সৌদি আরবে প্রবাসী কর্মীদের অমানবিক নিপীড়ন নির্যাতনের শেষ কোথায়!
শেখ জাফর আহমদ
সম্প্রতি সৌদি আরবের সরকার বাংলাদেশের দুই রেমিট্যান্স যোদ্ধা আব্দুল বশির ও সিতি আক্তার নামে তরুন-তরুনীর মৃত্যুদন্ডের রায় কার্যকর করেছে। তাদের অপরাদ মক্কার একটি মসজিদের ভিতরে তারা অনৈতিক কাজে লিপ্ত ছিলেন। কিন্তু কি ধরনের অপরাধ, অপরাদের ধরন, অপরাধের প্রমান ( সিসিটিভি ফটোজ) কিছুই স্পষ্ট করা হয় নি। তাড়াহুড়া করে বিচারের রায় এবং কার্যকর সন্দেহজনক। জেনেভা কনভেনশনের আইন অনুযায়ী কোন প্রবাসী কোন অপরাদের সাথে যুক্ত হলে তার নিজ দেশের দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করে অবহিত করতে হয়। সৌদিতে বর্তমানে প্রায় ৩৫ লাখের ও বেশী বাংলাদেশী রয়েছেন, তাদের মধ্যে বহু নারী গৃহকর্মী রয়েছেন।
উল্লেখ্য, বহুকাল থেকেই সৌদিতে পুরুষ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে থাকলেও ইদানিং নারী নির্যাতনের ঘটনা খুবই ভয়াবহ ও হৃদয় বিদারক। বহু নারী অভাবের তাড়নায় নিজের ভিটা মাটি বিক্রি করে, নিজের স্বামী, সন্তানাদি রেখে, কিংবা বাবার অভাবের সংসারকে একটু সচ্চল করার আশায়, বুক ভরা আশা নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি দেন। আর ঐদিকে সৌদিতে কফিল অপেক্ষার প্রহর গুনে কবে তার গৃহকর্মী নামক হুর তার কাছে এসে পৌছাবে?২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ম্যানচেস্টার ( যুক্তরাজ্য) থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে এমিরাতের একটি ফ্লাইটে দুবাই হয়ে যাত্রা করছিলাম।
দুবাই থেকে সিলেট রুটে যাবার প্রাক্কালে, আমার পাশের সিটে এক তরুনীর সিট। খুবই হালকা, রোগা ও ফ্যাকাসে চেহারার একটা মেয়ে বসে আছে। কি যেন একা একা ভ্যান - ভ্যান করে বলছেন, চেহারার দিকে থাকালে মনে হয় অনেক দিন ঘুমান নি, খাওয়া - দাওয়া- নাওয়া- এমনকি শরীরের প্রতি যে বিন্দু পরিমান কোন যত্ন ছিলা না তা পরিস্কার বুঝা যাচ্ছিল। সিটের মধ্যে বসার প্রতি ও মনোবেশ ছিল না, এদিক ওদিক শুধু উঁকি দিচ্ছিলেন। খানিকটা বিরক্ত হলেও মুখের দিকে থাকিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম মেয়েটা অনেক মানসিক চাপের মধ্যে রয়েছে, সে অনেক কিছু বলতে চায়, তার ভিতরের বুক ফাটা কান্নার আওয়াজ যেন অনুভব করতে পারছিলাম। অনেক কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, বোন আপনার কি হয়েছে? আপনি ঠিক আছেন তো? বস এবার ভিতরের কান্না বাহিরে চলে আসল। হাউ মাউ শব্দ, চোখের অঝোরো জ্বল সব মিলিয়ে এক অসাভাবিক অবস্থা । আমি আরো কৌতুহলী হলাম কেন এই অবস্থা, জানতে হবে ওকে জিজ্ঞেস করতে হবে। পাশের সিটে নিজের দেশের এক বোনের এমন আর্তনাদ বড়ই বেমানান। ও যখন একটু শান্ত হলো জিজ্ঞেস করলাম বোন একুটু জানতে পারি, কি হয়েছে?
