img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : যে নিয়ামত আমরা কখনোই অবহেলা করতে পারি না

প্রকাশিত :  ০৭:১১, ১৩ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৭:২৪, ১৩ মে ২০২৬

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা : যে নিয়ামত আমরা কখনোই অবহেলা করতে পারি না

শায়খ জামাল আবদিনাসির

আজ আমি এমন একটি মহান নিয়ামতের কথা ভাবতে চাই, যেটার সঙ্গে আমরা এত অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে অনেক সময় এর মূল্যই অনুভব করি না।এই নিয়ামত আমাদের ধন-সম্পদ, বুদ্ধি, পরিবার বা নিজের চেষ্টার কারণে আসেনি। এটি এসেছে শুধু এই কারণে যে, আল্লাহ আমাদের অন্তরে এটি দান করেছেন।সেই নিয়ামত হলো ইসলাম।

একবার রাসূলুল্লাহ (সা:) তাঁর সাহাবিদের একটি দলকে একসঙ্গে বসে থাকতে দেখলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কেন এখানে একত্রিত হয়েছ? তারা বললেন, “আমরা আল্লাহর প্রশংসা করতে এবং আমাদেরকে ইসলাম ধর্ম দেওয়ার জন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করতে একত্রিত হয়েছি।

রাসূল (সাঃ) তাদের শপথ করে বলতে বললেন যে, এটাই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। তারা শপথ করলেন । তখন তিনি বললেন, তিনি সন্দেহের কারণে জিজ্ঞেস করেননি; বরং জিবরীল (আঃ) এসে তাঁকে জানিয়েছেন যে, আল্লাহ তায়ালা তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করছেন। সুবহানাল্লাহ! শুধু ইসলাম পাওয়ার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করার একটি মজলিস এত প্রিয় হয়ে যায় যে, আল্লাহ ফেরেশতাদের সামনে তাদের কথা উল্লেখ করেন।

তাই আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, আপনাদেরও প্রশ্ন করি । সর্বশেষ কবে আমি বা আমরা সত্যিকারভাবে আল্লাহকে ধন্যবাদ দিয়েছি আমাকে মুসলিম বানানোর জন্য?

আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমাদের ওপর আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন তোমরা পরস্পরের শত্রু ছিলে, তারপর তিনি তোমাদের হৃদয়গুলোকে মিলিয়ে দিলেন, ফলে তোমরা তাঁর অনুগ্রহে ভাই ভাই হয়ে গেলে। সূরা আলে ইমরান।

মসজিদের দিকে তাকান। ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন পরিবার ও সংস্কৃতির মানুষ এক কাতারে দাঁড়ায়। কী আমাদের এক ছাদের নিচে এনেছে? রক্তের সম্পর্ক নয়। ব্যবসা নয়। সংস্কৃতি নয়। ইসলাম আমাদের এক করেছে। আল্লাহ আমাদের হৃদয়গুলোকে মিলিয়েছেন।

আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলকে (সাঃ) উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি যদি পৃথিবীর সবকিছু ব্যয় করতেন, তবুও তাদের অন্তর এক করতে পারতেন না। কিন্তু আল্লাহ তাদের অন্তর মিলিয়ে দিয়েছেন। সূরা আনফাল।

এটি এমন একটি জিনিস যা টাকা দিয়ে কেনা যায় না। সোনা, রূপা, হীরা কিংবা পৃথিবীর সব সম্পদ দিয়েও কারও অন্তরে ঈমান প্রবেশ করানো সম্ভব নয়। হিদায়াত শুধু আল্লাহর হাতে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেক মানুষকে হেদায়াত দিতাম । সূরা সাজদাহ। তিনি আরো বলেন, আপনার রব ইচ্ছা করলে পৃথিবীর সবাই একসঙ্গে ঈমান আনত। সূরা ইউনুস। এরপর আল্লাহ আরও স্পষ্ট করে বলেন, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ ঈমান আনতে পারে না। সূরা ইউনুস। তাই কখনো মনে করবেন না যে ইসলাম শুধু বংশগতভাবে পেয়েছেন। এটা ভাববেন না, আমি মুসলিম কারণ আমার বাবা-মা মুসলিম।

নাহ। আপনি মুসলিম কারণ আল্লাহ আপনার হৃদয়ে ইসলাম প্রবেশ করতে দিয়েছেন।

এ জন্য আমাদেরকে সর্বদা বিনয়ী থাকতে হবে । কৃতজ্ঞ হতে হবে। আমাদের অন্তরে ভয় জাগানো উচিত,  যদি আমরা এই নিয়ামত হারিয়ে ফেলি! কারণ অনেক মানুষ ইসলাম পেয়েছিল, পরে পথ হারিয়েছে ।

রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ঈমান পুরনো কাপড়ের মতো ক্ষয় হয়ে যায় । নতুন কাপড় প্রথমে সুন্দর থাকে। কিন্তু যত্ন না নিলে রং ফিকে হয়ে যায়, বোতাম খুলে যায়, কাপড় দুর্বল হয়ে পড়ে। ঈমানও এমনই। আমি যদি এটাকে রক্ষা না করি, যদি না জানি কোন কাজ ঈমান বাড়ায় আর কোন কাজ কমায়, তাহলে একদিন হয়তো নিজেকে আল্লাহ থেকে দূরে দেখতে পাব।

তাহলে এই নিয়ামত কীভাবে রক্ষা করব? প্রথমত, অন্তরে স্বীকার করতে হবে যে, হেদায়াত আল্লাহর পক্ষ থেকে। আমার নামাজ, আমার ইসলাম, আমার “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলার তাওফিক সবই আল্লাহর দান।

দ্বিতীয়ত, মুখে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে। বলুন: আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাকে মুসলিম বানিয়েছেন । নিজের দ্বীন নিয়ে কখনো লজ্জা করবেন না । এটাই আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় সম্মান।

তৃতীয়ত, এই নিয়ামতকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যবহার করতে হবে । যখন আমি কাজ ফেলে জুমআর জন্য আসি, যখন সালাতে দাঁড়াই, যখন “আল্লাহু আকবার” বলে দুনিয়াকে পেছনে ফেলে দিই- তখন আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। কারণ প্রকৃত কৃতজ্ঞতা হলো ইবাদত।

রাসূল (সাঃ) এত দীর্ঘ সময় নামাজ পড়তেন যে তাঁর পা ফুলে যেত । তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি (সাঃ) বলতেন, আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হব না? এটাই একজন মুমিনের মানসিকতা । এর পাশাপাশি সবসময় আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে যেন তিনি আমাদের ইসলাম অটুট রাখেন ।

ইবরাহিম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) দোয়া করেছিলেন, হে আমাদের রব, আমাদেরকে আপনার অনুগত মুসলিম বানিয়ে দিন । সূরা বাকারা । ইউসুফ (আঃ) বলেছিলেন, আমাকে মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দিন এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করুন। সূরা ইউসুফ।

আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সাঃ)কে নির্দেশ দিয়েছেন ঘোষণা করতে যে, তাঁর জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর জন্য এবং তিনি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা আনআম, ৬:১৬২–১৬৩)। আর আল্লাহ আমাদেরকে সতর্ক করে বলেন, তোমরা মুসলিম না হয়ে কখনো মৃত্যুবরণ করো না। সূরা আলে ইমরান। আমরা কেউই আমাদের নিজের মৃত্যুর সময় নিয়ন্ত্রণ করি না। কিন্তু আমরা কী চাইব, কী চেষ্টা করব এবং কতটা কৃতজ্ঞ হব- তা আমাদের হাতে।

তাই আসুন, ইসলামের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি । আমাদের ঈমানকে রক্ষা করি।

গর্বের সঙ্গে ইসলামের কথা বলি । আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ইবাদতে ব্যবহার করি।

এবং বারবার আল্লাহর কাছে দোয়া করি — যেন তিনি আমাদের মুসলিম হিসেবে বাঁচান, মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দেন, মুসলিম হিসেবে পুনরুত্থিত করেন এবং মুসলিম হিসেবেই জান্নাতে প্রবেশ করান।

হে আল্লাহ, আপনি যেভাবে আমাদের অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও ইসলাম দান করেছেন, আমাদের গুনাহের কারণে তা আমাদের হৃদয় থেকে কেড়ে নেবেন না ।

হে আল্লাহ, আমাদের ঈমানকে হেফাজত করুন, আমাদের অন্তরে তা নতুন করে জাগ্রত করুন, আমাদেরকে সত্যের ওপর ঐক্যবদ্ধ রাখুন এবং আমাদের শেষ কথা যেন হয় 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'। আমীন।

শায়খ জামাল আবদিনাসির : ইস্ট লন্ডন মসজিদের অতিথি খাতিব । ৮ মে, শুক্রবার ২০২৬



ধর্ম এর আরও খবর

img

ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবা: সামার হলিডে শুধু বিনোদন নয়, পরিবার গড়ারও সময়

