img

গাজায় ইসরায়েলি নিষ্ঠুরতা ও ভারতের নীরবতা: সোনিয়া গান্ধী

প্রকাশিত :  ০৬:৫১, ০১ জুলাই ২০২৬

গাজায় ইসরায়েলি নিষ্ঠুরতা ও ভারতের নীরবতা: সোনিয়া গান্ধী

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন অভিযোগ করেছিল, গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। ২০২৬ সালের জুনে একই কমিশন, যার নেতৃত্বে বর্তমানে ভারতের সাবেক বিচারপতি এস মুরলীধর রয়েছেন, আবারও দাবি করেছে যে গাজার শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেষ্টা করছে ইসরায়েল।

৯৪ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনটি পড়া সত্যিই এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। ইসরায়েল গাজায় যে চরম ধ্বংসযজ্ঞ ও পরিকল্পিত গণহত্যা চালাচ্ছে, তার রোমহর্ষ বিবরণ রয়েছে এতে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত ২০ হাজার শিশু নিহত এবং আরও ৪৪ হাজার শিশু আহত হয়েছে, যাদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছে। শিশুদের ওপর এই হামলা কোনো দুর্ঘটনাবশত ঘটনা নয়, এটি একটি পরিকল্পিত কৌশল। হতাহত ব্যক্তিদের শতকরা ২৭ ভাগই শিশু। নিহত অনেক ছেলের মাথায় ও ঘাড়ে গুলির ক্ষত পাওয়া গেছে।

গাজার ৯৭ শতাংশ স্কুল ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। শিশু হাসপাতালসহ স্বাস্থ্য অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ায় গর্ভপাত এবং সন্তান প্রসবজনিত জটিলতা ৩০০ শতাংশ বেড়েছে।

হামাস কর্তৃক ইসরায়েলের ওপর চালানো হামলার পর আড়াই বছর পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাল্টা জবাব ছিল চরম নিষ্ঠুর ও বর্বরতায় ভরা। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু থেকে শুরু করে তাঁর মন্ত্রিসভার শীর্ষ সদস্যরা গাজাকে ‘সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ’ ও ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করার ডাক দিয়েছেন। তাঁরা ফিলিস্তিনিদের ‘পশু’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন যে তাদের ‘বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই’। এমনকি গাজা থেকে ‘লাখ লাখ মানুষের পালিয়ে যাওয়াকেই’ তাঁরা নিজেদের সাফল্য হিসেবে দেখছেন।

এমন স্পষ্ট গণহত্যামূলক অভিপ্রায় থাকা সত্ত্বেও, ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অকুণ্ঠ সমর্থন ইসরায়েলকে এই নিষ্ঠুর অভিযান চালিয়ে যেতে সাহায্য করছে। তবে বিশ্বের বাকি দেশগুলোর বিবেক এবার জেগে উঠেছে।

আমেরিকার ভেটো ও বাধার কারণে জাতিসংঘ কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে না পারলেও, এর সংস্থাগুলো ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধের নথিপত্র তৈরিতে চমৎকার ভূমিকা পালন করেছে। পশ্চিমা ব্লকের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত শীর্ষ দেশগুলো—যেমন ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া—ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, অথচ কয়েক দশক ধরে তারা ফিলিস্তিন ইস্যুতে উদাসীন ছিল। 

দক্ষিণ আফ্রিকা, যার সঙ্গে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের সংহতির ইতিহাস রয়েছে, তারা ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের দায়ে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আদালতে দাঁড় করিয়েছে। ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ ইসরায়েলে অস্ত্র বিক্রি সীমিত করেছে এবং লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশ সম্পর্ক ছিন্ন বা সীমিত করেছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এমনকি ইসরায়েলি রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছেন। ভারতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এমন বহু দেশ গাজায় ইসরায়েলের এই কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।

মোদি সরকারের এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা শুধু নৈতিকভাবেই ভুল নয়, বরং ভারতের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের দিক থেকেও এর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। আমরা এমন এক সময়ে ইসরায়েলের কৌশলগত বলয়ের দিকে আরও ঝুঁকে পড়ছি, যখন সারা বিশ্ব তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান জনরোষ এবং গাজায় চালানো এই বর্বরতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের মাঝেও ভারত কেবলই নীরব। বিচারপতি মুরলীধরের এই প্রতিবেদন, যা বিশ্বজুড়ে গাজা গণহত্যার বিরুদ্ধে নতুন করে আলোচনা ও আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে, তা নিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকার সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। অবশ্য এটি মোটেও অবাক হওয়ার মতো বিষয় নয়। মনে রাখা দরকার, ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার আগে বিজেপির নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশ কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন বিচারপতি মুরলীধর। এর পরপরই তাঁকে দিল্লি হাইকোর্ট থেকে বদলি করা হয়েছিল।

ভারত ঐতিহাসিকভাবে উপনিবেশবাদ-বিরোধী সংহতি, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক শান্তির পক্ষে এক অনন্য কণ্ঠস্বর ছিল। কিন্তু আজ বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুনের লঙ্ঘন, গ্লোবাল সাউথের মানুষের কষ্ট এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে মানবতাবোধের চরম অবমাননার পরও ভারতের এই নীরবতা সত্যিই এক ব্যতিক্রমী ও দুঃখজনক ঘটনা।

পাঁচ বছরের শিশু হিন্দ রজবের করুণ গল্পটি গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার এক নির্মম প্রতীক। গাজা শহর থেকে পরিবারের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাদের গাড়ি লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বাহিনী ৩৩৫টি গুলি চালায়। এতে তার পরিবারের ছয় সদস্যই নিহত হন। উদ্ধারকারীদের আসার অপেক্ষায় হিন্দ ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ির ভেতরে স্বজনদের লাশের মাঝে আটকে ছিল। শেষ পর্যন্ত দুই উদ্ধারকর্মীসহ তাকেও হত্যা করা হয়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের নাগরিকদের মতো ভারতের নাগরিকদেরও হিন্দ রজব এবং গাজার অসংখ্য শিশুর এই গল্প জানার অধিকার আছে। অথচ, ইসরায়েলের অনুভূতিতে যাতে আঘাত না লাগে, সে জন্য এই বিষয়ক একটি চলচ্চিত্র ভারতে মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়েছিল। অবশেষে জনগণের তীব্র চাপের মুখে তা প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

মোদি সরকারের এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা শুধু নৈতিকভাবেই ভুল নয়, বরং ভারতের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের দিক থেকেও এর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। আমরা এমন এক সময়ে ইসরায়েলের কৌশলগত বলয়ের দিকে আরও ঝুঁকে পড়ছি, যখন সারা বিশ্ব তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

এই যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে এবং ইরানের ওপর ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে হত্যার মাত্র কয়েক দিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ইসরায়েল সফর ইতিহাসে একটি বিভ্রান্তিকর কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে। এর ফলে ফিলিস্তিন, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ঐতিহাসিক বন্ধুদের কাছ থেকে আমরা নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছি।

আমরা বিশ্বজনমত থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। আর এই সুযোগে পাকিস্তানের মতো একটি দেশ, যারা নিজেরা সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য পরিচিত, তারা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে এগিয়ে এসেছে—যে ভূমিকার দাবিদার ঐতিহাসিকভাবে সবার বন্ধু হিসেবে ভারতেরই হওয়ার কথা ছিল। নিজেদের নৈতিকতা ও কৌশলগত স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে আমরা কেবল প্রধানমন্ত্রী মোদি ও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মধ্যকার বন্ধুত্বটুকুই পেয়েছি। অথচ সেই নেতানিয়াহু আজ খোদ আমেরিকাসহ পুরো বিশ্বেই সমালোচিত।

ভারতের জাতীয়তাবোধের চেতনা দাবি করে যে আমরা যেন আমাদের ফিলিস্তিনি ভাইবোনদের পক্ষে কথা বলি, যাঁদের সন্তানদের এভাবে নির্মমভাবে টার্গেট করা হচ্ছে। দেশের জাতীয় স্বার্থের জন্যও ইসরায়েলি গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড এবং পশ্চিম তীরে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদ করার বিরুদ্ধে যে বিশ্বজনমত তৈরি হয়েছে, ভারত যেন তার সঙ্গে সুর মেলায়। মোদি সরকারের এই অনড় নীরবতার কোনো যৌক্তিক বা নৈতিক ব্যাখ্যা নেই।

সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির চেয়ারপারসন

মতামত এর আরও খবর

img

মালয়েশিয়ার বাজার খুলেছে, আমাদের প্রস্তুতি কোথায়?

প্রকাশিত :  ১৯:২৫, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ২০:৪৩, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

দীর্ঘ অপেক্ষার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য আবার খুলেছে। সেখানে কর্মী নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে, নিয়োগকর্তারা কোটার অনুমোদন নিচ্ছেন, চাহিদাপত্র দিচ্ছেন। অথচ বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় গতি নেই। বিদেশের দরজা খোলার পরও যদি দেশের প্রশাসনিক দরজায় কর্মীদের আটকে থাকতে হয়, তাহলে শ্রমবাজার খোলার সুফল যাবে কোথায়?

