img

জেনেভা ক্যাম্প: অপরাধের জন্মভূমি নয়, অবহেলার দীর্ঘ ছায়া

প্রকাশিত :  ১২:৩৭, ৩১ জুলাই ২০২৬

জেনেভা ক্যাম্প: অপরাধের জন্মভূমি নয়, অবহেলার দীর্ঘ ছায়া

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের নাম উচ্চারিত হলেই সাধারণ মানুষের মনে দুটি বিপরীত ছবি ভেসে ওঠে। একদিকে আছে সরু গলি, মাদক, সংঘর্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও অপরাধের সংবাদ। অন্যদিকে আছে এমন এক জনগোষ্ঠী, যারা পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অস্থায়ী আশ্রয়কে স্থায়ী জীবনে পরিণত করতে বাধ্য হয়েছে। প্রথম ছবিটি প্রতিদিনের সংবাদে দেখা যায়; দ্বিতীয় ছবিটি খুব কমই আলোচনায় আসে। অথচ এই দ্বিতীয় ছবিটি না বুঝলে প্রথমটির ব্যাখ্যাও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

জেনেভা ক্যাম্পের সংকট কেবল একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, কেবল একটি বস্তির সমস্যা নয়, আবার কেবল একটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সমস্যাও নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, ইতিহাস, নগর পরিকল্পনা, নাগরিক অধিকার, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং মানবিক দায়বদ্ধতার একটি দীর্ঘস্থায়ী পরীক্ষা। যে পরীক্ষায় আমরা আংশিক সফল হলেও এখনো পূর্ণ নম্বর অর্জন করতে পারিনি।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারতের বিহারসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু উর্দুভাষী মুসলিম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। এরপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাদের জীবনে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করে। যুদ্ধকালীন সময়ে এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, আবার অনেকে নিরপেক্ষ থেকেছিল বা সংঘাতের শিকার হয়েছিল। স্বাধীনতার পর পুরো সম্প্রদায়টি রাজনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। বহু মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা ও সামাজিক অবস্থান হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হন।

১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের উদ্যোগে মোহাম্মদপুরে একটি অস্থায়ী আশ্রয়শিবির প্রতিষ্ঠিত হয়। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের সদর দপ্তর থাকায় সেটি পরিচিতি পায় \"জেনেভা ক্যাম্প\" নামে। তখন কেউ কল্পনাও করেনি, কয়েক মাস বা কয়েক বছরের জন্য গড়ে ওঠা এই আশ্রয় একসময় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকবে। একটি অস্থায়ী মানবিক উদ্যোগ ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী নগর-অবরুদ্ধ এলাকায় পরিণত হয়।

আজকের জেনেভা ক্যাম্প বাংলাদেশের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা। বিভিন্ন জরিপে এর আয়তন ও জনসংখ্যার কিছু পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই এখানে মানুষের ঘনত্ব অস্বাভাবিকভাবে বেশি। অতি ক্ষুদ্র কক্ষে পাঁচ থেকে দশজন পর্যন্ত মানুষ বসবাস করেন। সরু গলিতে সূর্যের আলো প্রবেশ করে না। খোলা ড্রেন, অপর্যাপ্ত শৌচাগার, নিরাপদ পানির সংকট এবং অগ্নিকাণ্ডের স্থায়ী ঝুঁকি প্রতিদিনের বাস্তবতা।

এই পরিবেশে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর পৃথিবী কেমন হয়? সে কি খেলার মাঠ দেখে? সে কি পর্যাপ্ত আলো-বাতাসে পড়াশোনা করতে পারে? সে কি এমন একটি পরিবেশ পায়, যেখানে নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করা সম্ভব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের বিব্রত করে।

শিক্ষা সংকট এখানে একটি মৌলিক বাস্তবতা। অধিকাংশ পরিবারে উর্দু ভাষা ব্যবহৃত হলেও বিদ্যালয়ের শিক্ষা বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক। ফলে বহু শিশু শুরু থেকেই ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক বৈষম্য, পরিচয় নিয়ে সংকোচ এবং নানা ধরনের বুলিং। ফলাফল অনেক শিশু বিদ্যালয়ে টিকে থাকতে পারে না। একটি প্রজন্ম যখন শিক্ষার বাইরে চলে যায়, তখন পরবর্তী প্রজন্মের দারিদ্র্যও প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়।

২০০৩ এবং ২০০৮ সালের ঐতিহাসিক আদালতের রায়ে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার স্বীকৃতি পায়। এটি ছিল বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। অনেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছেন, ভোটার হয়েছেন এবং নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

