img

প্রধানমন্ত্রীর ত্বরিত পদক্ষেপ: তেলবিদ্যুৎ কেন্দ্র পূর্ণ উৎপাদনে ফিরছে, দ্রুত কমবে লোডশেডিং

প্রকাশিত :  ০৬:২৬, ২৫ আগষ্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:৪৪, ২৫ আগষ্ট ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর ত্বরিত পদক্ষেপ: তেলবিদ্যুৎ কেন্দ্র পূর্ণ উৎপাদনে ফিরছে, দ্রুত কমবে লোডশেডিং

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্রুত পদক্ষেপে দেশে লোডশেডিং কমানোর উদ্যোগ শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি করতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে শিল্প খাতে সরবরাহ বাড়ানোরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের মাধ্যমে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। ফলে আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরলে জাতীয় গ্রিডে আরো প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হতে পারে। এতে আশা করা যায়, লোডশেডিং কমার

পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতে সাশ্রয় হওয়া গ্যাসশিল্পে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

জানা যায়, দেশে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ। এর পরও দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে মানুষ। সম্প্রতি বিদ্যুৎ চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি থাকায় সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছেছে লোডশেডিং। গ্রাম ছাড়িয়ে লোডশেডিংয়ের তীব্রতা এখন শহরেও এসে ঠেকেছে।

অভিযোগ রয়েছে, গ্রামাঞ্চলের অনেক এলাকায় দিনে আট থেকে ১৪ ঘণ্টারও বেশি সময় লোডশেডিং হয়েছে। এতে জনজীবন প্রায় বিপর্যস্ত। যদিও এখন লোডশেডিং পরিস্থিতি কিছুটা কমেছে।

এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও শিল্প—দুই খাতের সংকট একসঙ্গে মোকাবেলায় সরকারের এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগে শিগগিরই শিল্পের দীর্ঘদিনের গ্যাসসংকট এবং বিদ্যুৎ খাতের লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি অনেকটাই কমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

একদিকে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে শিল্পে সরবরাহ বাড়ানো হবে। ফলে একই সঙ্গে লোডশেডিং ও শিল্পের গ্যাসসংকট কমানোর পথ তৈরি হচ্ছে।

এ বিষয়ে দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত গতকাল  বলেন, ‘সরকার এরই মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল পরিশোধের সিদ্ধান্তের কথা আমাদের জানিয়েছে। বকেয়া বিল পরিশোধ ও হিসাব হালনাগাদ হলে কেন্দ্রগুলো আবার পূর্ণf সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারবে। বর্তমানে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় দুই হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। বকেয়া বিল পরিশোধ করা হলে আরো প্রায় দুই হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।’

তিনি বলেন, ‘বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বকেয়া বিল না পাওয়ায় জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারছিল না। ফলে আমাদের মোট উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। বকেয়া পরিশোধ করা হলে তিন সপ্তাহের মধ্যে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতার কাছাকাছি উৎপাদনে যেতে পারবে। এতে একদিকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে এবং লোডশেডিং কমবে, অন্যদিকে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর চাপ কমবে। ফলে সাশ্রয় হওয়া গ্যাস শিল্প খাতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে পারে।’

ডেভিড হাসনাত আরো বলেন, ‘ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ বিল বকেয়া জমেছে ১২ হাজার কোটি টাকার মতো। গড়ে প্রায় ছয় মাসের বিল বকেয়া। এই অর্থ পরিশোধ করা হলে কেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করে দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারবে। সরকার তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে, যার কারণে দ্রুত বকেয়া পরিশোধের ব্যবস্থা নিয়েছে।’

