img

ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এল নিনোর আশঙ্কা

প্রকাশিত :  ০৬:০৬, ২৩ জুন ২০২৬

ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এল নিনোর আশঙ্কা

নীল প্রশান্ত মহাসাগরের শান্ত বুকে নিঃশব্দে জেগে উঠছে এক রুদ্র প্রকৃতির মহাকাব্য। যে সমুদ্রের ঢেউয়ে একদিন পেরুর জেলেরা বড়দিনের রাতে পরম মায়া আর বিস্ময়ে নাম রেখেছিল ‘এল নিনো’ বা ‘শিশু যিশু’, সেই এল নিনোই এবার রূপ নিতে যাচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম প্রলয়ঙ্করী এক জলবায়ু খ্যাপামিতে।    

বিশ্ব জুড়ে আবহাওয়া ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম জলবায়ুগত ঘটনা এল নিনো আবারও শুরু হয়েছে । সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) নতুন এল নিনোর সূচনার ঘোষণা দিয়েছে।

বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস বলছে, এবারের এল নিনো অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ, দাবানল ও খাদ্যসংকটের ঝুঁকি বাড়তে পারে।আবহাওয়াবিদদের মতে, এবারের এল নিনো যদি পূর্বাভাস অনুযায়ী শক্তিশালী হয়, তাহলে এটি গত ৭৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর এল নিনো হতে পারে । বিশেষ করে আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং এশিয়ার কিছু অংশে খরা ও বন্যা পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার নিতে পারে । শত শত বছর আগে পেরুর জেলেরা লক্ষ্য করেছিলেন, কয়েক বছর পরপর বড়দিনের সময় প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে অ্যাঙ্কোভি মাছ হঠাৎ কমে যায় । তারা এ ঘটনাকে ‘এল নিনো\' নামে অভিহিত করেন, যার অর্থ ‘শিশু যিশু\'।

বর্তমানে এল নিনোকে একটি বৈশ্বিক জলবায়ুগত চক্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি নিরক্ষীয় প্ৰশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ুর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে সৃষ্টি হয়। এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ধরন বদলে যায়। এল নিনোর শক্তি নির্ধারণ করা হয় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কতটা বেড়েছে তার ওপর। সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে সেটিকে শক্তিশালী এল নিনো ধরা হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আবহাওয়া মডেলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বাকি সময় এবং ২০২৭ সালের শুরুর দিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ে ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি, এমনকি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও ওপরে উঠতে পারে ।

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো ছিল ১৯৮২-৮৩ সালের, যখন তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিল ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এবারের এল নিনো সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনো নিজে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি হয় না। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে মিলিত হয়ে এর প্রভাব আরো তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৯৭-৯৮ সালের শক্তিশালী এল নিনোর পর ১৯৯৮ সাল সে সময়ের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ড গড়েছিল। একইভাবে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর পর ২০১৬ সালে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়। বর্তমানে ২০২৪ সাল সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ডধারী। সে বছর বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। জলবায়ু মডেল অনুযায়ী, ২০২৭ সাল আরো উষ্ণ হতে পারে। এল নিনোর প্রভাব সব অঞ্চলে এক রকম হয় না। কোথাও খরা দেখা দেয়, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা হয়।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) গত ৯ জুন সতর্ক করে বলেছে, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সাহেল অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এর আগে ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খরা দেখা গিয়েছিল। এফএওর মতে, সোমালিয়ায় অক্টোবর পর্যন্ত খরা চলতে পারে। এরপর ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। তবে দীর্ঘ খরার পর অতিবৃষ্টি পরিস্থিতি আরো খারাপ করতে পারে । কারণ শুকিয়ে যাওয়া মাটিতে বৃষ্টির পানি সহজে শোষিত হয় না, ফলে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং এশিয়ার বিভিন্ন এলাকাও খরার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক অঞ্চল এরই মধ্যে যুদ্ধ, খাদ্যসংকট ও অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে। এমন পরিস্থিতিতে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জটিলতার কারণে সার সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ।

