img

ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার

প্রকাশিত :  ১১:০৫, ০২ মে ২০২৩

ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার

 ড. ইকবাল কবীর মোহন

১৮৮৬ সালের কথা। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকরা শ্রমের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আত্মদান করেছিল। তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৮৯০ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। দুনিয়ার প্রতিটি দেশে পহেলা মে তারিখে নানা আয়োজনে দিবসটি পালিত হয়। বাংলাদেশও দিবসটি গুরুত্বসহকারে পালন করে। মেহনতি মানুষের প্রতি মর্যাদার স্মারক মহান পহেলা মে। এ দিবসে বাংলাদেশে সরকারি ছুটির দিন। 

মাঝেমধ্যে নিরীহ শ্রমিকরা ক্ষোভ ও হতাশায় প্রতিবাদী হলেও ক্ষমতাশালী ও অর্থশালী মালিকরা কঠোরভাবে তাদের দমন করত। তার পরও শ্রমিকরা থেমে যায়নি। এভাবে এলো ১৮৮৪ সাল। আমেরিকার ‘ফেডারেশন অব লেবার’ ওই বছর ৭ অক্টোবর প্রথমবারের মতো প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজের দাবি তুলল। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের দাবি মানল না। তারা অনড় অবস্থান নিল। ফলে একসময় শ্রমিকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বিস্ফোরণের আকার ধারণ করল। কাজের সময় ৮ ঘণ্টা নির্ধারণ, মজুরির পরিমাণ বৃদ্ধি ও কাজের উন্নত পরিবেশ তৈরিসহ শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ে ১৮৮৬ সালের পহেলা মে ‘হে মার্কেট’র শিল্পশ্রমিকরা ধর্মঘটের ডাক দিল। তিন লাখ শ্রমিক ধর্মঘটে যোগ দিলে সব কল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। শিকাগোর হে মার্কেটের বিশাল শ্রমিক সমাবেশে মালিকপক্ষ ও পুলিশ হামলা চালালে ১১ জন শ্রমিক মারা গেল। তা ছাড়া শ্রমিক ধর্মঘট সংঘটিত করার অপরাধে শ্রমিক নেতা ‘আগস্ট স্পিজ’সহ আটজনের বিরুদ্ধ মামলা দায়ের করা হলো। তারপর প্রহসনমূলক বিচার অনুষ্ঠান করে সরকার ১৮৮৭ সালে ‘আগস্ট স্পিজ’সহ ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর করল। তবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনকে স্তব্ধ করা গেল না। মালিকরা বাধ্য হয়েই অনেক কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে শ্রম সময় ৮ ঘণ্টা নির্ধারণ করা শুরু করল। তবে মেহনতি মানুষের প্রকৃত মজুরির সঠিকভাবে নির্ধারিত হলো না।

তবে মাত্র চার বছর পর ১৮৮৯ সালে আন্তর্জাতিক শ্রমিক কংগ্রেসে শিকাগোর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও আন্তর্জাতিক সংহতি প্রকাশের জন্য এক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তখন প্রতিবছর পহেলা মে ‘শ্রমিক দিবস’ পালনের ঘোষণা প্রদান করা হয়। এভাবেই আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের সূচনা হয়। এরপর ১৮৯০ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে পহেলা মে ‘শ্রমিক দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। এর ফলে একটা কাঠামোর মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে। 

