img

তেহরানে আরবনেতাদের মিটিং: কিভাবে দেখছে তাদের গণমাধ্যম?

প্রকাশিত :  ০৫:০৬, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

তেহরানে আরবনেতাদের মিটিং: কিভাবে দেখছে তাদের গণমাধ্যম?

সাইফুল খান

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় কাঁপতে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন ফের নতুন যুদ্ধের মেঘ জমা হচ্ছে, ঠিক তখনই গতকাল ২৬শে অক্টোবর তেহরানের কূটনৈতিক দরবারে রচিত হলো এক অভূতপূর্ব অধ্যায়। বিশ্বরাজনীতি যখন এই অঞ্চলকে কেবল সংঘাত আর বিভাজনের ছকে মাপতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ইরানের রাজধানী তেহরানে একই টেবিলে এসে মুখোমুখি বসলেন একসময়ের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী ও পরাশক্তিগুলোর হাইপ্রোফাইল প্রতিনিধিরা। একদিকে সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান ও দুবাইয়ের (সংযুক্ত আরব আমিরাত) শীর্ষ কূটনীতিবিদ ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা, অন্যদিকে স্বাগতিক ইরানের নীতি নির্ধারকেরা। উপস্থিত ছিলেন সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (MIT)-এর প্রধান ইব্রাহিম কালিন। 

সম্প্রতি মক্কায় স্বাক্ষরিত ত্রিদেশীয় নিরাপত্তা চুক্তির পর এই হাই-লেভেল বৈঠকটি কেবল কূটনৈতিক শিষ্টাচার ছিল না, বরং ছিল মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভবিষ্যৎ আঁকার এক ঐতিহাসিক চেষ্টা।  বিশ্ব সংবাদমাধ্যমগুলো কীভাবে দেখছে এই উত্তেজনাকর বৈঠকের পর্দার অন্তরাল? সেটা নিয়েই আজকের আলাপ।

কাতারভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এই নাটকীয় বৈঠককে উপস্থাপন করেছে মধ্যপ্রাচ্যের নিজেদের উদ্যোগে তৈরি \"ডি-এসকেলেশন বা সংঘাত প্রশমনের ঐতিহাসিক “diplomatic breakthrough\" হিসেবে। তাদের বিশ্লেষণের কেন্দ্রে ছিল একটাই বার্তা। বাইরের কোনো পরাশক্তির মুখাপেক্ষী না হয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন নিজের সুরক্ষার চাবি নিজের হাতে নিতে শুরু করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত হুমকির মুখে এবং লোহিত সাগরে হুতিদের অব্যাহত হামলার যে জটিল ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়েছিল, তা প্রশমিত করতে কাতার ও তার মিত্ররা তেহরানের সাথে সরাসরি আলোচনায় বসাটাকেই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করেছে। এই বৈঠকে আল-জাজিরা কাতারের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ঐতিহ্যগত ইতিবাচক ভূমিকার প্রশংসা করে। এই আলোচনার গূঢ় রহস্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রোগ্রেস সেন্টার ফর পলিসিজ-এর প্রখ্যাত গবেষক ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ের বিশ্লেষক ডক্টর মোহাম্মদ কওয়াস গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি স্পষ্ট জানান, \"এই তেহরান বৈঠকের আসল সাফল্য কিন্তু টেবিলে হেসে হাত মেলানোয় নয়; বরং ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক স্নায়যুদ্ধ, সেখান থেকে অঞ্চলটির তাৎক্ষণিক সংঘাতের বিষয়গুলোকে কতটা বিচ্ছিন্ন করে বাস্তবে রূপ দেওয়া যাচ্ছে তার ওপর নির্ভর করবে এই আলোচনার স্থায়িত্ব।\"

একই সময়ে আঙ্কারা থেকে তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি ঘটনাটিকে চিত্রিত করেছে যেন এক বিশাল কৌশলগত ক্যানভাসে মুসলিম বিশ্বের নতুন ঐক্যের সূত্রপাত। তুর্কি গোয়েন্দা সংস্থা (MIT) ও নিরাপত্তা বিভাগের শীর্ষ কর্তাদের এই বৈঠকে সক্রিয় উপস্থিতি প্রমাণ করে, তুরস্ক আর আগের মতো একপক্ষীয় অবস্থানের ছকে বন্দি নেই। আনাদোলু তাদের সুচিন্তিত বিশ্লেষণে উঠে আসা বার্তা তুলে ধরে জানায়, আঙ্কারার মূল ফোকাস এখন শুধু হরমুজ প্রণালি বা লোহিত সাগরের নৌ-নিরাপত্তা রক্ষা করা নয়, বরং গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলি তাণ্ডব বন্ধে পুরো মুসলিম ব্লককে এক ছাতার নিচে আনা। আঙ্কারার দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক লাইন এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক দর্শন টেনে আনাদোলুর বিশ্লেষণে উঠে আসে, \"সৌদি-তুর্কি-পাকিস্তান নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্ক বা মক্কা প্যাক্ট কিন্তু ইরানকে কোনোরকম কোণঠাসা করার জন্য গঠিত হয়নি। বরং এর মূল উদ্দেশ্যই হলো ইরানকে সাথে নিয়ে একটি শক্ত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুরক্ষা প্রাচীর তৈরি করা, যাতে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন থাকে এবং ফিলিস্তিনের মাটিতে চলা রক্তপাত চিরতরে বন্ধের পথ উন্মুক্ত হয়।\"

