img

পরাশক্তিগুলোর অনুধাবন করা উচিত, ক্ষমতা অসীম নয়: গুতেরেস

প্রকাশিত :  ১৯:১৭, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:১৯, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পরাশক্তিগুলোর অনুধাবন করা উচিত, ক্ষমতা অসীম নয়: গুতেরেস

বৈশ্বিক সংকটের গভীর বিভাজন এখন আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে পরাশক্তিগুলোর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, শুধু সামরিক, অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে এসব বৈশ্বিক সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।

মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে এ কথা বলেন সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

হতাশায় ঘেরা ওই ভাষণে ৭৭ বছর বয়সী পর্তুগিজ এ কূটনীতিক বলেন, ‘আমার ১০ বছরের দায়িত্বকালে বিশ্বজুড়ে ধ্বংসাত্মক পরিণতি নিয়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে, তা দীর্ঘায়িত হয়েছে। বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। মানবাধিকার পদদলিত হয়েছে। ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সেবাদানকারীরা প্রাণ হারিয়েছেন। আর আন্তর্জাতিক আইন ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলা হয়েছে।’

গুতেরেস বলেন, ‘ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হয়েছে। বৈষম্য তীব্র রূপ নিয়েছে। ধসে পড়েছে পারস্পরিক আস্থা। জলবায়ু সংকট এখন আর দূরবর্তী কোনো সতর্কবার্তা নয়, প্রতিদিনের নির্মম বাস্তবতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এমন অবিশ্বাস্য গতিতে এগিয়ে চলেছে, যা নির্মাতাদেরও দিশেহারা করে দিয়েছে।’

ইসরায়েলের নাম সরাসরি উচ্চারণ না করে তিনি বলেন, ‘২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের আক্রমণের পর গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর এমন এক হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে, যা মহাসচিব হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনকালে আগে দেখিনি।’

পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গুতেরেস মনে করেন, পুনর্গঠিত ও সর্বজনীন জাতিসংঘের অধীনে নতুন বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাই কেবল বর্তমান সংকট মোকাবিলার একমাত্র পথ। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘মানবজাতি যখন অভূতপূর্ব এক সংকটের মুখোমুখি, ঠিক তখন আমাদের সম্মিলিত সুরক্ষাকাঠামো মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে।’

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম না নিয়ে গুতেরেস বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘পরাশক্তিগুলোর এখন অনুধাবন করা উচিত, তাদের ক্ষমতা আসলে অসীম নয়। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিয়েছে- কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে শান্তি নিশ্চিত করা যায় না, অর্থনৈতিক শক্তি দিয়ে স্থিতিশীলতা আনা যায় না। কেবল প্রযুক্তিগত শক্তি দিয়ে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়।’

ভাষণে বিশ্ব অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ব্লকে বিভক্তি এবং আধিপত্যবাদী প্রবণতা এড়ানোর ওপর জোর দেন গুতেরেস। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার মূল চ্যালেঞ্জ হলো- ক্ষমতার কাঠামো যেভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, শাসনব্যবস্থা তার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না। রাষ্ট্রগুলোর হাত থেকে ক্ষমতার স্থানান্তর ঘটেছে গুটিকয়েক বেসরকারি কর্পোরেশন ও ধনকুবের ব্যক্তির হাতে। রাজনীতি, অর্থনীতি, তথ্যের প্রবাহ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি নাগরিক পরিসরে তাদের প্রভাব বিস্তার লাভ করেছে। মানুষ দিন দিন যন্ত্রের হাতে ক্ষমতা সঁপে দিচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টরা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠছে। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির অস্ত্র এখন সামরিক সত্যে পরিণত হয়েছে।

বর্তমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে গুতেরেস প্রশ্ন তোলেন— বিশ্ব কি ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা আর সঙ্কুচিত সহযোগিতার মাধ্যমে আরও বিভক্ত হবে, নাকি জাতিসংঘের নেতৃত্বে এক সুষম বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার দিকে মোড় নেবে? 

তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে আসল পরীক্ষা হলো, ক্ষমতা কী আইনের অধীনে পরিচালিত হবে, নাকি আইনের বাইরে? দ্বিমুখী নীতি বাদ দিয়ে আন্তর্জাতিক সনদ রক্ষা এবং ব্যতিক্রম ছাড়া বেসামরিক সব মানুষকে সুরক্ষা দিতে হবে।’

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধ করতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ত্রাণ সরবরাহের পথ উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়ে মনে করিয়ে দেন- গাজায় জাতিসংঘকে কাজ করতে দেওয়ার জন্য গত বছর আদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)।

গুতেরেস বলেন, ‘অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংসতা, ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ ও ইহুদি বসতি স্থাপন শান্তির পথকে গুড়িয়ে দিচ্ছে। জাতিগত নিধনের ভয়াবহ শঙ্কা তৈরি করছে। চোখের সামনে এই সংকটের সমাধান বিলীন হতে দেওয়া যায় না।’ 

ইউক্রেন প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, ‘রাশিয়ার আগ্রাসন জাতিসংঘ সনদের চরম লঙ্ঘন ঘটিয়ে একটি স্বাধীন দেশের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। এখন রাশিয়ার কিছু অঞ্চলে ঘরবাড়ি, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপর হামলা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলাকে হুমকির মুখে ফেলছে।’

