img

জেনেভা ক্যাম্প: অপরাধের জন্মভূমি নয়, অবহেলার দীর্ঘ ছায়া

প্রকাশিত :  ১২:৩৭, ৩১ জুলাই ২০২৬

জেনেভা ক্যাম্প: অপরাধের জন্মভূমি নয়, অবহেলার দীর্ঘ ছায়া

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের নাম উচ্চারিত হলেই সাধারণ মানুষের মনে দুটি বিপরীত ছবি ভেসে ওঠে। একদিকে আছে সরু গলি, মাদক, সংঘর্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও অপরাধের সংবাদ। অন্যদিকে আছে এমন এক জনগোষ্ঠী, যারা পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অস্থায়ী আশ্রয়কে স্থায়ী জীবনে পরিণত করতে বাধ্য হয়েছে। প্রথম ছবিটি প্রতিদিনের সংবাদে দেখা যায়; দ্বিতীয় ছবিটি খুব কমই আলোচনায় আসে। অথচ এই দ্বিতীয় ছবিটি না বুঝলে প্রথমটির ব্যাখ্যাও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

জেনেভা ক্যাম্পের সংকট কেবল একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, কেবল একটি বস্তির সমস্যা নয়, আবার কেবল একটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সমস্যাও নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, ইতিহাস, নগর পরিকল্পনা, নাগরিক অধিকার, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং মানবিক দায়বদ্ধতার একটি দীর্ঘস্থায়ী পরীক্ষা। যে পরীক্ষায় আমরা আংশিক সফল হলেও এখনো পূর্ণ নম্বর অর্জন করতে পারিনি।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারতের বিহারসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু উর্দুভাষী মুসলিম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। এরপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাদের জীবনে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করে। যুদ্ধকালীন সময়ে এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, আবার অনেকে নিরপেক্ষ থেকেছিল বা সংঘাতের শিকার হয়েছিল। স্বাধীনতার পর পুরো সম্প্রদায়টি রাজনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। বহু মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা ও সামাজিক অবস্থান হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হন।

১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের উদ্যোগে মোহাম্মদপুরে একটি অস্থায়ী আশ্রয়শিবির প্রতিষ্ঠিত হয়। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের সদর দপ্তর থাকায় সেটি পরিচিতি পায় \"জেনেভা ক্যাম্প\" নামে। তখন কেউ কল্পনাও করেনি, কয়েক মাস বা কয়েক বছরের জন্য গড়ে ওঠা এই আশ্রয় একসময় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকবে। একটি অস্থায়ী মানবিক উদ্যোগ ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী নগর-অবরুদ্ধ এলাকায় পরিণত হয়।

আজকের জেনেভা ক্যাম্প বাংলাদেশের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা। বিভিন্ন জরিপে এর আয়তন ও জনসংখ্যার কিছু পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই এখানে মানুষের ঘনত্ব অস্বাভাবিকভাবে বেশি। অতি ক্ষুদ্র কক্ষে পাঁচ থেকে দশজন পর্যন্ত মানুষ বসবাস করেন। সরু গলিতে সূর্যের আলো প্রবেশ করে না। খোলা ড্রেন, অপর্যাপ্ত শৌচাগার, নিরাপদ পানির সংকট এবং অগ্নিকাণ্ডের স্থায়ী ঝুঁকি প্রতিদিনের বাস্তবতা।

এই পরিবেশে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর পৃথিবী কেমন হয়? সে কি খেলার মাঠ দেখে? সে কি পর্যাপ্ত আলো-বাতাসে পড়াশোনা করতে পারে? সে কি এমন একটি পরিবেশ পায়, যেখানে নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করা সম্ভব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের বিব্রত করে।

শিক্ষা সংকট এখানে একটি মৌলিক বাস্তবতা। অধিকাংশ পরিবারে উর্দু ভাষা ব্যবহৃত হলেও বিদ্যালয়ের শিক্ষা বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক। ফলে বহু শিশু শুরু থেকেই ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক বৈষম্য, পরিচয় নিয়ে সংকোচ এবং নানা ধরনের বুলিং। ফলাফল অনেক শিশু বিদ্যালয়ে টিকে থাকতে পারে না। একটি প্রজন্ম যখন শিক্ষার বাইরে চলে যায়, তখন পরবর্তী প্রজন্মের দারিদ্র্যও প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়।

২০০৩ এবং ২০০৮ সালের ঐতিহাসিক আদালতের রায়ে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার স্বীকৃতি পায়। এটি ছিল বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। অনেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছেন, ভোটার হয়েছেন এবং নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

কিন্তু নাগরিকত্বের আইনি স্বীকৃতি এবং নাগরিকত্বের বাস্তব অভিজ্ঞতা এক বিষয় নয়।

কোনো নাগরিক যদি পরিচয়পত্র পান, কিন্তু চাকরি পেতে ঠিকানার কারণে বৈষম্যের শিকার হন, তাহলে তিনি কাগজে নাগরিক হলেও বাস্তবে সমান সুযোগ পান না। যদি ব্যাংক ঋণ পেতে অসুবিধা হয়, ব্যবসার লাইসেন্স পেতে বাধা আসে অথবা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি হয়, তাহলে সেই নাগরিকত্ব অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

এখানে একটি বিষয় সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। অনেক সময় বলা হয়, ক্যাম্পের ঠিকানার কারণে সবাই পাসপোর্ট পান না বা সব আবেদন আটকে যায়। বাস্তবে এ ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বিভিন্ন ব্যক্তি ও মানবাধিকার সংগঠন উল্লেখ করেছে, তবে প্রতিটি আবেদন একইভাবে নিষ্পত্তি হয় এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তাই যেসব প্রশাসনিক বাধা বাস্তবে বিদ্যমান, সেগুলো নীতিগতভাবে পর্যালোচনা করে সমাধান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

জেনেভা ক্যাম্প নিয়ে জনমনে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় অপরাধ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময়ে এখানে অভিযান চালিয়েছে, অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করেছে এবং অপরাধী গ্রেপ্তার করেছে। এসব ঘটনা বাস্তব। কিন্তু এখানেই আলোচনার সমাপ্তি ঘটলে একটি বড় ভুল হবে।

অপরাধ কখনোই কোনো জাতিগত পরিচয়ের বৈশিষ্ট্য নয়। অপরাধ সৃষ্টি হয় সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক এবং স্থানিক নানা কারণের সমন্বয়ে। জেনেভা ক্যাম্পে দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, সীমিত শিক্ষা, ঘনবসতি, অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা এবং সংগঠিত অপরাধচক্রের প্রভাব একত্রে একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করেছে। এই বাস্তবতা স্বীকার করেও একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে ক্যাম্পের অধিকাংশ মানুষ সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাঁরা মোটর মেকানিক, দর্জি, বাবুর্চি, চালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গৃহকর্মী কিংবা কারুশিল্পী। অল্পসংখ্যক অপরাধীর কারণে পুরো সম্প্রদায়কে অপরাধী হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের অন্যান্য ঘনবসতিপূর্ণ দরিদ্র এলাকাতেও আমরা একই বাস্তবতা দেখেছি। যেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি দুর্বল, শিক্ষার সুযোগ সীমিত এবং কর্মসংস্থানের পথ সংকুচিত, সেখানে সংঘবদ্ধ অপরাধ সহজেই শেকড় গাড়ে। তাই কেবল অভিযান চালিয়ে সমস্যার উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও মূল কারণ দূর করা যায় না।

এখানে রাষ্ট্রের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে। প্রথম পথটি কেবল নিরাপত্তাকেন্দ্রিক অভিযান, গ্রেপ্তার, নজরদারি। দ্বিতীয় পথটি নিরাপত্তার পাশাপাশি সামাজিক বিনিয়োগের শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং আইনের সমান প্রয়োগ। দীর্ঘমেয়াদে দ্বিতীয় পথটিই কার্যকর।

জেনেভা ক্যাম্পের পুনর্বাসন নিয়ে বহু বছর ধরেই আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু পরিকল্পনা যত হয়েছে, বাস্তবায়ন তত এগোয়নি। অথচ এই সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়।

প্রথমত, একটি সমন্বিত নগর পুনর্গঠন পরিকল্পনা প্রয়োজন। বর্তমান অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ আবাসন ধাপে ধাপে পরিকল্পিত বহুতল আবাসনে রূপান্তর করা যেতে পারে। কোথায় পুনর্বাসন হবে, কীভাবে হবে, কী ধরনের মালিকানা কাঠামো থাকবে এসব বিষয়ে অধিবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হবে সফলতার শর্ত।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা হতে হবে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। ভাষাগত সহায়তা, ঝরে পড়া রোধ, উপবৃত্তি, কারিগরি শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষায় বিশেষ সহায়তা ছাড়া প্রজন্মগত দারিদ্র্যের চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।

তৃতীয়ত, কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ক্যাম্পের বহু পরিবার কাবাব, বেকারি, বেনারসি, কারচুপি, টেইলারিং ও বিভিন্ন কারুশিল্পে দক্ষ। এসব ঐতিহ্যবাহী দক্ষতাকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে হাজারো তরুণের জন্য বৈধ আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

চতুর্থত, প্রশাসনিক সেবা আরও সহজলভ্য করতে হবে। নাগরিকত্বের স্বীকৃতি বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা জরুরি। পরিচয়পত্র, জন্ম নিবন্ধন, ব্যাংকিং সেবা, ব্যবসায়িক নিবন্ধন এবং অন্যান্য সরকারি সেবায় অযৌক্তিক বাধা থাকলে তা দ্রুত দূর করতে হবে।

পঞ্চমত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কেবল অভিযান নয়, কমিউনিটি পুলিশিং, মাদক নিরাময়, কিশোর পুনর্বাসন এবং সামাজিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার উদ্যোগ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধে জড়িয়ে পড়া তরুণদের জন্য দ্বিতীয় সুযোগ সৃষ্টি না করলে নতুন প্রজন্মও একই চক্রে আটকে পড়বে।

জেনেভা ক্যাম্পের প্রশ্নে আমাদের ভাষাও সংযত হওয়া দরকার। কোনো সম্প্রদায়কে সামগ্রিকভাবে \"অপরাধপ্রবণ\" বলে চিহ্নিত করা ন্যায্য নয়। অপরাধী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, কিন্তু নিরীহ মানুষকে সেই পরিচয়ের বোঝা বহন করতে বাধ্য করা উচিত নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেমন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তেমনি বৈষম্যহীন নাগরিক মর্যাদাও নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর বহু জটিল মানবিক সংকট মোকাবিলা করেছে। জেনেভা ক্যাম্প সেই দীর্ঘ ইতিহাসের একটি অধ্যায়, যার সমাপ্তি এখনো লেখা হয়নি। পাঁচ দশকের অস্থায়ী জীবন আর অস্থায়ী থাকতে পারে না। একটি শিশুর জন্ম যেন আর সংকীর্ণ অন্ধকার গলিতে ভবিষ্যৎ হারানোর প্রতীক না হয়।

জেনেভা ক্যাম্পকে আমরা চাইলে কেবল অপরাধের মানচিত্রে দেখতে পারি। আবার চাইলে এটিকে একটি অসমাপ্ত রাষ্ট্রনৈতিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখতে পারি। দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গিটিই আমাদের আরও মানবিক, আরও ন্যায়ভিত্তিক এবং আরও দূরদর্শী রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যাবে।

একটি রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার অর্থনীতির আকারে নয়, বরং সে কতটা দক্ষতার সঙ্গে প্রান্তিক মানুষকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে পারে তার মধ্যেও নিহিত থাকে। জেনেভা ক্যাম্পের ভবিষ্যৎ সেই পরীক্ষারই আরেকটি নাম।

img

আত্মপরিচয়ের রাজনীতি: বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ

প্রকাশিত :  ০৮:৫২, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

সাইফুল খান 

\"একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র যখন তিন দিক থেকে একটি বৃহৎ প্রতিবেশী দ্বারা আবৃত, তখন তার রাষ্ট্রীয় আত্মপরিচয়ই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ঠিক সেই ঢাল। রাষ্ট্রতত্ত্বের আলোকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ।\"

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব কেবল সরকারই পরিচালনা করেন না রাষ্ট্রের অস্তিত্বের দার্শনিক ভিত্তিটাই নতুন করে নির্মাণ করেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঠিক এই কাজটি করেছিলেন। \'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ\' কেবল একটি রাজনৈতিক মতবাদ হিসেবে তিনি হাজির করেননি,  এটি ছিল ভূগোলের নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখে একটি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র জাতি-রাষ্ট্রের আত্মপরিচয় রক্ষার সুচিন্তিত কৌশল, রাষ্ট্রতত্ত্বের ভাষায় যাকে বলা যায় \'সার্বভৌমত্বের অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ\'।

বাংলাদেশের ভূগোলটা একবার মানচিত্রে দেখুন। তিন দিক - উত্তর, পশ্চিম এবং পূর্ব  ভারত দ্বারা আবৃত। কেবল দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। ১৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটারের এই ভূখণ্ডটি ভূরাজনৈতিক দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানগুলোর একটিতে বিদ্যমান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মার্শাল সিঙারের \'এনক্লেভ থিওরি\' বলে, যে রাষ্ট্র চারপাশ থেকে বড় শক্তির দ্বারা আবৃত, তার সার্বভৌমত্ব সর্বদাই \'কন্ডিশনাল\' বা শর্তযুক্ত ;  যদি না সে রাষ্ট্র নিজের একটি শক্তিশালী, স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করতে সক্ষম হয়। জিয়াউর রহমান সেই পরিচয় নির্মাণ করেছিলেন।

ভূ-রাজনীতির ফাঁদ: কেন বাংলাদেশের জন্য পরিচয়ই সুরক্ষা

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের \'নিও-রিয়েলিস্ট\' ধারায় কেনেথ ওয়ালজ দেখিয়েছেন, দুর্বল রাষ্ট্রগুলো শক্তিশালী প্রতিবেশীর পাশে দুটি উপায়ে টিকে থাকতে পারে ; \'ব্যান্ডওয়াগনিং\' (প্রভাবশালী শক্তির অনুগামী হয়ে যাওয়া) অথবা \'ব্যালেন্সিং\' (পাল্টা জোট বা কৌশল তৈরি করা)। কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের জন্য এই দুটি বিকল্পের কোনোটিই যথেষ্ট নয়।

ব্যান্ডওয়াগনিং মানে ভারতের কক্ষপথে পরিণত হওয়া  যা স্বাধীনতাকে আনুষ্ঠানিক রেখে বাস্তবে রাষ্ট্রীয় স্বায়ত্তশাসন বিলুপ্ত করে। আর ব্যালেন্সিং-এর জন্য  ভূ-রাজনৈতিক গভীরতা দরকার।  সেজন্য তুলনামূলক  বন্ধু-রাষ্ট্র, কৌশলগত গভীরতা, নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা প্রয়োজন যা  বাংলাদেশের ভূগোল অনুমোদন করে না। এই দ্বিধার মধ্যে জিয়াউর রহমান একটি তৃতীয় পথ বেছে নিয়েছিলেন: \'আইডেন্টিটি-বেইজড সভারেইন্টি\' বা পরিচয়ভিত্তিক সার্বভৌমত্ব।

তাত্ত্বিক ধারণা / আইডেন্টিটি-বেইজড সভারেইন্টি

যখন কোনো রাষ্ট্র সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তিতে নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে না, তখন সে একটি শক্তিশালী, স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয় তৈরি করে যা বাইরের শক্তির কাছে একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক বাধা তৈরি করে। এই পরিচয় যত স্পষ্ট ও গভীরে প্রোথিত, বাইরের শক্তির কাছে তা গ্রাস করা তত কঠিন হয়।

বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো যেমন- এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া  সোভিয়েত অধিভুক্তির পরেও পাঁচ দশক নিজেদের জাতীয় পরিচয় টিকিয়ে রেখেছিল। সেই পরিচয়ই তাদের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের ভিত্তি হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ঐতিহাসিক বাস্তবতা, কিন্তু যুক্তির কাঠামো একই: পরিচয় হারালে রাষ্ট্র থাকলেও সত্তা থাকে না।

বাংলা ভাষা বনাম বাংলাদেশি জাতিসত্তা: দুটি ধারণার মৌলিক পার্থক্য

এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিশ্লেষণ করা দরকার। \'বাঙালি জাতীয়তাবাদ\' এবং \'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ\'  এই দুটি ধারণার মধ্যে পার্থক্যটা কেবল শব্দের নয়, এটা রাষ্ট্রদর্শনের মূলগত পার্থক্য।

রেনান ১৮৮২ সালে তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতায় জিজ্ঞেস করেছিলেন: জাতি কী? তাঁর উত্তর ছিল  জাতি কেবল ভাষা, জাতি বা ধর্মের ঐক্য নয়; জাতি হলো একটি \'দৈনিক গণভোট\'  প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত একসাথে থাকব। \'বাঙালি জাতীয়তাবাদ\' যদি ভাষাকে কেন্দ্রে রাখে, তাহলে সেটা স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষীদের সাথে একটি সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অভিন্নতার ধারণা তৈরি করে। ভারতের লক্ষ্য যদি হয় এই অভিন্নতাকে রাজনৈতিক মেরুকরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা, তাহলে \'বাঙালি পরিচয়\' হয়ে পড়ে বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত অস্ত্র।

\"একটি জাতির পরিচয় যদি তার নিজের সীমানার বাইরে অন্য একটি রাষ্ট্রের সংজ্ঞার সাথে অভিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে সেই পরিচয় আর সুরক্ষা নয় স্পষ্টত ফাঁদ।\"

বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন, Imagined Communities (১৯৮৩)

বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের \'ইমাজিন্ড কমিউনিটিজ\' তত্ত্ব বলে, জাতি একটি \'কল্পিত সম্প্রদায়\' যার সদস্যরা পরস্পরকে চেনেন না, কিন্তু একটি অভিন্ন ধারণায় নিজেদের যুক্ত মনে করেন। এই ধারণাটি নির্মিত হয় ছাপাখানা, সংবাদপত্র, সাহিত্য এবং রাজনৈতিক আখ্যানের মাধ্যমে। জিয়াউর রহমান \'বাংলাদেশি\' পরিচয়ের এই নির্মাণে সচেতনভাবে হাত দিয়েছিলেন। এমন একটি পরিচয়, যার কেন্দ্রে আছে ভূখণ্ড, ইতিহাস, সংস্কৃতির সমন্বয় এবং সর্বোপরি একটি আলাদা রাষ্ট্রিক অস্তিত্বের চেতনা।

এই পরিচয়ে ভাষা আছে, কিন্তু ভাষাই একমাত্র নয়। ধর্ম আছে, কিন্তু ধর্ম আধিপত্য করে না। ইতিহাস আছে,  যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস, যা বাংলাদেশকে অনন্য করে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: এই পরিচয়ের ভৌগোলিক সীমানা সুনির্দিষ্ট এবং তা পশ্চিমবঙ্গের সীমানায় গিয়ে শেষ হয়।

ওয়েস্টফালিয়ান সার্বভৌমত্ব ও বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়া চুক্তিতে। যেখানে প্রথমবারের মতো প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজের সীমানার মধ্যে সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত হয়। এই সার্বভৌমত্বের তিনটি স্তম্ভ: ভূখণ্ডের অখণ্ডতা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে রাষ্ট্রের আইনগত সমতা।

কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে এই তিনটি স্তম্ভের কোনোটিই শুধু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিতে টেকে না। হ্যান্স মর্গেনথাউর \'পলিটিক্স অ্যামং নেশনস\' তত্ত্ব বলে, রাষ্ট্রের বাস্তব সার্বভৌমত্ব নির্ভর করে তার \'ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট\' বা জাতীয় স্বার্থকে সংজ্ঞায়িত ও রক্ষা করার ক্ষমতার ওপর। এই সংজ্ঞায়ন যদি নিজে না করতে পারেন, তাহলে অন্য কেউ করে দেবে।

ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যকার অসামঞ্জস্য বোঝার জন্য কিছু তথ্য উল্লেখ প্রাসঙ্গিক: ভারতের আয়তন বাংলাদেশের প্রায় ২২ গুণ, জনসংখ্যা প্রায় ৮ গুণ, GDP প্রায় ১২ গুণ এবং সামরিক ব্যয় তুলনাতীতভাবে বেশি। এই বাস্তবতায় দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সমতা আছে, কিন্তু বাস্তব সমতা নেই।

তাত্ত্বিক প্রয়োগ / \'পাওয়ার অ্যাসিমেট্রি\' ও ছোট রাষ্ট্রের কৌশল

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের \'পাওয়ার অ্যাসিমেট্রি\' তত্ত্ব বলে, যখন দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে শক্তির ব্যবধান অনেক বেশি, তখন দুর্বল রাষ্ট্রের কাছে \'হার্ড পাওয়ার\' (সামরিক-অর্থনৈতিক শক্তি) ব্যবহারের সুযোগ সীমিত। তখন তার প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে \'সফট পাওয়ার\' যেমন-জাতীয় পরিচয়, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং আন্তর্জাতিক নীতির নৈতিক অবস্থান।

জোসেফ নাইয়ের \'সফট পাওয়ার\' তত্ত্বে (১৯৯০) বলা হয়, কোনো রাষ্ট্রের আকর্ষণীয়তা, তার মূল্যবোধ এবং বৈধতার ধারণা  এগুলো বলপ্রয়োগ ছাড়াই প্রভাব বিস্তার করতে পারে। বাংলাদেশের \'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ\' এই সফট পাওয়ারের একটি প্রয়োগ,  একটি স্বতন্ত্র পরিচয় যা বাংলাদেশকে ভারতের \'কাল্চারাল হেজিমনি\' থেকে রক্ষা করে।

জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদের পাঁচটি স্তম্ভ: একটি রাষ্ট্রতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

স্তম্ভ ১: ভূখণ্ড-কেন্দ্রিক পরিচয় নির্মাণ

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কেন্দ্রে রাখলেন বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে। এটি ঠিক সেই কাজ যা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা \'টেরিটোরিয়াল ন্যাশনালিজম\' বলেন। যেখানে জাতীয় পরিচয় নির্মিত হয় একটি সুনির্দিষ্ট ভূগোলকে কেন্দ্রে রেখে, শুধু ভাষা বা জাতিসত্তাকে নয়। এর ফলে \'বাংলাদেশি\' হওয়ার সংজ্ঞা স্পষ্ট হয়: যে এই ভূখণ্ডের বাসিন্দা, এই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যশীল, সে বাংলাদেশি ধর্ম, ভাষা বা জাতিনির্বিশেষে।