ইউরোপীয় কমিশন সতর্ক করেছে, সুদান, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, চাদ, ইকুয়েডর, ভেনেজুয়েলা ও হাইতির মতো দেশগুলো মানবিক সংকটের মুখে পড়তে পারে। এল নিনো বিশ্বের প্রভাবশালী জলবায়ুগত ঘটনাগুলোর একটি। ১৯৯৭-৯৮ এবং ২০১৫-১৬ সালের শক্তিশালী এল নিনো বিশ্বের বহু অঞ্চলে ভয়াবহ খরা, বন্যা এবং খাদ্যসংকট সৃষ্টি করেছিল । এবারও বিজ্ঞানীরা একই ধরনের ঝুঁকির কথা বলছেন। পূর্বাভাস সত্যি হলে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড গড়তে পারে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা-খরা পরিস্থিতি আরো তীব্র হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাব পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও ক্ষতির পরিমাণ কমানো যায় । খরাসহিষ্ণু বীজ ব্যবহার, গবাদিপশুর জন্য খাদ্য ও পানি সংরক্ষণ এবং আগাম দুর্যোগ প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ।


img

অনুমোদন পেল বিশ্বে প্রথম এমআরএনএ ফ্লু টিকা

প্রকাশিত :  ০৬:০১, ০৮ আগষ্ট ২০২৬

করোনাভাইরাসের টিকার পর এবার ফ্লু চিকিৎসাতেও আশার আলো দেখাচ্ছে মার্কিন ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা মডার্নার এমআরএনএ টিকা।

বিশ্বে প্রথম জিনগত উপাদান মেসেঞ্জার আরএনএ-কে কাজে লাগিয়ে এমন টিকা তৈরি করেছেন গবেষকেরা, যা ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়ার মতো যে কোনও ধরনের ফ্লু ঠেকাতে কাজে আসবে বলে দাবি করা হয়েছে।

জিনগত উপাদান আরএনএ-কে কাজে লাগিয়ে তৈরি হয়েছিল কোভিডের প্রতিষেধকও। তখনই আশার আলো দেখেছিলেন গবেষকরা। 

তারা জানিয়েছিলেন, এই এমআরএনএ টিকা ভবিষ্যতে ক্যানসারের বিরুদ্ধেও কাজে আসতে পারে। সেই আশা যে খুব একটা ভিত্তিহীন ছিল না, তেমনই ইঙ্গিত মিলল আমেরিকার ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা মডার্নার নতুন একটি টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের ফলাফলে। 

মডার্নার তৈরি নতুন ফ্লু টিকায় এমআরএনএ প্রযুক্তির ব্যবহার হয়েছে। এই টিকা তৈরি হয়েছে প্রবীণদের জন্য। মডার্না জানিয়েছে, ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সিদের জন্যই এই টিকা। 

বয়সকালে ইনফ্লুয়েঞ্জা বা নিউমোনিয়ার সংক্রমণ প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। সাধারণ ফ্লু টিকায় সংক্রমণ ঠেকানো যায় না অনেক সময়। তাই মেসেঞ্জার আরএনএ দিয়েই টিকা তৈরি করা হয়েছে, যা শরীরকে আরও বেশি পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে উদ্দীপিত করে।

বিশ্বে প্রথমবার ফ্লুয়ের টিকা তৈরি হয়েছে এমআরএনএ প্রযুক্তিতে। এখন যে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ক্যানসারের প্রতিষেধক তৈরি করা হচ্ছে। টিকাটির নাম ‘এমফ্লুসিভা’। 

প্রাথমিক ভাবে ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সিদের জন্য টিকাটি অনুমোদন পেয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সিদের জন্যেও টিকাটির অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।

টিকাটির ট্রায়াল করে দেখা গিয়েছে, সাধারণ ফ্লু টিকার চেয়ে নতুন টিকাটি ভাইরাস ঠেকাতে অনেক বেশি সক্ষম। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের একাধিক প্রজাতির সংক্রমণও এই টিকা ঠেকাতে পারবে বলে দাবি।

ভারতের দিল্লির এমসের একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, বিশ্বে নিউমোনিয়ায় সব চেয়ে বেশি আক্রান্ত হন পাঁচ বছরের কম বা ৬৫ বছরের বেশি বয়সের মানুষজন। 

তাদের মধ্যেই এই রোগে মৃত্যুর হার বেশি। দেশের যে-কোনও হাসপাতালে আইসিইউয়ের রোগীদের হিসেব নিলে দেখা যাবে, ৬৫-৭০ শতাংশ শয্যায় রয়েছেন নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত বয়স্কেরা। 

তাদের মধ্যে ৩০ শতাংশই ‘ইনভেসিভ নিউমোনিয়া’র রোগী। এতে রোগের জীবাণু রক্ত ও দেহরসের মাধ্যমে শরীরে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এবং রোগীর সেপসিস হয়ে যায়। 

তাই বয়সকালে নিউমোনিয়া বিপজ্জনক। গবেষকেরা জানাচ্ছেন, এই টিকাটি কার্যকর হলে প্রবীণদের ভাইরাসঘটিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে।