img

চুপ্পুর পদত্যাগ নিয়ে কিছু কথা

প্রকাশিত :  ০৯:৩৪, ০৪ আগষ্ট ২০২৬

চুপ্পুর পদত্যাগ নিয়ে কিছু কথা

আবদুল হামিদ মাহবুব

মো. শাহাবুদ্দিন চুপ্পু অবশেষে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। অনেক দিন ধরেই এই পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা চলছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকেই তার পদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং আন্দোলনকারীদের একটি অংশ মনে করতেন, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার এই পদে থাকা উচিত নয়। আবার অন্যরা বলেছিলেন, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করাও জরুরি। এই দুই অবস্থানের টানাপোড়েনের মধ্যেই তিনি দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

তার পদত্যাগপত্র প্রকাশের পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ তিনি শুধু পদত্যাগ করেননি। দীর্ঘ একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। সেখানে তিনি নিজের দায়িত্ব পালনের মূল্যায়ন করেছেন। সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলায় নিজের ভূমিকার কথাও বলেছেন। একই সঙ্গে নিজের গুরুতর অসুস্থতার বর্ণনাও দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, একটি পদত্যাগপত্রে এত কিছু বলার প্রয়োজন ছিল কি?

রাষ্ট্রপতির পদ একটি সাংবিধানিক পদ। এই পদে থাকা ব্যক্তি শুধু একজন ব্যক্তি নন। তিনি রাষ্ট্রের একটি প্রতীকও। তাই তার প্রতিটি বক্তব্য গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে বিদায়ের সময় লেখা একটি চিঠি ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। সেই কারণে তার প্রতিটি শব্দ নিয়েও আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।

তিনি লিখেছেন, তিনি নিষ্ঠা, সততা এবং সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। এটি তার নিজের মূল্যায়ন। কিন্তু একজন রাষ্ট্রপতির কাজের প্রকৃত মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত জনগণ, ইতিহাস এবং গবেষকরাই করবেন। নিজের কর্মের প্রশংসা নিজে করলে সেটি সব সময় সবাই গ্রহণ করবেন, এমন নয়। তিনি আরও বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনার পর দেশে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছিল। সেই সংকট থেকে বের হতে তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত নেন। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেন। তিনি এটাও বলেছেন, তার ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।

এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেবে। কারণ সেই সময়ের ঘটনাকে সবাই একইভাবে দেখেন না। কেউ মনে করেন রাষ্ট্রপতি প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। আবার কেউ মনে করেন, তিনি পরিস্থিতির চাপে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আরও অনেকে বলেন, তার আগে নেওয়া নানা সিদ্ধান্তের কারণেই তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ফলে তার নিজের ভূমিকার এমন প্রশংসা বিতর্ককে আরও বাড়াতে পারে।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তার অসুস্থতার বর্ণনা। তিনি লিখেছেন, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি জটিলতা এবং অটোনোমিক নিউরোপ্যাথিতে তিনি ভুগছেন। তিনি বলেছেন, মাঝে মাঝে তিনি অচেতন হয়ে যান। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসারও প্রয়োজন রয়েছে।

অসুস্থতার কারণে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়; এটি একটি গ্রহণযোগ্য কারণ। যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা প্রয়োজন। একজন রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন তিনি আর সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না, তাহলে পদত্যাগ করাই যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন উঠে আসে। যদি মূল কারণ অসুস্থতা হয়, তাহলে এত দীর্ঘ ব্যাখ্যার প্রয়োজন ছিল কেন? তিনি চাইলে খুব সংক্ষিপ্ত ভাষায় বলতে পারতেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা আর সম্ভব নয়। তাই সংবিধান অনুযায়ী আমি পদত্যাগ করছি। এতটুকুই যথেষ্ট হতো। এতে কোনো বিতর্কও তৈরি হতো না।

