎসব আয়োজন—সব মিলিয়ে তৈরি হয় স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।

 দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য এই অভিজ্ঞতা শুধু ছবি তোলা কিংবা প্রকৃতি দেখা নয়; বরং চা-শ্রমিকদের জীবন, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে কাছ থেকে জানার সুযোগ। বিশেষ করে অমাবস্যার রাতে মন্দির ও পূজামণ্ডপের আলোকসজ্জা চা-বাগানের প্রাকৃতিক পরিবেশে এক ভিন্ন সৌন্দর্য সৃষ্টি করে।

 তবে পর্যটনের বিকাশে স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি, ব্যক্তিগত পরিসর ও স্বাভাবিক উৎসব উদ্‌যাপনের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা জরুরি। পূজামণ্ডপে ছবি তোলা, ভিডিও ধারণ কিংবা উৎসব উপভোগের ক্ষেত্রে স্থানীয় আয়োজকদের অনুমতি ও নির্দেশনা মেনে চলা প্রয়োজন।

 পরিকল্পিত সাংস্কৃতিক পর্যটন স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে চা-বাগানের ইতিহাস, শ্রমিকদের অবদান এবং তাঁদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

 অমাবস্যার অন্ধকারে সবুজে জ্বলে উৎসবের আলো

 চা-বাগানের কালীপূজার মূল শক্তি তার মানুষ। তাঁদের শ্রমে সবুজ হয় পাহাড়ি ঢাল, তাঁদের ঘামে সমৃদ্ধ হয় চা-শিল্প, আর তাঁদের বিশ্বাস ও ভালোবাসায় প্রাণ পায় উৎসব। নতুন পোশাকের আনন্দ, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, মন্দিরে প্রার্থনা, প্রদীপ জ্বালানো আর পরিচিতজনদের সঙ্গে মিলন—এসব ছোট ছোট মুহূর্ত মিলেই গড়ে ওঠে কালীপূজার বড় ছবি।

 বাংলাদেশের ১৭২টি নিবন্ধিত চা-বাগানের বিস্তৃত পরিসরে চা-শিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে মানুষের ইতিহাস ও সংস্কৃতির বহুবর্ণ অধ্যায়। এর মধ্যে সিলেট বিভাগের ১৩৫টি চা-বাগান এই শিল্পের ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছে। সিলেটের চা-বাগানে কালীপূজা সেই অধ্যায়েরই এক আবেগময় প্রকাশ।

 কার্তিকের অমাবস্যার রাতে যখন চারপাশ ঘন অন্ধকারে ঢেকে যায়, তখন চা-বাগানের মন্দিরে জ্বলে ওঠে সারি সারি প্রদীপ। শ্রমিকপল্লির ঘরে ঘরে জ্বলে মাটির প্রদীপ ও মোমবাতি। সবুজ চা-পাতার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসে ঢাকের শব্দ, মন্ত্রোচ্চারণ ও শ্যামাসংগীত। আলোর সেই আবহে মনে হয়—প্রকৃতির সৌন্দর্য, মানুষের বিশ্বাস আর উৎসবের আনন্দ এখানে একসূত্রে গাঁথা।

এই কালীপূজা তাই কেবল পূজামণ্ডপের আলো কিংবা দেবী আরাধনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি চা-শ্রমজীবী মানুষের আশা, ঐতিহ্য, আত্মপরিচয়, বিশ্বাস ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। অমাবস্যার অন্ধকারে প্রদীপের ক্ষুদ্র শিখার মতোই তাঁদের জীবনে এই উৎসব জ্বালিয়ে রাখে আনন্দ, ভালোবাসা ও আগামীর আশার আলো।

সিলেটের খবর এর আরও খবর