img

ভুয়া স্পন্সর: ইতালিতে ‘শ্রমদাস’ বানানোর ফাঁদ

প্রকাশিত :  ০৫:৫৫, ০৭ অক্টোবর ২০২৬

ভুয়া স্পন্সর: ইতালিতে ‘শ্রমদাস’ বানানোর ফাঁদ

ইতালিতে বৈধভাবে কাজ দেওয়ার কথা বলে ভোলার লালমোহনের মো. রাসেলকে নিয়ে ঘরবন্দি করে রাখে একটি পাচারকারী চক্র। একপর্যায়ে তিনি জানতে পারেন, তাঁকে অন্যত্র ‘শ্রমদাস’ হিসেবে বিক্রির চেষ্টা চলছে।

নিরুপায় হয়ে রাসেল চক্রের সদস্য মো. সাঈদের পা জড়িয়ে ধরে বৈধভাবে কাজ দেওয়ার এবং অবৈধভাবে অন্য কারও কাছে তুলে না দেওয়ার অনুরোধ করেন। তখন সাঈদ নতুন স্পন্সর দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাঁর কাছে আরও চার লাখ টাকা দাবি করেন।

দেশে ফিরে টাকা জোগাড় করে দ্বিতীয়বার ইতালি গেলেও একইভাবে রাসেলকে আটকে রাখা হয়। এক পর্যায়ে দেশি এক ব্যক্তির সহায়তায় পালিয়ে পূর্বপরিচিত একজনের কাছে আশ্রয় নেন তিনি।

পরে ইতালি পুলিশের সহায়তায় কাগজপত্র যাচাই করে জানতে পারেন, তাঁর ভিসার মেয়াদ শেষ এবং যে স্পন্সরের ভিত্তিতে তাঁকে নেওয়া হয়েছিল, সেটি সম্পূর্ণ ভুয়া। চক্রটি তাঁকে ‘শ্রমদাস’ বানানোর ফাঁদে ফেলতে যাচ্ছে। শেষমেশ স্বজনদের পাঠানো টিকিটে সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফেরেন তিনি।

এসব অভিযোগে ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মানবপাচার ও অভিবাসন ট্রাইব্যুনালে সাঈদসহ চক্রের চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন রাসেল।

অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) মামলাটির তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। সিআইডির উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবদুল হাকিম তদন্ত শেষে চলতি বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। চক্রের মূল হোতা চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের মো. হাসান আলীসহ (৪৬) চার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের এই সত্যতা পাওয়া গেছে।

মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬-এর ৬ ও ৭ ধারায় অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।

চক্রের অন্য সদস্যরা হলেন হাসানের বেয়াই মো. সাঈদ (৩৮), হাসানের ভাই মো. হোসেন খান (৪২) ও মো. জাবেদ (২৮)। তবে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললেও আসামিরা এখনো কেউ ধরা পড়েননি।

এ বিষয়ে সিআইডি কর্মকর্তা মো. আবদুল হাকিম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘তদন্তে যা পেয়েছি, সেটাই প্রতিবেদনে জমা দিয়েছি। এখন বাকি ব্যবস্থা আদালত নেবেন।’

সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর মোস্তফা কামাল বলেন, ‘এখানে সাত মাস ধরে নিজস্ব বিচারক না থাকায় প্রতিবেদনে সত্যতা পাওয়ার পরও এ ধরনের ১০০ মামলার আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার হচ্ছে না। জেলা ও দায়রা জজ (ভারপ্রাপ্ত) বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে এটি দেখছেন। ওখানে মাঝেমধ্যে শুনানি হয়, যা মানবপাচারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রাইব্যুনালে  দ্রুত বিচার পাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।’

ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, সিআইডির প্রতিবেদনটি গ্রহণের বিষয়ে আদালতে আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে। আদেশ হওয়ার পরই আসামিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মামলার অভিযোগ ও সিআইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার নয়াপল্টনে ভুক্তভোগী রাসেলের (৩০) চাচার অফিসে ১ নম্বর আসামি ও (মূল মাধ্যম) চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের হাসান আলীর সঙ্গে পরিচয় হয়। হাসানের প্রলোভনে পড়ে ইতালিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রাসেল। ২০২৩ সালের ২০ মার্চ নয়াপল্টনের একটি অফিসে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে তাঁদের চুক্তি হয়। যেখানে ১৫ লাখ টাকা দিলেই বৈধ ইতালিয়ান স্পন্সর ভিসা, পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট কার্ড (পিআরসি) ও চাকরি দেওয়ার কথা ছিল। তবে প্রসেসিং, ভিসা ফি, ম্যানপাওয়ার ও টিকিটের খরচের কথা বলে ধাপে ধাপে মোট ১৮ লাখ ২৩ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর টার্কিশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে ইতালি পৌঁছার পর হাসান আলীর নির্দেশমতো তাঁর বেয়াই ২ নম্বর আসামি সাঈদের কাছে যান রাসেল। সাঈদ তাঁকে ইতালির নেপোলির পালমা ক্যাম্পানিয়ায় একটি কক্ষে নিয়ে এক মাস আটকে রাখেন। বৈধ কোনো কাজ না দিয়ে অন্য এক ব্যক্তির কাছে বাধ্যতামূলক ‘শ্রমদাস’ হিসেবে বিক্রির জন্য দেনদরবার শুরু করেন। প্রতারণার বিষয় বুঝতে পেরে ভেঙে পড়েন রাসেল এবং সাঈদের পা ধরে কান্নাকাটি করে আকুতি জানান। এক পর্যায়ে বিষয়টি গোপনে দেশে মামাকে জানালে তিনি পল্টন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