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, গতকাল সোমবার বিকেল ৩টায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৩৯৬ মেগাওয়াট, তখন সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৮২৩ মেগাওয়াট। এ সময় লোডশেডিং ছিল এক হাজার ৫৭৩ মেগাওয়াট।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের কিছু কর্মকর্তার ভুল সিদ্ধান্ত, সিন্ডিকেশন, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাঁরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী আগেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে এই লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে পড়তে হতো না সাধারণ মানুষকে। ভবিষ্যতে সংকট এড়াতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ এবং আগাম পরিকল্পনা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্র জানায়, আপাতত ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ প্রায় চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রগুলোকে প্রায় ৮০ শতাংশ সক্ষমতায় চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় তা দ্রুত ৯০ শতাংশে উন্নীত করার নির্দেশও আসতে পারে। এ জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) যথাসম্ভব ফার্নেস অয়েল মজুদ করতে বলা হয়েছে। বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে হঠাৎ করে ফার্নেস অয়েলের চাহিদা ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এখন তেল বিতরণ কম্পানিতে তেলের মজুদ বাড়াতে বেশি করে আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিপিসি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির বর্তমান দামের কারণে পরিস্থিতিও কিছুটা বদলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। স্পট মার্কেটে টেন্ডার করেও কাঙ্ক্ষিত সময়ে এলএনজি সরবরাহকারী পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি ২৬ আগস্টের জন্য নির্ধারিত কার্গোও পাওয়া যায়নি। ফলে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখা কঠিন হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎসচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, ‘সরকার লোডশেডিং কমাতে বদ্ধপরিকর। একই সঙ্গে শিল্প খাত সচল রাখতে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম গতকাল  বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা কমিয়ে শিল্প খাতে গ্যাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তবসম্মত। এটি আদর্শ কোনো সিদ্ধান্ত নয়, তবে বিদ্যমান সংকট বিবেচনায় এ মুহূর্তে এর বিকল্পও নেই। এর মাধ্যমে শিল্পে গ্যাস সরবরাহের সংকট কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানো গেলে বিদ্যুৎ সরবরাহও বাড়বে।’

অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘বর্তমানে প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বন্ধ রয়েছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধ করা হলে তারা দ্রুত ফার্নেস অয়েল সংগ্রহ করে উৎপাদনে ফিরতে পারবে। এতে লোডশেডিং কমানো সম্ভব হবে।’ তিনি বলেন, ‘কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও যেন কয়লার অভাবে বন্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রকে অন্তত ৮০ শতাংশ সক্ষমতায় চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় কয়লার সরবরাহ নিশ্চিত করা উচিত।’

অধ্যাপক ম. তামিম আরো বলেন, ‘সাধারণত তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় ব্যয়বহুল। বর্তমানে এলএনজির দাম প্রায় ২৪ ডলারে থাকায় হিসাবটি কিছুটা বদলে গেছে। ফলে এই মুহূর্তে ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী বিকল্প হয়ে উঠছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে তেলভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো উচিত নয়। গ্যাসের সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক রিটার্ন আসে শিল্প খাত থেকে। দীর্ঘদিন গ্যাসের সংকটে দেশের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ ফিরিয়ে এনে উৎপাদন সচল করার উদ্যোগটি খুবই জরুরি ছিল।’

বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে মোট বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ১৩৩। এর মধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ৭৮। গ্রিডভিত্তিক মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা পাঁচ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট, যা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ১৯ শতাংশ। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট, যা মোট বিদ্যুৎ সক্ষমতার ৪২ শতাংশ। এ ছাড়া কয়লাভিত্তিক সাত হাজার ২০৩ মেগাওয়াট, ডিজেল ৭৬৮ মেগাওয়াট, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে এক হাজার ১২৯ মেগাওয়াট, আদানিসহ আমদানি বিদ্যুৎ দুই হাজার ৬৯৬ মেগাওয়াট।

জানা গেছে, এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের তীব্র সংকট চলছিল। গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে জাহাজ থেকে জাহাজে এলএনজি স্থানান্তরের সময় অগ্নিকাণ্ডে এক্সিলারেটের টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। পরে সরকার দ্রুত প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি করে টার্মিনালটি মেরামতের উদ্যোগ নেয়। মেরামত শেষে টার্মিনালটি আংশিকভাবে গ্যাস সরবরাহ শুরু করলেও এলএনজি মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় গত সপ্তাহে আবারও সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। গত শনিবার থেকে দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। 

গতকাল সোমবার পেট্রোবাংলার গ্যাস সরবরাহের তথ্যে দেখা গেছে, গতকাল মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) থেকে জাতীয় গ্রিডে মোট ৭৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হয়েছে। একই সময়ে জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৩৮১ মিলিয়ন ঘনফুট, কয়েক দিন আগেও এলএনজির সরবরাহ কমে যাওয়ায় মোট গ্যাস সরবরাহ দুই হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে গিয়েছিল। সরকার এখন ওই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

গত রবিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকেও বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বৈঠকে শিল্প খাত সচল রাখার স্বার্থে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া অর্থনৈতিক দিক থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিল্প খাতে গ্যাস ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন, রপ্তানি, কর্মসংস্থান, রাজস্বসহ সব ক্ষেত্রেই সরাসরি অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যায়।

অর্থনীতি এর আরও খবর

img

পুঁজিবাজারে ধস: বিনিয়োগকারীরা কি সরকারের কাছে অপ্রয়োজনীয়?

প্রকাশিত :  ১৪:২১, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

৯৭ পয়েন্টের পতন শুধু সূচকের হিসাব নয়, এটি আস্থার সংকেত। নির্বাচিত সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিল পরিবর্তনের, এখন সেই প্রত্যাশার জায়গায় জমছে হতাশা

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের দিকে তাকালে এখন একটি দৃশ্যই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। সংখ্যাগুলো নিচের দিকে যাচ্ছে, আর মানুষের আস্থা তার চেয়েও দ্রুত কমছে।

ডিএসইএক্সের প্রায় ৯৭ পয়েন্ট পতন হয়তো বাজারের এক দিনের হিসাব। কিন্তু এই পতনের অভিঘাত কেবল একটি সূচকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো পোর্টফোলিও, লাখো মানুষের সঞ্চয় এবং বহু পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

পুঁজিবাজারকে তাই শুধু শেয়ারের দামের ওঠানামার জায়গা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে যে অর্থ প্রবাহিত হয়, তার সঙ্গে মানুষের শ্রম, সঞ্চয়, স্বপ্ন এবং নিরাপত্তা জড়িয়ে থাকে।

এই জায়গাতেই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে।

সরকার কি সত্যিই পুঁজিবাজারের সংকটকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছে?

প্রশ্নটি রাজনৈতিকও, অর্থনৈতিকও। কারণ বাজারের প্রতিটি দিনের পতনের জন্য সরকারকে দায়ী করা যায় না। শেয়ারের দাম বাজারের চাহিদা ও সরবরাহ, কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশাসহ বহু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।

কিন্তু একটি বাজার দীর্ঘদিন দুর্বল থাকলে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ভেঙে পড়লে, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হলে রাষ্ট্র তার দায় এড়িয়ে যেতে পারে না।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব সূচক কৃত্রিমভাবে ওপরে তুলে রাখা নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন একটি বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে নিয়ম কার্যকর, আইন সবার জন্য সমান এবং বিনিয়োগকারীরা জানেন যে তাঁদের অর্থের নিরাপত্তার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।

এই জায়গাতেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সংকট সবচেয়ে গভীর।

প্রত্যাশা ছিল, হতাশা কেন?

নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ নতুন আশায় বুক বেঁধেছিলেন।

তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে অর্থনীতিতে গতি আসবে। ব্যবসা বাড়বে, বিনিয়োগ বাড়বে, নতুন শিল্প গড়ে উঠবে এবং তার প্রভাব পড়বে পুঁজিবাজারেও।

এই প্রত্যাশা অমূলক ছিল না।

একটি শক্তিশালী অর্থনীতির জন্য কার্যকর পুঁজিবাজার প্রয়োজন। ব্যাংকনির্ভর অর্থায়নের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভালো কোম্পানি বাজারে আসবে, সাধারণ মানুষ বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়বে, এটাই একটি সুস্থ পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক কাঠামো।

কিন্তু বাস্তবতা এখন বিনিয়োগকারীদের অনেককে হতাশ করছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে পুঁজিবাজার রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।

এই ধারণা সত্য কি না, সেটি সরকারেরই পরিষ্কার করা উচিত।

কারণ নীরবতা অনেক সময় সন্দেহকে আরও বড় করে তোলে।

৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষের প্রশ্ন

বাজারসংশ্লিষ্টদের একটি অংশের দাবি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষ পুঁজিবাজারের সঙ্গে যুক্ত। এই সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যান দিয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা না গেলেও পুঁজিবাজারের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এই মানুষগুলো কেবল বিনিয়োগকারী নন। তাঁরা বাবা, মা, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং তরুণ প্রজন্মের সদস্য।

কারও বিনিয়োগ সন্তানের শিক্ষার জন্য। কারও অবসর জীবনের নিরাপত্তার জন্য। কেউ ব্যবসার লাভের অর্থ বাজারে রেখেছেন। কেউ হয়তো চাকরির পাশাপাশি বছরের পর বছর সামান্য করে সঞ্চয় করেছেন।

একটি শেয়ারের দাম যখন ১০ টাকা কমে যায়, তখন বাজারের পর্দায় সেটি শুধু একটি সংখ্যা।

কিন্তু কোনো পরিবারের কাছে সেই ১০ টাকার পতন হয়তো কয়েক মাসের সঞ্চয়ের সমান।

এই পার্থক্যটি নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন

পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে একটি সুস্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী চাইলে কি এই বাজারের জন্য একটি সমন্বিত সংস্কার উদ্যোগ নিতে পারেন না?

অবশ্যই পারেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়, বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে নিয়ে একটি সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব। বাজার কারসাজি প্রতিরোধ, করপোরেট গভর্ন্যান্স উন্নত করা, মানসম্মত কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা জোরদারের জন্য আলাদা লক্ষ্য নির্ধারণ করা সম্ভব।

প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি পুঁজিবাজার সংস্কার কমিটিও গঠন করা যেতে পারে।

প্রশ্ন হলো, উদ্যোগটি কোথায়?

একটি নির্বাচিত সরকারকে প্রতিটি বাজার পতনের ব্যাখ্যা দিতে হবে না। কিন্তু বাজারের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা এবং আস্থার সংকট নিয়ে একটি নীতিগত অবস্থান জানানো তার দায়িত্ব।

বিনিয়োগকারীরা অন্তত জানতে চান, সরকার সমস্যাটি দেখছে কি না এবং দেখলে কী করতে যাচ্ছে।

অর্থমন্ত্রীর সামনে বড় পরীক্ষা

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পুঁজিবাজারের সঙ্গে অপরিচিত নন। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার ইতিহাস রয়েছে।

এই অভিজ্ঞতার কারণে তাঁর প্রতি প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই বেশি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রীর সামনে শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির হিসাব নেই। রয়েছে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জও।

এখন প্রয়োজন একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ।

কোন সংস্কার আগে হবে? কোনটি পরে? বাজার কারসাজি ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? ভালো কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে কী প্রণোদনা থাকবে? সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ কীভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি হবে? প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কেন বাড়ছে না?

এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু বক্তব্যে নয়, কার্যকর নীতির মাধ্যমে দিতে হবে।

অর্থনীতি পরিচালনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আস্থা। আর আস্থা তৈরি হয় কথায় নয়, ধারাবাহিক ফলাফলে।

বিএসইসির সাফল্যের মাপকাঠি কী?

পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এর দায়িত্ব শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে অনিয়মের সুযোগই সীমিত হয়ে আসে।

বর্তমান চেয়ারম্যান মাসুদ খান দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন, বাজারের সুশাসন শক্তিশালী করা এবং মানসম্মত কোম্পানি তালিকাভুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

এসব উদ্যোগের গুরুত্ব রয়েছে।

কিন্তু বাজার শেষ পর্যন্ত বক্তব্যের মূল্যায়ন করে ফল দিয়ে।

তাহলে প্রশ্ন উঠবে, কারসাজি কি কমেছে? বিনিয়োগকারীদের অভিযোগের নিষ্পত্তি কি দ্রুত হচ্ছে? দুর্বল কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কি দৃশ্যমান? তালিকাভুক্ত কোম্পানির সুশাসন কি উন্নত হচ্ছে? বাজারে তথ্যের স্বচ্ছতা কি বেড়েছে?

এসব প্রশ্নের উত্তরই বিএসইসির কার্যকারিতার প্রকৃত মাপকাঠি।

বিএসইসির চেয়ারম্যান পরিবর্তনের দাবি উঠতে পারে। দক্ষ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। কিন্তু শুধু চেয়ারম্যান পরিবর্তন করে বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর হবে না।

প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত বিচার এবং আইনের দৃশ্যমান প্রয়োগ।

সূচক নয়, আস্থা বাঁচাতে হবে

সরকারের একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন।

পুঁজিবাজারের সূচক কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রাখার দায়িত্ব সরকারের নয়।

সূচক কমবে, বাড়বে। বাজারে ঝুঁকি থাকবে। বিনিয়োগে লাভ যেমন থাকবে, ক্ষতিও থাকবে।

সরকারের দায়িত্ব হলো ন্যায্য খেলার মাঠ তৈরি করা।

কেউ বাজার কারসাজি করলে তাকে শাস্তি পেতে হবে।

কোনো কোম্পানি ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে তার পরিচালনা পর্ষদকে জবাবদিহি করতে হবে।

কেউ অভ্যন্তরীণ তথ্য ব্যবহার করে অন্যায় সুবিধা নিলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

কোনো দুর্বল কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের অর্থ ঝুঁকিতে ফেললে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সময়মতো ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই মৌলিক নিশ্চয়তাগুলো না থাকলে কোনো বাজার দীর্ঘদিন টেকসই হতে পারে না।

সরকার বিনিয়োগকারীদের লাভের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। কিন্তু ন্যায্য বাজারের নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

সংখ্যার পেছনের মানুষগুলো কোথায়?

বাজারের দৈনিক প্রতিবেদনে আমরা বলি, সূচক এত পয়েন্ট কমেছে। বাজার মূলধন এত কোটি টাকা কমেছে। লেনদেন হয়েছে এত টাকা।

কিন্তু সংখ্যার পেছনে থাকা মানুষটির গল্প কোথায়?

একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি হয়তো জীবনের শেষ সঞ্চয় নিয়ে বাজারে এসেছেন।

একজন তরুণ হয়তো ভেবেছেন, বেতনের সামান্য অংশ বিনিয়োগ করে ভবিষ্যৎ তৈরি করবেন।

একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হয়তো ব্যবসার মুনাফা বাজারে রেখেছেন।

তাঁদের প্রত্যেকের কাছে পুঁজিবাজারের অর্থ আলাদা।

কারও কাছে এটি স্বপ্ন। কারও কাছে নিরাপত্তা। কারও কাছে শেষ আশ্রয়।

তাই বাজারের পতনকে কেবল একটি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে অর্থনীতির মানবিক বাস্তবতাটি হারিয়ে যায়।

এখনই সংস্কারের সময়

সরকার চাইলে বর্তমান সংকটকে একটি সুযোগে পরিণত করতে পারে।

একটি সময়বদ্ধ পুঁজিবাজার সংস্কার কর্মসূচি ঘোষণা করা যেতে পারে। বিএসইসির নজরদারি আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে। স্টক এক্সচেঞ্জের প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ বাড়ানো যেতে পারে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও করপোরেট গভর্ন্যান্সে কঠোরতা আনা যেতে পারে।

বাজার কারসাজির মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত বিচারব্যবস্থা কার্যকর করা দরকার।

ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনার জন্য নীতিগত প্রণোদনা প্রয়োজন।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো দরকার।

আর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ শুরু করা জরুরি।

কারণ যে বাজারে বিনিয়োগকারীরা কথা বলার সুযোগ পান না, সেই বাজারে আস্থা স্থায়ী হয় না।

দায় কার?

