img

সাংবাদিক রাষ্ট্রের কর্মচারী নন

প্রকাশিত :  ১১:০০, ০৬ জুন ২০২৬

সাংবাদিক রাষ্ট্রের কর্মচারী নন

আবদুল হামিদ মাহবুব

সম্প্রতি বরগুনা জেলা প্রশাসনের একটি চিঠি সাংবাদিক মহলে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। চিঠিতে জেলার কর্মরত সাংবাদিকদের প্রতি মাসের প্রথম রবিবার জেলা প্রশাসকের কাছে জেলার বিভিন্ন সমস্যা, অনিয়ম, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়েছে। নির্দেশটি জেলা প্রশাসকের। আর চিঠি ইস্যু করেছেন একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র মোঃ সোহেল রেজা। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বরগুনা জেলা প্রশাসনের জারিকৃত চিঠির বিষয় নিয়ে ইতোমধ্যে একটি তথ্যবহুল আলোচনা লিখেছেন। যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার সাথে যুক্ত,  এরা হয়তো সেটা দেখেছেন। আমি এখানে সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু কথা তুলে ধরছি সকল পাঠকের জানার জন্য। পাশাপাশি আমাদের সাংবাদিক বন্ধুদেরও বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

বরগুনা জেলা প্রশাসনের চিঠিটি দেখে অনেকের কাছে প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির একটি উদ্যোগ এটি। কিন্তু বিষয়টি গভীরভাবে ভাবলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। সাংবাদিক কি প্রশাসনের কাছে নিয়মিত রিপোর্ট দেওয়ার মানুষ? সাংবাদিক কি প্রশাসনের অনানুষ্ঠানিক তথ্য সংগ্রহকারী? নাকি তাঁর প্রধান দায়িত্ব জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা?

সাংবাদিকতার মূল দর্শন বলছে, সংবাদমাধ্যমের জন্ম হয়েছে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার জন্য। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের বাইরে এটি একটি স্বাধীন সামাজিক শক্তি। এর প্রধান কাজ হলো জনস্বার্থ রক্ষা করা, দুর্নীতি ও অনিয়ম তুলে ধরা এবং ক্ষমতার ব্যবহার সম্পর্কে জনগণকে সচেতন রাখা।

সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিক নীতিমালায় বারবার বলা হয়েছে, সাংবাদিকের প্রথম দায়িত্ব সত্যের প্রতি এবং তাঁর প্রথম আনুগত্য জনগণের প্রতি। কারণ সাংবাদিক কোনো সরকারি কর্মকর্তা নন। তিনি জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করেন। তাঁর দায়িত্ব সত্য তথ্য সংগ্রহ করা, যাচাই করা এবং জনগণের সামনে তুলে ধরা।

গণমাধ্যমকে দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার একটি স্বাধীন ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়। এই স্বাধীনতাই সংবাদমাধ্যমের শক্তি। যদি সংবাদমাধ্যম প্রশাসনিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয় বা সে রকম ধারণা তৈরি হয়, তাহলে তার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সংবাদমাধ্যমের অন্যতম প্রধান ভূমিকা হলো প্রহরীর ভূমিকা পালন করা। অর্থাৎ ক্ষমতা কোথায় কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কোথাও অনিয়ম হচ্ছে কি না, জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না; এসব বিষয়ে নজর রাখা। একজন সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে পর্যবেক্ষণ করা, প্রশ্ন তোলা এবং তথ্য প্রকাশ করা। প্রশাসনের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া নয়।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা আচরণবিধিতেও সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ, সত্য ও নির্ভুল সংবাদ পরিবেশন এবং তথ্য যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে। কোথাও বলা নেই যে সাংবাদিকরা কোনো সরকারি কর্মকর্তার কাছে নিয়মিত প্রশাসনিক রিপোর্ট জমা দেবেন। এ কারণেই বরগুনা জেলা প্রশাসনের চিঠিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যে সাংবাদিক প্রশাসনের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করবেন, তিনি যদি একই সঙ্গে প্রশাসনের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদনও দেন, তাহলে তাঁর স্বাধীন অবস্থান কোথায় থাকবে?

রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ ও তদারকি ব্যবস্থা রয়েছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করে। ফলে জেলার পরিস্থিতি জানার জন্য সাংবাদিকদের প্রশাসনিক রিপোর্টদাতা হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তা কতটা যৌক্তিক, সেটি ভেবে দেখার বিষয়।

এ ধরনের উদ্যোগ থেকে কয়েকটি বাস্তব সমস্যা তৈরি হতে পারে। আমার বিবেচনায় সেগুলো হচ্ছে, সাধারণ মানুষের কাছে সাংবাদিকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, তথ্যদাতা বা অনিয়ম সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তিরা সাংবাদিকের কাছে তথ্য দিতে দ্বিধা করতে পারেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ প্রশাসনের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক রিপোর্টিং সম্পর্ক সাংবাদিককে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলতে পারে এবং পেশাগত স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে এটাও সত্য যে জেলা প্রশাসনের উদ্দেশ্য হয়তো জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ করা। কিন্তু গণতান্ত্রিক সমাজে শুধু উদ্দেশ্য নয়, পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন চাইলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করতে পারে, সংবাদ সম্মেলন করতে পারে, বিভিন্ন বিষয়ে মতামত নিতে পারে কিংবা জনগণের সমস্যা নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা আয়োজন করতে পারে। এসব উদ্যোগ গণতান্ত্রিক ও ইতিবাচক। কিন্তু সাংবাদিকদের কাছ থেকে নিয়মিত প্রশাসনিক প্রতিবেদন আহ্বান করা সাংবাদিকতার স্বাধীন ভূমিকা সম্পর্কে একটি ভুল ধারণার প্রতিফলন বলে মনে হয়।

প্রশাসনের উপলব্ধি করা দরকার, সাংবাদিক রাষ্ট্রের শত্রু নন, আবার রাষ্ট্রের কর্মচারীও নন। তিনি জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। একজন স্বাধীন সাংবাদিক অনেক সময় ক্ষমতাসীনদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারেন, কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য তিনি অপরিহার্য। কারণ স্বাধীন সাংবাদিকতাই অনিয়ম উন্মোচন করে, দুর্নীতি প্রকাশ করে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।

বরগুনা জেলা প্রশাসনের চিঠিটি হয়তো সদিচ্ছা থেকেই জারি করা হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে এটি একটি বিতর্কিত বার্তা বহন করে। সাংবাদিককে প্রশাসনের মাসিক রিপোর্টদাতায় পরিণত করা যায় না।

সাংবাদিক জনগণের প্রতিনিধি। তাঁর কাজ জনগণের পক্ষে সত্য তুলে ধরা, ক্ষমতার ওপর নজর রাখা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। প্রশাসন ও গণমাধ্যম; উভয়ই রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে তাদের ভূমিকা এক নয়। সেই ভিন্নতাকে সম্মান করাই একটি পরিণত গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব।
মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪, ই-মেইল:  [email protected]
img

মুহম্মদ জাফর ইকবাল দুবছর কই ছিলেন?

প্রকাশিত :  ১৫:৪২, ২৫ জুলাই ২০২৬

আবদুল হামিদ মাহবুব

বাংলাদেশের সাহিত্য, বিজ্ঞানচর্চা ও শিশু-কিশোর সাহিত্যের জগতে মুহম্মদ জাফর ইকবাল একটি অত্যন্ত পরিচিত নাম। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি অসংখ্য তরুণ-তরুণীকে বই পড়তে শিখিয়েছেন, বিজ্ঞানমনস্ক হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সাহিত্যের ভাষায় তুলে ধরেছেন। ঠিক এই কারণেই তার প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে একটি অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি এবং সেখানে দেওয়া বক্তব্য নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হচ্ছে; গত দুই বছর তিনি কোথায় ছিলেন?

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুহম্মদ জাফর ইকবালকে আর দেশের জনপরিসরে এক্কেবারেই দেখা যায়নি। এরপরও দীর্ঘ সময় তিনি প্রকাশ্যে ছিলেন না। হঠাৎ করেই ২০২৬ সালের  ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে এক অনুষ্ঠানে তাকে দেখা গেল। সেখানে তিনি নিজেই বলেন, তারা গত দুই বছর ধরে ‘নির্বাসনে’ আছেন। এই একটি শব্দই জনমনে নতুন কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। কারণ ‘নির্বাসন’ সাধারণত এমন একটি অবস্থা বোঝায়, যেখানে রাষ্ট্র কাউকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে অথবা দেশে ফিরে আসার সুযোগ সীমিত করে। কিন্তু মুহম্মদ জাফর ইকবালের ক্ষেত্রে এমন কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বা প্রজ্ঞাপনের তথ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।

এই কারণেই প্রশ্ন উঠছে, তিনি কি স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়েছেন, নাকি এমন কোনো বাস্তবতা ছিল যা তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছে? যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তাহলে সেটি কী? আবার যদি তিনি নিজ সিদ্ধান্তে বিদেশে অবস্থান করে থাকেন, তাহলে তাকে ‘নির্বাসিত’ বলা কতটা যথাযথ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় তার একটি সংক্ষিপ্ত লেখা বিশেষ বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। সেখানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের একটি স্লোগানের অংশবিশেষ উল্লেখ করে লিখেছিলেন, \"ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার বিশ্ববিদ্যালয়, আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়। তবে আমি মনে হয় আর কোনোদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চাইব না। ছাত্র-ছাত্রীদের দেখলেই মনে হবে, এরাই হয়তো সেই \'রাজাকার\'। আর যে কয়দিন বেঁচে আছি, আমি কোনো রাজাকারের মুখ দেখতে চাই না। একটাই তো জীবন। সেই জীবনে আবার কেন নতুন করে রাজাকারদের দেখতে হবে?\" তার এই মন্তব্য অনেকের কাছে অত্যন্ত আপত্তিকর মনে হয়েছে। কারণ আন্দোলনের স্লোগান ছিল, \"তুমি কে? আমি কে? রাজাকার রাজাকার।\" পরের অংশ ছিল; \"কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার স্বৈরাচার।\" তিনি শিক্ষার্থীদের স্লোগানের প্রথম অংশ নিয়ে সমালোচনা করে শিক্ষার্থীদের কাছে বিরাগভাজন হন। কিন্তু দ্বিতীয় অংশ স্বৈরাচারের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার পেছনে কি রহস্য ছিল? যা তিনি কোন সময়েই খোলাসা করেননি। তার সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি তখনকার সরকারের অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই বক্তব্য দিয়েছিলেন।

এরপর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। আন্দোলনে বহু মানুষের মৃত্যু হয়, রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে এবং শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারান। কিন্তু এই পুরো সময়ে মুহম্মদ জাফর ইকবালের কাছ থেকে সেই হত্যাকাণ্ড, রক্তপাত কিংবা পরবর্তী বাস্তবতা নিয়ে তেমন কোনো প্রকাশ্য মন্তব্য শোনা যায়নি। অনেকেই মনে করেন, তার নীরবতা ছিল বিস্ময়কর। আবার অন্যদের মতে, তিনি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা অন্য কোনো কারণে প্রকাশ্যে আসেননি। কোন ব্যাখ্যাটি সত্য, সেটি একমাত্র তিনিই স্পষ্ট করতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বাংলাদেশ একদিন আবার একাত্তরের আদর্শে ফিরে যাবে। তিনি আরও বলেন, ইতিহাসকে ‘রিসেট বাটন’ টিপে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তার এই বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার দীর্ঘদিনের অবস্থানই প্রতিফলিত হয়েছে। কারণ তার সাহিত্যজীবনের বড় একটি অংশজুড়েই মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন ছিল।

কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে। যে মানুষটি শিশু-কিশোরদের দেশপ্রেমের শিক্ষা দিয়েছেন, তিনি কেন এমন একটি সময়ে দেশ ছেড়ে গেলেন, যখন দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল? যদি তিনি সত্যিই নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করে থাকেন, তাহলে সেই অভিজ্ঞতার কথা খোলাখুলিভাবে বলা কি উচিত নয়? আর যদি তিনি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে বিদেশে থাকেন, তাহলে সেটিও স্পষ্ট করে জানানো দরকার। কারণ জনপরিসরের একজন মানুষের নীরবতা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় জল্পনা-কল্পনার জন্ম দেয়।

আরেকটি বিষয় জনমনে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কোন আইনি মর্যাদায় অবস্থান করছেন? তিনি কি পর্যটক ভিসায় আছেন, কোনো দীর্ঘমেয়াদি ভিসায় আছেন, স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে আছেন, নাকি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক? এ বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য প্রকাশ্যে নেই। ফলে বিভিন্ন ধরনের গুঞ্জন শোনা গেলেও সেগুলোকে তথ্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। তার ঘনিষ্ঠজন কিংবা তিনি নিজেই যদি এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দেন, তাহলে এই বিতর্কের অবসান হতে পারে।

একইভাবে বহুদিন ধরেই একটি প্রশ্ন আলোচনায় রয়েছে; মুহম্মদ জাফর ইকবাল কি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন? তিনি দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা ও কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু নাগরিকত্ব নিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে নেই। তাই এটি নিয়ে অনুমান করার চেয়ে তথ্যের অপেক্ষা করাই যুক্তিযুক্ত।

নিউ জার্সির অনুষ্ঠানে তার স্ত্রী অধ্যাপক ইয়াসমিন হকও বলেন, তারা ‘দেশহীন’ অবস্থায় আছেন। এই বক্তব্যও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ ‘দেশহীন’ শব্দটির একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক ও আইনি অর্থ রয়েছে। তারা কি সেই অর্থে দেশহীন, নাকি এটি কেবল মানসিক বেদনার প্রকাশ?সেটিও স্পষ্ট নয়। একইভাবে ‘নির্বাসন’ শব্দটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, নাকি আইনি বাস্তবতা বোঝাতে; সেটিও ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

মুহম্মদ জাফর ইকবালের সমালোচনা করা যেমন একজন নাগরিকের অধিকার, তেমনি তার দীর্ঘ সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিষয়ক অবদান অস্বীকার করাও ন্যায়সঙ্গত হবে না। তিনি এমন একজন লেখক, যার বই পড়ে বহু তরুণ বিজ্ঞানকে ভালোবেসেছে, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জেনেছে এবং যুক্তিবাদী চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। সেই কারণেই তার কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। একজন জনপ্রিয় লেখকের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাখ্যার দাবি তৈরি করে।

আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি রাজনৈতিক নয়, ব্যক্তিগতও নয়; বরং জনস্বার্থের। দুই বছর তিনি কোথায় ছিলেন? কী পরিস্থিতিতে দেশ ছাড়লেন? বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে কী স্ট্যাটাসে আছেন? তিনি কি আবার বাংলাদেশে ফিরবেন? যদি ফিরতে চান, তাহলে কবে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানার আগ্রহ অস্বাভাবিক নয়। কারণ তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের অন্যতম পরিচিত মুখ।

বিতর্কের চেয়ে স্বচ্ছতা সবসময় বেশি শক্তিশালী। মুহম্মদ জাফর ইকবাল যদি নিজেই এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেন, তাহলে হয়তো অনেক বিতর্কের অবসান হবে। কারণ গুজবের চেয়ে সত্য সবসময় বেশি গ্রহণযোগ্য। একজন লেখকের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভাষা, আর সেই ভাষায় নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে বলার সাহসও তারই থাকা উচিত।

আজকের বাংলাদেশে মতের ভিন্নতা থাকবে, রাজনৈতিক অবস্থানও ভিন্ন হবে। কিন্তু একজন লেখক, একজন শিক্ষক এবং একজন জনবুদ্ধিজীবী হিসেবে মুহম্মদ জাফর ইকবালের কাছে মানুষ যে জবাবদিহির প্রত্যাশা করবে, সেটিও অস্বাভাবিক নয়। প্রশ্ন করা গণতন্ত্রের অংশ, আবার সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াও জনজীবনের অংশ। এখন অপেক্ষা শুধু একটাই; তিনি কি নিজেই এই নীরবতার অবসান ঘটাবেন?


লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব  ও  যুগ্ম সাধারণ  সম্পাদক, মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল। মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪, ই-মেইল:  [email protected]

মতামত এর আরও খবর