রাসেলের দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে আসামি সাঈদ বৈধ স্পন্সরের জন্য আরো চার লাখ টাকা দাবি করেন। রাসেল এতে রাজি হয়ে ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন। ২০২৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি নয়াপল্টনের কার্যালয়ে হাসান আলীকে তাঁর ভাই হোসেন খান এবং আসামি জাবেদের উপস্থিতিতে অতিরিক্ত চার লাখ টাকা দেন রাসেল। বিমান টিকিটের জন্য নিজে খরচ করেন আরো এক লাখ টাকা।

২৮ এপ্রিল সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইনসের এসভি ৮০৫ ফ্লাইটে পুনরায় ইতালি যান রাসেল। দ্বিতীয়বার ইতালি পৌঁছলেও তাঁকে কোনো কাজ না দিয়ে একটি কক্ষে বন্দি রেখে প্রাণনাশের হুমকি দেন আসামিরা এবং গোপনে তাঁকে অন্য লোকের কাছে বিক্রির চেষ্টা করে সাঈদ।

পরিস্থিতি বুঝতে পেরে সেখানে থাকা বরিশালের এক ব্যক্তির সহায়তায় দরজার লক খুললে পালিয়ে যান রাসেল। পূর্বপরিচিত আজাদের আশ্রয়ে যান তিনি। আজাদের সহায়তায় ৮ জুলাই ইতালি পুলিশের শরণাপন্ন হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানা যায়, মূল মালিকের স্বাক্ষর জাল করে ওই স্পন্সর তৈরি করা হয়। ইতালির পুলিশের সহায়তা নিয়ে স্বজনদের পাঠানো বিমান টিকিটে ১৫ জুলাই সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফেরেন রাসেল।

ভুক্তভোগী মো. রাসেল  বলেন, ‘এরা একটি চক্র। আমি ছাড়াও অনেকের সঙ্গে এমন করেছে। জাল স্পন্সরের বিষয়টি ইতালি যাওয়ার আগে বুঝতে পারিনি। ওরা সেখানকার আইনজীবী দিয়ে মূল একজন মালিকের স্বাক্ষর জাল করে মূলত এটা তৈরি করে। এ জন্য ইতালির ওই আইনজীবীরাও জেলে গেছে। ইতালি পুলিশই আমাকে প্রথম জানায় যে এটি সম্পূর্ণ ভুয়া স্পন্সর। আমার কাছ থেকে চক্রটি ১৮ লাখ ২৩ হাজার টাকা ছাড়াও আরো ক্যাশ টাকা নিয়েছে। তবে সেগুলোর কোনো প্রমাণ না থাকায় সিআইডির প্রতিবেদনে উঠে আসেনি।’

আসামিদের শাস্তির দাবি করে রাসেল বলেন, ‘চার আসামির মধ্যে ২ নম্বর আসামি সাঈদ ইতালিতে, হাসানসহ অন্যরা দেশে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। এরা সংঘবদ্ধ চক্র। আমি আদালতের কাছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

আন্তর্জাতিক এর আরও খবর

img

বিক্ষোভ উত্তাল দিল্লি: পুলিশ টেনে-হিঁচড়ে সরানোর পর আবারও ধর্মঘটে রাহুল-প্রিয়াঙ্কা

প্রকাশিত :  ১৪:২৬, ০৭ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৬:০৯, ০৭ অক্টোবর ২০২৬

দিল্লির যন্তর মন্তরে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ ‘ইন্ডিয়া’ জোটের একাধিক নেতাকে টেনে-হিঁচড়ে সরিয়ে দেয় পুলিশ। তাদেরকে আটক করে বাসেও তোলা হয়। পরে বাস থেকে নেমে পড়ে রাস্তার মধ্যে অবস্থান  ধর্মঘটে বসেন গান্ধীসহ অন্যান্য নেতারা। আজ বুধবার তাদের আটকের এ ঘটনা ঘটে। এটি স্বাভাবিক গ্রেপ্তারের কোনো প্রক্রিয়া নয়।