অন্যদিকে ইসলামাবাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পাকিস্তানের প্রথিতযশা পত্রিকা ডন (Dawn) এক টানটান উত্তেজনার কূটনৈতিক ব্যালেন্সিং অ্যাক্টের গল্প শুনিয়েছে। পাকিস্তানের বার্তা ছিল পরিষ্কার, তারা কোনো শিয়া-সুন্নি বা ইরান-সৌদি অক্ষের বলি হতে প্রস্তুত নয়। আগস্টে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে সই হওয়া \'মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি\'-র পর তেহরানের মনে যে নিরাপত্তার আশঙ্কা জেগেছিল, তা দূর করতেই ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলটি দ্রুত তেহরানে উড়ে যায়। ডন পত্রিকা তাদের বিশ্লেষণে দেখায় যে, পাকিস্তান একদিকে রিয়াদ ও আঙ্কারার প্রতি নিজের প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি বজায় রাখছে, আবার অন্যদিকে প্রতিবেশী তেহরানকে আশ্বস্ত করছে যে এই অক্ষ ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হুমকি নয়। এই জটিল সমীকরণের জট খুলতে গিয়ে পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনীতি বিষয়ক খ্যাতনামা বিশ্লেষক আরিবা শাহিদ চমৎকার এক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, \"পাকিস্তান সুচতুরভাবে এক অনন্য মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়েছে। পাকিস্তানি ও মিত্র প্রতিনিধি দলের এই ঝটিকা সফর এটাই প্রমাণ করে যে, ইসলামাবাদ রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যকার ঐতিহাসিক দূরত্ব কাটিয়ে এক ছাদের নিচে আনছে। রিয়াদকে সীমান্ত নিরাপত্তা আর লোহিত সাগরে হুতিদের হামলা থেকে স্বস্তি দেওয়া এবং একই সাথে তেহরানকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার অংশীদার করে আস্থায় নেওয়া। এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষায় পাকিস্তান এখন মূল অনুঘটক।\"

সবশেষে, স্বাগতিক ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ এজেন্সি (Mehr News) তেহরানের বুক থেকে বিজয়ের সুর বাজিয়ে পুরো ঘটনার বিশ্লেষণ সাজিয়েছে। তাদের চোখে, পশ্চিমা পরাশক্তি আমেরিকা বা ইসরায়েলকে সম্পূর্ণ বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে স্বনামধন্য সব ইসলামিক দেশের শীর্ষ প্রতিনিধিদের তেহরানে এসে এক টেবিলে বসাটা ইরানের \'জাতীয় নিরাপত্তা দর্শন\' ও \'আঞ্চলিক প্রতিরোধের\' এক বিরাট জয়। মেহের নিউজ লিখেছে, এটি হলো বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যকে স্বাবলম্বী করার এক মোক্ষম জবাব। ইরানের প্রেসিডেন্টের দফতর ও সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের আবহ তুলে ধরে মেহের নিউজ তুলে আনে দেশটির শীর্ষ নেতাদের অবস্থান। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বৈঠক শেষে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, \"ইরান তার যেকোনো মুসলিম প্রতিবেশীর সাথে ভুল বোঝাবুঝি বা মতভেদ মেটাতে পুরোপুরি প্রস্তুত। আমরা যখন দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে একসাথে হাত মেলাব, তখন দুনিয়ার কোনো বাইরের শক্তি আমাদের ওপর অন্যায্য চাপ সৃষ্টি করতে পারবে না।\" একই সুর শোনা যায় ইরানের উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও শীর্ষ কর্মকর্তা মহসেন রেজাই-এর কণ্ঠে। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বিশ্লেষণী মন্তব্য করেন, \"তেহরানের নিরাপত্তা মডেলটি তৈরিই হয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোর পারস্পরিক বিশ্বাসের শক্ত ভিতের ওপর। সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং উপসাগরীয় দেশের প্রতিনিধিদের সাথে আমাদের এই গভীর আলোচনা শুধু কালকের জন্য নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যে এক চিরস্থায়ী শান্তির নতুন সূর্যোদয় ঘটাল।\"

এভাবেই আল-জাজিরার সংঘাত কমানোর বার্তা, আনাদোলুর ঐক্যবদ্ধ ইসলামিক ফ্রন্ট, ডন-এর ভারসাম্যপূর্ণ ও সতর্ক কূটনীতি এবং মেহের নিউজের স্বাবলম্বী নিরাপত্তা দর্শনের মধ্য দিয়ে তেহরানের এই ২৬শে অক্টোবরের বৈঠকটি বিশ্ব ভূরাজনীতিতে এক নতুন ও আকর্ষণীয় অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