প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর সরকারি উদ্যোগটি আশাব্যঞ্জক। কর্মীদের ব্যয় নিয়োগকর্তারা বহন করবেন, এমন ব্যবস্থা হলে বিদেশে যাওয়ার জন্য ঋণ করে বা জমি বিক্রি করে অর্থ জোগাড় করা পরিবারগুলোর ওপর চাপ কমবে। কিন্তু নীতি যতই ভালো হোক, বাস্তবায়ন ধীর হলে তার সুফল থাকে না। এখন সেটিই বড় উদ্বেগের বিষয়।

মালয়েশিয়ার অংশে নিয়োগের প্রস্তুতি এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশে অনুমোদন, যাচাই, বহির্গমন ছাড়পত্র ও অন্যান্য প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই কর্মীদের সুরক্ষা ও নিয়ম মানা নিশ্চিত করা। কিন্তু সুরক্ষার নামে যদি এমন ব্যবস্থা তৈরি হয়, যেখানে একটি আবেদন কোথায় আটকে আছে তা কর্মী নিজেই জানেন না, তাহলে সেটি সুশাসনের লক্ষণ নয়।

এখানে বোয়েসেলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বোয়েসেলের দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ অভিবাসন, স্বচ্ছতা ও নিয়ম মেনে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির শক্তিশালী ভূমিকা থাকা দরকার। কিন্তু তদারকি ও সমন্বয়ের বদলে যদি পুরো প্রক্রিয়ার ওপর অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়, তাহলে গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই থাকবে, তবে সেই নিয়ন্ত্রণ যেন কর্মী পাঠানোর পথে বাধা না হয়।

বৈধ বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ক্ষেত্রেও ভারসাম্য জরুরি। অনিয়ম করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, এতে দ্বিমত নেই। কিন্তু বৈধ এজেন্সিগুলোর সক্ষমতাকে কাজে না লাগিয়ে সবকিছু একটি কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল করলে প্রশাসনিক চাপ বাড়বে। বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারের মূল কাজ হওয়া উচিত নিয়ম নির্ধারণ, নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের অতীত আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ও অনিয়মের অভিযোগের কারণে এই বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার পর এবার স্বচ্ছ ও সিন্ডিকেটমুক্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ এসেছে। কিন্তু পুরোনো অনিয়ম ঠেকাতে গিয়ে যদি নতুন আমলাতান্ত্রিক জট তৈরি হয়, তাহলে কর্মীদের দুর্ভোগের ধরন বদলাবে, দুর্ভোগ কমবে না।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সময়। মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তারা অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করবেন না। বাংলাদেশ সময়মতো কর্মী দিতে না পারলে তারা অন্য দেশ থেকে কর্মী নেবে। ভারত, নেপাল, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ এ সুযোগ নিতে প্রস্তুত। একটি শ্রমবাজারে সুযোগ হারানো মানে শুধু কয়েক হাজার চাকরি হারানো নয়। এর সঙ্গে হারাতে হয় ভবিষ্যৎ রেমিট্যান্সের সম্ভাবনাও।

একজন প্রবাসী কর্মীর পাঠানো অর্থ তাঁর পরিবারের কাছে জীবনের অবলম্বন। সেই অর্থে ঋণ পরিশোধ হয়, সন্তানের পড়াশোনা চলে, ঘর তৈরি হয়, চিকিৎসার খরচ মেটে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে ভূমিকা রাখে। তাই বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অকারণ বিলম্বকে কেবল দাপ্তরিক সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

আরেকটি ঝুঁকি আরও গুরুতর। সরকারি প্রক্রিয়া যত জটিল হয়, দালালের প্রভাব তত বাড়ে। কর্মী যখন সরকারি ব্যবস্থায় দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পান না, তখন তিনি অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। সেখান থেকেই প্রতারণা ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়। নিরাপদ অভিবাসনের লক্ষ্য তখন ব্যর্থ হয়।

এখন সরকারের সামনে তাই কাজ একটাই: প্রক্রিয়ার জট খুলতে হবে। বোয়েসেলকে কার্যকর সমন্বয় ও তদারকির ভূমিকায় রেখে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে নির্ধারিত নিয়মে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। বিএমইটির ক্লিয়ারেন্স, ভিসা ও বহির্গমন প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা দরকার। আবেদন কোন পর্যায়ে আছে, কোথায় আটকে আছে, কেন আটকে আছে, তা কর্মীর জানার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

এ জন্য পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়বে, ফাইল আটকে রাখার সুযোগ কমবে এবং দালালনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে এখন আর নতুন ঘোষণা দরকার নেই। দরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর বাস্তবায়ন। বিদেশের নিয়োগকর্তা প্রস্তুত, কর্মীরা অপেক্ষায়। বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা যদি এখনও ধীরগতির থাকে, তবে এই সুযোগ অন্যরা নিয়ে নেবে।

আমরা যেন আবারও শ্রমবাজার হারিয়ে পরে কারণ খুঁজতে না বসি। কারণ এবার সমস্যাটি বাজার বন্ধ হওয়া নয়। বাজার খোলা থাকার পরও কর্মী পাঠাতে না পারার ঝুঁকি।

মালয়েশিয়ার দরজা খুলেছে। এখন বাংলাদেশের কাজ হলো, নিজের দরজাটা সময়মতো খুলে দেওয়া।