কংগ্রেস সূত্র দাবি করেছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রতিবাদে বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেওয়া এবং টানা দ্বিতীয় দিনের মতো প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে বরখাস্তের দাবি জানানোর সময় এ ঘটনা ঘটে। 

সূত্র আরও জানিয়েছে, রাহুল এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এখনো ওই এলাকায় অবস্থান ধর্মঘটে বসে আছেন। তারা পুলিশের চলে যাওয়ার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরে যেতে বাধা দেওয়ার পর আকাশবাণী ভবনে হঠাৎ করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করার সময়ও গান্ধীদের হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল।

পুলিশের দাবি, আজ তারা আগাম কোনো অনুমতি নেননি। মধ্য দিল্লির একটি রেস্তোরাঁয় কৌশল নির্ধারণী মধ্যাহ্নভোজের পর সাংসদেরা যন্তর-মন্তরের দিকে রওনা হয়েছিলেন। তবে পুলিশ তাদের থামিয়ে দেয়। প্রাথমিকভাবে, রাহুল গান্ধীসহ নেতাদের আটক করে একটি বাসে বসানো হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ অন্যদের ধরতে গেলে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতারা বাস থেকে নেমে এসে আবার রাস্তায় বসে পড়েন।

রাজধানীতে দিনভর চরম নাটকীয়তা, রাহুল গান্ধীর বিক্ষোভ এবং পরবর্তীতে আটকের পর, ‘ভোট চুরি’ ইস্যুতে আন্দোলন জোরদার করতে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের আমন্ত্রণে বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোট দিল্লির জনপথের সাগর রত্ন রেস্তোরাঁয় সমবেত হয়েছিল।

গণতন্ত্র ধ্বংস করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে খাড়গে বলেন, বিরোধীরা ‘ভোট চুরি’র বিষয়টি জনগণের কাছে নিয়ে যাবে।

জনপথের সাগর রত্ন রেস্তোরাঁর বাইরে বাস পার্ক করা ছিল এবং মধ্যাহ্নভোজের পর সাংসদেরা সেগুলোতে উঠে যন্তর মন্তরের দিকে রওনা হন। পুলিশ যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার সব রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছিল। পথিমধ্যেই বিরোধী সাংসদদের বহনকারী বাসগুলো পুলিশ আটকে দেয়।

দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, যন্তর মন্তরে কোনো বিক্ষোভ করার জন্য পূর্বানুমতির প্রয়োজন হয়। এ ধরনের অনুমতি চাওয়ার আবেদনগুলো প্রস্তাবিত কর্মসূচির অন্তত ১০ দিন আগে নয়াদিল্লি জেলার ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশের কাছে জমা দিতে হয়।

রাহুল গান্ধীও জানিয়েছিলেন, বিরোধী সাংসদেরা যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ করবেন।

মধ্যাহ্নভোজের পর রাহুল গান্ধী বলেন, ‘আমি গতকাল যেমনটি বলেছিলাম, প্রায় ৩০০ জন সাংসদ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাথে দেখা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তারা জানান যে আমরা সেখানে বিক্ষোভ করতে পারব না। তাই আজ আমাদের পরিকল্পনা হলো নির্ধারিত বিক্ষোভের স্থান যন্তর মন্তরে যাওয়া, সেখানে আবার একসাথে বসবো। আমরা দেশকে বলবো, আমাদের কাছে জ্ঞানেশ কুমার দেশের বৈধ নির্বাচন কমিশনার নন। মোদিজি, অমিত শাহজি, মোহন ভাগবত এবং জ্ঞানেশ কুমার দেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছেন।’ 

মঙ্গলবারের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে হওয়া এফআইআর নিয়ে ঠাট্টা করে রাহুল গান্ধী বলেন, তিনি চান তার বিরুদ্ধে ১০০টি এফআইআর দায়ের করা হোক। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ৪৫টি এফআইআর আছে। আমার টার্গেট হলো ১০০টি।’ 

বিনা অনুমতিতে আকাশবাণী ভবনে প্রবেশ ও ছয় ঘণ্টা ধরে অবস্থান ধর্মঘট করার অভিযোগে আজ বুধবার গান্ধী এবং তার বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

বিরোধীদের রাজপথের বিক্ষোভে রাহুল গান্ধীর মধ্যমণি হয়ে ওঠার এক দিন পরই এই মধ্যাহ্নভোজের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো। গতকাল তার নেতৃত্বে আট ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা ওই অবস্থান কর্মসূচির কারণে পার্লামেন্ট স্ট্রিট পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। বিরোধী সাংসদদের কাছের নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ের দিকে পদযাত্রা করতে বাধা দেওয়ার পর জোরপূর্বক তাকে আটকের মধ্য দিয়ে এর সমাপ্তি ঘটে।

লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা এবং অন্যদের প্রায় দুই ঘণ্টা আটকে রাখার পর রাত ১০টায় ছেড়ে দেওয়া হয়।


আন্তর্জাতিক এর আরও খবর