লেখক - ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
img

যুদ্ধের ময়দানে উজ্জীবিত ইরানের পরমাণু স্বপ্ন: ইউরোশিয়া রিভিউ

প্রকাশিত :  ০৬:২২, ২২ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:২৭, ২২ অক্টোবর ২০২৬

একসময় ইরানের রাজনীতিতে পারমাণবিক বোমা তৈরির আলোচনা ছিল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও গোপনীয়। তবে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে টানা আট মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলেছে। এখন দেশটির নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রণেতারা প্রকাশ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি তুলছেন।

অথচ এই দেশেই একদিন সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একটি ধর্মীয় ফতোয়া ছিল আইন, যেখানে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি বা সংরক্ষণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে তেহরান বিশ্ববাসীকে এটাই বোঝানোর চেষ্টা করেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক কাজের জন্য। কিন্তু যুদ্ধের কালো মেঘ সেই পুরোনো ধারণাকে এক নিমিষে উড়িয়ে দিয়েছে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের প্রথম দফার আকস্মিক আঘাতেই কেঁপে উঠেছিল ইরান। সেই হামলায় শুধু সামরিক বা পারমাণবিক স্থাপনাই ধ্বংস হয়নি, প্রাণ হারিয়েছেন খেসারত দেওয়া বহু সাধারণ নাগরিক এবং খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব। যদিও পরবর্তী সময়ে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক তৎপরতা কমিয়ে এনে নৌ-অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপের পথ বেছে নিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে উল্টো নতুন হামলার হুমকি দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের সাফ কথা, চুক্তি করতে হলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে।

আর ঠিক এ অনিশ্চিত ও চরম অস্তিত্বের সংকটের মাঝেই তেহরানের অন্দরে শুরু হয়েছে তীব্র দন্তনখ লড়াই। একপক্ষ বলছে, পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ইরান এরই মধ্যে অনেক চড়া মূল্য চুকিয়ে ফেলেছে। পার্লামেন্ট সদস্য আহমাদ বাখশায়্যাশ আরদেস্তানি কিংবা মহসেন রেজাইয়ের মতো শীর্ষ নিরাপত্তা কর্তারা মনে করেন, এখন আর পিছু হটার সময় নেই; বরং শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে পরমাণু অস্ত্র অর্জনের পথেই হাঁটা উচিত।

রক্ষণশীল বিশ্লেষক দাউদ মোদাররেসিয়ানের ভাষায়, একটি পরমাণু বোমা অর্জন করা আজকের দিনে রুটি-রুজির চেয়েও বড় ও জরুরি প্রয়োজন, যা দেশের টিকে থাকার একমাত্র নিশ্চয়তা। তারা ট্রাম্পের সেই পুরোনো কথারই প্রতিধ্বনি করেন, যেখানে উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের উদাহরণ টেনে ট্রাম্প বলেছিলেন, কারও হাতে ১১টি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠেও রয়েছে শক্ত যুক্তি। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবের এই চিন্তার তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে আছে, তাদের পরমাণু বোমার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, একটি বোমা বড়জোর ৫০ থেকে ১ লাখ মানুষের প্রাণ নিতে পারে, কিন্তু হরমুজ প্রণালি আটকে দিলে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও কোটি কোটি মানুষের জীবন জিম্মি করা সম্ভব। সাংবাদিক সিনা জাহানি কিংবা বিশ্লেষক আমির আলী আবুলফাতদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর এ উন্মাদনা সরাসরি ইসরায়েলের ফাঁদে পা দেওয়ার শামিল। বোমা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকান বোমায় দেশের বাকি অবকাঠটুকুও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে, এমন আত্মঘাতী পথ কোনো সুরক্ষাই দিতে পারে না।

কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, ইরান কি চাইলেও এখন বোমা বানাতে পারবে? যুদ্ধের আগুনে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মূল অবকাঠামো আজ প্রায় পঙ্গু। নাতানজ ও ফরদোর মতো প্রধান ভূগর্ভস্থ প্লান্টগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তবে সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ দশমিক ১৯ কেজি ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে এই বিশাল মজুতের সঠিক হদিস তাদের জানা নেই।

মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দাবি, গ্রানাইট পাথরের ৮০ থেকে ১০০ মিটার গভীরে অবস্থিত গোপন ও সুরক্ষিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ সুড়ঙ্গে হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ ও এই ইউরেনিয়াম লুকিয়ে ফেলেছে তেহরান। আর এ কারণেই ট্রাম্প সম্প্রতি হুংকার ছেড়েছেন, আমাদের হয়তো সেখানেই গিয়ে অভিযান চালাতে হতে পারে!

তাত্ত্বিকভাবে, ওই গোপন মজুতের নাগাল পেলে সামান্য সেন্ট্রিফিউজ দিয়েই অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়াম বানিয়ে ফেলা সম্ভব। ইরান যদিও যুদ্ধ বন্ধের বিনিময়ে এই মজুত হালকা বা পাতলা করার প্রস্তাব দিয়েছে, তবুও ওয়াশিংটনের কড়া নজর এবং পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের হিমশীতল পাহাড়ের আড়ালে এখন ঝুলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তথা গোটা বিশ্বের ভাগ্য।