রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেপরোয়া কিশোর গ্যাং, আতঙ্ক ছড়াচ্ছে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত
জ্যৈষ্ঠ প্রতিবেদক সৈয়দ আমানউল্লাহ: বাংলাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও উত্থান ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে শুরু হলেও, এদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দৃশ্যমানভাবে আলোচনায় আসে ২০১২ সালের দিকে । ২০১৭ সালে উত্তরার আদনান কবির হত্যাকাণ্ডের পর এই গ্রুপগুলোর তৎপরতা ব্যাপকহারে গণমাধ্যমে প্রকাশ পেতে থাকে এবং ২০১৭-২০১৮ সাল থেকেই এটি মারাত্মক সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এখন বাংলাদেশে এক নতুন আতঙ্কের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। একসময় যা ছিল শহরকেন্দ্রিক বিচ্ছিন্ন সমস্যা, এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম পর্যন্ত। সময়ের চক্রে আইনি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে আরও ডালপালা মেলেছে এ কিশোর অপরাধ। ধরনও হয়ে উঠছে ভয়াবহ—চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, এমনকি খুনের মতো গুরুতর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে শিশু-কিশোররা।
কিশোর গ্যাং হলো এমন একটি দল বা গোষ্ঠী, যেখানে সাধারণত কিশোররা (১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী) একত্রিত হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে।
তার প্রভাব বিস্তার ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। তবে এর চেয়ে কম বা বেশি বয়সীরাও রয়েছে গ্যাংয়ে। ঢাকায় বস্তি ও ছিন্নমূল শিশুদের মাদক সেবনের মাধ্যমেই মূলত কিশোর গ্যাংয়ের সূত্রপাত হয়। সেখান থেকে অনেক উচ্চবিত্তের সন্তানও জড়িয়ে পড়েছে এই গ্যাংয়ে। মারামারি, চুরি, ছিনতাই, প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, মাদক বিক্রি, এমনকি খুনের মতো জঘন্য অপরাধ এখন তাদের জন্য নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের নিয়ে নানাভাবে শঙ্কা জানিয়ে আসছে নাগরিক ও সুশীল সমাজ।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্র বলছে, প্রতিটি থানা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের অসংখ্য সদস্য রয়েছে। ঢাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের মধ্যে ৪০ শতাংশই কিশোর। নিয়মিত বেড়ে চলা তাদের দলে সদস্যসংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়েছে। তাদের হাতে দেশীয় ধারালো অস্ত্রের পাশাপাশি পিস্তলের মতো আগ্নেয়াস্ত্রও রয়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, পল্লবী, মিরপুর ও উত্তরা থানা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি বলে তদন্ত সংস্থাগুলো জানিয়েছে। ঢাকা মহানগরের বাইরে কামরাঙ্গীরচর, সাভার, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর, টঙ্গীসহ বিভিন্ন এলাকায়ও গড়ে উঠছে নতুন গ্যাং নেটওয়ার্ক।
কিশোর অপরাধীদের কর্মকাণ্ডের সরকারি পৃথক কোনো তথ্যভাণ্ডার নেই। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে, ২০২২ সালে দেশে ১৭৩টি কিশোর গ্যাং অপরাধী চক্র ছিল। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩৭টিতে। এর মধ্যে রাজধানীতে এখনো সক্রিয় ১২৭টি কিশোর গ্যাং। চট্টগ্রামে অর্ধশত কিশোর গ্যাংয়ে রয়েছে কয়েকশ সদস্য।
বিভিন্ন থানা এলাকা ও পাড়া-মহল্লায় ছোট-বড় গ্রুপে নানা অপরাধে জড়িত রয়েছে কিশোর গ্যাং। আর এদের ‘বড় ভাইদের’ ভূমিকায় রয়েছেন স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা। চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ ও নিজেদের শক্তি প্রদর্শনে একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতারা কিশোর গ্যাংকে ব্যবহার করায় এদের দমন করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র।
গত সপ্তাহে আলোচিত কুমিল্লার ধর্মসাগরপাড়ে কোতোয়ালি থানার এক পুলিশ দম্পতিকে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ কুমিল্লা মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার রিফাতের বয়স ১৯ এবং সিয়ামের বয়স ২০ বছর।
গতকাল অস্ত্র মহড়া ও দাঙ্গাবাজির ঘটনায় অভিযান চালিয়ে, কুমিল্লা নগরীর ঠাকুরপাড়া থেকে অস্ত্রসহ কিশোর গ্যাংয়ের ৫ সদস্য গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় দেশীয় অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে।
