img

সৌদি আরবে প্রবাসী কর্মীদের অমানবিক নিপীড়ন নির্যাতনের শেষ কোথায়!

প্রকাশিত :  ১২:৩৫, ২০ অক্টোবর ২০২৬

সৌদি আরবে প্রবাসী কর্মীদের অমানবিক নিপীড়ন নির্যাতনের শেষ কোথায়!

শেখ জাফর আহমদ 

সম্প্রতি সৌদি আরবের সরকার বাংলাদেশের দুই রেমিট্যান্স যোদ্ধা  আব্দুল বশির ও সিতি আক্তার নামে তরুন-তরুনীর মৃত্যুদন্ডের রায় কার্যকর করেছে।  তাদের  অপরাদ মক্কার একটি মসজিদের ভিতরে তারা অনৈতিক কাজে লিপ্ত ছিলেন। কিন্তু কি ধরনের অপরাধ,  অপরাদের ধরন, অপরাধের প্রমান ( সিসিটিভি ফটোজ) কিছুই স্পষ্ট করা হয় নি। তাড়াহুড়া করে বিচারের রায় এবং কার্যকর সন্দেহজনক।  জেনেভা কনভেনশনের আইন অনুযায়ী কোন প্রবাসী কোন অপরাদের সাথে যুক্ত হলে তার নিজ দেশের দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করে অবহিত করতে হয়। সৌদিতে বর্তমানে প্রায় ৩৫ লাখের ও বেশী বাংলাদেশী রয়েছেন, তাদের মধ্যে বহু নারী গৃহকর্মী রয়েছেন।

উল্লেখ্য, বহুকাল থেকেই সৌদিতে পুরুষ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে থাকলেও ইদানিং নারী নির্যাতনের ঘটনা খুবই ভয়াবহ ও হৃদয় বিদারক। বহু নারী অভাবের তাড়নায় নিজের ভিটা মাটি বিক্রি করে, নিজের স্বামী,  সন্তানাদি রেখে,  কিংবা বাবার অভাবের সংসারকে  একটু সচ্চল করার আশায়,  বুক ভরা আশা নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি দেন।  আর ঐদিকে সৌদিতে কফিল অপেক্ষার প্রহর গুনে কবে তার গৃহকর্মী নামক হুর তার কাছে এসে পৌছাবে?২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ম্যানচেস্টার ( যুক্তরাজ্য) থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে  এমিরাতের একটি ফ্লাইটে দুবাই হয়ে যাত্রা করছিলাম। 

দুবাই থেকে সিলেট রুটে যাবার প্রাক্কালে, আমার পাশের সিটে এক তরুনীর সিট। খুবই হালকা, রোগা ও ফ্যাকাসে  চেহারার একটা মেয়ে বসে আছে।  কি যেন একা একা ভ্যান - ভ্যান করে বলছেন,  চেহারার দিকে থাকালে মনে হয় অনেক দিন ঘুমান নি, খাওয়া - দাওয়া- নাওয়া- এমনকি শরীরের প্রতি যে বিন্দু পরিমান কোন যত্ন ছিলা না তা পরিস্কার বুঝা যাচ্ছিল। সিটের মধ্যে বসার প্রতি ও মনোবেশ ছিল না,  এদিক ওদিক শুধু উঁকি দিচ্ছিলেন। খানিকটা বিরক্ত হলেও মুখের দিকে থাকিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম মেয়েটা অনেক মানসিক চাপের  মধ্যে রয়েছে, সে অনেক কিছু বলতে চায়,  তার ভিতরের বুক ফাটা কান্নার আওয়াজ যেন অনুভব করতে পারছিলাম। অনেক কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, বোন আপনার  কি হয়েছে? আপনি  ঠিক আছেন তো?  বস এবার ভিতরের কান্না বাহিরে চলে আসল।  হাউ মাউ শব্দ,  চোখের অঝোরো জ্বল সব মিলিয়ে এক অসাভাবিক অবস্থা । আমি আরো কৌতুহলী হলাম কেন  এই অবস্থা,  জানতে হবে ওকে জিজ্ঞেস করতে হবে।  পাশের সিটে নিজের দেশের এক বোনের এমন আর্তনাদ বড়ই বেমানান। ও যখন একটু শান্ত হলো জিজ্ঞেস করলাম বোন একুটু জানতে পারি,  কি হয়েছে?

