প্রকাশিত :
০৭:১৮, ০৭ নভেম্বর ২০২৬ সর্বশেষ আপডেট: ০৮:২০, ০৭ নভেম্বর ২০২৬
আর্থিক কেলেঙ্কারি ও তীব্র রাজনৈতিক সংকটের মুখে প্যারাগুয়ের ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনিয়াকে অভিশংসন করার মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই গৃহবন্দি করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি একটি বিতর্কিত ব্যাংককে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে বন্ধ হয়ে যায়।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, এই ঘটনায় দেশটির অর্ধেকেরও বেশি মানুষ তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে না পেরে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, পেনিয়ার প্রশাসন উয়েনো ব্যাংককে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার পর ব্যাংকটি অতি দ্রুত প্রসার লাভ করে। কিন্তু সম্প্রতি অনিয়মের অভিযোগে ব্যাংকটির কার্যক্রম স্থগিত করায় এর প্রায় ২৯ লাখ গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়। এটি দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ।
এর ফলে গ্রাহকরা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার মতো মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্যও নিজেদের টাকা তুলতে পারছেন না। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
গত সপ্তাহে দ্রুতগতির এই অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে শুক্রবার (৬ নভেম্বর) পেনিয়ার গ্রেপ্তারের নির্দেশ জারির মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এর মধ্যেই তার ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা নতুন নেতা হিসেবে শপথ নেন।
পেনিয়ার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে সরকারি কৌঁসুলির কার্যালয়।
বিশ্লেষকদের মতে, উয়েনো ব্যাংকে রাষ্ট্রীয় ও পেনশন তহবিল থেকে প্রায় ৮০ থেকে ৮৬ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট পেনিয়ারও ব্যাংকটির মূল সংস্থায় প্রায় ১০ লাখ ডলারের শেয়ার ছিল, যা তিনি ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে বিক্রি করেন। এই কেলেঙ্কারির কারণে জনরোষ চরমে পৌঁছালে এবং খুচরা বিক্রি ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেলে পেনিয়া তার দলের সমর্থনও হারান। বিরোধী সিনেটররা এটিকে প্যারাগুয়ের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম দুর্নীতি ও জালিয়াতি হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এদিকে আর্জেন্টিনার পালিয়ে যাওয়ার গুঞ্জন উঠলেও পেনিয়া নিজ বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। শেষ পর্যন্ত আইনি সুরক্ষার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাকে সাধারণ আদালতের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
২৫০ ফিলিস্তিনি যুগলের গণবিয়ে, ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন
প্রকাশিত :
০৪:৫২, ০৭ নভেম্বর ২০২৬
ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত গাজায় ঘরবাড়ি হারানো ও স্বজনবিয়োগের শোকের মধ্যেও নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছেন ফিলিস্তিনিরা। এমন বাস্তবতায় ধ্বংসস্তূপ ও বাস্তুচ্যুতদের তাঁবুর পাশে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন ২৫০ ফিলিস্তিনি যুগল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সহযোগিতায় আয়োজিত এই গণবিয়ের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ড্রেস অব জয়-৩’।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) গাজা সিটির সমুদ্র উপকূলবর্তী সি ক্লাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নেন ২৫০ বর ও ২৫০ কনে। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় এমন আয়োজনকে ঘিরে নবদম্পতি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দেখা যায় আনন্দ ও আবেগের মিশ্র অনুভূতি।
বিয়ের শোভাযাত্রায় ফিলিস্তিনের পতাকা, ফুল ও লাল ফিতা দিয়ে সাজানো কয়েক ডজন গাড়ি অংশ নেয়। ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপ এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবুর পাশ দিয়ে উপকূলীয় সড়ক ধরে শোভাযাত্রাটি অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছায়।