প্রকাশিত :  ১৭:১০, ১৫ আগষ্ট ২০২৬

শায়খ আব্দুল কাইয়ুম

সামার হলিডেকে শুধু ভ্রমণ, বিশ্রাম ও বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিবার ও সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন ইস্ট লন্ডন মসজিদের প্রধান ইমাম ও খতীব শায়খ আব্দুল কাইয়ুম। তিনি গত ৭ আগস্ট শুক্রবার ইস্ট লন্ডন মসজিদের জুমার খুতবায় এ আহবান জানান।  

তিনি বলেন, ছুটির এই সময় বাবা-মায়ের জন্য সন্তানদের সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটানো, তাদের ইসলামী চরিত্র গড়ে তোলা এবং বর্তমান সময়ের নানা বিভ্রান্তি ও ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

এ প্রসঙ্গে তিনি পবিত্র কুরআনের আয়াত উদৃত করেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।” [সূরা আত-তাহরিম: ৬]

তিনি বলেন, সন্তানের খাদ্য, পোশাক ও শিক্ষার ব্যবস্থা করাই শুধু বাবা-মায়ের দায়িত্ব নয়; বরং তাদের আল্লাহর পথে পরিচালিত করা, ঈমান ও উত্তম চরিত্রের সঙ্গে বড় হতে সহায়তা করাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

রাসুলুল্লাহ (সা:)এর হাদিস উল্লেখ করে তিনি বলেন, “তোমাদের প্রত্যেকেই একজন রাখাল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।” [বুখারি, মুসলিম]

শায়খ আব্দুল কাইয়ুম বলেন, সন্তানকে ভালোবাসার অর্থ তার সব দাবি মেনে নেওয়া নয়। প্রয়োজনের সময় ‘না’ বলতে জানা এবং তার ঈমান ও চরিত্রের জন্য ক্ষতিকর বিষয় থেকে তাকে রক্ষা করাও প্রকৃত ভালোবাসার অংশ।

হযরত লুকমান (আ.)-এর উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, তিনি স্নেহের সঙ্গে সন্তানকে উপদেশ দিয়েছিলেন, “হে আমার প্রিয় পুত্র, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না।” [সূরা লুকমান: ১৩] এতে সন্তানকে ভালোবাসা ও একই সঙ্গে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার একটি সুন্দর ভারসাম্য ফুটে ওঠে।

তিনি বলেন, আজকের শিশু-কিশোররা এমন এক ডিজিটাল পরিবেশে বেড়ে উঠছে, যেখানে সামাজিক সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তারা অনৈতিকতা ও ঈমান নিয়ে সংশয় এবং নানা ক্ষতিকর মতাদর্শের মুখোমুখি হতে পারে। তাই সন্তানদের পুরোপুরি মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল ডিভাইসের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।

তবে তিনি বলেন, প্রতিটি কথোপকথনকে জিজ্ঞাসাবাদে পরিণত না করে বাবা-মাকে এমনভাবে সন্তানের জীবনে উপস্থিত থাকতে হবে, যাতে তারা (মা-বাবা) বুঝতে পারেন সন্তান কী করছে এবং সন্তানও যেন খোলামনে নিজের কথা বাবা-মায়ের সঙ্গে ভাগ করতে পারে।

গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে নামাজ আদায়, প্রতিদিন কিছু সময় কুরআন তিলাওয়াত বা আলোচনা, মোবাইল ফোন থেকে দূরে থেকে একসঙ্গে খাবার খাওয়া এবং সন্তানদের মসজিদ, ইসলামি ক্লাস ও যুব কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।

একই সঙ্গে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা, একসঙ্গে দান-সদকা করা, উপকারী অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এবং পরিবার নিয়ে ভ্রমণের সময় আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা শেখানোর আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, সন্তানরা একদিন বড় হয়ে স্বাধীন হয়ে যাবে। তাই তাদের সঙ্গে বর্তমানের সময়টি সচেতনভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন।

রাসুলুল্লাহ (সা:) এর হাদিস উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আদমসন্তান যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তিনটি বিষয় ছাড়া তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। তার একটি হলো নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।” [মুসলিম]

সবশেষে তিনি দোয়া করেন, আল্লাহ যেন আমাদের সন্তানদের সব ধরনের প্রকাশ্য ও গোপন ফিতনা থেকে রক্ষা করেন, তাদের কুরআন ও নামাজের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন, উত্তম সঙ্গ দান করেন এবং তাদেরকে বাবা-মায়ের জন্য দুনিয়ায় চোখের শীতলতা ও আখিরাতে অব্যাহত সওয়াবের কারণ বানান। আমিন।


শায়খ আব্দুল কাইয়ুম : প্রধান ইমাম ও খতীব, ইস্ট লণ্ডন মস্ক এন্ড লন্ডন মুসলিম সেন্টার । জুমার খুতবা, শুক্রবার, ৭ আগস্ট ২০২৬।