সাথে সাথে ওর পাসপোর্টের ছবি বাহির করে আমাকে দেখিয়ে বলল এই কে চিনতে পেরেছেন? আমি তো অবাক এতো সুন্দর চেহারা, গঠন,  স্বাস্থ্য, এবং সুঠাম দেহের অধিকারী, ছবির সাথে বাস্তব মেয়ের চেহারার কোন মিল খুজে পাচ্ছি না।  এবার কৌতুহলের পালা আরো বাড়ল আমাকে সব জানতে হবে। বোন আমি জানতে চাই কি করে আপনার  এই অবস্থা হলো। 

ভাই - আমি দেশে  একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে কাজ করতাম, ইনকাম ও মোটামুটি ভালো ছিল, কিন্তু বাবার অভাবের সংসারটাকে আরো একটু উন্নত, ভাই - বোনদের মুখে হাসি ফোটানো এবং  আরো একটু উন্নত জীবনের প্রত্যাশায়, এক এজেন্সির মাধ্যমে  আজ থেকে এক বছর আগে সৌদিতে এসেছিলাম, নার্সিং জব করব বলে।  সৌদিতে আসার পর দেখি অবস্থা সম্পুর্ন ভিন্ন। আমাকে একটি বাসার গৃহকর্মী হিসাবে কাজ করতে হলো।  বাসায় এসে দেখি বাসার কর্তা ( কফিল) ও কফিলের ছেলে আমার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে।  আমাকে বাসার সকল কাজ কর্ম বুঝিয়ে দেওয়া হলো,  লম্বা জার্নি করে গিয়েছি, আমার অনেক লম্বা ঘুমের প্রয়োজন।  আমার জন্য নিয়োজিত  ঘরে আমি ঘুমাতে গেলাম, এত বেশী ক্লান্ত ছিলাম, যে বেডে যাওয়া মাত্রই ঘুমিয়ে পড়লাম। মাত্র ১৫ /২০ মিনিটের মাথায় আমার দরজায় নক - নক আওয়াজ।  আমি দরজা খুলব কি খুলব না কিছুই বুঝতে পারছিলাম না,  আরো বেশী শব্দ করে নক করায় দরজা খুলতে বাধ্য হলাম।  দরজার সামনে আমার কফিল, আমার রুমে ঢুকে গেল, অনেক জোর আর কাকুতি মিনতি করে আটকাতে পারলাম না। সে বের হওয়ার আরো ২০/২৫ মিনিটের মাথায় আবারো দরজায় অনেক শব্দ করে নক,  কি ব্যাপার একটু আগেই তো দরজা খুললাম এখন আবার কে এল? ঘরের গৃহকর্মী তাদের অধীনে, আমি আবারো দরজা খুলতে বাধ্য হলাম,  এবার দেখি একটা টগবগে যুবক,  ভাবলাম হয়ত মালিকের ছেলে,  সে ও রুমে ঢুকল, সে ও তার বাবার মত আচরন করে রুম থেকে বের হয়ে গেল। সেই থেকে শুরু,  সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে - বেড়ে যাবার আগ পর্যন্ত কাজ করতে হয়, ঘুমানোর সময় ঘুমের পরিবর্তে বাবা - ছেলের সাথে সময় কাটাতে হয়। মাঝে মধ্যে বাবা ও ছেলের বন্ধুদের ও নিয়ে আসত।  সারাদিন কাজ আর রাতের বেলায় ক্রমাগত  নির্যাতনের ফলে আজকে আমার এই অবস্থা। অনেক কাকুতি মিনতি করেছি,  ওদের কাছে আমার জীবন ভিক্ষা চেয়েছি, আমাকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য।  আমি আর পারছি না। যতবার দেশে যাবার কথা বলেছি, ততবার নির্যাতনের শিকার হয়েছি। অনেক কষ্ট করে বাসা থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের দুতাবাসের সাথে যোগাযোগ করে আজ আমি আমার প্রবাস জীবনের সকল স্বপ্ন কবর দিয়ে বাবার কাছে চলে যাচ্ছি।  এরকম শত শত ঘটনা প্রতিদিন আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতে পাই,। ১৯/১০/২০২৬ সালের ঢাকা পোষ্ট নামক একটি পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী,  গত ৯ মাসে প্রবাস থেকে ১৬৭৮ জন নারী শ্রমিক নির্যাতিত হয়ে  দেশে ফিরেছেন যার মধ্যে সৌদি আরব থেকে ফিরেছেন ৯৭৯।

