রেইনবো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের জমকালো সমাপ্তি
নিলুফা ইয়াসমীন হাসান, লন্ডন: সার্বিকভাবে সফল ও সুন্দর একটি চলচ্চিত্র উৎসব শেষ হলো সম্প্রতি। কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের BLOC-এ বিপুল সংখ্যক দর্শকের সমাগমে পর্দা নামলো ২৭তম রেইনবো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের।
বিভিন্ন দেশের নান্দনিক ও জনপ্রিয় সিনেমা লন্ডনের দর্শকদের দেখার সুযোগ করে দিয়েছিল রেইনবো সোসাইটি। দেশীয় সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ছড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি অন্যান্য সংস্কৃতির সুউপাদানসমূহ গ্রহণের মাধ্যমে সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধি করার লক্ষ্যে এবারে অনুষ্ঠিত হলো ২৭তম রেইনবো ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। বহু মাত্রিক সাংস্কৃতিক সমাজের উপযোগী চলচ্চিত্রগুলো উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে।
প্রতিটি প্রদর্শনীতে দর্শকদের বিপুল সাড়া ছিল। উদ্বোধনী এবং সমাপনী দিনে দর্শনীর বিনিময়ে প্রদর্শিত ছবি ছিল হাউজফুল। ২৩শে মে রেইনবো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সমাপনী দিনে ভারতীয় বাংলা ভাষার নাট্যধর্মী চলচ্চিত্র 'স্বার্থপর' প্রদর্শিত হয়েছে। ছবিটি পরিচালনা করেছেন অন্নপূর্ণা বসু। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন কোয়েল মল্লিক, কৌশিক সেন এবং রঞ্জিত মল্লিক। চলচ্চিত্রের মূল কাহিনী ছিল বাস্তবধর্মী পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও সম্পত্তি নিয়ে। গল্পটি মূলত ভাই-বোনের নিপাট ভালোবাসার সম্পর্ক এবং পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে। অধিকার বনাম আত্মসম্মান:- ছোটবেলার স্মৃতিবিজড়িত পৈতৃক ভিটে থেকে বোন অপর্ণাকে তার অনুমতি ছাড়াই বঞ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেয় দাদা সৌরভ। কিন্তু বিয়ের পর আলাদা সংসারে থেকেও অপর্ণা নিজের পৈতৃক অধিকার ছাড়তে নারাজ। ছবিটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কীভাবে সমাজের চিরাচরিত নিয়মে নারীদের সম্পত্তি বা পারিবারিক সিদ্ধান্তে কোণঠাসা করে রাখা হয় এবং অপর্ণা চরিত্রটি তার অধিকারবোধ ও আত্মসম্মানের জন্য লড়াই করে।
২২শে মে প্রদর্শিত ‘গৃহ প্রবেশ’ সিনেমাটিও দর্শকদের বাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত পরিচালিত একটি আবেগঘন ও মনস্তাত্ত্বিক বাংলা পারিবারিক নাট্য চলচ্চিত্র, যা কিংবদন্তি পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রতি উৎসর্গীকৃত। গল্পের নায়িকা তিতলির (শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়) বিয়ের পর তার স্বামী শাওন কাজের সূত্রে বিদেশে চলে যায় এবং তারপর থেকে তার কোনো খোঁজ থাকে না। স্বামী-পরিত্যক্তা তিতলি শ্বশুর-শাশুড়ির আশ্রয়ে থেকে সেই বিশাল বাড়ির অভিভাবক হয়ে ওঠে। সময়ের সাথে সাথে বাড়ির শূন্যতা ও একাকীত্ব ঘোচাতে তিতলি সেই বাড়িতে একটি পেয়িং গেস্টের ব্যবস্থা করে। মেঘদূত (জিতু কামাল) নামে এক রহস্যময় অতিথি সেই বাড়িতে এসে ওঠে। মেঘদূতের আগমনের পর তিতলির জীবনে ধীরে ধীরে নতুন অনুভূতির জোয়ার আসে। তবে গল্পটি শুধু প্রেম বা সম্পর্কের ত্রিকোণ নয়, বরং এটি অপেক্ষা, আত্মপরিচয়, যৌনতা এবং সম্পর্কের বহুমুখী টানাপড়েনের এক গভীর বিশ্লেষণ।
১৮ই মে প্রদর্শিত হয়েছে বাংলাদেশের ছায়াছবি ‘নয়া মানুষ’। মূলত: নদীর চরে বসবাসরত বানভাসি ও প্রান্তিক মানুষের সুখ-দুঃখ এবং প্রকৃতির সঙ্গে তাদের লড়াইয়ের গল্প। আ. মা. ম. হাসানুজ্জামানের 'বেদনার বালুচর' গল্পের ওপর ভিত্তি করে মাসুম রেজার চিত্রনাট্যে সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে। সোহেল রানা বয়াতি পরিচালিত এটি তার প্রথম চলচ্চিত্র। নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভাসতে ভাসতে মানুষ এক চর থেকে অন্য চরে আশ্রয় নেয়। চরের এই প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার সংগ্রামই চলচ্চিত্রের মূল উপজীব্য। নদীর চরে যখন নতুন কোনো মানুষ আসে, তখন স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনে কী ধরনের সংকট, কৌতূহল এবং পরিবর্তনের সৃষ্টি হয়—তা চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। চরের বিচ্ছিন্ন জীবনের মাঝেও মানুষের আত্মিক সম্পর্ক, মানবিক দায়বদ্ধতা ও বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা গল্পটিতে ফুটে উঠেছে। অভিনয় করেছেন মৌসুমী হামিদ ও রওনক হাসান।
জোবায়দুর রহমান পরিচালিত বাংলাদেশী চলচ্চিত্র 'উড়াল' প্রদর্শিত হয়েছে ২০শে মে। এটি মূলত: একদল তরুণের যাপিত জীবন, প্রেম, তীব্র সম্পর্কের টানাপোড়েন, অনার কিলিং, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং অবিচার ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে তাদের প্রাণান্ত সংগ্রামের গল্প। সম্পর্কের জেরে পারিবারিক পরিমণ্ডলে অনার কিলিং (পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে হত্যার ঘটনা)-এর মতো সংবেদনশীল বিষয় এর মূল উপজীব্য। একটি মর্মান্তিক হত্যা ও বিচারহীনতার করুণ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় সিনেমার মূল প্লট।
উদ্বোধনী দিনে ১৭ই মে জেনেসিস সিনেমা হলে প্রদর্শিত হয়েছে বাংলাদেশের ছায়াছবি ‘আগন্তুক’। গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনার সাথে পরিচালনা করেছেন সুমন ধর। মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন পূজা চেরি এবং শ্যামল মওলা। সিনেমাটির মূল কাহিনি গড়ে উঠেছে একজন মুখোশধারী সাইকোলজিক্যাল সিরিয়াল কিলারকে ঘিরে, যে ‘ইতি’ নামের মেয়েদের টার্গেট করে একের পর এক খুন করে। পূজা চেরি একজন প্রাণোচ্ছল তরুণ সাংবাদিক। এই সিরিয়াল কিলিংয়ের রহস্য উদঘাটনের জন্য যখন তিনি গোপনে অনুসন্ধান চালাতে শুরু করেন, তখন নিজের অজান্তেই সেই ভয়ংকর খুনির ফাঁদে পা দিতে থাকেন।
উল্লেখ্য, গত ১৭ই মে রবিবার পূর্ব লন্ডনের ঐতিহাসিক জেনেসিস সিনেমা হলে উদ্বোধন হয়েছিল সপ্তাহব্যাপী রেইনবো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের। ২৭ তম এবারের এই উৎসবে প্রায় দশটি দেশের ৪০ টির বেশী চলচ্চিত্র প্রদর্শীত হবে। অংশগ্রহণকারী দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, সাউথ কোরিয়া, কিরগিজস্তান, তাজাকিস্তান, ফিলিপাইন, রাশিয়া, চীন, ইরান, আরমেনিয়া এবং ইউক্রেন। চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের ছয়টি সিনেমা প্রদর্শিত হয়েছে। তা হলো: ‘আগন্তুক’, ‘নয়া মানুষ’, ‘উড়াল’, ‘নয়া নোট’, ‘দ্য স্টোরি অফ এ রক (বাংলা)’, ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অফ চাংখারপুল’ (বাংলা)। ভারতের বাংলা সিনেমাগুলো হলো: ‘যত কাণ্ড কলকাতায়’, ‘গৃহপ্রবেশ’, ‘স্বার্থপর’, ‘অংক কি কঠিন’, ‘রাগু ডাকাত’ এবং ‘বিজয় নগরীর হীরে’।
ইরানের ‘They loved me’, ‘Gageriev’, ‘He does not sleep’, ‘Whispar my name’. রাশিয়ার ‘The Mystery of black hand’. চায়নার ‘The shore of life’. সাউথ কোরিয়ার Drained by dream’. কিরগিজস্তানের ‘Zhara’ এবং ‘KURAK’. তাজাকিস্তানের ‘Mohi Dar’. ফিলিপাইনের ‘Republika ng Pipolipinas’. এছাড়াও অনেকগুলো শর্ট ফিল্ম প্রদর্শিত হয়েছে। প্রতিটি সিনেমায় ইংলিশ সাব টাইটেল ছিল। চলচ্চিত্রপ্রেমীরা উপভোগ করেছেন প্রতিটি সিনে
রেইনবো সোসাইটির কর্ণধার উৎসব পরিচালক মি. মোস্তফা কামাল প্রতিবারের মত এবারও দর্শকদের বিপুল সাড়া পেয়েছেন উল্লেখ করে আগামী বছর রেইনবো ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এর ২৮তম আসর আরো জাঁকজমক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। বরাবরের মত এবারও চলচ্চিত্র উৎসবের সংবাদ ভালভাবে তুলে ধরার জন্য সত্যবাণী অনলাইন পোর্টাল ও অন্যান্য মিডিয়াকে এবং যারা সহযোগিতা করেছেন তাদেরকে তিনি ধন্যবাদ জানান। সমাপনী দিনে পুরো সপ্তাহব্যাপী চলা চলচ্চিত্র নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা এবং প্রতিদিন চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শেষে দর্শকদের বিভিন্ন আশাব্যঞ্জক মন্তব্য তুলে ধরেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব বুলবুল হাসান, কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের BLOC-এর মি. রুপার্ট ড্যানরয়থার। ট্রেইনি পরিচালক সামির কামালও চলচ্চিত্র উৎসব সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ বছর প্রয়াত রেইনবো ফিল্ম সোসাইটির ট্রাস্টি মিস জয়স্রী কবিরকে স্মরণ করা হয়। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান “আনন্দলোকে” দলীয়ভাবে পরিবেশন করা হয় এবং পুরো দর্শকও গানে অংশগ্রহণ করেন, যা অনুষ্ঠানে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে। সফল এই আয়োজন আবারও প্রমাণ করেছে যে, রেইনবো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব লন্ডনে বহুসাংস্কৃতিক চলচ্চিত্র, শিল্পচর্চা এবং কমিউনিটি সম্প্রীতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তার ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে।



