স্তম্ভ ২: বহুত্ববাদী জাতি-সংজ্ঞা

জিয়াউর রহমান \'বাংলাদেশি\' পরিচয়ে একটি বহুত্ববাদী কাঠামো যোগ করেছিলেন  বাঙালি, চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারো সকলেই \'বাংলাদেশি\'। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক সংজ্ঞা একটি ছোট রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ  কারণ বৈচিত্র্যকে বিভাজনের হাতিয়ার বানানো হলে বাইরের শক্তি সেই বিভাজন ব্যবহার করতে পারে। উইল কিমলিকার \'মাল্টিকালচারাল সিটিজেনশিপ\' তত্ত্ব বলে, সংখ্যালঘুদের পরিচয়কে অন্তর্ভুক্ত করা রাষ্ট্রের বৈধতা ও স্থিতিশীলতা উভয়কেই শক্তিশালী করে।

স্তম্ভ ৩: ঐতিহাসিক স্বাতন্ত্র্যের দাবি

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো স্বাধীনতার ইতিহাস। জিয়াউর রহমান নিজে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন,  এই ঐতিহাসিক সত্যটি তাঁর রাজনৈতিক বর্ণনায় কেন্দ্রীয় ছিল। রাষ্ট্রদার্শনিক হেগেলের \'ঐতিহাসিক চেতনা\' ধারণা বলে, একটি জাতি তখনই পূর্ণ পরিচয় পায়, যখন সে নিজের ইতিহাসকে নিজের দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করতে শেখে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে কেবল ভারত-সহায়তার ফসল হিসেবে নয়, বাংলাদেশের জনগণের নিজস্ব সংগ্রামের ফসল হিসেবে উপস্থাপন করা এই দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রকাশ। যে দৃষ্টিভঙ্গি দৃঢ়ভাবে পোষন করতেন জিয়াউর রহমান। 

স্তম্ভ ৪: বৈদেশিক নীতিতে ভারসাম্য

জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সবচেয়ে ব্যবহারিক প্রকাশ ছিল বৈদেশিক নীতিতে। তিনি সক্রিয়ভাবে চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো এবং অন্যান্য প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন। এটি ছিল ওয়ালজের \'ব্যালেন্সিং\' কৌশলের একটি পরিশীলিত প্রয়োগ।  কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পদ্ধতি ভিন্ন, পূর্ণ সামরিক জোটের পরিবর্তে কূটনৈতিক বহুমুখিতার মাধ্যমে সম্পর্ক ।

SAARC প্রতিষ্ঠায় জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ এই কৌশলের সবচেয়ে সৃজনশীল প্রকাশ। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার এই কাঠামো তৈরি করে তিনি ভারতকে একটি বহুপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন।  যেখানে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর শুধু দ্বিপাক্ষিক নয়, আঞ্চলিক পরিসরেও শোনা যাবে।

স্তম্ভ ৫: ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবহার বিচ্ছিন্নতার নয়, পার্থক্যের ভিত্তি হিসেবে

সংবিধানে \'বিসমিল্লাহ\' যোগ করা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার স্থানে ইসলামি মূল্যবোধের স্বীকৃতি  এটি কেবল ধর্মীয় রাজনীতি ছিল না। এটি ছিল একটি স্বাতন্ত্র্য-নির্মাণের কৌশল। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের ভাষার মিল আছে, কিন্তু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা আলাদা। এই আলাদা অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অংশ করা বাংলাদেশের \'ইউনিক সেলিং পয়েন্ট\' তৈরি করে। এটা এমন একটি পার্থক্য যা ভারতের সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে ঠেকায়।

হেজিমনি তত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

অ্যান্টোনিও গ্রামশির \'হেজিমোনি\' ধারণায় ক্ষমতা কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শগত \'সম্মতি আদায়ের\' মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতের বাংলাদেশের ওপর প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা এই সাংস্কৃতিক হেজিমনির হিন্দি ও বাংলা চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, সংগীত, সাহিত্য এবং উচ্চশিক্ষার আকর্ষণ।

এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কার্যকর পথ সামরিক নয় সাংস্কৃতিক। নিজস্ব শক্তিশালী পরিচয়, নিজস্ব সাহিত্য-সংস্কৃতির সমৃদ্ধি এবং নিজস্ব বৈধতার আখ্যান এগুলোই বাইরের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে দুর্গ। জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এই দুর্গ নির্মাণের একটি রাজনৈতিক পরিকল্পনা।

