img

নতুন বেতন স্কেলের অর্থ জোগাতে ভর্তুকি ও সরকারি ব্যয় কমানোর সুপারিশ

প্রকাশিত :  ০৬:৫০, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

নতুন বেতন স্কেলের অর্থ জোগাতে ভর্তুকি ও সরকারি ব্যয় কমানোর সুপারিশ

নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে ভর্তুকি কমানো, রপ্তানি খাতে নগদ প্রণোদনা ধাপে ধাপে বন্ধ করা এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের সুপারিশ করেছে জাতীয় বেতন কমিশন। পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস, অকার্যকর উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো এবং রাজস্ব আয় বাড়াতে কর ব্যবস্থার সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে কমিশন।

সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন কমিশন চলতি বছরের জানুয়ারিতে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। সে সময় কমিশনের প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো প্রকাশ করা হলেও পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি জনসমক্ষে আসেনি।

বর্তমান বিএনপি সরকার চলতি ও আগামী অর্থবছরে কয়েক ধাপে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। মন্ত্রিপরিষদে কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে বেতন কাঠামো অনুমোদনের পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের নতুন বেতন-ভাতা দিতে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

কমিশন এ খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন করেছিল ১ লাখ ৬ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেতন বাবদ ৩৯ হাজার ৩৪০ কোটি, বিভিন্ন ভাতা বাবদ ২৯ হাজার ২৬৩ কোটি, পেনশনভোগীদের জন্য ১৯ হাজার ৭৩৩ কোটি এবং বাজেট বরাদ্দ থেকে বেতন-ভাতা পাওয়া কর্মচারীদের জন্য ১৭ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল।

প্রতিরক্ষা খাতসহ সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত প্রায় ২৩ লাখ কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য এ বাড়তি অর্থ ব্যয় হবে। এর আগে পুরোনো বেতন কাঠামোয় সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের পেছনে সরকারের বার্ষিক ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।

ভর্তুকি কমিয়ে ব্যয় সংকোচনের পরিকল্পনা

জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদনে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও কৃষি খাতের ভর্তুকির কার্যকারিতা নিয়মিত পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিশনের মতে, যেসব ভর্তুকি অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে তুলে নিয়ে ওই অর্থ অন্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

এ জন্য জ্বালানি তেলের দাম বাজারের সঙ্গে সমন্বয়, ধাপে ধাপে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে একদিকে ভর্তুকির চাপ কমবে, অন্যদিকে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে বলে মনে করছে কমিশন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় রপ্তানি খাতে নগদ প্রণোদনার প্রয়োজন আগের তুলনায় কমেছে। তাই ১২ থেকে ১৪ মাসের মধ্যে ধাপে ধাপে এ প্রণোদনা বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে সরকারের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট নথি অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে সরকারের ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকায়। পরবর্তী অর্থবছরে সংশোধিত বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। আর চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা।

উন্নয়ন প্রকল্প ও প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর প্রস্তাব

সরকারি ব্যয় কমাতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন অতিরিক্ত বিভাগ একীভূত বা সংখ্যা কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছে কমিশন। প্রশাসনিক সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে দেওয়া এ সুপারিশ বাস্তবায়ন করা গেলে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি নিয়মিত পরিচালন ব্যয়ও কমতে পারে।

এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ধীরগতির এবং প্রত্যাশিত সুফল দিতে ব্যর্থ প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্রকল্প থেকে সাশ্রয় হওয়া অর্থ অগ্রাধিকারমূলক উন্নয়ন কার্যক্রম এবং বেতন-ভাতাসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতের ব্যয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে।

দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ, সরকারি ভ্রমণ, জ্বালানি তেল, লুব্রিকেন্ট, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজস্ব আয় বাড়াতে কর সংস্কার

বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় কম উল্লেখ করে রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়ন ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা এবং ঋণের সুদ পরিশোধের বাড়তি চাপ মোকাবিলায় বর্তমান রাজস্ব আদায় যথেষ্ট নয়।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা—এই দুই ভাগে পুনর্গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি কর ছাড়ের পরিমাণ পর্যালোচনা ও নিয়ন্ত্রণে একটি কার্যকর কর ব্যয় ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে কমিশন।

কর ব্যবস্থার আওতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে সম্পদশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়লেও তাঁদের অনেকে এখনো করের আওতার বাইরে রয়েছেন। তাদের করজালের মধ্যে আনতে রাজস্ব বিভাগে জনবল বাড়ানো এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া রাজস্ব বিভাগের গবেষণা কার্যক্রম জোরদার, দক্ষ জনবল নিয়োগ, পৃথক গবেষণা সেল গঠন এবং নিয়মিত নতুন রাজস্ব উৎস চিহ্নিত করে প্রতিবেদন তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।

কর-বহির্ভূত আয় বাড়ানোর তাগিদ

কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের মোট রাজস্ব আয়ের মাত্র ১৩ দশমিক ২ শতাংশ এসেছে কর-বহির্ভূত উৎস থেকে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এ হার কম।

সেবার মান বজায় রেখে বিদ্যমান কর-বহির্ভূত ফির হার বাড়ানো এবং নতুন আয়ের উৎস চিহ্নিত করার মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছে কমিশন।

এ ছাড়া ভূমি উন্নয়ন কর, মদ ও মাদকদ্রব্যের ওপর শুল্ক, সড়ক কর, স্ট্যাম্প ডিউটি এবং গাড়ির করের হার বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কমিশনের রাজস্বসংক্রান্ত সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকার ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে, যার কিছু প্রতিফলন চলতি বাজেটেও দেখা যাচ্ছে। ব্যয় কমানোর প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। তবে কমিশনের সব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব নাও হতে পারে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দীর্ঘদিন ধরে এসব সংস্কারের তাগিদ দিয়ে আসছে। ঋণ আলোচনার সময়ও দাতা সংস্থাগুলো ভর্তুকি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেয়।

সব মিলিয়ে, নতুন বেতন কাঠামোর বিপুল ব্যয় সামাল দিতে ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস, প্রশাসনিক ব্যয় সংকোচন এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধির সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছে জাতীয় বেতন কমিশন। তবে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।


বাংলাদেশ এর আরও খবর

img

মক্কায় বাংলাদেশি নারী-পুরুষের ফাঁসি কার্যকর

প্রকাশিত :  ০৮:৪১, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:৪৮, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

সৌদির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের অপরাধে আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত বুধবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি হলেন- নজরুল ইসলাম আবদুল বশীর ও সিতি আক্তার।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পবিত্র নগরী মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কাজের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় নিরাপত্তা বাহিনী ওই দুই বাংলাদেশিকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জশিট দেওয়া হয়।

মামলাটি বিচারিক আদালতে পাঠালে সময়ের গুরুত্ব ও পবিত্র স্থানের মর্যাদা লঙ্ঘনের অপরাধ বিবেচনা করে আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। পরবর্তীতে উচ্চতর কর্তৃপক্ষ রায়টি বহাল রাখে এবং রাজকীয় ফরমানের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দেশ দেওয়া হয়।

গতকাল বুধবার মক্কা অঞ্চলে নজরুল ইসলাম ও সিতি আকতারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিজ্ঞপ্তিতে জোর দিয়ে বলেছে, দেশের নিরাপত্তা রক্ষা, বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং যারা মসজিদের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করে বা অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়—তাদের বিরুদ্ধে ইসলামি শরিয়াহ আইন বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যে কেউ এ ধরনের অপরাধ করার চেষ্টা করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

সূত্র: আজেল নিউজ

বাংলাদেশ এর আরও খবর