img

উঠে এল জিয়াউর রহমানের পলাতক খুনিকে গ্রেপ্তারের রুদ্ধশ্বাস অভিযানের গল্প

প্রকাশিত :  ১০:৪৮, ১৮ জুলাই ২০২৬

উঠে এল জিয়াউর রহমানের পলাতক খুনিকে গ্রেপ্তারের রুদ্ধশ্বাস অভিযানের গল্প

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং টানা ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা সাবেক মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেনকে অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দীর্ঘদিন নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে ছদ্মবেশে আত্মগোপনে থাকলেও শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাননি তিনি। তদন্তে মেয়ের কর্মস্থল থেকে পাওয়া তথ্য এবং নাকের নিচে থাকা একটি জন্মদাগ গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে কাজ করে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার (১৫ জুলাই) গভীর রাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন অধরা থাকা এই আসামিকে ধরতে তার মেয়ের কর্মস্থলের তথ্যটি প্রথম সূত্র হিসেবে কাজ করে। তার মেয়ে একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে কয়েক মাস ধরে মেয়ের গতিবিধি ও কর্মস্থল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে গোয়েন্দারা বনানী ডিওএইচএস এলাকার একটি বাড়ি চিহ্নিত করেন। ছদ্মবেশে বাড়িটি নজরদারিতে রাখার পর মোজাফফরের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের একটি পুরোনো ক্লু—নাকের ঠিক নিচে থাকা একটি আঁচিল বা কালো দাগ—শনাক্তকরণের প্রধান ভিত্তি হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

বুধবার গভীর রাতে চূড়ান্ত অভিযান পরিচালনা করা হয়। ডিবির একটি চৌকস দল সাধারণ পোশাকে ওই বাসায় গিয়ে কড়া নাড়ে। দরজা খোলার পর গোয়েন্দারা সরাসরি কোনো অভিযান বা গ্রেপ্তারের ভয়ভীতি না দেখিয়ে নিজেদের মেয়ের অফিসের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। এত রাতে অফিসের লোকজন আসায় ভেতর থেকে সন্দেহ নিয়ে এক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি এগিয়ে আসেন এবং রাতে আসার কারণ জানতে চান।

ডিবির কর্মকর্তারা তখন কৌশলগতভাবে ওই ব্যক্তির চেহারা পর্যবেক্ষণ করেন এবং বাড়ির অল্প আলোতেই তার নাকের নিচে থাকা সেই পরিচিত জন্মদাগটি দেখতে পান। অধিকতর নিশ্চিত হওয়ার জন্য কর্মকর্তারা তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘মুরব্বি, আমরা তো আপনাকে চিনি না, আপনি কে? আমরা যার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, তার সঙ্গে দেখা করতে দিন।’ সরল বিশ্বাসে ওই ব্যক্তি উত্তর দেন, ‘আমি মোজাফফর, মেয়ের বাবা।’ নিজের মুখে এ কথা স্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গেই এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ডিবির দল তাকে হাতকড়া পরায়।

মামলার নথি ও তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থান এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মেজর মোজাফফর। আক্রমণের রাতে তিনি ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন সরাসরি রাষ্ট্রপতির কক্ষের দিকে অগ্রসর হন। মোজাফফরই সশরীরে রাষ্ট্রপতিকে কক্ষের বাইরে এনে শনাক্ত করেন এবং ঠান্ডা মাথায় সরাসরি গুলি চালান বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত হওয়ার পরপরই মোজাফফর চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে ফোনে ইংরেজিতে একটি ঐতিহাসিক সংক্ষিপ্ত বার্তা দেন—‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিল্ড’।