কিন্তু নাগরিকত্বের আইনি স্বীকৃতি এবং নাগরিকত্বের বাস্তব অভিজ্ঞতা এক বিষয় নয়।

কোনো নাগরিক যদি পরিচয়পত্র পান, কিন্তু চাকরি পেতে ঠিকানার কারণে বৈষম্যের শিকার হন, তাহলে তিনি কাগজে নাগরিক হলেও বাস্তবে সমান সুযোগ পান না। যদি ব্যাংক ঋণ পেতে অসুবিধা হয়, ব্যবসার লাইসেন্স পেতে বাধা আসে অথবা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি হয়, তাহলে সেই নাগরিকত্ব অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

এখানে একটি বিষয় সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। অনেক সময় বলা হয়, ক্যাম্পের ঠিকানার কারণে সবাই পাসপোর্ট পান না বা সব আবেদন আটকে যায়। বাস্তবে এ ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বিভিন্ন ব্যক্তি ও মানবাধিকার সংগঠন উল্লেখ করেছে, তবে প্রতিটি আবেদন একইভাবে নিষ্পত্তি হয় এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তাই যেসব প্রশাসনিক বাধা বাস্তবে বিদ্যমান, সেগুলো নীতিগতভাবে পর্যালোচনা করে সমাধান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

জেনেভা ক্যাম্প নিয়ে জনমনে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় অপরাধ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময়ে এখানে অভিযান চালিয়েছে, অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করেছে এবং অপরাধী গ্রেপ্তার করেছে। এসব ঘটনা বাস্তব। কিন্তু এখানেই আলোচনার সমাপ্তি ঘটলে একটি বড় ভুল হবে।

অপরাধ কখনোই কোনো জাতিগত পরিচয়ের বৈশিষ্ট্য নয়। অপরাধ সৃষ্টি হয় সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক এবং স্থানিক নানা কারণের সমন্বয়ে। জেনেভা ক্যাম্পে দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, সীমিত শিক্ষা, ঘনবসতি, অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা এবং সংগঠিত অপরাধচক্রের প্রভাব একত্রে একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করেছে। এই বাস্তবতা স্বীকার করেও একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে ক্যাম্পের অধিকাংশ মানুষ সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাঁরা মোটর মেকানিক, দর্জি, বাবুর্চি, চালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গৃহকর্মী কিংবা কারুশিল্পী। অল্পসংখ্যক অপরাধীর কারণে পুরো সম্প্রদায়কে অপরাধী হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের অন্যান্য ঘনবসতিপূর্ণ দরিদ্র এলাকাতেও আমরা একই বাস্তবতা দেখেছি। যেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি দুর্বল, শিক্ষার সুযোগ সীমিত এবং কর্মসংস্থানের পথ সংকুচিত, সেখানে সংঘবদ্ধ অপরাধ সহজেই শেকড় গাড়ে। তাই কেবল অভিযান চালিয়ে সমস্যার উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও মূল কারণ দূর করা যায় না।

এখানে রাষ্ট্রের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে। প্রথম পথটি কেবল নিরাপত্তাকেন্দ্রিক অভিযান, গ্রেপ্তার, নজরদারি। দ্বিতীয় পথটি নিরাপত্তার পাশাপাশি সামাজিক বিনিয়োগের শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং আইনের সমান প্রয়োগ। দীর্ঘমেয়াদে দ্বিতীয় পথটিই কার্যকর।

জেনেভা ক্যাম্পের পুনর্বাসন নিয়ে বহু বছর ধরেই আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু পরিকল্পনা যত হয়েছে, বাস্তবায়ন তত এগোয়নি। অথচ এই সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়।

প্রথমত, একটি সমন্বিত নগর পুনর্গঠন পরিকল্পনা প্রয়োজন। বর্তমান অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ আবাসন ধাপে ধাপে পরিকল্পিত বহুতল আবাসনে রূপান্তর করা যেতে পারে। কোথায় পুনর্বাসন হবে, কীভাবে হবে, কী ধরনের মালিকানা কাঠামো থাকবে এসব বিষয়ে অধিবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হবে সফলতার শর্ত।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা হতে হবে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। ভাষাগত সহায়তা, ঝরে পড়া রোধ, উপবৃত্তি, কারিগরি শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষায় বিশেষ সহায়তা ছাড়া প্রজন্মগত দারিদ্র্যের চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।

তৃতীয়ত, কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ক্যাম্পের বহু পরিবার কাবাব, বেকারি, বেনারসি, কারচুপি, টেইলারিং ও বিভিন্ন কারুশিল্পে দক্ষ। এসব ঐতিহ্যবাহী দক্ষতাকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে হাজারো তরুণের জন্য বৈধ আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

চতুর্থত, প্রশাসনিক সেবা আরও সহজলভ্য করতে হবে। নাগরিকত্বের স্বীকৃতি বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা জরুরি। পরিচয়পত্র, জন্ম নিবন্ধন, ব্যাংকিং সেবা, ব্যবসায়িক নিবন্ধন এবং অন্যান্য সরকারি সেবায় অযৌক্তিক বাধা থাকলে তা দ্রুত দূর করতে হবে।

পঞ্চমত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কেবল অভিযান নয়, কমিউনিটি পুলিশিং, মাদক নিরাময়, কিশোর পুনর্বাসন এবং সামাজিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার উদ্যোগ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধে জড়িয়ে পড়া তরুণদের জন্য দ্বিতীয় সুযোগ সৃষ্টি না করলে নতুন প্রজন্মও একই চক্রে আটকে পড়বে।

জেনেভা ক্যাম্পের প্রশ্নে আমাদের ভাষাও সংযত হওয়া দরকার। কোনো সম্প্রদায়কে সামগ্রিকভাবে \"অপরাধপ্রবণ\" বলে চিহ্নিত করা ন্যায্য নয়। অপরাধী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, কিন্তু নিরীহ মানুষকে সেই পরিচয়ের বোঝা বহন করতে বাধ্য করা উচিত নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেমন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তেমনি বৈষম্যহীন নাগরিক মর্যাদাও নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর বহু জটিল মানবিক সংকট মোকাবিলা করেছে। জেনেভা ক্যাম্প সেই দীর্ঘ ইতিহাসের একটি অধ্যায়, যার সমাপ্তি এখনো লেখা হয়নি। পাঁচ দশকের অস্থায়ী জীবন আর অস্থায়ী থাকতে পারে না। একটি শিশুর জন্ম যেন আর সংকীর্ণ অন্ধকার গলিতে ভবিষ্যৎ হারানোর প্রতীক না হয়।

জেনেভা ক্যাম্পকে আমরা চাইলে কেবল অপরাধের মানচিত্রে দেখতে পারি। আবার চাইলে এটিকে একটি অসমাপ্ত রাষ্ট্রনৈতিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখতে পারি। দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গিটিই আমাদের আরও মানবিক, আরও ন্যায়ভিত্তিক এবং আরও দূরদর্শী রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যাবে।

একটি রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার অর্থনীতির আকারে নয়, বরং সে কতটা দক্ষতার সঙ্গে প্রান্তিক মানুষকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে পারে তার মধ্যেও নিহিত থাকে। জেনেভা ক্যাম্পের ভবিষ্যৎ সেই পরীক্ষারই আরেকটি নাম।

মতামত এর আরও খবর

img

পুঁজিবাজারের প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনতে একজন 'হিরো'র প্রয়োজন

প্রকাশিত :  ১৯:৪৬, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:৪৮, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

​সম্পাদকীয়

​পুঁজিবাজার আসলে শুধু সূচক, লেনদেন কিংবা কিছু সংখ্যার সমষ্টি নয়। এর ভেতরে জড়িয়ে থাকে লাখো বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশা, সঞ্চয়, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। একটি প্রাণবন্ত বাজার গড়ে তুলতে হলে দরকার এমন কিছু মানুষ, যাঁদের চিন্তা, সময় ও আগ্রহ গভীরভাবে এই বাজারকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।

​এই প্রসঙ্গেই উঠে আসে পুঁজিবাজারের বহুল আলোচিত নাম আবুল খায়ের, বাজারে যিনি পরিচিত 'হিরো' নামে। তাঁকে নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে, বিতর্কও থাকতে পারে; তবে একটি সত্য অস্বীকারের উপায় নেই, বাজারের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের আগ্রহ ও সক্রিয় উপস্থিতি আলোচনায় একটি আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

​এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, একজন সক্রিয় বাজারসংশ্লিষ্ট মানুষকে আমরা আসলে কোন দৃষ্টিতে দেখছি? তাঁকে দূরে ঠেলে রাখার সংস্কৃতি কি বাজারকে সত্যিই শক্তিশালী করবে, নাকি নিয়মকানুনের সীমার মধ্যে থেকে তাঁর মতো সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের শক্তিকে কাজে লাগানোই বেশি ফলদায়ক হবে?