আজকের পুঁজিবাজারের সব সমস্যার দায় কোনো একজন ব্যক্তির নয়। বর্তমান সংকট দীর্ঘদিনের।

দুর্বল সুশাসন, নীতিগত অসঙ্গতি, বাজার কারসাজির অভিযোগ, মানসম্মত কোম্পানির ঘাটতি, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা একসঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বর্তমান সরকার দায়মুক্ত।

কারণ সরকার পুরোনো সমস্যার উত্তরাধিকার গ্রহণ করার পাশাপাশি সেগুলো সমাধানের দায়িত্বও গ্রহণ করে।

একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা তাই খুব বেশি কিছু নয়।

তাঁরা লাভের নিশ্চয়তা চান না।

তাঁরা শুধু চান, আইন যেন সবার জন্য সমান হয়।

তাঁরা চান, কারসাজি যেন শাস্তি পায়।

তাঁরা চান, ভালো কোম্পানি যেন বাজারে আসে।

তাঁরা চান, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান যেন কার্যকর হয়।

তাঁরা চান, তাঁদের সঞ্চয় যেন নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্ব পায়।

এখন উত্তর দেওয়ার সময়

ডিএসইএক্সের ৯৭ পয়েন্ট পতন একটি দিনের ঘটনা হতে পারে।

কিন্তু আস্থার পতন এক দিনের নয়।

আস্থা তৈরি হতে সময় লাগে। ভাঙতে লাগে খুব অল্প সময়। একটি বাজারে মানুষ একবার বিশ্বাস হারালে তা ফিরিয়ে আনা শুধু অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয় থাকে না, এটি হয়ে ওঠে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার সেই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

সরকার চাইলে এখনো পরিস্থিতি বদলাতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী চাইলে বিষয়টিকে জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারে আনতে পারেন। অর্থমন্ত্রী চাইলে একটি স্পষ্ট সংস্কার রোডম্যাপ দিতে পারেন। বিএসইসি চাইলে কঠোর ও দৃশ্যমান প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারে।

কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন সিদ্ধান্ত।

প্রয়োজন সমন্বয়।

প্রয়োজন জবাবদিহি।

সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

বিনিয়োগকারীরা এখন আর শুধু সূচকের দিকে তাকিয়ে নেই। তাঁরা তাকিয়ে আছেন রাষ্ট্রের দিকে।

তাঁদের প্রশ্ন, এই বাজার কি সরকারের কাছে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ?

তাঁদের আরেকটি প্রশ্ন, তাঁদের সঞ্চয়, তাঁদের উদ্বেগ, তাঁদের ক্ষতি এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ কি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিতে কোনো বাস্তব মূল্য বহন করে?

এই প্রশ্নের উত্তর কেবল একটি বিবৃতি দিয়ে দেওয়া যাবে না।

উত্তর দিতে হবে কার্যকর সংস্কারে।

উত্তর দিতে হবে আইনের প্রয়োগে।

উত্তর দিতে হবে দৃশ্যমান জবাবদিহিতে।

কারণ পুঁজিবাজারের সূচক আবার উঠবে। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ভালো কোম্পানি নতুন করে বাজারে আসতে পারে।

কিন্তু মানুষের আস্থা যদি একবার পুরোপুরি হারিয়ে যায়, তখন শুধু সূচক বাড়িয়ে সেই ক্ষত পূরণ করা যায় না।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সামনে তাই আজ সবচেয়ে বড় লড়াই পতন ঠেকানোর নয়।

আস্থা ফিরিয়ে আনার লড়াই।

আর সেই লড়াইয়ে সরকার যদি নীরব থাকে, ইতিহাসের প্রশ্নটি আরও কঠিন হয়ে উঠবে:

যখন বিনিয়োগকারীরা রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তখন রাষ্ট্র তাঁদের জন্য কী করেছিল?