\"প্রতিটি জাতিরাষ্ট্রের নিজস্ব একটি \'কাল্চারাল লজিক\' থাকে ।  নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া একটি বোঝাপড়া, যা অন্য কেউ সম্পূর্ণ শেয়ার করতে পারে না। এই লজিকই জাতির টিকে থাকার মৌলিক শক্তি।\"

আন্থনি স্মিথ, The Ethnic Origins of Nations (১৯৮৬)

আন্থনি স্মিথের \'এথনো-সিম্বলিজম\' তত্ত্ব বলে, জাতি কেবল আধুনিক রাজনৈতিক নির্মাণ নয়  এর শিকড় আছে ঐতিহাসিক স্মৃতি, মিথ এবং প্রতীকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন এবং এই ভূখণ্ডের হাজার বছরের ইতিহাস এগুলো সেই \'এথনো-সিম্বল\', যা বাংলাদেশি পরিচয়কে গভীরতা দেয়। জিয়াউর রহমান এই প্রতীকগুলোকে একটি রাজনৈতিক আখ্যানে সংযুক্ত করেছিলেন।

ছোট রাষ্ট্রের কৌশলগত সংস্কৃতি: তুলনামূলক দৃষ্টান্ত

বাংলাদেশের পরিস্থিতি পৃথিবীতে অনন্য নয়। আরও কিছু ছোট রাষ্ট্র বড় প্রতিবেশীর পাশে টিকে থাকার একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে এবং পরিচয়-ভিত্তিক সার্বভৌমত্বের পথ বেছে নিয়েছে।

সিঙ্গাপুরের উদাহরণটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মালয়েশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর সিঙ্গাপুর একটি শক্তিশালী, স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয় নির্মাণে মনোযোগ দিয়েছিল। লি কুয়ান ইউর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল এমন একটি \'সিঙ্গাপুরিয়ান\' পরিচয়  যা চীনা, মালয় ও তামিল সকলকে একটি রাষ্ট্রীয় ছাদের নিচে একত্রিত করেছিল। এই পরিচয় সিঙ্গাপুরকে মালয়েশিয়ার বা চীনের প্রভাব বলয়ে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করেছিল।

সুইজারল্যান্ড আরেকটি উদাহরণ। চারপাশে জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালির মতো বড় শক্তি, কিন্তু সুইজারল্যান্ড তার নিজস্ব \'সুইস পরিচয়\' তৈরি করেছে যেখানে চারটি ভাষা ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি একটি শক্তিশালী নিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কাঠামোয় একত্রিত। এই পরিচয়ই সুইজারল্যান্ডকে সার্বভৌম রেখেছে, সামরিক শক্তি নয়।

বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো সোভিয়েত দখলদারিত্বের পঞ্চাশ বছরেও নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয় আঁকড়ে ধরে ছিল। ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের সময় সেই পরিচয়ই তাদের \'রেজিলিয়েন্স\'-এর মূল শক্তি হয়েছিল।

\'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ\' না থাকলে কী হতো: একটি কাউন্টারফ্যাকচুয়াল বিশ্লেষণ

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে \'কাউন্টারফ্যাকচুয়াল বিশ্লেষণ\'  অর্থাৎ \'যদি এমন না হতো তাহলে কী হতো\' একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। যদি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বদলে কেবল \'বাঙালি জাতীয়তাবাদ\'ই রাষ্ট্রের মতাদর্শিক ভিত্তি থাকত, তাহলে কী ঘটতে পারত?

প্রথমত, ভারত একটি \'বৃহত্তর বাঙালি\' আখ্যান ব্যবহার করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের নৈতিক ভিত্তি পেত। সাংস্কৃতিক আধিপত্যের দাবি করা হতো সহজ। 

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সাথে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের একটি টানাপোড়েন তৈরি হতো। 

তৃতীয়ত, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো  যারা \'বাঙালি\' নয়  তারা রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের বাইরে পড়ে যেত, বিচ্ছিন্নতার ক্ষেত্র তৈরি হতো।

সিকিমের পরিণতি এখানে একটি সতর্ক দৃষ্টান্ত। ১৯৭৫ সালে ভারতীয় কূটনৈতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের সুযোগ নিয়ে সিকিমকে ভারতভুক্ত করা হয়। সিকিমের নিজস্ব শক্তিশালী জাতীয় পরিচয়ের অনুপস্থিতি এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সেই একীভূতকরণকে সম্ভব করেছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি দুর্বল জাতীয় পরিচয় একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারত।