​সক্রিয় বিনিয়োগকারী যত বাড়ে, বাজার নিয়ে আলোচনা যত জমে ওঠে, কোম্পানির মৌলভিত্তি নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণে আগ্রহ যত বাড়ে, বাজারও ততই প্রাণবন্ত হওয়ার সুযোগ পায়। কেউ যদি প্রতিদিন বাজার নিয়ে ভাবেন, কোম্পানির পারফরম্যান্স অনুসরণ করেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেন, তাহলে মূল আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত, সেই আগ্রহকে কীভাবে গঠনমূলক দিকে চালিত করা যায়।

​আমরা মনে করি, কোনো সক্রিয় অংশগ্রহণকারীকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের মাপকাঠিতে নয়, বরং বাজারের নিয়ম, স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার কাঠামোর ভেতরেই মূল্যায়ন করা উচিত। নিয়ম হবে সবার জন্য সমান; কিন্তু যাঁরা সেই নিয়ম মেনে বাজারে সক্রিয় থাকেন, তাঁদের অবদানও স্বীকৃতি পাওয়া উচিত।

​আবুল খায়েরকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও বাজারসংশ্লিষ্ট অনেকেই তাঁর সক্রিয়তার কথা জানেন। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব কাউকে ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করা নয়, বরং যেকোনো ইতিবাচক দিক তুলে ধরা এবং বাজারের স্বার্থে জরুরি প্রশ্নগুলো সামনে আনা।

​এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কোনো প্রতিবেদন বা সম্পাদকীয়তে কারও ইতিবাচক ভূমিকা তুলে ধরা মানেই এই নয় যে তার বিনিময়ে কোনো সুবিধা নেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা দাঁড়িয়ে থাকে স্বাধীনতা, দায়িত্বশীলতা এবং তথ্যনির্ভরতার ওপর। আমাদের অর্থনীতিবিষয়ক প্রতিবেদনেও এই নীতি সমানভাবে অনুসৃত হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন বা বাণিজ্যিক সম্পর্ককে সংবাদ বা সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়।

​বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে আমরা সবসময় অগ্রাধিকার দিই। কারণ শক্তিশালী পুঁজিবাজার মানে শুধু কিছু কোম্পানির শেয়ারদর বেড়ে যাওয়া নয়; এর অর্থ বাজারে আস্থা তৈরি হওয়া, অংশগ্রহণ বাড়া, ভালো কোম্পানির যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগসংস্কৃতি গড়ে ওঠা।

​এই প্রেক্ষাপটে আবুল খায়েরের মতো সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর ভূমিকা নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। তাঁর উপস্থিতি নিয়ে কারও ভিন্নমত থাকতেই পারে, কিন্তু তাঁকে ঘিরে যে আগ্রহ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও সমীচীন নয়।

​বাজারে প্রাণ ফেরাতে দরকার আস্থা, স্বচ্ছতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ। দরকার এমন একটি পরিবেশ, যেখানে বিনিয়োগকারী নির্দ্বিধায় মত প্রকাশ করতে পারেন, বাজার নিয়ে ভাবতে পারেন এবং নিয়ম মেনে অংশ নিতে পারেন। কাউকে অকারণে দমিয়ে রাখার বদলে নিয়মের ভেতরে থেকে ইতিবাচক শক্তিকে কাজে লাগানোই হতে পারে একটি পরিণত পুঁজিবাজারের বৈশিষ্ট্য।

​কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে কেন এত কথা? উত্তরটা সহজ, ভালো কিছু চোখে পড়লে সেটি ভালো বলাই স্বাভাবিক। যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বাজারের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখেন, তাঁদের সেই দিক আলোচনায় আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

​আজকের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আস্থা। বিনিয়োগকারীরা চান প্রাণবন্ত, স্বচ্ছ ও সুযোগসমৃদ্ধ একটি বাজার, যেখানে ভালো কোম্পানি প্রাপ্য মূল্যায়ন পায়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী উৎসাহ পান এবং ইতিবাচক অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ে।

​তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত কে বাজারে আছেন, তা নয়; বরং বাজারকে আরও কার্যকর করার উপায় কী, সেটিই।

​আবুল খায়ের যদি সত্যিই দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজার নিয়ে ভাবেন, কাজ করেন এবং সক্রিয় থাকেন, তবে তাঁর সেই আগ্রহকে বাজারের ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তরের সুযোগ আছে কি না, সেটিই এখন খতিয়ে দেখা দরকার।

​কারণ পুঁজিবাজারকে প্রাণবন্ত করতে শুধু নীতিমালাই যথেষ্ট নয়; দরকার মানুষ, দরকার অংশগ্রহণ, দরকার আস্থা, আর দরকার বাজারকে ভালোবাসে এমন সক্রিয় মানুষ।

​হিরো নিছক একজন ব্যক্তি। কিন্তু তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া আলোচনা আমাদের একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আমরা কি সক্রিয় বাজার অংশগ্রহণকারীদের দূরে সরিয়ে রাখব, নাকি নিয়মের কাঠামোর ভেতরে রেখে তাঁদের ইতিবাচক শক্তিকে কাজে লাগাব?

​শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব একটি পুঁজিবাজার গড়তে দ্বিতীয় পথটিই বিবেচনার যোগ্য।