বরং দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি যেন নিজের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভূমিকার একটি ব্যাখ্যা রেখে যেতে চেয়েছেন। অনেকের কাছে সেটি আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা বলেও মনে হতে পারে। কারণ পদত্যাগপত্র সাধারণত নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার জায়গা নয়। এটি মূলত দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার একটি আনুষ্ঠানিক নথি।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকেই রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে বিতর্ক ছিল। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ শুরু থেকেই তার অপসারণ দাবি করেছিল। রাষ্ট্রপতি ভবন ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিও হয়েছিল। তখন যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তাকে সরালে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতে পারে। তাই তাকে পদে রাখা হয়। সেই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না ভুল ছিল, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু এটাও সত্য, সেই সময় দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রশ্নটি সামনে ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে কঠিন বাস্তবতা ছিল। তাই তারা কোন যুক্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেটিও আলোচনার বিষয়।

এখন তিনি বিদায় নেওয়ার সময় নিজের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। এতে যারা এত দিন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার যুক্তি দিয়েছিলেন, তাদের অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠতেই পারে। কারণ রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যকে অনেকেই রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখবেন।আরেকটি প্রশ্ন এখন জনমনে ঘুরছে। তিনি কি ভবিষ্যতে আইনের আওতায় আসবেন? এ প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তিনি আইনি দায়ে দোষী হয়ে যান না। অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হতে হবে। প্রমাণ থাকলে বিচার হবে। আদালতই শেষ কথা বলবেন।

তার অতীত ভূমিকা নিয়ে নানা সময়ে রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা হয়েছে। দুদকে দায়িত্ব পালন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং অন্যান্য দায়িত্ব নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও বিতর্ক রয়েছে। আবার এসব অভিযোগের অনেকগুলোর বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায়ও নেই। তাই আইন ও সংবিধানের পথেই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার স্বাক্ষরে তৎকালীন সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়েছে। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত বা ফৌজদারি দায়—এই দুটি বিষয় এক নয়। যদি কেউ মনে করেন তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বা আইনের লঙ্ঘন করেছেন, তাহলে তারও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিচার হতে হবে। আবেগ নয়, প্রমাণই সেখানে প্রধান বিষয়।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড়।কোনো ব্যক্তি আজ ক্ষমতায় থাকবেন, কাল থাকবেন না। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকবে। তাই প্রতিটি সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির উচিত এমনভাবে দায়িত্ব পালন করা, যাতে তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে। কারণ রাষ্ট্রপতির প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হলে রাষ্ট্রের মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

চুপ্পুর পদত্যাগ একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি। কিন্তু এর মাধ্যমে অনেক প্রশ্নের শেষ হয়নি। বরং নতুন করে অনেক প্রশ্ন সামনে এসেছে। কেন তিনি এত দিন পদে ছিলেন? কেন বিদায়ের সময় এত ব্যাখ্যা দিলেন? তার ভূমিকার প্রকৃত মূল্যায়ন কী হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।

ইতিহাস খুব ধৈর্য নিয়ে বিচার করে। ইতিহাস কারও আত্মপ্রশংসা দেখে সিদ্ধান্ত দেয় না। আবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ শুনেও সিদ্ধান্ত দেয় না। ইতিহাস দলিল দেখে। ঘটনা দেখে। মানুষের অভিজ্ঞতা দেখে। এরপর রায় দেয়।

চুপ্পুর পদত্যাগপত্র হয়তো একদিন গবেষণার বিষয় হবে। সেখানে তার দাবি যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে সমালোচনাও। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তখন বিচার করবে, তিনি সত্যিই সাংবিধানিক সংকট রক্ষা করেছিলেন, নাকি কেবল নিজের ভূমিকার পক্ষে একটি ব্যাখ্যা রেখে গেছেন।

সবশেষে একটি কথাই বলা যায়। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। পদও স্থায়ী নয়। কিন্তু মানুষের কর্ম ইতিহাসে থেকে যায়। তাই বিদায়ের সময় সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত বিনয়। সবচেয়ে বড় ভাষা হওয়া উচিত সংযম। আর সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত জবাবদিহি। একটি সংক্ষিপ্ত ও মর্যাদাপূর্ণ পদত্যাগপত্র হয়তো আরও কম বিতর্ক তৈরি করত। কিন্তু দীর্ঘ ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি নিজের বিদায়কেই আবারও নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব  ও  যুগ্ম সাধারণ  সম্পাদক, মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল। মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪
ই-মেইল: [email protected]
img