১৯৮১ সালের ৩১ মে সরকারি বাহিনী পুনরায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিলে এবং মেজর জেনারেল মঞ্জুর নিহত হলে মোজাফফর বুঝতে পারেন তার বাঁচার কোনো পথ নেই। পরবর্তীতে সামরিক আদালতে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হলেও মোজাফফর এবং তার সহযোগী মেজর এস এম খালেদ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যান।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে অবস্থানকালে তিনি নিজের আসল পরিচয় পুরোপুরি মুছে ফেলেন। সম্পূর্ণ নতুন ছদ্মনাম ধারণ করে এবং চেহারা ও বেশভূষায় পরিবর্তন এনে তিনি সেখানে থাকতেন। কল ট্র্যাকিং এড়াতে পুরোনো চেনা পরিমণ্ডল ও পারিবারিক যোগাযোগের সব সূত্রও তিনি বিচ্ছিন্ন করেছিলেন। ১৯৯৭-১৯৯৮ সালের দিকে তিনি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থান করেন। কেবল ভারতেই নয়, ভুয়া নাগরিকত্ব ও জাল নথির সাহায্যে পাসপোর্ট তৈরি করে তিনি বিশ্বের একাধিক দেশ সফর করেছেন। এ কারণেই ইন্টারপোল বা বাংলাদেশের গোয়েন্দারা দীর্ঘ সময় তার আসল নামে কোনো হদিস পাননি।

জীবনের শেষভাগে এসে তিনি অত্যন্ত গোপনে বাংলাদেশে ফেরেন এবং রাজধানীর সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকা বনানী ডিওএইচএসে বসবাস শুরু করেন। সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসেবে এলাকাটি পরিচিত হলেও, সেখানে তিনি নিজেকে রাজনীতিবিমুখ এক বয়োবৃদ্ধ সাধারণ নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ফলে প্রতিবেশীদেরও সন্দেহ করার কোনো কারণ ছিল না।

গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে ডিএমপি ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, মোজাফফর হোসেন একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। এ কারণে প্রয়োজনীয় আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে এবং তাদের নিজস্ব বিচারিক প্রক্রিয়ার (জুডিশিয়াল প্রসেস) অধীনে হস্তান্তর করা হয়েছে।

জাতীয় এর আরও খবর

img

প্রধানমন্ত্রীর মুখে ‘মধু’, অন্তরে ‘ছলনা’: নাহিদ ইসলাম

প্রকাশিত :  ১৮:৫৯, ১৮ জুলাই ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:১৫, ১৮ জুলাই ২০২৬

গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় অনুযায়ী ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন না হলে আবারও গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের পথ বেছে নেওয়া হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তার দাবি, গণভোটে ‘জুলাই সনদ’-এর পক্ষে স্পষ্ট জনসমর্থন থাকলেও সরকার তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

আজ শনিবার (১৮ জুলাই) বিকালে বরিশাল কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।

নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী গণভোট ও জুলাই সনদের পক্ষে প্রচার চালালেও নির্বাচনের পর ৭০% জনগণের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করছেন না।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এখনও হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি দিইনি। তবে প্রয়োজন হলে যেকোনো সময় সে ধরনের কর্মসূচি দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। আমরা এই মুহূর্তে এমন কর্মসূচির পক্ষে ছিলাম না। কিন্তু সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পরিস্থিতিকে সেদিকে ঠেলে দিচ্ছেন।’

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উদ্দেশ্যে করে তিনি বলেন, ‘দেশের জনগণ আপনাকে ক্ষমতা দিয়েছে, তার মানে এই নয় যে যা খুশি তাই করবেন বা জনগণের সঙ্গে ছলনা করবেন।’

বিএনপির সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিএনপি গত ১৬ বছর গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে, কিন্তু দুঃখের বিষয় ৫ আগস্ট পর থেকে তারা গণতন্ত্রের বিপক্ষে লড়াই করে যাচ্ছে। আসল কথা হচ্ছে বিএনপি কখনো গণতন্ত্রের পক্ষে ছিল না। তারা লড়াই করেছিল ক্ষমতার জন্য। তারা গণঅভ্যুত্থানে আমাদের সাথে লড়াই করেছিল ক্ষমতার জন্য, নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য।’

‘নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়েছে। এখন তারা পরিবর্তনের কথা বলে না। সংস্কারের কথা বলে না। এখন তারা ৩১ দফার কথা বলে না। বরং তারা এখন বলছে তারা না কি, কখনো সংস্কারের কথা বলেনি অথচ তাদের ৩১ দফার প্রথম দফা ছিল সংবিধান সংস্কর কমিটি গঠন করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘সংবিধান সংস্কারের নামে কোনো প্রহসন মেনে নেওয়া হবে না। প্রয়োজন হলে নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং নতুন গণপরিষদ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।’

জাতীয় এর আরও খবর