স্যাটেলাইট চিত্র প্রকাশ

img

শি জিনপিংয়ের দিল্লি সফরের মধ্যেই ভারতীয় সীমান্তে অগ্রসর হচ্ছে চীনা সেনারা

প্রকাশিত :  ১০:০৭, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১০:১৩, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শি জিনপিংয়ের দিল্লি সফরের মধ্যেই ভারতীয় সীমান্তে অগ্রসর হচ্ছে চীনা সেনারা

ভারত-চীন সীমান্তের বিরোধপূর্ণ অরুণাচল প্রদেশে চীনের সামরিক উপস্থিতি ও অবকাঠামো নির্মাণের তৎপরতা দ্রুত বাড়ছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে নয়াদিল্লি সফরে রয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সীমান্তে চীনের তৎপরতা বৃদ্ধির খবরের সময়েই তাঁর ভারত সফর নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।

ভান্টর স্যাটেলাইট সংস্থার সরবরাহ করা ছবি বিশ্লেষণ করে দ্য ইনডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, অরুণাচলের আপার সুবনসিরি উপত্যকা সংলগ্ন একাধিক স্থানে নতুন ভবন, পাকা সড়ক ও একাধিক হেলিপ্যাড নির্মাণ করা হয়েছে। তিব্বতের লুনজে কাউন্টির উত্তরে ঝারি শহরের কাছাকাছি দুটি এলাকায় সবচেয়ে বেশি নির্মাণকাজ দেখা গেছে বলে জানিয়েছে ওপেন সোর্স গোয়েন্দা সংস্থা জেনস। তারা আরও জানায়, দুই দেশের দাবি করা সীমান্তরেখা মিলিয়ে দেখলে এসব স্থাপনার একাংশ বিতর্কিত এলাকার ভেতরেই পড়ে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঝারি শহরের দক্ষিণে ২০১৯ সালে শুরু হওয়া একটি নির্মাণকাজ এখনও চলছে, যেখানে জমি সমতলীকরণ, প্রকৌশল যন্ত্রপাতি ও কংক্রিট মিশ্রণ প্ল্যান্ট দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এটির সামরিক ব্যবহারও হতে পারে। এছাড়া লুনজের দক্ষিণে দুটি ছোট হেলিপ্যাডের জায়গায় একটি বড় হেলিপ্যাড এবং আরও দক্ষিণে নতুন আরেকটি হেলিপ্যাড তৈরি হয়েছে। আগস্ট ২০২৬-এর সর্বশেষ ছবিতে অন্তত একটি ভবনের ছাদ নির্মাণ সম্পন্ন দেখা গেছে, যা থেকে বোঝা যায় নির্মাণকাজ পূর্ণ গতিতে এগোচ্ছে।

সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের গ্রাম গেলেমোর একজন বাসিন্দা দ্য ইনডিপেনডেন্টকে জানান, চীনা বাহিনী তাদের পূর্বপুরুষের জমি দখল করে নিচ্ছে এবং কত দূর পর্যন্ত তারা ঢুকে পড়েছে তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়, তবে অনেকটা এলাকা তাদের দখলে চলে গেছে।

অল তাগিন স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সভাপতি তাদক পাকবার নেতৃত্বে আটজনের একটি প্রতিনিধিদল গত ১১-১৩ আগস্ট গেলেমো ও তাকসিং এলাকায় সরেজমিন তদন্ত চালায়। পাকবা জানান, চীনা অনুপ্রবেশের বর্তমান গতি "নজিরবিহীন", আর ভারতীয় বাহিনী পিছু হটছে অথচ চীনা বাহিনী এগিয়ে যাচ্ছে। তার দলের প্রতিবেদনে বলা হয়, জুন মাস থেকে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়েছে এবং গ্রামবাসীদের চিরাচরিত শিকার ও পশুচারণ এলাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি অভিযোগ করে, যে চীনা সেনাবাহিনী চারণভূমি ও বনভূমিতে সড়ক, সেতু ও সেনাশিবির তৈরি করেছে।

ক্ষমতাসীন বিজেপির জোটসঙ্গী পিপলস পার্টি অব অরুণাচলের একটি পৃথক প্রতিনিধিদলও তাকসিং, গেলেমো ও মাজা এলাকা ঘুরে দেখে। দলের সদস্য ও সাবেক রাজ্য মন্ত্রী কাপা বেংগিয়া জানান, চীনা সেনারা ইতিমধ্যে এগিয়ে এসেছে এবং ভারতীয় টহল দলকে নিজেদের এলাকাতেও যেতে দেওয়া হচ্ছে না।

ভারতীয় সেনাবাহিনী এসব অনুপ্রবেশের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে এগুলোকে "ভুল ও ভিত্তিহীন" বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, সীমান্ত পরিস্থিতির ওপরই দুই দেশের সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।

অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও চিয়াকুন জানিয়েছেন, চীন-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি সার্বিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।

অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর জানান, সিংহ বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সহায়তা দেওয়া হবে।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শ্রীকান্ত কোন্ডাপল্লির মতে, এটি চীনের পরিচিত "সালামি স্লাইসিং" কৌশলের অংশ — ধীরে ধীরে ছোট ছোট এলাকা দখল করে সংহত করা, একবারে বড় আক্রমণের বদলে। তিনি বলেন, প্রথমে কিছু ইয়াক সীমান্ত পার করে ছেড়ে দিয়ে ভারতীয় বাহিনীর প্রতিক্রিয়া যাচাই করা হয়; মাসের পর মাস বাধা না পেলে একটি ছোট কুঁড়েঘর তৈরি হয়, পরে তা স্থায়ী কাঠামোয় রূপ নেয়, শেষে পুরোদস্তুর সেনাশিবির গড়ে ওঠে। ভারতের নিয়ন্ত্রণরেখা পর্যন্ত নিয়মিত পৌঁছাতে না পারার কারণেই চীন এই সুযোগ পাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকা সংঘর্ষের পর এটিই শি জিনপিংয়ের প্রথম দিল্লি সফর, যে সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছিলেন। প্রায় ৪০০ কর্মকর্তার বিশাল প্রতিনিধিদল নিয়ে তিনি দিল্লি পৌঁছান, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সবচেয়ে বড় প্রতিনিধিদল। দুই দেশই সীমান্তে কোনো সক্রিয় উত্তেজনা নেই বলে বিষয়টি খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করছে।

 


আন্তর্জাতিক এর আরও খবর

img

ইরানে ভূপাতিত যুদ্ধবিমান: দুই মার্কিন সেনাকে ‘ভুয়া’ সাক্ষাৎকার দিতে চাপ দিয়েছিলেন হেগসেথ

প্রকাশিত :  ০৫:৫৮, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:০৭, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এ বছরের এপ্রিলে ইরানের আকাশে ভূপাতিত হওয়া মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের দুই সদস্যকে ‘ভুয়া’ সাক্ষাৎকার দিতে চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। মার্কিন গণমাধ্যম সিবিএসের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘৬০ মিনিটস’-এ সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথসহ পেন্টাগনের কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মকর্তা।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) একাধিক সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে সিএনএন। ‘৬০ মিনিটস’-এর নতুন মৌসুমের প্রথম পর্বে ওই সাক্ষাৎকার প্রচার হওয়ার কথা রয়েছে।

সিবিএস জানিয়েছে, সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে রাজি হওয়া মার্কিন সেনাকে শুধু ‘ব্রাভো’ নামে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে। তিনি ওই যুদ্ধবিমানের ওয়েপনস সিস্টেমস অফিসার ছিলেন এবং কর্নেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা। ইরানের পাহাড়ি এলাকায় প্রায় দুই দিন একা অবস্থান করার পর তাকে উদ্ধার করা হয়। এটি হবে ওই কর্মকর্তার ঘটনা ও উদ্ধার অভিযানের বিষয়ে প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্য।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথমদিকে দুই সেনাই সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, কার্যত তাদের ওই সাক্ষাৎকার দিতে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। পরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ উদ্ধার হওয়া দুই সেনার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে বৈঠক করেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত ‘ব্রাভো’ সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হন। তবে অপর সেনা, ‘আলফা’, এতে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান। ওয়াশিংটন এখনো তাদের কারও পরিচয় প্রকাশ করেনি।

সিএনএনের দাবি, এই ঘটনাটি দেখিয়েছে—ইরানের সঙ্গে অজনপ্রিয় যুদ্ধকে ঘিরে জনমত ও বয়ান নিজেদের অনুকূলে গড়ে তুলতে হেগসেথ কীভাবে ওই দুই সেনার বেঁচে থাকা ও উদ্ধার হওয়ার নাটকীয় ঘটনাকে কাজে লাগাতে চেয়েছেন।

তবে পেন্টাগন এ অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল সিএনএনকে বলেছেন, প্রতিবেদনটি ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’।

পারনেল বলেন, ‘সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে প্রত্যেক সেনার নিজস্ব ছিল—কারণ এটি তাদের গল্প।’

তিনি আরও বলেন, ‘সিএনএনও উল্লেখ করেছে, একজন সেনা সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং অন্যজন নেননি। পাশাপাশি, অপারেশনাল নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্যের উৎস ও পদ্ধতি সুরক্ষিত রাখতে প্রতিরক্ষা বিভাগ সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছে।’

‘৬০ মিনিটস’-এর সাংবাদিক নোরাহ ও’ডনেল ওই প্রতিবেদন তৈরির সময় হেগসেথ, মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এবং ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারেরও সাক্ষাৎকার নেন।

কীভাবে ভূপাতিত হয়েছিল যুদ্ধবিমানটি?

গত ৩ এপ্রিল ইরানের আকাশে মার্কিন এয়ার ফোর্সের এফ-১৫ই ‘স্ট্রাইক ঈগল’ যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর এটিই ছিল ইরানের হাতে ভূপাতিত প্রথম মার্কিন যুদ্ধবিমান।

বিমানটিতে থাকা দুই সেনাই প্যারাসুটে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ওই যুদ্ধ শুরু করেছিল ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি দূর করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক দুর্বল করার ঘোষিত লক্ষ্য নিয়ে।

যুদ্ধবিমানের পাইলটকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ধার করা হয়। কিন্তু ওয়েপনস সিস্টেমস অফিসার ইরানের দুর্গম এলাকায় আটকা পড়েন। তাকে উদ্ধারে মার্কিন বাহিনী ব্যাপক অভিযান শুরু করে। একই সময়ে ইরানি বাহিনীও তাকে খুঁজছিল।

ইসরাইল গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে মার্কিন উদ্ধার অভিযানকে সহায়তা করে। এমনকি নিখোঁজ মার্কিন সেনা যে এলাকায় অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল, সেখানে হামলাও পিছিয়ে দেয় ইসরাইল।

পাহাড়ে একা ছিলেন প্রায় দেড় দিন

বিমান থেকে নামার সময় ওই ওয়েপনস সিস্টেমস অফিসার অচেতন হয়ে পড়েন এবং মাথায় আঘাত পান। ফলে প্রথমদিকে তিনি উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি।

পরে তিনি যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হন। এরপর ইরানি বাহিনীর চোখ এড়িয়ে পাহাড়ি এলাকায় চলাচল করতে থাকেন। ইসরাইলি প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, তিনি প্রায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার পথ হেঁটে একটি পাহাড়ি ফাটলে লুকিয়ে ছিলেন এবং উদ্ধারের অপেক্ষা করছিলেন।

প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পর মার্কিন বিশেষ বাহিনী আহত ওই কর্মকর্তার কাছে পৌঁছায়। তাকে উদ্ধারে ব্যাপক বিমান সহায়তা দেওয়া হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন বলেছিলেন, ইরানি সেনারা বিপুল সংখ্যায় ওই মার্কিন সেনাকে খুঁজছিল এবং মার্কিন বাহিনী পৌঁছানোর সময় তারা তার অবস্থানের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল।

উদ্ধার অভিযানেও বড় বিপদ

ওই সেনাকে এবং উদ্ধারকারী দলকে ইরান থেকে বের করে আনার জন্য ব্যবহারের কথা ছিল দুটি মার্কিন পরিবহন বিমানের। কিন্তু প্রত্যন্ত একটি বিমানঘাঁটিতে গিয়ে বিমান দুটি আটকে পড়ে।

ইরানের হাতে বিমান দুটি চলে যাওয়ার আশঙ্কায় মার্কিন বাহিনী সেগুলো ধ্বংস করে দেয়। পরে বিকল্প বিমান এনে আহত কর্মকর্তাসহ উদ্ধারকারী দলকে ইরান থেকে বের করে আনা হয়।


আন্তর্জাতিক এর আরও খবর