২১ শতকের নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকাকে ‘অন্যায়’ আখ্যা দিয়ে গুতেরেস বলেন, ‘তহবিল সংকট ও নানা সমালোচনার মধ্যেও জাতিসংঘই একমাত্র জায়গা যেখানে শক্তিশালী পক্ষগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়।’ জাতিসংঘের ইতিহাসে এই প্রথম শীর্ষ নেতৃত্ব, প্রধান কার্যালয় ও পেশাদার পদে পুরুষের পাশাপাশি সমসংখ্যক নারী নিয়োগ নিশ্চিত করা গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

‘সমতা কোনো স্বপ্ন নয়, এটি একটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত’ উল্লেখ করে গুতেরেস বলেন ‘জাতিসংঘ যদি বদলে যেতে পারে, তবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পার্লামেন্ট, সরকার ও শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়াতেও বদল সম্ভব।’


আন্তর্জাতিক এর আরও খবর

img

জাতিসংঘে ইরানকে দুটি প্রস্তাব দিলেন ট্রাম্প

প্রকাশিত :  ১৭:৩৮, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের সামনে দুটি ভিন্ন পথের প্রস্তাব দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করে পুনর্গঠনের সুযোগ, অন্যদিকে চুক্তি না হলে সম্ভাব্য ভয়াবহ সংঘাতের মুখে পড়ার সতর্কতা দিয়েছেন তিনি।

বার্তা সংস্থা এএফপির তথ্য অনুযায়ী, ভাষণের শুরুতে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ নিয়ে কথা বলেন। তাঁর দাবি, দেশটির বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো অবস্থায় আছেন। চুক্তি না করলে ইরানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আমি কি তাদেরকে এমন নরকে ঠেলে দেব, যেখান থেকে বেঁচে ফেরার সুযোগ থাকবে না?’ হুমকির সুরে এমন কথা বললেও পরে জানান, আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির সম্ভাবনা আছে বলে তিনি মনে করেন।

ভাষণে এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রসঙ্গ তোলেন ট্রাম্প। বলেন, যুদ্ধ অবসানে নিকট ভবিষ্যতে মস্কো-কিয়েভের মধ্যে চুক্তি হতে পারে। আমরা দুই দেশের নেতাদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি। বিষয়টির সমাধান করব। মানুষ যতটা ধারণা করছে, তার চেয়েও দ্রুত সময়ে এটি ঘটবে।

আট যুদ্ধ বন্ধের দাবি

মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষণের একাংশ নিজেদের লাইভ ব্লগে তুলে ধরেছে আল জাজিরা। যুদ্ধ বন্ধে নিজের চেষ্টার প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আটটি যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন। এটি তাঁর কাছে অত্যন্ত সম্মানের বিষয়। অন্যরা যখন শুধু কথা বলে বেড়ায়, তখন তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন।

গত বছর জাতিসংঘ অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় সাতটি যুদ্ধ বন্ধের দাবি করেছিলেন ট্রাম্প। সেগুলো হলো আজারবাইজান-আর্মেনিয়া, কঙ্গো-রুয়ান্ডা, ভারত-পাকিস্তান, ইরান-ইসরায়েল, থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া, মিশর-ইথিওপিয়া এবং কসোভো-সার্বিয়া।

তাঁর দাবিগুলোর তখন ফ্যাক্ট চেক করেছিল দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। এক প্রতিবেদনে তারা লিখেছিল, ট্রাম্পের আহ্বানে দেশগুলো ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করলেও পরে আবার সংঘাতে জড়ায়। এছাড়া, ওই ঘোষণাপত্রগুলো কোনো শান্তি চুক্তি ছিল না। 

কিউবার ওয়াকআউট

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের পর ট্রাম্প কিউবার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, দেশটির পরিস্থিতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করছে। এটি পুরোপুরি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বেশি ব্যর্থতার দিকে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত তারা পতনের মুখে পড়বে।

ট্রাম্পের এমন কথার পর কিউবার প্রতিনিধিদল পরিষদ থেকে বেরিয়ে যান। তখন ট্রাম্প জানান, কিউবার বংশোদ্ভূত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দেশটির সঙ্গে আলোচনা করছেন। আমেরিকার দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কোনো বিদেশি প্রতিপক্ষকে আমরা হুমকি হতে দেব না।

কৃত্রিম নয়, অতিবুদ্ধিমত্তা

ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ওপর আন্তর্জাতিক তদারকির আহ্বান দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি এটিকে নতুন প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের একটি ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেন।

ট্রাম্প ঘোষণা দেন, এখন থেকে মার্কিন সরকার তাদের যোগাযোগে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিবর্তে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ বা অতিবুদ্ধিমত্তা শব্দ ব্যবহার করবে। বাকি বিশ্বও একই পথ অনুসরণ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জাতিসংঘে অবস্থানরত বিবিসির সাংবাদিক সারাহ স্মিথ গণমাধ্যমটির লাইভ ব্লগে লিখেছেন, ট্রাম্প তাঁর ভাষণে অর্থনীতি, অভিবাসন ও সীমান্ত পরিস্থিতিতে নিজের কর্মকাণ্ডের নানা দিক তুলে ধরেন। এমনভাবে নিজের সফলতার দাবি করেন, যা শুনে মনে হয় তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে নয় বরং মার্কিন ভোটারদের সামনে কথা বলছেন।

আন্তর্জাতিক এর আরও খবর