সাথে সাথে ওর পাসপোর্টের ছবি বাহির করে আমাকে দেখিয়ে বলল এই কে চিনতে পেরেছেন? আমি তো অবাক এতো সুন্দর চেহারা, গঠন, স্বাস্থ্য, এবং সুঠাম দেহের অধিকারী, ছবির সাথে বাস্তব মেয়ের চেহারার কোন মিল খুজে পাচ্ছি না। এবার কৌতুহলের পালা আরো বাড়ল আমাকে সব জানতে হবে। বোন আমি জানতে চাই কি করে আপনার এই অবস্থা হলো।
ভাই - আমি দেশে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে কাজ করতাম, ইনকাম ও মোটামুটি ভালো ছিল, কিন্তু বাবার অভাবের সংসারটাকে আরো একটু উন্নত, ভাই - বোনদের মুখে হাসি ফোটানো এবং আরো একটু উন্নত জীবনের প্রত্যাশায়, এক এজেন্সির মাধ্যমে আজ থেকে এক বছর আগে সৌদিতে এসেছিলাম, নার্সিং জব করব বলে। সৌদিতে আসার পর দেখি অবস্থা সম্পুর্ন ভিন্ন। আমাকে একটি বাসার গৃহকর্মী হিসাবে কাজ করতে হলো। বাসায় এসে দেখি বাসার কর্তা ( কফিল) ও কফিলের ছেলে আমার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে। আমাকে বাসার সকল কাজ কর্ম বুঝিয়ে দেওয়া হলো, লম্বা জার্নি করে গিয়েছি, আমার অনেক লম্বা ঘুমের প্রয়োজন। আমার জন্য নিয়োজিত ঘরে আমি ঘুমাতে গেলাম, এত বেশী ক্লান্ত ছিলাম, যে বেডে যাওয়া মাত্রই ঘুমিয়ে পড়লাম। মাত্র ১৫ /২০ মিনিটের মাথায় আমার দরজায় নক - নক আওয়াজ। আমি দরজা খুলব কি খুলব না কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, আরো বেশী শব্দ করে নক করায় দরজা খুলতে বাধ্য হলাম। দরজার সামনে আমার কফিল, আমার রুমে ঢুকে গেল, অনেক জোর আর কাকুতি মিনতি করে আটকাতে পারলাম না। সে বের হওয়ার আরো ২০/২৫ মিনিটের মাথায় আবারো দরজায় অনেক শব্দ করে নক, কি ব্যাপার একটু আগেই তো দরজা খুললাম এখন আবার কে এল? ঘরের গৃহকর্মী তাদের অধীনে, আমি আবারো দরজা খুলতে বাধ্য হলাম, এবার দেখি একটা টগবগে যুবক, ভাবলাম হয়ত মালিকের ছেলে, সে ও রুমে ঢুকল, সে ও তার বাবার মত আচরন করে রুম থেকে বের হয়ে গেল। সেই থেকে শুরু, সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে - বেড়ে যাবার আগ পর্যন্ত কাজ করতে হয়, ঘুমানোর সময় ঘুমের পরিবর্তে বাবা - ছেলের সাথে সময় কাটাতে হয়। মাঝে মধ্যে বাবা ও ছেলের বন্ধুদের ও নিয়ে আসত। সারাদিন কাজ আর রাতের বেলায় ক্রমাগত নির্যাতনের ফলে আজকে আমার এই অবস্থা। অনেক কাকুতি মিনতি করেছি, ওদের কাছে আমার জীবন ভিক্ষা চেয়েছি, আমাকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। আমি আর পারছি না। যতবার দেশে যাবার কথা বলেছি, ততবার নির্যাতনের শিকার হয়েছি। অনেক কষ্ট করে বাসা থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের দুতাবাসের সাথে যোগাযোগ করে আজ আমি আমার প্রবাস জীবনের সকল স্বপ্ন কবর দিয়ে বাবার কাছে চলে যাচ্ছি। এরকম শত শত ঘটনা প্রতিদিন আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতে পাই,। ১৯/১০/২০২৬ সালের ঢাকা পোষ্ট নামক একটি পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ৯ মাসে প্রবাস থেকে ১৬৭৮ জন নারী শ্রমিক নির্যাতিত হয়ে দেশে ফিরেছেন যার মধ্যে সৌদি আরব থেকে ফিরেছেন ৯৭৯।