গতকাল ভোররাতে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার উদ্যোগে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- ফরহাদ হোসাইন, ইব্রাহিম হোসেন জসিম, শাহাদত হোসেন শান্ত, তানভীর আহম্মেদ ও সাজ্জাদ হোসেন ওরফে রিতিক। গ্রেপ্তারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কোতোয়ালি থানার বিসিক শিল্পনগরী সংলগ্ন নোনাবাদ পুকুরের পূর্ব পাড়ে অভিযান চালিয়ে ৪টি রামদা/হাঁসুয়া ও একটি এসএস পাইপ দিয়ে তৈরি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা আরও ১৪ জনের নাম প্রকাশ করেছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ১৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১৪০-১৫০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার জানান, গত ৩ এপ্রিল বিকাল ৪টার দিকে ঠাকুরপাড়া মদিনা মসজিদ রোড এলাকায় একদল কিশোর গ্যাং সদস্য দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া, পটকা বিস্ফোরণ, মিছিল ও শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। তাদের শনাক্ত এবং গ্রেপ্তারের জন্য এ অভিযান পরিচালিত হয়। নগরীতে এমন অভিযান চলমান থাকবে।
গত শুক্রবার (৩ এপ্রিল) বিকেলে চট্টগ্রামে বিশেষ অভিযানে নগরীর জামালখান এলাকা থেকে দেশীয় অস্ত্রসহ ‘ডেঞ্জার’ কিশোর গ্যাং গ্রুপের ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে সিএমপির কোতোয়ালি থানা পুলিশ।
গত শনিবার (৪ এপ্রিল) নোয়াখালীর সদর উপজেলার দাদপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের গৌরিপুর গ্রামে ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের মারধরে মো. সেলিম (৫০) নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় চারজনকে আটক করেছে পুলিশ।
এ ছাড়া গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ নগরের ঐতিহ্যবাহী আনন্দ মোহন কলেজের দুই শিক্ষার্থী নুরুল্লাহ শাওন ও তার বন্ধু মঞ্জুরুল আহসান (রিয়াদ) ব্রহ্মপুত্র নদের বিপরীত পাশে বেড়াতে যান। সেখানে তারা ছিনতাইকারী ‘কিশোর গ্যাং’-এর কবলে পড়েন। মঞ্জুরুল আহসান (রিয়াদ) সাঁতরে বেঁচে ফিরলেও নুরুল্লাহ শাওন সাঁতার না জানায় ব্রহ্মপুত্র নদে প্রাণ হারান।
সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বন্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক।
গত মঙ্গলবার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে শুরু করে—তার আগে তো ছিলই, কিশোর গ্যাংয়ের অত্যাচারে সমাজে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে...এই সরকার একটি গণতান্ত্রিক সরকার, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি বিভাগীয় ডিআইজিদের (পুলিশের উপমহাপরিদর্শক) বলে দেন, থানাগুলো যদি তৎপর হয় সবচেয়ে ভালো হবে।’
সারাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের আতঙ্ক, হুমকি ও পুলিশের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, শুধু পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সমাজে অপরাধ তৎপরতা পুরোপুরি দমন করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে পুলিশের পাশাপাশি পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে এবং গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে হবে।
কিশোর গ্যাং নিয়ে এলিট ফোর্সের পদক্ষেপ কী—জানতে চাইলে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবিব পলাশ বলেন, ‘কিশোর গ্যাং বাংলাদেশে দিনে দিনে প্রকট আকার ধারণ করছে। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের যৌক্তিক কার্যক্রম ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। পেছনের গডফাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা সব সময় কাজ করে যাচ্ছি। এ কাজে আপনাদের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করি।
কিশোর গ্যাংয়ের ব্যাপকতা ও কার্যকলাপ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক অস্থিতিশীলতা, শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণেই এই গ্যাং সমাজে দিন দিন জায়গা করে নিচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, পরিবার থেকে পর্যাপ্ত স্নেহ ও মূল্যবোধের অভাব এবং সহিংস বা অপরাধপ্রবণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা কিশোররা সহজেই গ্যাং সংস্কৃতির দিকে আকৃষ্ট হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিভাগের অধ্যাপক শাহরিয়ার আফরিন বলেন, ‘শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ, প্রশাসনের তোড়জোড় কিংবা লোক দেখানো উদ্যোগ দিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের মতো জটিল বিষয় সহজে দূর করা সম্ভব নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যেখানে সবার সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে চূড়ান্ত ফলাফল অর্জন করতে হবে। তা না হলে, শুধু বর্তমান নিরাপত্তা ও সামাজিক শৃঙ্খলাই নয়, ভবিষ্যতেও দেশ ও সমাজের জন্য বড় ধরনের সমস্যা ও হুমকি হিসেবে দাঁড়াতে পারে কিশোর গ্যাং।



















