img

পিয়ারা পাকিস্তানি ভাই, কিন্তু দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর দায় নিয়ে প্রশ্ন কোথায়?

প্রকাশিত :  ১৩:০০, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৪:৫১, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

পিয়ারা পাকিস্তানি ভাই, কিন্তু দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর দায় নিয়ে প্রশ্ন কোথায়?

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

মানুষের মৃত্যু কখনো কখনো একটি সংবাদ হয়ে আসে, কয়েক ঘণ্টা আলোচনার কেন্দ্রে থাকে, তারপর হারিয়ে যায় অসংখ্য নতুন ঘটনার ভিড়ে। কিন্তু কিছু মৃত্যু আছে, যেগুলো শুধু শোকের নয়, প্রশ্নেরও জন্ম দেয়। যে প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হয়। মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা তেমনই একটি নির্মম অধ্যায়।

প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে সৌদি আরবের আদালত কেন দুই বাংলাদেশিকে মৃত্যুদণ্ড দিল। প্রশ্ন হলো, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রকৃত অভিযোগ কী ছিল, কী ধরনের সাক্ষ্যপ্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তাঁরা নিজেদের পক্ষে কথা বলার যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছিলেন কি না এবং পুরো বিচারপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল। এমন একটি ঘটনা, যেখানে দুটি মানুষের জীবন চিরতরে শেষ হয়ে গেছে, সেখানে এসব প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন বর্ণনায় দাবি করা হচ্ছে, ওই দুই বাংলাদেশি ছিলেন নবদম্পতি। ওমরাহ পালন করতে গিয়ে একটি মসজিদে নামাজ শেষে স্বামী তাঁর স্ত্রীর কপালে চুম্বন করেছিলেন। একজন পাকিস্তানি নাগরিক নাকি সেই দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করে নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে অভিযোগ করেন। পরবর্তী সময়ে সেই ব্যক্তির সাক্ষ্য মামলার পরিণতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলেও দাবি করা হচ্ছে।

কিন্তু এখানেই সতর্ক হওয়া জরুরি। এসব বিবরণের সবকিছুর স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। অতএব, একজন পাকিস্তানি নাগরিক মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর কারণ হয়েছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, এই দাবি সত্য হলে তার যথাযথ তদন্তের দাবি তোলাও জরুরি। কারণ অভিযোগের গুরুত্ব যত বড়, সত্য যাচাইয়ের দায়িত্বও তত বেশি।

তবু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। আমরা কি কেবল পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের পক্ষ নিই? কেউ পাকিস্তানি হলে তাঁর ভুলের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে আমাদের সংকোচ হয় কেন? আবার কেউ বাংলাদেশি হলে তাঁর প্রতি সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে আমরা কখনো কখনো তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনটুকুও ভুলে যাই কেন?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে ভালোবাসার ভাষায় ‘পিয়ারা পাকিস্তানি ভাই’ বলে সম্বোধন করা ব্যক্তিগত আবেগের বিষয় হতে পারে। কিন্তু সেই আবেগ যদি প্রশ্ন করার অধিকারকে সংকুচিত করে, তবে তা আর সুস্থ সম্পর্কের পরিচয় দেয় না। কোনো জাতির প্রতি অনুরাগ কখনোই কোনো ব্যক্তির সম্ভাব্য অন্যায়কে আড়াল করার যুক্তি হতে পারে না। মানুষকে বিচার করতে হবে তাঁর কাজ দিয়ে, জাতীয়তা দিয়ে নয়।

যদি কোনো ব্যক্তি জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকেন, নিরপরাধ মানুষকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন, অথবা কোনো বিচারপ্রক্রিয়াকে অন্যায়ভাবে প্রভাবিত করে থাকেন, তাহলে তাঁর পরিচয় যা-ই হোক, সেই অভিযোগের তদন্ত হওয়া উচিত। তিনি পাকিস্তানি, সৌদি, বাংলাদেশি কিংবা অন্য কোনো দেশের নাগরিক, তাতে ন্যায়বিচারের মানদণ্ড বদলে যেতে পারে না। আর যদি অভিযোগটি প্রমাণিত না হয়, তবে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার দেখে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করাও ন্যায়বিচার নয়।