এই সংখ্যাই প্রমান করে সৌদি আরবে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র। নারী নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশিত হলে ও পুরুষ নির্যাতনের ঘটনা সাধারণত প্রকাশিত হয় না। অনেক পুরুষ সেই নির্যাতন নিরবে নিভৃতে সহ্য করেই যাচ্ছেন আর কেউ কেউ সহ্য করতে না পেরে নিজ দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। সৌদি আরব হলো আমাদের (মুসলমানদের) আবেগ অনুভূতির জায়গা। এখানেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহামানব আমাদের রাসুল হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সা:) সহ অনেক নবী ও রাসুল গনের আগমন হয়েছে। মক্কা ও মদীনার মতো পবিত্র স্থান ও রয়েছে। ইসলামের শ্রেষ্ট চার জন খলিফার জন্ম ও এই সৌদি আরবে হয়েছে। সুতারাং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সৌদি আরবের কোন সমালোচনা আমরা করতে চাই না। কিন্তু কিছু লেবাস ধারী মুসলমান যারা ধর্ম সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান থাকা সত্তেও যে অশালীন আচার - আচারন
, যৌনাচার, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অন্যায় ও অবিচার করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করতে চাই, নিন্দা ও ঘৃনা জানাতে চাই। অন্যায় ও অবিচারের বিচার চাই। কিন্তু চাইলেই কি সম্ভব, ওরা তো অনেক সময় আমাদের মানুষ হিসাবে. গন্যই করে না। মিসকিন বলে সম্বোধন করে। মিসকিনদের আবার কিসের বিচার? ঘর বাড়ি বিক্রি করে যাওয়া, নির্যাতিত কর্মীরা যখন খালি হাতে ফিরে আসে তখন তাদের বুক একটু কাপে না। কারন মিসকিন জাতি, গরীব দেশে জন্ম নেওয়া টা কি পাপ? সিতি ও বশির সেই গরিব দেশের নাগরিক বলে, আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে,আইনের সঠিক প্রয়োগ না করে, বাংলাদেশ সরকারকে কোন রকমের অবগত না করেই, একজন বিচারকের বিশেষ বিবেক আর ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে দুটি তাজা প্রান কেড়ে নিয়েছে। ওরা যদি ইউরোপ / আমেরিকা কিংবা শক্তিশালী কোন দেশের নাগরিক হতো তাহকে কি এমনটা হতো ? কত বিধর্মী নারী পুরুষ অনায়াসেই সৌদিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, এমনকি সম্প্রতি সৌদির বাদশা সিনেমা, কন্সার্ট, সহ অনেক কিছুর অনুমতি দিয়েছেন। সৌদির বাদশা বিশ্বের নামী দামি মডেল, গায়িকা, নায়িকা দের নিয়ে ব্যক্তিগত পার্টি দিয়ে থাকেন । এগুলো কি অশ্লীলতা, অনৈতিক কার্যকলাপ এর আওতায় আসে না? সৌদির প্রশাসন ভালো করেই জানে প্রবাসী শ্রমিক, বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের নির্যাতনের কথা কিন্তু কোন বিচার নেই প্রতিকারের কোন সম্ভাবনা ও নেই। সুতারাং নিজ দেশের সরকার যদি নিজ দেশের শ্রমিকদের পাশে শক্ত হাতে না দাঁড়ায় এরকম ঘটনা ঘটতেই থাকবে। সিতি ও বশিরের এই অমানবিক রায়ের বিরুদ্ধে বিশ্ব বিবেক নাড়া দিয়েছে, বিশ্ব জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এখন প্রয়োজন শুধু শক্ত হাতে রুখে দাড়াবার। তাদের অমানবিক, অন্যায়,অবিচার , নিপীড়ন, নির্যাতন, আর লালসার শিকার যেন আর কোন সিতি আর বশির না হয়।


