এই সংখ্যাই প্রমান করে সৌদি আরবে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র। নারী নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশিত হলে ও পুরুষ নির্যাতনের ঘটনা সাধারণত প্রকাশিত হয় না।  অনেক পুরুষ সেই নির্যাতন নিরবে নিভৃতে সহ্য করেই যাচ্ছেন আর কেউ কেউ  সহ্য করতে না পেরে নিজ দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। সৌদি আরব হলো আমাদের (মুসলমানদের) আবেগ অনুভূতির জায়গা। এখানেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহামানব আমাদের রাসুল হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সা:) সহ অনেক নবী ও রাসুল গনের আগমন হয়েছে। মক্কা ও মদীনার মতো পবিত্র স্থান ও রয়েছে। ইসলামের শ্রেষ্ট চার জন খলিফার জন্ম ও এই সৌদি আরবে হয়েছে।  সুতারাং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সৌদি আরবের কোন সমালোচনা আমরা করতে চাই না।  কিন্তু কিছু লেবাস ধারী মুসলমান যারা ধর্ম সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান থাকা সত্তেও যে অশালীন আচার - আচারন

, যৌনাচার, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন,  অন্যায় ও অবিচার করে,  তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করতে চাই,  নিন্দা ও ঘৃনা জানাতে চাই।  অন্যায় ও অবিচারের বিচার চাই।  কিন্তু চাইলেই কি সম্ভব,  ওরা তো অনেক সময় আমাদের মানুষ হিসাবে. গন্যই করে না।  মিসকিন বলে সম্বোধন করে।  মিসকিনদের আবার কিসের বিচার? ঘর বাড়ি বিক্রি করে যাওয়া, নির্যাতিত কর্মীরা যখন খালি হাতে ফিরে আসে তখন তাদের বুক একটু কাপে না। কারন মিসকিন জাতি, গরীব দেশে জন্ম নেওয়া টা কি পাপ? সিতি ও বশির সেই গরিব দেশের নাগরিক বলে, আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে,আইনের সঠিক প্রয়োগ না করে, বাংলাদেশ সরকারকে কোন রকমের অবগত না করেই,  একজন বিচারকের বিশেষ বিবেক আর ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে দুটি তাজা প্রান কেড়ে নিয়েছে। ওরা যদি ইউরোপ / আমেরিকা কিংবা শক্তিশালী কোন দেশের নাগরিক হতো তাহকে কি এমনটা হতো ?  কত বিধর্মী নারী পুরুষ  অনায়াসেই সৌদিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, এমনকি সম্প্রতি সৌদির বাদশা সিনেমা, কন্সার্ট,  সহ অনেক কিছুর অনুমতি দিয়েছেন। সৌদির বাদশা বিশ্বের নামী দামি মডেল,  গায়িকা, নায়িকা দের নিয়ে ব্যক্তিগত পার্টি দিয়ে থাকেন । এগুলো  কি অশ্লীলতা,  অনৈতিক কার্যকলাপ এর আওতায় আসে না?  সৌদির প্রশাসন ভালো করেই জানে প্রবাসী শ্রমিক, বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের নির্যাতনের কথা কিন্তু কোন বিচার নেই প্রতিকারের কোন সম্ভাবনা ও  নেই।  সুতারাং নিজ দেশের সরকার যদি নিজ দেশের শ্রমিকদের পাশে শক্ত হাতে না দাঁড়ায় এরকম ঘটনা ঘটতেই থাকবে। সিতি ও বশিরের  এই অমানবিক রায়ের বিরুদ্ধে বিশ্ব বিবেক নাড়া দিয়েছে, বিশ্ব জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।  এখন প্রয়োজন শুধু শক্ত হাতে রুখে দাড়াবার। তাদের অমানবিক, অন্যায়,অবিচার , নিপীড়ন, নির্যাতন, আর লালসার শিকার যেন আর কোন  সিতি আর বশির না হয়।

লেখক: শেখ জাফর আহমদ 
ম্যানচেস্টার, যুক্তরাজ্য 
img

পিয়ারা পাকিস্তানি ভাই, কিন্তু দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর দায় নিয়ে প্রশ্ন কোথায়?