বাংলাদেশেও পহেলা মে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পালন করা হয়। এদিন সরকারি ছুটির দিন। এই দিবসে শ্রমিক সংগঠনগুলো নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করে। রাষ্ট্রের সরকারি দল ও বিরোধী দলসহ অন্য বিভিন্ন সংগঠনও দিনটি পালন করে থাকে। তবে সত্যিকথা বলতে কী, শ্রমিক দিবস কাগজে-কলমে একটি আন্তর্জাতিক দিবস হলেও শ্রমিকের প্রকৃত অধিকার আজও প্রতিষ্ঠা হয়নি। আজও শ্রমিক শোষণ ও নিপীড়ন বন্ধ হয়নি। নিশ্চিত হয়নি শ্রমিকের বেঁচে থাকার অধিকার। মালিকরা শ্রমিকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এখনো পিছিয়ে আছে। ফলে আজও শ্রমিক লাঞ্ছনার ঘটনা অহরহ ঘটছে। ফলে প্রায়ই শ্রমিক-মালিক দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। এখনো শ্রমের প্রকৃত মূল্যের জন্য শ্রমিকদের রাস্তায়, কারখানায় বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। এর মূল কারণ আদর্শিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অভাব। শ্রমিকরাও যে মানুষ এবং তাদেরও যে উন্নত জীবন-জীবিকার অধিকার আছে তা বস্তুবাদী আদর্শগুলো নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়নি। লক্ষ করলে দেখা যায়, যাঁরা শ্রমিকের জন্য আইন ও বিধান তৈরি করছেন, তাঁরা নিজেরাই শোষক ও ধনিকশ্রেণির লোক অথবা মালিকপক্ষের স্বার্থরক্ষায় তৎপর।

এরই প্রেক্ষাপটে ইসলামী আদর্শ সত্যিকার সমাধান পেশ করেছে। একমাত্র ইসলাম শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করেছে। প্রায় দেড় হাজার বছর আগে মহানবী মুহাম্মদ (সা.) খেটে খাওয়া মানুষের স্বার্থ সমুন্নত করে গেছেন। আল্লাহর নবী (সা.) শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। নবীজি (সা.) প্রণীত নীতি ও আদর্শ আজও সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে অনন্য আদর্শ হিসেবে বিবেচিত। আল্লাহ প্রদত্ত বিধানের আলোকে মহানবী (সা.) যে শ্রমনীতি ঘোষণা করেছিলেন তা শ্রমিক ও মেহনতি মানুষকে প্রকৃত মুক্তির পথ দেখিয়েছিল। শ্রমিক ও মালিকের সম্পর্ক ন্যায়নীতি ও সমতার মাপকাঠিতে নির্ধারণ করেছে ইসলাম। শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক ‘ভাই ভাই’ বলে মহানবী (সা.) অভিহিত করেছেন। মহানবী (সা.) বলেন,  ‘যারা তোমাদের কাজ করছে তারা তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি)

আল্লাহর নবী (সা.) অন্য এক হাদিসে বলেছেন, ‘তোমরা যা খাবে তা থেকে তাদের (শ্রমিককে) খাওয়াবে এবং যা পরিধান করবে তা তাকে পরিধান করতে দেবে।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

ইসলামী আইন মতে, ‘শ্রমিক নিয়োগ করলে তার মজুরি কত হবে তা অবশ্যই তাকে জানিয়ে দেবে।’ (হিদায়া) শ্রমিকের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়ে নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমরা অধীনদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে এবং তাদের কোনো রকমের কষ্ট দেবে না। তোমরা কি জানো না, তাদেরও তোমাদের মতো একটি হৃদয় আছে। ব্যথা দানে তারা দুঃখিত হয় এবং কষ্টবোধ করে। আরাম ও শান্তি প্রদান করলে সন্তুষ্ট হয়। তোমাদের কী হয়েছে যে তোমরা তাদের প্রতি আন্তরিকতা প্রদর্শন করো না।’ (সহিহ বুখারি)

শ্রমিকরাও মানুষ। তাদের শক্তি-সামর্থ্য ও মানবিক অধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখা জরুরি। এ বিষয়ে মহানবী (সা.) বলেন,  ‘মজুরদের সাধ্যের অতীত কোনো কাজ করতে তাদের বাধ্য করবে না। অগত্যা যদি তা করাতে হয় তবে নিজে সাহায্য করো।’ (সহিহ বুখারি)

আল্লাহর নবী (সা.) আরো বলেন, ‘শ্রমিককে এমন কাজ করতে বাধ্য করা যাবে না, যা তাকে সেটির দুঃসাধ্যতার কারণে অক্ষম ও অকর্মণ্য বানিয়ে দেবে।’ (সহিহ বুখারি)

