img

২৫০ প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনঃতফসিলের অনুমতি বাংলাদেশ ব্যাংকের, মেয়াদ সর্বোচ্চ ১৫ বছর

প্রকাশিত :  ০৬:৪৪, ১০ আগষ্ট ২০২৫

২৫০ প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনঃতফসিলের অনুমতি বাংলাদেশ ব্যাংকের, মেয়াদ সর্বোচ্চ ১৫ বছর

ক্রমশ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে আসায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমে গতি আনতে দেশের বড় করপোরেট ঋণখেলাপিসহ প্রায় ২৫০টি প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

প্রতিষ্ঠানগুলো এই সুবিধা অনুযায়ী তাদের ঋণ ৫ থেকে ১৫ বছরের জন্য পরিশোধের সুযোগ পাবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জনৈক কর্মকর্তারা জানান, এই সুবিধার আওতায় ডাউন পেমেন্ট মাত্র ১ শতাংশ থেকে শুরু হবে এবং কিস্তি পরিশোধ শুরু করার আগে তিন বছর পর্যন্ত সময় দেওয়া হবে। তবে শর্তগুলো প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আলাদা হবে।

যেসকল প্রতিষ্ঠান এই বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে তাদের মধ্যে রয়েছে- আবদুল মোনেম গ্রুপ, ড্যান্ডি ডাইং, তানাকা গ্রুপ, অরিয়ন গ্রুপ, দেশবন্ধু গ্রুপ, বেঙ্গল গ্রুপ, জিপিএইচ ইস্পাত, আনোয়ার গ্রুপ, শাদাব ফ্যাশন, অ্যাপেক্স উইভিং এবং আরও কিছু প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, মোট ১ হাজার ২৫০টি প্রতিষ্ঠান বিশেষ নীতি সহায়তার জন্য আবেদন করেছিল, যার মধ্যে ২৫০টি নির্বাচন করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিদেশি মুদ্রার ক্ষতি, জ্বালানি সংকট এবং রাজনৈতিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কোম্পানিগুলোকে সহায়তা করার জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের এই সুবিধার বাইরে রাখা হবে।

আব্দুল মোনেমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএসএম মঈনুদ্দিন মোনেম গণমাধ্যমকে বলেন, \'রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও করোনাসহ নানা কারণে আমাদের কাজ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। আগে আমরা মাসে ৫০টি প্রজেক্ট পেতাম, এখন তা নেমে এসেছে দু-একটিতে।\'

তিনি বলেন, \'২০২১ সালে আমি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নিলাম। তখন আমাদের ব্যাংক ঋণ ছিল দুই হাজার ১৩৭ কোটি টাকা। এরপর থেকে উচ্চ সুদের কারণে বকেয়া ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে।\'

তিনি প্রশ্ন তোলেন, \'১৬ শতাংশ সুদের কারণে কিস্তি পরিশোধ করার পরও বকেয়া শুধু বেড়ে যাচ্ছে। এত বেশি সুদ দিয়ে আমরা কীভাবে ব্যবসা করব?\'

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডলারের বিনিময় হার ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়াকেও দায়ী করে তিনি বলেন, \'আগে ডলারের দাম ছিল ৮০ থেকে ৮৬ টাকা। এখন সেটা ১২০ টাকা।\'

ওরিয়ন গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ওরিয়ন অয়েল অ্যান্ড শিপিংয়ের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৮২ কোটি টাকা। গত মার্চ পর্যন্ত তারা জনতা, রূপালী, এবি ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক এবং সিভিসি ফাইন্যান্সে ঋণখেলাপি হয়েছে।

ওরিয়ন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান ওবায়দুল করিম বলেন, তারা ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য বিশেষ নীতি সহায়তা পাবেন। তিনি বলেন, \'বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতার কারণে ওরিয়ন অয়েল অ্যান্ড শিপিং লিমিটেড খেলাপি হয়ে পড়েছে।\'

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কেবল অগ্রণী ব্যাংকেই ৯২৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে তানাকা গ্রুপের।

দেশবন্ধু গ্রুপও বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে এই নীতি সহায়তার অনুমতি পেয়েছে।

এই সুবিধা পেতে যাওয়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ড্যান্ডি ডাইং লিমিটেড, বেঙ্গল গ্রুপ, অ্যাম্বিয়েন্ট স্টিল বিডি, জিপিএইচ ইস্পাত, প্রাইম গ্রুপ, আনোয়ার গ্রুপ, সিল্কওয়ে গ্রুপ, সাদাব ফ্যাশন ও এপেক্স উইভিং।

এ ছাড়া, ডায়মন্ড স্পিনিং মিলস, মীম গ্রুপ (আলেমা টেক্সটাইল), এসএমএ গ্রুপ (এএ নিট স্পিন), বিইউসি অ্যাগ্রো, রাইজিং স্টিল, ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস, অঙ্কুর স্পেশালাইজড কোল্ড স্টোরেজ, সোরভ অ্যালুমিনিয়াম ওয়ার্কস, ইনটেনসিটি লিমিটেড ও গ্লোবাল অ্যাসেট লিমিটেডও এই বিশেষ সুবিধা পেতে যাচ্ছে।

জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, \'আমরা ব্যাংকের নিয়মিত গ্রাহক। তবে, উৎপাদন সম্পূর্ণ সচল রাখতে এবং ব্যাংকের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার প্রচেষ্টায় আমরা নীতিগত সহায়তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছি।\'

গত জানুয়ারিতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকার কারণে ঋণখেলাপি হয়ে যাওয়া করপোরেট ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে অফসাইট সুপারভিশন বিভাগের নির্বাহী পরিচালকের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এরপর থেকে কমিটি ডজনখানেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং ন্যূনতম ডাউন পেমেন্ট থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পরিশোধের জন্য বিভিন্ন শর্ত দিয়ে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।

কমিটির সদস্যদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই সহায়তা পাওয়ার জন্য আবেদন করার প্রাথমিক সময়সীমা ছিল ৩০ এপ্রিল। পরে তা বাড়িয়ে ৩১ মে করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমিটির একজন সদস্য বলেন, \'প্রতিষ্ঠান ভেদে সুনির্দিষ্ট চাহিদা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন নীতি সহায়তা দেওয়া হবে।\'

\'কিছু কোম্পানির ক্ষেত্রে ডাউন পেমেন্ট কমানো হতে পারে, আবার কিছু কোম্পানি দীর্ঘমেয়াদি সময় পেতে পারে। এসব সুবিধা দেওয়া হবে, যাতে তারা তাদের কার্যক্রমও চালিয়ে যেতে পারে,\' যোগ করেন তিনি।

তবে ব্যাংকাররা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই ধরনের সুবিধা দেওয়া হলে ঋণ পরিশোধ না করার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করতে পারে এবং ব্যাংকিং শৃঙ্খলাকে দুর্বল করতে পারে।

গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হঠাৎ খেলাপি ঋণ বেড়ে গত মার্চের শেষে রেকর্ড চার লাখ ২০ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

অনেক ঋণগ্রহীতা নীতি সহায়তা পাওয়ার আশায় কিস্তি পরিশোধ করছেন না। এর ফলে ব্যাংকগুলোর জন্য ঋণের টাকা ফেরত পাওয়া আরও কঠিন হয়ে গেছে।

ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, \'কিস্তির টাকা পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নীতি সহায়তার জন্য আবেদন করার পর প্রায় সব ঋণগ্রহীতাই কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।\'

ব্যাংকাররা আরো বলছেন, এই পদক্ষেপ ঋণ পরিশোধ না করার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করতে পারে এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা নষ্ট করতে পারে। বিশেষত, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া দীর্ঘদিনের খেলাপিরাও এই সুবিধা পাওয়ায় তারা এ নিয়ে শঙ্কিত। তাদের মতে, এই বৃহৎ আকারের ছাড় ব্যাংকিং খাতের গভীর সংকটেরই ইঙ্গিত।

মার্চ ২০২৫ এর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। গত বছর আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অনেক ঋণগ্রহীতা নীতি সহায়তার প্রত্যাশায় কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দেয়, যা ঋণ আদায়কে আরও কঠিন করে তুলেছে।

অর্থনীতি এর আরও খবর

img

বাসের পর এবার বাড়ল লঞ্চের ভাড়া

প্রকাশিত :  ১৬:০৭, ০৬ মে ২০২৬

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কারণে বাসের পর এবার বাড়ানো হয়েছে লঞ্চের ভাড়াও। একজন যাত্রীর লঞ্চ ভাড়া কম দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারে ১৮ পয়সা ও বেশি দূরত্বে ১৪ পয়সা বেড়েছে। কম দূরত্বে লঞ্চের ভাড়া ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ ও বেশি দূরত্বের ক্ষেত্রে ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার (৫ মে) লঞ্চের ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।

লঞ্চভাড়া প্রথম ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বের জন্য বর্তমান ভাড়া ২ টাকা ৭৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৯৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। যা শতাংশের হিসেবে ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি। অন্যদিকে, ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ২ টাকা ৩৮ পয়সা থেকে ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ বাড়িয়ে ২ টাকা ৫২ পয়সা করা হয়েছে। 

নতুন ভাড়া মঙ্গলবার (৫ মে) থেকেই কার্যকর হবে বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, ‘বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন (নৌরুট, পারমিট, সময়সূচি ও ভাড়া নির্ধারণ) বিধিমালা, ২০১৯’-এর ২৭ বিধি অনুযায়ী সরকার নৌযানে যাত্রী পরিবহনের জন্য জনপ্রতি সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন যাত্রী ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করেছে।

এর আগে গত ১৮ এপ্রিল জ্বালানি তেলে অকটেন, পেট্রল, কেরোসিনের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার। জ্বালানি তেলের নতুন দাম ১৯ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে কার্যকর হয়। এরপরই গণপরিবহনের ভাড়া বাড়াতে তৎপর হয়ে ওঠেন মালিক ও শ্রমিকরা। দফায় দফায় সরকারের সঙ্গে মিটিং করেন তারা।

পরে গত ২৩ এপ্রিল ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়ানোর ঘোষণা দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। ওইদিনই ভাড়া বাড়িয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে এ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ওইদিন থেকে কার্যকর হয় নতুন ভাড়া।

 


অর্থনীতি এর আরও খবর