img

ইরানকে সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে গোপনে সহায়তা করছে রাশিয়া: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস

প্রকাশিত :  ০৮:০৪, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইরানকে সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে গোপনে সহায়তা করছে রাশিয়া: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস

ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে উন্নতমানের সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে গোপনে সহায়তা করছে রাশিয়া, এমন দাবি করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস (এফটি)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মস্কো থেকে তেহরানে কৌশলগত সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের অন্যতম বড় ঘটনা হতে পারে এটি।

এফটির অনুসন্ধান অনুযায়ী, ‘সি৪৩০এল’ কোডনামে ২০২৩ সালে এই বহুবছর মেয়াদি গোপন কর্মসূচি শুরু হয়। এতে রাশিয়ার অভিজ্ঞ ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞরা ইরানকে নতুন ধরনের অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীসহ অন্যান্য যুদ্ধজাহাজের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।

ফাঁস হওয়া রুশ চিঠিপত্র, ভ্রমণ নথি এবং সামরিক পেটেন্ট বিশ্লেষণ করে এফটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ চলাকালেও কর্মসূচিটি অব্যাহত ছিল।

কর্মসূচিটির মূল লক্ষ্য ইরানকে ‘র‌্যামজেট’ প্রপালশন ব্যবস্থা তৈরিতে সহায়তা করা। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির কয়েক গুণ গতিতে উড়তে পারে। ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিটি মূলত জাহাজবিধ্বংসী ও স্থল লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হচ্ছে বলে ধারণা করা যায়।

যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক অস্ত্র শনাক্তকরণ সংস্থা কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ-এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক এবং ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ফ্যাবিয়ান হিনজ বলেন, এটি রাশিয়ার কাছ থেকে অত্যন্ত কৌশলগত ও সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের ঘটনা। এমন কর্মসূচির জন্য রাশিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে রাজনৈতিক অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উচ্চগতির পাশাপাশি নিচু দিয়ে উড়তে সক্ষম হওয়ায় প্রচলিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার শনাক্ত ও প্রতিহত করার সময় কমিয়ে দিতে পারে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকায় ইরানের জন্য এই প্রযুক্তি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ইরানকে সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে গোপনে সহায়তা করছে রাশিয়া

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান এরই মধ্যে র‌্যামজেট প্রপালশন ব্যবস্থা তৈরি ও পরীক্ষামূলকভাবে উড্ডয়ন করেছে। তবে রাশিয়ার সহায়তায় তৈরি কোনো সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এখনো মোতায়েন করা হয়েছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সাবেক সিআইএ সামরিক বিশ্লেষক জিম ল্যামসনের মতে, এই প্রযুক্তি ইরানকে এমন একটি নতুন কৌশলগত অস্ত্রব্যবস্থা দিতে পারে, যা মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজকে হুমকির মুখে ফেলতে সক্ষম।

ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের গ্রীষ্মকালেও এই কর্মসূচি নিয়ে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত ছিল।

রাশিয়া ও ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতার অংশ হিসেবেই এই কর্মসূচি চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত শাহেদ ড্রোন রাশিয়াকে সরবরাহের পাশাপাশি দেশটির অভ্যন্তরে এসব ড্রোনের উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতেও ইরান সহায়তা করেছে।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি তথ্যচিত্রে আলাবুগা ড্রোন কারখানার ভেতরের উৎপাদন তুলে ধরার সময় সিএনএন ১৭০টিরও বেশি ড্রোন গণনা করেছে। ছবি: টিভি জভেজদা

এদিকে ইউক্রেন ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা অভিযোগ করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের সময় রাশিয়া ইরানকে স্যাটেলাইট ছবি, ড্রোন সহায়তা এবং অস্ত্রের যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন ধরনের সামরিক সহযোগিতা দিয়েছে।

প্যারিসের সায়েন্সেস পো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নিকোল গ্রাজিউস্কি বলেছেন, ‘গোপন র‍্যামজেট কর্মসূচিটি দেখায় যে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধকে বিস্তৃত করতে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বিভিন্ন রণাঙ্গনে টেনে আনতে চেষ্টা করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই অঞ্চলের রেড লাইনগুলো নিয়ে রাশিয়া ততটা চিন্তিত নয়।’

সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র সহায়তা কর্মসূচিটি আয়োজন করেছিল রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রোসোবোরোনেক্সপোর্ট, যারা এনপিও মাশিনোস্ত্রোইয়েনিয়ার সাথে প্রকল্পটি সমন্বয় করেছিল।


২০১৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এনপিও মাশিনোস্ত্রোইয়েনিয়া-র ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সংস্থাটিকে তারা একটি প্রধান রুশ রকেট নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করে, যা জাহাজ, সাবমেরিন ও স্থল প্ল্যাটফর্ম থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তৈরির পাশাপাশি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ রাশিয়ার কৌশলগত পারমাণবিক বাহিনীকে সহায়তা করার কাজেও নিয়োজিত।

এফটি কর্তৃক পর্যালোচনা করা ফাঁস হওয়া ভ্রমণ নথি থেকে দেখা যায়, ২০২৩ সালের নভেম্বরে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী রসদ বিভাগের সাথে সি৪৩০এল চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার আগে রাশিয়ার অস্ত্র রপ্তানি কর্মকর্তারা এবং এনপিও মাশিনোস্ত্রোইয়েনিয়া-র বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী একাধিকবার ইরান সফর করেছিলেন।

২০২৫ সালের মধ্যে, এনপিও মাশিনোস্ত্রোইয়েনিয়া র‍্যামজেট প্রোপালশন সিস্টেম সম্পর্কিত বিপুল পরিমাণ ইরানি প্রযুক্তিগত উপকরণ হাতে পায়। এরপর রুশ প্রকৌশলীরা একটি ইরানি ফ্লাইট পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে সিস্টেমটি কেমন কাজ করেছে সে সম্পর্কে তেহরানকে বিস্তারিত প্রশ্নাবলি পাঠায়।

তারা এর জ্বালানি ব্যবস্থা, দহন স্থিতিশীলতা, বায়ু গ্রহণ ব্যবস্থা এবং ইঞ্জিন নজলের পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। প্রকৌশলীরা আরও জানতে চেয়েছিলেন যে, পরীক্ষা শুরুর এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে ইরানের সরবরাহ করা টেলিমেট্রি, যা উড্ডয়নকালে ইঞ্জিনের কার্যকারিতা প্রদর্শনকারী তথ্য- শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও র‍্যামজেটটি চালু ছিল কি না।

২০২৫ সালের এপ্রিলে, রোসোবোরোনেক্সপোর্ট সি৪৩০এল-এর অধীনে প্রযুক্তিগত পরামর্শের জন্য প্রায় দুই ডজন রুশ বিশেষজ্ঞের একটি প্রতিনিধিদল ইরানে পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। একই চিঠিতে তেহরানকে প্রস্তাবিত সফরের আগে ফ্লাইট-টেস্টের টেলিমেট্রি সম্পর্কে প্রকৌশলীদের প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হয় এবং এই মিশনটিকে ইরানের প্রোপালশন সিস্টেমের প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের সাথে যুক্ত করা হয়।

ক্রেমলিন, রোসোবোরোনেক্সপোর্ট এবং এনপিও মাশিনোস্ত্রোইয়েনিয়া মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। লন্ডনে অবস্থিত দূতাবাসের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলে ইরান সরকার এফটি-র প্রশ্নের উত্তর দেয়নি।

রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন মঙ্গলবার তার ইরানি প্রতিপক্ষ মাসুদ পেজেশকিয়ানকে বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধের এই কঠিন সময়ে মস্কো ‘আপনাদের প্রয়োজনীয় সাহায্য দেওয়ার চেষ্টা করছে’ এবং ‘আপনাদের প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করছে’, তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি।

সি৪৩০এল-এর কাজ যখন চলছিল, তখনই ২০২৪ সালে পুতিন ইউক্রেনে পশ্চিমা দেশগুলোর উন্নত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের প্রতিশোধ হিসেবে এই মর্মে হুমকি দেন যে, ‘যারা রাশিয়ার সঙ্গে একই কাজ করছে, বিশ্বের সেইসব অঞ্চলে আমরা আমাদের একই শ্রেণির অস্ত্র সরবরাহ করব, যেখান থেকে সেইসব দেশের সংবেদনশীল স্থানগুলোতে হামলা চালানো হবে’।

ইরান ক্রমশ অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যার মধ্যে তাদের বর্ণনাকৃত হাইপারসনিক অস্ত্রও রয়েছে, এবং ধীরগতির ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য টার্বোজেট ও টার্বোফ্যান ইঞ্জিন উৎপাদনকারী একটি দেশীয় শিল্পও তাদের আছে।

কিন্তু র‍্যামজেট প্রোপালশন ব্যবহার করে একটি সুপারসনিক, এয়ার-ব্রেদিং ক্রুজ মিসাইল আয়ত্ত করা, যা শব্দের গতির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বেগে বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে একটানা চালিত উড্ডয়নের সুযোগ করে দেয়, তা এর অস্ত্রাগারে একটি বড় প্রযুক্তিগত ঘাটতি হিসেবে রয়ে গেছে।

অভ্যন্তরীণ সামরিক প্রকৌশল, অবৈধ বিদেশি সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং বিদেশি ব্যবস্থার রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং প্রচেষ্টার মাধ্যমে সেই ব্যবধান ঘোচানোর জন্য তেহরানের উদ্যোগগুলো কয়েক দশক ধরে চলে আসছে এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ে এর সমন্বয় করা হয়েছে।

২০১৬ সালে ইরানের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন যে দেশটি সুপারসনিক জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করবে। দুই বছর পর, সোভিয়েত আমলের খ-৩১এ সুপারসনিক জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ ও নথিপত্র সংগ্রহের চেষ্টার সময় ইউক্রেনে দুই ইরানি কূটনীতিক গ্রেপ্তার হন।

২০১৯ সালে, ইরানের প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট একটি সংস্থা তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে স্থানীয়ভাবে তৈরি একটি র‍্যামজেট ইঞ্জিন পরিদর্শন করতে দেখায় এবং ২০২৩ সালের আগস্টে, আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট তাসনিম সংবাদ সংস্থা দাবি করে যে ইরান একটি সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রোটোটাইপের পরীক্ষা শুরু করেছে।

হিনজ বলেন, একটি কার্যকর র‍্যামজেট-ভিত্তিক অস্ত্র তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন এবং মাত্র অল্প কয়েকটি দেশের কাছেই তা করার প্রযুক্তিগত জ্ঞান রয়েছে।

হিনজ বলেন, ‘রুশরা অনেক দিন ধরেই এই প্রযুক্তির ওপর মনোযোগ দিয়ে আসছে।’

‘মানুষ প্রায়শই প্রযুক্তি হস্তান্তর বলতে শুধু নকশা, যন্ত্রাংশ বা আস্ত ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোকেই বোঝে, কিন্তু একজন ৬০ বছর বয়সী প্রকৌশলীকে উড়ে এসে তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সমস্যার সমাধান করতে পাঠানোটাও অত্যন্ত মূল্যবান।’

ইরানের জন্য, এই ইঞ্জিনটি আয়ত্ত করা সম্ভব হলে তা দেশটিকে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র তৈরি করতে, পরবর্তী প্রজন্মের অস্ত্রের উন্নতি ঘটাতে এবং বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

ল্যামসন বলেন, ‘যদি রুশরা ইরানকে তাদের প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধানে সাহায্য করতে পারে, তবে আমি মনে করি এটি হবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানকে দেওয়া রুশ সামরিক-প্রযুক্তিগত সহায়তার অন্যতম প্রভাবশালী একটি ক্ষেত্র এবং এটি ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা বয়ে আনবে।’

সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস


আন্তর্জাতিক এর আরও খবর

img

কঙ্গোতে এক সপ্তাহে পুড়ল ৭০০ ঘর, এবার স্কুলে আগুনে নিহত ২৯ শিশু

প্রকাশিত :  ০৭:২৬, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (ডিআর কঙ্গো) বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত বুকাভু শহরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকালে চিমপুন্ডা এলাকার একটি বসতিতে আগুন লাগার পর তা দ্রুত পাশের উজামা ও ফুরাহা স্কুলে ছড়িয়ে পড়ে। আগুন থেকে বাঁচতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক হুড়োহুড়ি শুরু হলে পদদলিত ও ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় হাসপাতাল ও কর্মকর্তাদের হিসাবে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