জেনেভা ক্যাম্প: অপরাধের জন্মভূমি নয়, অবহেলার দীর্ঘ ছায়া

প্রকাশিত :  ১২:৩৭, ৩১ জুলাই ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের নাম উচ্চারিত হলেই সাধারণ মানুষের মনে দুটি বিপরীত ছবি ভেসে ওঠে। একদিকে আছে সরু গলি, মাদক, সংঘর্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও অপরাধের সংবাদ। অন্যদিকে আছে এমন এক জনগোষ্ঠী, যারা পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অস্থায়ী আশ্রয়কে স্থায়ী জীবনে পরিণত করতে বাধ্য হয়েছে। প্রথম ছবিটি প্রতিদিনের সংবাদে দেখা যায়; দ্বিতীয় ছবিটি খুব কমই আলোচনায় আসে। অথচ এই দ্বিতীয় ছবিটি না বুঝলে প্রথমটির ব্যাখ্যাও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

জেনেভা ক্যাম্পের সংকট কেবল একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, কেবল একটি বস্তির সমস্যা নয়, আবার কেবল একটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সমস্যাও নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, ইতিহাস, নগর পরিকল্পনা, নাগরিক অধিকার, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং মানবিক দায়বদ্ধতার একটি দীর্ঘস্থায়ী পরীক্ষা। যে পরীক্ষায় আমরা আংশিক সফল হলেও এখনো পূর্ণ নম্বর অর্জন করতে পারিনি।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারতের বিহারসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু উর্দুভাষী মুসলিম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। এরপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাদের জীবনে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করে। যুদ্ধকালীন সময়ে এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, আবার অনেকে নিরপেক্ষ থেকেছিল বা সংঘাতের শিকার হয়েছিল। স্বাধীনতার পর পুরো সম্প্রদায়টি রাজনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। বহু মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা ও সামাজিক অবস্থান হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হন।

১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের উদ্যোগে মোহাম্মদপুরে একটি অস্থায়ী আশ্রয়শিবির প্রতিষ্ঠিত হয়। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের সদর দপ্তর থাকায় সেটি পরিচিতি পায় \"জেনেভা ক্যাম্প\" নামে। তখন কেউ কল্পনাও করেনি, কয়েক মাস বা কয়েক বছরের জন্য গড়ে ওঠা এই আশ্রয় একসময় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকবে। একটি অস্থায়ী মানবিক উদ্যোগ ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী নগর-অবরুদ্ধ এলাকায় পরিণত হয়।

আজকের জেনেভা ক্যাম্প বাংলাদেশের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা। বিভিন্ন জরিপে এর আয়তন ও জনসংখ্যার কিছু পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই এখানে মানুষের ঘনত্ব অস্বাভাবিকভাবে বেশি। অতি ক্ষুদ্র কক্ষে পাঁচ থেকে দশজন পর্যন্ত মানুষ বসবাস করেন। সরু গলিতে সূর্যের আলো প্রবেশ করে না। খোলা ড্রেন, অপর্যাপ্ত শৌচাগার, নিরাপদ পানির সংকট এবং অগ্নিকাণ্ডের স্থায়ী ঝুঁকি প্রতিদিনের বাস্তবতা।

এই পরিবেশে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর পৃথিবী কেমন হয়? সে কি খেলার মাঠ দেখে? সে কি পর্যাপ্ত আলো-বাতাসে পড়াশোনা করতে পারে? সে কি এমন একটি পরিবেশ পায়, যেখানে নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করা সম্ভব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের বিব্রত করে।

