তেহরানের এঙ্গেলব চত্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী একটি বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন এক ইরানি ব্যক্তি।
তেহরানের এঙ্গেলব চত্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী একটি বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ ইরানের বিরুদ্ধে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। বরং এ যুদ্ধ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তেহরানের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে বলে দাবি করেছেন ইরানের আইনপ্রণেতা মাহমুদ নবভিয়ান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ধারাবাহিক কয়েকটি পোস্টে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য ছিল ইরানের সভ্যতা ধ্বংস করা, দেশটিকে বিভক্ত করা, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সরকার উৎখাত করা এবং দেশটির পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিশ্চিহ্ন করা।
নবভিয়ানের দাবি, ইরানের প্রতিরোধ ও সামরিক অভিযানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে এবং রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণকেও বড় ধরনের কৌশলগত সুবিধা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য, যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ইরান একটি ‘বিশ্ব পরাশক্তিতে’ পরিণত হয়েছে।
এ সময় যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে ভিন্ন বয়ান তৈরির বিষয়ে সতর্ক করেন নবভিয়ান। তার অভিযোগ, ভীত ও পশ্চিমাপন্থী হিসেবে পরিচিত কিছু কণ্ঠস্বর যুদ্ধের জয়-পরাজয়ের প্রকৃত চিত্র উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর নবভিয়ান এসব মন্তব্য করেন।
ডেমোক্র্যাটদের জয়ে শেষের পথে ইরান যুদ্ধ, ইসরায়েল নীতিতেও পরিবর্তন
প্রকাশিত :
১২:০১, ০৬ নভেম্বর ২০২৬
তেহরানের এঙ্গেলব চত্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী একটি বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন এক ইরানি ব্যক্তি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর ইরান যুদ্ধ বন্ধ এবং ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের নীতি পরিবর্তনের চাপ বাড়তে যাচ্ছে। এর ফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বড় সংকটে পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস ইরান যুদ্ধের ব্যয় বন্ধ করা এবং ইসরায়েলের সামরিক সহায়তা পুনর্বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মঙ্গলবারের নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, বছরের শেষ নাগাদ ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বন্ধ হয়ে যাবে। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর তিনি স্বীকার করেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং এর কারণে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মার্কিন জনগণের অসন্তোষ এ ফলাফলের অন্যতম কারণ। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পেছনে ভূমিকা রাখা কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ইসরায়েলের পশ্চিম তীর ও গাজা নীতি নিয়ে নিষেধাজ্ঞার আইন আনার আগে ইরান যুদ্ধ বন্ধ করাকেই অগ্রাধিকার দিতে চান ডেমোক্র্যাটরা। সম্ভাব্য পরবর্তী সিনেট সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা চাক শুমার বলেছেন, কংগ্রেসের অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা ব্যবহার করে এ লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করবেন তারা।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধে কংগ্রেস অতীতে যে কৌশল নিয়েছিল, ডেমোক্র্যাটরা এবারও তা অনুসরণ করতে পারেন। সরকারি কার্যক্রম চালু রাখতে প্রয়োজনীয় পরবর্তী অর্থায়ন বিলে ইরানের উপকূলের কাছে মার্কিন সামরিক অভিযানে অর্থ বরাদ্দ বন্ধের শর্ত যুক্ত করা হতে পারে। ট্রাম্প বিলে স্বাক্ষর না করলে সরকারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যার দায় তার ওপর পড়তে পারে।
তাই ৩ জানুয়ারি নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরুর আগেই ট্রাম্পকে যুদ্ধ গুটিয়ে নেওয়ার চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। তবে যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধান চাইলেও নির্বাচনী ফল ইরানকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে উৎসাহিত করতে পারে। কারণ, মার্কিন জনগণের মধ্যে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব বেড়েছে; এটি বুঝে তেহরান সমঝোতায় ছাড় দিতে অনাগ্রহী হতে পারে।
ইসরায়েলকে বছরে ৩৮০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১০ বছর মেয়াদি সমঝোতা রয়েছে, যা ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা। তবে প্রতিবছর এ অর্থ কংগ্রেসের অনুমোদন নিয়ে বরাদ্দ করতে হয়। ফলে ডেমোক্র্যাটরা চাইলে আগামী বছর থেকেই সহায়তা বন্ধের উদ্যোগ নিতে পারেন।
গাজা যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনার জন্য ট্রাম্পের নেতৃত্বে গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর অর্থায়ন নিয়েও কংগ্রেসে আপত্তি উঠতে পারে। এ বোর্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী জ্যারেড কুশনারের ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে তদন্তের দাবি তুলেছেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা। তদন্ত ও অর্থায়ন নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে গাজার পুনর্গঠন পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে নতুন সরকারের প্রতিনিধিদের দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। তার মতে, ইসরায়েলের সমালোচকদের সবাই দেশটির বিরোধী নন; তাদের অনেকেই বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও নেতানিয়াহু সরকারের নীতির বিরোধিতা করছেন।
তবে নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ব্র্যাড ল্যান্ডার লাপিদের প্রস্তাবের সমালোচনা করে বলেছেন, মার্কিন ভোটাররা শুধু আলোচনাসফর চান না, তারা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান দেখতে চান। মিশিগানের ডেমোক্র্যাট নেতা জর্ডান অ্যাকারও বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের আচরণ নিয়ে সাধারণ মার্কিন ভোটারদের ক্ষোভ ইসরায়েলিরা ঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন না।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান শাপিরোর মতে, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতায় রেখে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের মৌলিক পরিবর্তন আসবে না। তার মতে, নেতানিয়াহু শুধু ডেমোক্র্যাটদের নয়, অনেক রিপাবলিকানের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন। সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত ইসরায়েলের নেতৃত্বে নতুন মুখ আনা।
বিশ্লেষক জোয়েল ব্রাউনল্ডের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যেই ইসরায়েলের বর্তমান নীতি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। ডেমোক্র্যাটরা জানতে চায়, ইসরায়েল কোন মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল।
অন্যদিকে ভ্যান্সের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান, লেবানন, সিরিয়া, গাজা কিংবা পশ্চিম তীর কোনো ক্ষেত্রেই ইসরায়েল যেন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির জন্য বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ফলে শুধু প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন নয়, ইসরায়েলের সামগ্রিক নীতিতেও বড় পরিবর্তনের চাপ তৈরি হতে পারে।