জাতিসংঘ পরিচালিত রেডিও ওকাপি এবং রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় সকাল ৮টার দিকে চিমপুন্ডা এলাকার আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিকভাবে ২০ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও পরে হাসপাতাল ও স্থানীয় সূত্রের হিসাবে মৃতের সংখ্যা ২৯-এ পৌঁছে। নিহতদের মধ্যে ১৯ জন মেয়ে ও পাঁচজন ছেলে থাকার তথ্য জানিয়েছে এএফসি/এম২৩ কর্তৃপক্ষ; নিহতদের পরিচয় ও মোট সংখ্যার বিষয়ে বিভিন্ন স্থানীয় সূত্রে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

আগুনে দুটি স্কুলের পাশাপাশি প্রায় ৩০০টি কাঠের তৈরি ঘর পুড়ে গেছে বলে দক্ষিণ কিভু প্রদেশের উপ-গভর্নর দুনিয়া মাসুমবুকো বুয়েঙ্গে জানিয়েছেন। আগুনের ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়া বহু শিক্ষার্থীকে বুকাভুর বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, একটি হাসপাতালে ৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা হয়, যাদের মধ্যে অন্তত ১৪ জন মারা গেছে বলে চিকিৎসাকর্মীরা জানিয়েছেন।

আগুন লাগার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুনের পথ থেকে বের হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীরা ছোটাছুটি শুরু করলে অনেকে একে অপরের ওপর পড়ে যায়। কেউ কেউ নিরাপদ পথ না পেয়ে বিপজ্জনকভাবে বের হওয়ার চেষ্টা করে। এতে অনেকে পদদলিত হন এবং ধোঁয়ায় শ্বাস নিতে না পেরে জ্ঞান হারান। রেডিও ওকাপির তথ্যেও কিছু শিক্ষার্থীর বাঁচার চেষ্টার সময় হুড়োহুড়িতে প্রাণহানির কথা বলা হয়েছে।

এএফসি/এম২৩ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগুনে আহত ২৯ জনকে বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে ২১ জনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। গুরুতর আহতদের কয়েকজন কাদুতু জেনারেল হাসপাতাল ও বুকাভু প্রাদেশিক জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসাকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, গুরুতর আহতদের মধ্যে আরও প্রাণহানি হতে পারে।

স্থানীয় একটি চিকিৎসাকেন্দ্রের কর্মীরা জানান, আগুনের পর একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে সেখানে নেওয়া হয়। তাদের অনেকেরই ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। কয়েকজনকে ঘটনাস্থলেই মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, অন্যদের হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যু হয়। আগুন নেভানোর পরও ধ্বংসস্তূপ ও পুড়ে যাওয়া টিনের নিচ থেকে হতাহতদের উদ্ধারের কাজ চলছিল।

আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে। রেডিও ওকাপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগুনের কারণ সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বুকাভুতে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

বিশেষ করে চলতি সপ্তাহে বুকাভুতে অগ্নিকাণ্ডের মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। রেডিও ওকাপির তথ্যমতে, এক সপ্তাহে শহরটিতে প্রায় ৭০০টি ঘর আগুনে পুড়েছে। ৬ সেপ্টেম্বরের আগুনেই অন্তত ৭০টি ঘর ধ্বংস হয়। এর এক দিন পরও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন।

বুকাভু বর্তমানে রুয়ান্ডার সমর্থনপুষ্ট এএফসি/এম২৩ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। গোষ্ঠীটি ২০২৫ সালের শুরুতে পূর্ব ডিআর কঙ্গোতে দ্রুত সামরিক অভিযান চালিয়ে শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বাহিনী ও বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত চলছে। এএফসি/এম২৩ বর্তমানে বুকাভুতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণও প্রতিষ্ঠা করেছে।


আন্তর্জাতিক এর আরও খবর