শিক্ষা সংকট এখানে একটি মৌলিক বাস্তবতা। অধিকাংশ পরিবারে উর্দু ভাষা ব্যবহৃত হলেও বিদ্যালয়ের শিক্ষা বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক। ফলে বহু শিশু শুরু থেকেই ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক বৈষম্য, পরিচয় নিয়ে সংকোচ এবং নানা ধরনের বুলিং। ফলাফল অনেক শিশু বিদ্যালয়ে টিকে থাকতে পারে না। একটি প্রজন্ম যখন শিক্ষার বাইরে চলে যায়, তখন পরবর্তী প্রজন্মের দারিদ্র্যও প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়।

২০০৩ এবং ২০০৮ সালের ঐতিহাসিক আদালতের রায়ে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার স্বীকৃতি পায়। এটি ছিল বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। অনেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছেন, ভোটার হয়েছেন এবং নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

কিন্তু নাগরিকত্বের আইনি স্বীকৃতি এবং নাগরিকত্বের বাস্তব অভিজ্ঞতা এক বিষয় নয়।

কোনো নাগরিক যদি পরিচয়পত্র পান, কিন্তু চাকরি পেতে ঠিকানার কারণে বৈষম্যের শিকার হন, তাহলে তিনি কাগজে নাগরিক হলেও বাস্তবে সমান সুযোগ পান না। যদি ব্যাংক ঋণ পেতে অসুবিধা হয়, ব্যবসার লাইসেন্স পেতে বাধা আসে অথবা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি হয়, তাহলে সেই নাগরিকত্ব অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

এখানে একটি বিষয় সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। অনেক সময় বলা হয়, ক্যাম্পের ঠিকানার কারণে সবাই পাসপোর্ট পান না বা সব আবেদন আটকে যায়। বাস্তবে এ ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বিভিন্ন ব্যক্তি ও মানবাধিকার সংগঠন উল্লেখ করেছে, তবে প্রতিটি আবেদন একইভাবে নিষ্পত্তি হয় এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তাই যেসব প্রশাসনিক বাধা বাস্তবে বিদ্যমান, সেগুলো নীতিগতভাবে পর্যালোচনা করে সমাধান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

জেনেভা ক্যাম্প নিয়ে জনমনে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় অপরাধ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময়ে এখানে অভিযান চালিয়েছে, অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করেছে এবং অপরাধী গ্রেপ্তার করেছে। এসব ঘটনা বাস্তব। কিন্তু এখানেই আলোচনার সমাপ্তি ঘটলে একটি বড় ভুল হবে।

অপরাধ কখনোই কোনো জাতিগত পরিচয়ের বৈশিষ্ট্য নয়। অপরাধ সৃষ্টি হয় সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক এবং স্থানিক নানা কারণের সমন্বয়ে। জেনেভা ক্যাম্পে দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, সীমিত শিক্ষা, ঘনবসতি, অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা এবং সংগঠিত অপরাধচক্রের প্রভাব একত্রে একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করেছে। এই বাস্তবতা স্বীকার করেও একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে ক্যাম্পের অধিকাংশ মানুষ সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাঁরা মোটর মেকানিক, দর্জি, বাবুর্চি, চালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গৃহকর্মী কিংবা কারুশিল্পী। অল্পসংখ্যক অপরাধীর কারণে পুরো সম্প্রদায়কে অপরাধী হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের অন্যান্য ঘনবসতিপূর্ণ দরিদ্র এলাকাতেও আমরা একই বাস্তবতা দেখেছি। যেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি দুর্বল, শিক্ষার সুযোগ সীমিত এবং কর্মসংস্থানের পথ সংকুচিত, সেখানে সংঘবদ্ধ অপরাধ সহজেই শেকড় গাড়ে। তাই কেবল অভিযান চালিয়ে সমস্যার উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও মূল কারণ দূর করা যায় না।

এখানে রাষ্ট্রের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে। প্রথম পথটি কেবল নিরাপত্তাকেন্দ্রিক অভিযান, গ্রেপ্তার, নজরদারি। দ্বিতীয় পথটি নিরাপত্তার পাশাপাশি সামাজিক বিনিয়োগের শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং আইনের সমান প্রয়োগ। দীর্ঘমেয়াদে দ্বিতীয় পথটিই কার্যকর।