প্রকাশিত :  ১৩:০০, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৪:৫১, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

মানুষের মৃত্যু কখনো কখনো একটি সংবাদ হয়ে আসে, কয়েক ঘণ্টা আলোচনার কেন্দ্রে থাকে, তারপর হারিয়ে যায় অসংখ্য নতুন ঘটনার ভিড়ে। কিন্তু কিছু মৃত্যু আছে, যেগুলো শুধু শোকের নয়, প্রশ্নেরও জন্ম দেয়। যে প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হয়। মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা তেমনই একটি নির্মম অধ্যায়।

প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে সৌদি আরবের আদালত কেন দুই বাংলাদেশিকে মৃত্যুদণ্ড দিল। প্রশ্ন হলো, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রকৃত অভিযোগ কী ছিল, কী ধরনের সাক্ষ্যপ্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তাঁরা নিজেদের পক্ষে কথা বলার যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছিলেন কি না এবং পুরো বিচারপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল। এমন একটি ঘটনা, যেখানে দুটি মানুষের জীবন চিরতরে শেষ হয়ে গেছে, সেখানে এসব প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন বর্ণনায় দাবি করা হচ্ছে, ওই দুই বাংলাদেশি ছিলেন নবদম্পতি। ওমরাহ পালন করতে গিয়ে একটি মসজিদে নামাজ শেষে স্বামী তাঁর স্ত্রীর কপালে চুম্বন করেছিলেন। একজন পাকিস্তানি নাগরিক নাকি সেই দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করে নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে অভিযোগ করেন। পরবর্তী সময়ে সেই ব্যক্তির সাক্ষ্য মামলার পরিণতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলেও দাবি করা হচ্ছে।

কিন্তু এখানেই সতর্ক হওয়া জরুরি। এসব বিবরণের সবকিছুর স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। অতএব, একজন পাকিস্তানি নাগরিক মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর কারণ হয়েছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, এই দাবি সত্য হলে তার যথাযথ তদন্তের দাবি তোলাও জরুরি। কারণ অভিযোগের গুরুত্ব যত বড়, সত্য যাচাইয়ের দায়িত্বও তত বেশি।

তবু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। আমরা কি কেবল পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের পক্ষ নিই? কেউ পাকিস্তানি হলে তাঁর ভুলের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে আমাদের সংকোচ হয় কেন? আবার কেউ বাংলাদেশি হলে তাঁর প্রতি সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে আমরা কখনো কখনো তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনটুকুও ভুলে যাই কেন?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে ভালোবাসার ভাষায় ‘পিয়ারা পাকিস্তানি ভাই’ বলে সম্বোধন করা ব্যক্তিগত আবেগের বিষয় হতে পারে। কিন্তু সেই আবেগ যদি প্রশ্ন করার অধিকারকে সংকুচিত করে, তবে তা আর সুস্থ সম্পর্কের পরিচয় দেয় না। কোনো জাতির প্রতি অনুরাগ কখনোই কোনো ব্যক্তির সম্ভাব্য অন্যায়কে আড়াল করার যুক্তি হতে পারে না। মানুষকে বিচার করতে হবে তাঁর কাজ দিয়ে, জাতীয়তা দিয়ে নয়।

যদি কোনো ব্যক্তি জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকেন, নিরপরাধ মানুষকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন, অথবা কোনো বিচারপ্রক্রিয়াকে অন্যায়ভাবে প্রভাবিত করে থাকেন, তাহলে তাঁর পরিচয় যা-ই হোক, সেই অভিযোগের তদন্ত হওয়া উচিত। তিনি পাকিস্তানি, সৌদি, বাংলাদেশি কিংবা অন্য কোনো দেশের নাগরিক, তাতে ন্যায়বিচারের মানদণ্ড বদলে যেতে পারে না। আর যদি অভিযোগটি প্রমাণিত না হয়, তবে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার দেখে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করাও ন্যায়বিচার নয়।

এখানে সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কেও কিছু মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, সৌদি কর্তৃপক্ষ দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’ করার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা জানিয়েছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। বাংলাদেশি কনস্যুলেটও আগাম অবহিত হওয়ার কথা অস্বীকার করে পরে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ঘটনার বিস্তারিত জানতে চেয়েছে।

মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির ক্ষেত্রে এই অস্পষ্টতা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। অভিযোগের প্রকৃতি, সাক্ষ্যপ্রমাণ, অভিযুক্তদের বক্তব্য, আইনজীবীর সহায়তা, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা এবং আপিলের সুযোগ সম্পর্কে জনসমক্ষে যতটা সম্ভব পরিষ্কার তথ্য থাকা প্রয়োজন। কোনো অভিযুক্ত আরবি ভাষা না জানলে তিনি বিচারপ্রক্রিয়া বুঝতে পেরেছিলেন কি না, তাঁর বক্তব্য সঠিকভাবে অনুবাদ হয়েছিল কি না এবং নিজের পক্ষে কার্যকরভাবে সওয়াল করার সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, সেসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সংশ্লিষ্ট দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রে এসব ঘাটতি ঘটেছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্যও নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন।

একটি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা তার কঠোরতার মাধ্যমে নয়, ন্যায়বিচারের নির্ভরযোগ্যতার মাধ্যমে আস্থা অর্জন করে। ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষার নামে কোনো আইন প্রয়োগ করা হলেও সেই আইনের প্রয়োগে স্বচ্ছতা, প্রমাণের যথার্থতা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন তার নিজস্ব পথে চলবে, কিন্তু অভিযোগের প্রকৃতি অস্পষ্ট রেখে দুটি জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যদি পরিবার, স্বজন ও সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ পূর্ণাঙ্গ তথ্য না পান, তাহলে ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

আমাদের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো, আমরা ঘটনার পুরো সত্য জানার আগেই নিজেদের পছন্দমতো পক্ষ বেছে নিই। কেউ বিদেশি রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়ান, কেউ জাতীয় আবেগে উত্তেজিত হন, আবার কেউ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি গল্পকেই চূড়ান্ত সত্য ধরে নেন। অথচ সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা এসব অবস্থানের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল, কথিত সাক্ষী সত্যিই ছিলেন কি না, তাঁর বক্তব্য কী ছিল এবং বিচার কোন তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে হয়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তর চাইতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের কাছেও প্রত্যাশা, তারা যেন কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করে এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম বা অধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়।

আমি কোনো জাতির বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াতে চাই না। পাকিস্তানের সব মানুষকে দায়ী করারও কোনো যুক্তি নেই। কিন্তু পাকিস্তানি বলে কেউ প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকবেন, কিংবা অন্য কোনো পরিচয়ের কারণে কেউ আগাম অপরাধী হয়ে যাবেন, এমন বিচারবোধ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

‘পিয়ারা পাকিস্তানি ভাই’ বলে কাউকে আপন ভাবতেই পারেন। কিন্তু সেই ভালোবাসা যেন সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতাকে বিসর্জন না দেয়। বন্ধুত্বের অর্থ অন্যায়ের ক্ষেত্রে নীরব থাকা নয়। মানবিকতার অর্থ নিজের পক্ষের মানুষের ভুল অস্বীকার করা নয়। বরং প্রকৃত মানবিকতা হলো, নিজের প্রিয় মানুষটির বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠলে সত্যকে সত্য এবং অন্যায়কে অন্যায় বলার সাহস রাখা।

দুটি মানুষের জীবন আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু তাঁদের মৃত্যু ঘিরে ওঠা প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা এখনো সম্ভব। তাই আবেগের জয়গান নয়, চাই তথ্যের স্বচ্ছতা। জাতীয় পরিচয়ের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়, চাই নিরপেক্ষ তদন্ত। আর কোনো রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নহীনভাবে মেনে নেওয়া নয়, চাই এমন ন্যায়বিচার, যেখানে মানুষের জীবন, মর্যাদা ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়।

কারণ, শেষ পর্যন্ত আমাদের পরিচয় পাকিস্তানি, বাংলাদেশি কিংবা অন্য কোনো দেশের নাগরিক হওয়ার চেয়েও বড় হলো আমরা মানুষ। আর মানুষের জীবনের প্রশ্নে সত্যের চেয়ে বড় কোনো আনুগত্য থাকতে পারে না।