এখানে সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কেও কিছু মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, সৌদি কর্তৃপক্ষ দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’ করার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা জানিয়েছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। বাংলাদেশি কনস্যুলেটও আগাম অবহিত হওয়ার কথা অস্বীকার করে পরে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ঘটনার বিস্তারিত জানতে চেয়েছে।

মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির ক্ষেত্রে এই অস্পষ্টতা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। অভিযোগের প্রকৃতি, সাক্ষ্যপ্রমাণ, অভিযুক্তদের বক্তব্য, আইনজীবীর সহায়তা, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা এবং আপিলের সুযোগ সম্পর্কে জনসমক্ষে যতটা সম্ভব পরিষ্কার তথ্য থাকা প্রয়োজন। কোনো অভিযুক্ত আরবি ভাষা না জানলে তিনি বিচারপ্রক্রিয়া বুঝতে পেরেছিলেন কি না, তাঁর বক্তব্য সঠিকভাবে অনুবাদ হয়েছিল কি না এবং নিজের পক্ষে কার্যকরভাবে সওয়াল করার সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, সেসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সংশ্লিষ্ট দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রে এসব ঘাটতি ঘটেছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্যও নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন।

একটি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা তার কঠোরতার মাধ্যমে নয়, ন্যায়বিচারের নির্ভরযোগ্যতার মাধ্যমে আস্থা অর্জন করে। ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষার নামে কোনো আইন প্রয়োগ করা হলেও সেই আইনের প্রয়োগে স্বচ্ছতা, প্রমাণের যথার্থতা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন তার নিজস্ব পথে চলবে, কিন্তু অভিযোগের প্রকৃতি অস্পষ্ট রেখে দুটি জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যদি পরিবার, স্বজন ও সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ পূর্ণাঙ্গ তথ্য না পান, তাহলে ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

আমাদের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো, আমরা ঘটনার পুরো সত্য জানার আগেই নিজেদের পছন্দমতো পক্ষ বেছে নিই। কেউ বিদেশি রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়ান, কেউ জাতীয় আবেগে উত্তেজিত হন, আবার কেউ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি গল্পকেই চূড়ান্ত সত্য ধরে নেন। অথচ সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা এসব অবস্থানের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল, কথিত সাক্ষী সত্যিই ছিলেন কি না, তাঁর বক্তব্য কী ছিল এবং বিচার কোন তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে হয়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তর চাইতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের কাছেও প্রত্যাশা, তারা যেন কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করে এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম বা অধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়।

আমি কোনো জাতির বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াতে চাই না। পাকিস্তানের সব মানুষকে দায়ী করারও কোনো যুক্তি নেই। কিন্তু পাকিস্তানি বলে কেউ প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকবেন, কিংবা অন্য কোনো পরিচয়ের কারণে কেউ আগাম অপরাধী হয়ে যাবেন, এমন বিচারবোধ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

‘পিয়ারা পাকিস্তানি ভাই’ বলে কাউকে আপন ভাবতেই পারেন। কিন্তু সেই ভালোবাসা যেন সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতাকে বিসর্জন না দেয়। বন্ধুত্বের অর্থ অন্যায়ের ক্ষেত্রে নীরব থাকা নয়। মানবিকতার অর্থ নিজের পক্ষের মানুষের ভুল অস্বীকার করা নয়। বরং প্রকৃত মানবিকতা হলো, নিজের প্রিয় মানুষটির বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠলে সত্যকে সত্য এবং অন্যায়কে অন্যায় বলার সাহস রাখা।

দুটি মানুষের জীবন আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু তাঁদের মৃত্যু ঘিরে ওঠা প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা এখনো সম্ভব। তাই আবেগের জয়গান নয়, চাই তথ্যের স্বচ্ছতা। জাতীয় পরিচয়ের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়, চাই নিরপেক্ষ তদন্ত। আর কোনো রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নহীনভাবে মেনে নেওয়া নয়, চাই এমন ন্যায়বিচার, যেখানে মানুষের জীবন, মর্যাদা ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়।