অনুষ্ঠানে বরদের পরনে ছিল বিয়ের পোশাক। আর কনেরা সেজেছিলেন সাদা পোশাকের সঙ্গে ফিলিস্তিনের ঐতিহ্যবাহী রঙিন নকশার পোশাকে। মাথায় সোনালি রঙের অলংকার, হাতে ফুলের তোড়া আর ঐতিহ্যবাহী সূচিকর্ম করা আবরণে তাদের দেখা যায়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘আল-ফারিস আল-শাহম-৩ অপারেশন সাপোর্ট কমিটি’ সাকর বিন মোহাম্মদ আল কাসিমি চ্যারিটেবল অ্যান্ড হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় এ আয়োজন করে। গাজার কঠিন জীবনযাত্রার কারণে যেসব তরুণ-তরুণীর বিয়ে করা কঠিন হয়ে পড়েছে, তাদের সহায়তা করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
‘এই আনন্দ পুরো গাজাবাসীর’
গণবিয়েতে অংশ নেওয়া বর সাঈদ আল-নাজ্জার বলেন, ইসরাইলি বোমাবর্ষণে তাদের পরিবারের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরের ইয়েলো লাইনের কাছে একটি তাঁবুতে বসবাস করছেন তারা।
আয়োজক কমিটির লটারিতে নির্বাচিত হয়ে বিয়েতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান তিনি। বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে সাঈদ বলেন, ‘এই আনন্দ শুধু একজন বর কিংবা ২৫০ বরের নয়, এটি পুরো গাজার মানুষের আনন্দ।’
তিনি বলেন, ইসরাইলি হামলায় বহু ফিলিস্তিনি তাদের বাড়িঘর হারিয়ে তাঁবুতে বসবাস করতে বাধ্য হয়েছেন। তার নিজেরও আশ্রয় নেওয়ার মতো অন্য কোনো জায়গা নেই।
গাজায় ইসরাইলি হামলায় বাড়িঘর ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখনো লাখ লাখ ফিলিস্তিনি তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছেন। সেখানে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটও প্রকট।
বিয়েতে মায়ের অনুপস্থিতি কাঁদাল মুনিরকে
গণবিয়েতে অংশ নেওয়া আরেক বর মুনির আল-তাতারি যুদ্ধের সময় মা ও পরিবারের অনেক সদস্যকে হারিয়েছেন। ইসরাইলি হামলায় তাদের বাড়িটিও ধ্বংস হয়ে গেছে।
জীবনের বিশেষ এই দিনে মাকে পাশে পাওয়ার প্রবল ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি। মায়ের অনুপস্থিতির বেদনা নিয়েই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেন তিনি।
মুনির বলেন, ‘গাজায় অবরোধ ও যুদ্ধের মধ্যেও আমরা আনন্দ করব এবং আমাদের হৃদয়ে আবারও আশার সঞ্চার করব।’
তিনি জানান, হামলার আগে তাদের একটি বাড়ি ছিল। কিন্তু ইসরাইলি হামলায় সেটি ধ্বংস হয়ে গেছে। একই যুদ্ধে মাকেও হারিয়েছেন তিনি।
তাঁবুতেই শুরু হবে দাম্পত্য জীবন
গণবিয়েতে অংশ নেওয়া বর মোহাম্মদ কুওয়াইদির সামনে নতুন সংসার শুরু করার বড় চ্যালেঞ্জ। ইসরাইলি হামলায় বাড়ি হারানোর পর নতুন করে বাড়ি ভাড়া নেওয়া কিংবা কেনার সামর্থ্য নেই তার। তাই বিয়ের পর স্ত্রীকে নিয়ে তাঁবুতেই থাকতে হবে তাকে।
কুওয়াইদি বলেন, গাজায় পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তরুণ ফিলিস্তিনিদের জন্য বিয়ে করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিয়ের পর স্ত্রীকে নিয়ে কোথায় থাকবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা একটি তাঁবুতে বসবাস করব।’
তিনি জানান, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও এই গণবিয়ের আয়োজন তাকে এবং অন্য ২৪৯ বরকে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে নতুন জীবন শুরুর সুযোগ করে দিয়েছে।
আয়োজক কমিটির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ‘ড্রেস অব জয়-৩’ গণবিয়েতে অংশ নিতে আবেদন করেছিলেন ১১ হাজার ৬২২ জন। নিবন্ধন ও যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করায় ১ হাজার ৩৩৫ জন চূড়ান্ত লটারিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। সেখান থেকে নির্বাচিত ২৫০ বর ২৫০ কনেকে বিয়ে করেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ফারিস আল-শাহম-৩ অপারেশন সাপোর্ট কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ এরবি বলেন, ৫০০ মানুষের এই গণবিয়ে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও দুর্ভোগের মধ্যেও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষার একটি মানবিক চিত্র তুলে ধরেছে।
তিনি বলেন, ফিলিস্তিনি তরুণদের মনে আশা জাগানো এবং তাদের পরিবার গঠনে সহায়তা করাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য। গাজার ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতির মধ্যেও জীবন থেমে নেই, এই আয়োজন সেই বার্তাই দিয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরাইলের হামলা শুরুর পর থেকে গাজায় ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন এক লাখ ৭৫ হাজারের বেশি মানুষ। ইসরাইলি হামলায় আবাসিক এলাকাগুলো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন লাখ লাখ ফিলিস্তিনি। এতে অঞ্চলটিতে মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।