নব্য-সার্বভৌমত্ব তত্ত্ব: জাতীয়তাবাদ একুশ শতকে

একুশ শতকে সার্বভৌমত্বের ধারণা পরিবর্তিত হয়েছে। স্টিফেন ক্রাসনার দেখিয়েছেন, আধুনিক যুগে \'ওয়েস্টফালিয়ান সার্বভৌমত্ব\' অনেক ক্ষেত্রেই \'হাইপোক্রিটিক্যাল\'  অর্থাৎ নামে আছে, কিন্তু বাস্তবে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো দুর্বল রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে। এই বাস্তবতায় দুর্বল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো একটি শক্তিশালী জনমত তৈরি করা  ভেতরে এবং বাইরে উভয় দিকে।

ভেতরে: জনগণের মধ্যে এমন একটি রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের বোধ তৈরি করা, যা বাইরের হস্তক্ষেপকে \'জাতীয় অবমাননা\' হিসেবে দেখে এবং প্রতিরোধ করে। 

বাইরে: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি স্বতন্ত্র, সুনির্দিষ্ট পরিচয়ের রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে হাজির করা  যেটা অন্য কারো অনুপ্রাণিক সম্প্রসারণ নয়।

জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ঠিক এই দুটি কাজই করেছিল। \'বাংলাদেশ আমার\'  এই বোধটি কেবল আবেগীয় নয়, এটি রাজনৈতিক। এটি জনগণকে বলে: এই ভূখণ্ড তোমার, এই রাষ্ট্র তোমার, এর ভবিষ্যৎ তোমার হাতে। এই বোধ যখন গভীরে প্রোথিত হয়, তখন বাইরের শক্তির পক্ষে সেই জনগণকে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা: একটি সৎ মূল্যায়ন

যেকোনো বিশ্লেষণ সৎ হতে হলে সমালোচনাকে উপেক্ষা করা চলে না। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে কিছু সমালোচনা রয়েছে যা বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

প্রথমত, এই জাতীয়তাবাদ সামরিক শাসনামলে জন্ম নিয়েছিল  ফলে এর গণতান্ত্রিক বৈধতা নিয়ে পরিকল্পিত প্রশ্ন ওঠানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, \'বাংলাদেশি\' পরিচয় কখনো কখনো সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়কে পরিচয়ের কেন্দ্র থেকে বাইরে রাখে কিনা  এই উদ্বেগও লক্ষ্যনীয়। তৃতীয়ত, এই জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করে কখনো অতিরিক্ত \'ভারত-বিরোধিতা\' উসকে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যেতে পারে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাগুলো মূল যুক্তিকে খণ্ডন করে না। একটি রাজনৈতিক মতবাদের জন্মের ক্ষন এবং তার মূল কার্যকারিতা আলাদা বিষয় তবে প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ । বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী স্বতন্ত্র পরিচয়ের প্রয়োজন ছিল এবং এখনো আছে,  কীভাবে সেই পরিচয় আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক হবে, সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তা বিতর্কের উর্ধ্বে ।

উপসংহার:  রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রতিটি প্রধান ধারা যেমন- রিয়েলিজম, লিবারেলিজম, কনস্ট্রাক্টিভিজম  তার নিজস্ব ভাষায় একটি বিষয়কে সত্য বলে: দুর্বল রাষ্ট্রের শক্তি হলো তার  পরিচয়ে। যে রাষ্ট্র জানে সে কে, সে কোথায় যেতে চায় এবং সে কীসের জন্য দাঁড়িয়ে আছে সে রাষ্ট্র অনেক কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজেকে হারিয়ে ফেলে না।

ভারতের পেটের ভেতরে  তিন দিক থেকে আবৃত একটি ছোট রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সামনে দুটি পথ ছিল: নিজেকে হারিয়ে ফেলা অথবা নিজেকে আরও স্পষ্টভাবে আবিষ্কার করা। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন। \'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ\' সেই পথের দার্শনিক মানচিত্র।

এই মানচিত্রে হয়তো ভুলভ্রান্তি আছে, এতে সংশোধন দরকার আছে। কিন্তু এই মানচিত্র ছাড়া যাত্রাটা কখনোই সম্ভব ছিল না। ভূগোলের নিষ্ঠুরতাকে পরিচয়ের শক্তিতে মোকাবেলার এই কৌশল এটিই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রকৃত রক্ষাকবচ।  একুশ শতকে, যখন সীমানা পেরিয়ে সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক প্রভাবের শক্তি আরও বেড়েছে, তখন এই রক্ষাকবচের প্রাসঙ্গিকতা আরও বেশি ।

লেখক- ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।

মতামত এর আরও খবর