জেনেভা ক্যাম্পের পুনর্বাসন নিয়ে বহু বছর ধরেই আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু পরিকল্পনা যত হয়েছে, বাস্তবায়ন তত এগোয়নি। অথচ এই সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়।

প্রথমত, একটি সমন্বিত নগর পুনর্গঠন পরিকল্পনা প্রয়োজন। বর্তমান অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ আবাসন ধাপে ধাপে পরিকল্পিত বহুতল আবাসনে রূপান্তর করা যেতে পারে। কোথায় পুনর্বাসন হবে, কীভাবে হবে, কী ধরনের মালিকানা কাঠামো থাকবে এসব বিষয়ে অধিবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হবে সফলতার শর্ত।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা হতে হবে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। ভাষাগত সহায়তা, ঝরে পড়া রোধ, উপবৃত্তি, কারিগরি শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষায় বিশেষ সহায়তা ছাড়া প্রজন্মগত দারিদ্র্যের চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।

তৃতীয়ত, কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ক্যাম্পের বহু পরিবার কাবাব, বেকারি, বেনারসি, কারচুপি, টেইলারিং ও বিভিন্ন কারুশিল্পে দক্ষ। এসব ঐতিহ্যবাহী দক্ষতাকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে হাজারো তরুণের জন্য বৈধ আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

চতুর্থত, প্রশাসনিক সেবা আরও সহজলভ্য করতে হবে। নাগরিকত্বের স্বীকৃতি বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা জরুরি। পরিচয়পত্র, জন্ম নিবন্ধন, ব্যাংকিং সেবা, ব্যবসায়িক নিবন্ধন এবং অন্যান্য সরকারি সেবায় অযৌক্তিক বাধা থাকলে তা দ্রুত দূর করতে হবে।

পঞ্চমত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কেবল অভিযান নয়, কমিউনিটি পুলিশিং, মাদক নিরাময়, কিশোর পুনর্বাসন এবং সামাজিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার উদ্যোগ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধে জড়িয়ে পড়া তরুণদের জন্য দ্বিতীয় সুযোগ সৃষ্টি না করলে নতুন প্রজন্মও একই চক্রে আটকে পড়বে।

জেনেভা ক্যাম্পের প্রশ্নে আমাদের ভাষাও সংযত হওয়া দরকার। কোনো সম্প্রদায়কে সামগ্রিকভাবে \"অপরাধপ্রবণ\" বলে চিহ্নিত করা ন্যায্য নয়। অপরাধী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, কিন্তু নিরীহ মানুষকে সেই পরিচয়ের বোঝা বহন করতে বাধ্য করা উচিত নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেমন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তেমনি বৈষম্যহীন নাগরিক মর্যাদাও নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর বহু জটিল মানবিক সংকট মোকাবিলা করেছে। জেনেভা ক্যাম্প সেই দীর্ঘ ইতিহাসের একটি অধ্যায়, যার সমাপ্তি এখনো লেখা হয়নি। পাঁচ দশকের অস্থায়ী জীবন আর অস্থায়ী থাকতে পারে না। একটি শিশুর জন্ম যেন আর সংকীর্ণ অন্ধকার গলিতে ভবিষ্যৎ হারানোর প্রতীক না হয়।

জেনেভা ক্যাম্পকে আমরা চাইলে কেবল অপরাধের মানচিত্রে দেখতে পারি। আবার চাইলে এটিকে একটি অসমাপ্ত রাষ্ট্রনৈতিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখতে পারি। দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গিটিই আমাদের আরও মানবিক, আরও ন্যায়ভিত্তিক এবং আরও দূরদর্শী রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যাবে।

একটি রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার অর্থনীতির আকারে নয়, বরং সে কতটা দক্ষতার সঙ্গে প্রান্তিক মানুষকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে পারে তার মধ্যেও নিহিত থাকে। জেনেভা ক্যাম্পের ভবিষ্যৎ সেই পরীক্ষারই আরেকটি নাম।

মতামত এর আরও খবর