কারণ, শেষ পর্যন্ত আমাদের পরিচয় পাকিস্তানি, বাংলাদেশি কিংবা অন্য কোনো দেশের নাগরিক হওয়ার চেয়েও বড় হলো আমরা মানুষ। আর মানুষের জীবনের প্রশ্নে সত্যের চেয়ে বড় কোনো আনুগত্য থাকতে পারে না।

img

সৌদি ও হুতির সামনে এখন যে দুই পথ খোলা রয়েছে

প্রকাশিত :  ০৬:৪৮, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১১:১৮, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

আব্দুলসামাদ আলফাগি

সৌদি আরবে ইরান-সমর্থিত হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা ইয়েমেন যুদ্ধকে এক নতুন মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো এসব হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে লাল রেখা বা সীমারেখা মানার সব পথই বন্ধ হয়ে গেছে।

হুতিদের এটি একটি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন বাজি, যা কোনোভাবেই তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করবে না। তারা খুব ভালো করেই জানে এর পরিণতি এবং পাল্টা হামলা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তারপরও তারা সৌদি আরবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে মূলত মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের (মিডটার্ম) ঠিক আগে এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াতে ইরানের যে পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়নের জন্য।

পরিস্থিতি যেহেতু ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে, তাই বর্তমান প্রেক্ষাপট দুটি বড় ধরনের দৃশ্যপটের জন্ম দিতে পারে: হুতিদের বিরুদ্ধে একটি বড় আঞ্চলিক সামরিক অভিযান অথবা একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ (ওয়ার অব অ্যাট্রিশন)।

হুতিদের ক্রমাগত উসকানির জবাবে সৌদি আরব এখন আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করার চেষ্টা করছে। লক্ষ্য একটাই—একটি শক্তিশালী ঐক্যবদ্ধ জোট গঠন করা, যা আঞ্চলিক হুমকিতে পরিণত হওয়া এই গোষ্ঠীকে প্রতিহত করতে পারবে।

রিয়াদ স্বাভাবিকভাবেই তার প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে; কারণ, অঞ্চলটির চলমান অশান্তির আঁচ তাদের গায়েও লাগছে। সবার মধ্যেই এখন এই উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে বিপদটি শুধু সৌদির একার নয়, বরং পুরো অঞ্চলের জন্য।

ফলে ওমান ছাড়া বাকি উপসাগরীয় দেশগুলো ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে রিয়াদকে পূর্ণ সমর্থন দিতে পারে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের পাশাপাশি তুরস্কও এই জোটে যুক্ত হতে পারে। কারণ, সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের ‘মক্কা চুক্তি’ নামে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। চুক্তিটি তুর্কি সংসদে অনুমোদন পেলেই সৌদি আরবকে সহায়তায় সেখানে তুর্কি সেনা মোতায়েনের পথ সহজ হবে। অবশ্য আড়ালে তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক সহায়তা, রসদ ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ ইতিমধ্যেই পুরোদমে চালু রয়েছে।

 ইয়েমেন সংকটের একমাত্র সমাধান হলো—ইয়েমেন সরকারের নেতৃত্বে এবং একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক জোটের সমর্থনে একটি চূড়ান্ত ও নির্ণায়ক সামরিক অভিযান। আর তা বাস্তবায়ন করতে হলে ইয়েমেন সরকারকে অবশ্যই সবার আগে নিজের ঘর সামলাতে হবে এবং তাদের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের এ যুদ্ধের সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ঘটার সম্ভাবনা বেশ কম। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো নতুন সামরিক অভিযানে জড়ানোকে মার্কিন ভোটাররা ইতিবাচকভাবে দেখেন না।

একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক জোট ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিশ্বস্ত বাহিনীকে শক্তিশালী পাল্টা আক্রমণ চালাতে সাহায্য করতে পারে। এটি বাব আল-মানদেব ও ধুবাব ছাড়িয়ে পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল আবার নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি জোগাবে।

উপকূলীয় এই সাফল্যগুলো লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেবে এবং যুদ্ধের পাল্লা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। ইয়েমেনের অন্যান্য শহর ও প্রদেশে নতুন সামরিক ফ্রন্ট খুলে দেওয়া সম্ভব হলে হুতিদের মনোযোগ ও রসদ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এতে সরকারি বাহিনীকে আরও দ্রুত সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

এর ফলে রাজধানী সানা পুনরুদ্ধারের পথও হয়তো উন্মোচিত হতে পারে। তবে সরকারের পক্ষে সানা পুনর্দখলের প্রধান বাধা হলো তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল। বাইরের নেতিবাচক হস্তক্ষেপ বা প্রভাব এই কোন্দলকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং হুতিদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াইকে দুর্বল করে ফেলতে পারে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেন সরকার তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে এক ছাতার নিচে আনা এবং সামরিক কমান্ডকে সংহত করতে যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তার সুফল মাঠে ইতিবাচকভাবে দেখা যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও রাজধানী সানা পুনর্দখলের চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে তাদের লাগাতার প্রচেষ্টা ও অবিচল রাজনৈতিক সংকল্প প্রয়োজন।

সরকারি বাহিনী যদি কৌশলগতভাবে বড় ধরনের কোনো অগ্রগতি অর্জন করতে পারে, তবে হুতিরা সাময়িক যুদ্ধবিরতি বা বিরতির বিনিময়ে কিছু ছাড় দিতে বাধ্য হতে পারে। অতীতেও তারা এমনটা করেছে। তবে তাদের আসল উদ্দেশ্য শান্তি প্রতিষ্ঠা নয়; বরং কিছুটা সময় নিয়ে নিজেদের নতুন করে গুছিয়ে নেওয়া এবং পুনরায় নতুন শক্তিতে হামলা চালানো। হুতিদের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসার সময় কূটনীতিক ও মধ্যস্থতাকারীদের এ বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে মাথায় রাখতে হবে।

যদি সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং ইয়েমেন সরকার নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও মতপার্থক্য মেটাতে ব্যর্থ হয়, তবে হুতিদের বিরুদ্ধে তাদের অগ্রযাত্রা অনেকটাই থমকে যাবে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে হুতি যোদ্ধারা কেবল নিজেদের অবস্থানই শক্ত করবে না, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাইজ শহরের ওপর চাপ বাড়াবে এবং সৌদির বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যাবে।

এমন পরিস্থিতি সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলবে। ফলে বেসামরিক প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা বহুগুণ বাড়বে এবং কোনো চূড়ান্ত ফলাফল ছাড়াই যুদ্ধ প্রলম্বিত হতে থাকবে।

এর একটি বড় অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে সৌদি আরবের ওপর। প্রতিরক্ষা খাতে অস্বাভাবিক খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়বে।

যেহেতু সৌদি আরব এই অঞ্চলের অর্থনীতির চালিকা শক্তি, তাই পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতেই এর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তা ছাড়া হুতিদের কাছে ভূখণ্ড হাতছাড়া হওয়ার অর্থ হলো হরমুজ প্রণালির সংকট অব্যাহত থাকা, যা মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি রপ্তানি ব্যাহত করবে।

এই দ্বিতীয় দৃশ্যপটের ফল হবে একটি স্থবির অবস্থা বা অচলাবস্থা, যেখানে ‘কেউ বিজয়ী নয়, কেউ পরাজিত নয়’। তবে আড়ালে আসল লাভটা হবে ইরানের। লোহিত সাগর উপকূলে একটি ক্ষয়িষ্ণু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চলতে থাকলে তেহরান সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ থেকে অনেকটাই হালকা হতে পারবে।

এর ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ের আলোচনায় ইরান ‘হুতি কার্ড’কে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে এবং নিজেদের শর্ত ও দাবিগুলো আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ পাবে।

অতএব ইয়েমেন সংকটের একমাত্র সমাধান হলো—ইয়েমেন সরকারের নেতৃত্বে এবং একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক জোটের সমর্থনে একটি চূড়ান্ত ও নির্ণায়ক সামরিক অভিযান। আর তা বাস্তবায়ন করতে হলে ইয়েমেন সরকারকে অবশ্যই সবার আগে নিজের ঘর সামলাতে হবে এবং তাদের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে হবে।


 আব্দুলসামাদ আলফাগি ওয়াশিংটন সেন্টার ফর ইয়েমেন স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা। (আল-জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।)