মহানবী (সা.) শ্রমিকের ওপর নির্যাতন করার পরিণাম সম্পর্কে বলেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে স্বীয় দাস-দাসীকে (শ্রমিককে) প্রহার করবে কিয়ামতের দিন তাকে তার পরিণাম দেওয়া হবে।’ (বায়হাকি)

শ্রমিকের মজুরি যথাসময়ে পরিশোধ করার প্রতি মহানবী (সা.) গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেছেন,  ‘মজুরকে তার গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই মজুরি পরিশোধ করে দাও।’ (ইবনে মাজাহ)

প্রতিবছর বিশ্বের দেশে দেশে মে দিবস পালিত হচ্ছে। শ্রমিক দিবসে নানা আয়োজনে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তার পরও শ্রমের মূল্য, শ্রমিকের মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আজও ছিনিমিনি খেলে মালিকরা। প্রকৃত অর্থে শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আজও শ্রমিকরা মালিকদের নানা রকম অবহেলা ও উপেক্ষার শিকার হচ্ছে। ফলে এখনো ন্যায্য মজুরির দাবিতে শ্রমিকরা নানা দেশে সংগ্রাম করছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি মালিক-শ্রমিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিতে ইসলাম যে শ্রমনীতি ঘোষণা করেছে, তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা গেলে শ্রমিকের অধিকার ও মর্যাদা শতভাগ নিশ্চিত হবে। দূর হবে মালিক-শ্রমিক বিরোধ আর প্রতিষ্ঠিত হবে শ্রমের আসল মর্যাদা।

লেখক : প্রাবন্ধিক, শিশু-সাহিত্যিক, কলাম লেখক ও সিনিয়র ব্যাংকার

ধর্ম এর আরও খবর

img

জানা গেল ঈদুল আজহার সম্ভাব্য তারিখ

প্রকাশিত :  ০৬:০৫, ০৭ মে ২০২৬

মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহার সম্ভাব্য তারিখ বিভিন্ন দেশে ঘোষণা করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাব অনুযায়ী আগামী ২৭ মে ঈদুল আজহা উদযাপনের সম্ভাবনা রয়েছে।

সৌদি আরবের সরকারি ক্যালেন্ডার ‘উম আল কুরা’। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, জিলকদ মাসের ২৯তম দিন ১৬ মে এবং ১৭ মে ৩০তম দিন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অর্থাৎ মাসটি পূর্ণ ৩০ দিনের হয়ে জিলহজ মাস শুরু হতে পারে। জিলহজ মাসের ১০ তারিখে ঈদুল আজহা পালিত হয়। সে হিসাবে আগামী ২৭ মে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপনের সম্ভাবনা রয়েছে।

সৌদি আরবের মতো একই সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন পাকিস্তানের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।

তাদের মতে, চাঁদ দেখার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে দেশটিতে ২৭ মে ঈদ উদযাপন হতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ২৬ মে আরাফাতের দিন এবং ২৭ মে ঈদুল আজহা পালিত হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে।

ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে ঈদুল আজহা উদযাপন নিয়ে মুসলিম জীবনধারাভিত্তিক প্ল্যাটফরম হাইফেন জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে ২৭ বা ২৮ মে ঈদুল আজহা উদযাপন করা হবে।

বাংলাদেশে ঈদুল আজহার সম্ভাব্য তারিখ

ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে সড়ক যানজটমুক্ত রাখা, পশুর হাট স্থাপন, নিরাপত্তাসহ নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করছে বাংলাদেশ সরকার।

বাংলাদেশে সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর একদিন পর ঈদ উদযাপিত হয়। সে হিসাবে দেশে ২৮ মে (বৃহস্পতিবার) ঈদুল আজহা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে ঈদ উদযাপনের তারিখ চূড়ান্ত করা হবে। জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবে।