img

স্বাধীনতার ২৫০ বছরে আমেরিকা

প্রকাশিত :  ০৮:২৮, ১৯ মে ২০২৬

স্বাধীনতার ২৫০ বছরে আমেরিকা
পেছনে বিখ্যাত ইনডিপেনডেন্স হল।সামনে কালো জর্জ ওয়াশিংটনের মূর্তি।তাঁর সামনে লেখকসহ তার স্ত্রী, ছেলে ও বউমা।
পেছনে বিখ্যাত ইনডিপেনডেন্স হল।সামনে কালো জর্জ ওয়াশিংটনের মূর্তি।তাঁর সামনে লেখকসহ তার স্ত্র

আবদুল হামিদ মাহবুব

আমি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া শহরে অবস্থান করছি। ফিলাডেলফিয়া মানেই ইতিহাসের শহর। যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই শহরের নাম। আজও সেই ইতিহাস যেন জীবন্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শহরের পথে পথে। ২০২৬ সালে এসে সেই ইতিহাস আরও বেশি আলোচনায় এসেছে। কারণ এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। ১৭৭৬ সালে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিল আমেরিকা।তার ঠিক আড়াইশ বছর পরে পুরো দেশ এখন উদযাপনে ব্যস্ত। আগামী ৪ জুলাই স্বাধীনতার সেই ঐতিহাসিক দিবস।১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই ব্রিটিশের কাছ থেকে আমেরিকা স্বাধীনতা লাভ করেছিল।

পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের শহর।ফিলাডেলফিয়া ছিল আমেরিকার প্রথম রাজধানী।স্বাধীনতার স্বপ্ন, সংগ্রাম আর নতুন রাষ্ট্র গঠনের অনেক বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এখানেই। এই শহরে হাঁটলে মনে হয় ইতিহাস যেন এখনো কথা বলে। কিন্তু আজকের ফিলাডেলফিয়া আধুনিক শহর। উঁচু দালান, ব্যস্ত রাস্তা, পর্যটকের ভিড় সবই আছে। তবু শহরের প্রাণে লুকিয়ে আছে স্বাধীনতার স্মৃতি। বিশেষ করে ইনডিপেনডেন্স ন্যাশনাল হিস্টোরিক্যাল পার্ক এলাকায় গেলে সেই অনুভূতি আরও গভীর হয়। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে বিখ্যাত ইনডিপেনডেন্স হল। লাল ইটের এই ভবনটি দেখতে খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু আমেরিকার ইতিহাসে এর গুরুত্ব অসাধারণ। এই ভবনের ভেতরেই ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র গৃহীত হয়েছিল। পরে এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান নিয়েও আলোচনা হয়।

হলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে জর্জ ওয়াশিংটনের মূর্তি। তিনি ছিলেন আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি। পরে তিনিই হন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট। তার নেতৃত্ব ছাড়া আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জন এত সহজ হতো না। আজ অনেক পর্যটক সেই মূর্তির সামনে ছবি তুলছিলেন।অনেকে শিশুদের নিয়ে ইতিহাস শিখতে এসেছেন।কেউ কেউ গাইডের কথা মন দিয়ে শুনছিলেন। চারদিকে ছিল উৎসবের আবহ। কারণ স্বাধীনতার ২৫০ বছর শুধু একটি সংখ্যা নয়। এটি একটি জাতির দীর্ঘ পথচলার স্মারক।

দুঃখের বিষয়, আমরা গত ১৪ মে ২০২৬ দেখার জন্য গেলে ইনডিপেনডেন্স হলের ভেতরের মিউজিয়ামটি বন্ধ ছিল। তাই ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি। তবু বাইরে দাঁড়িয়েই অনুভব করা যায় ইতিহাসের ভার।এই ভবনের প্রতিটি দেয়াল যেন স্বাধীনতার গল্প বলে।

সামনেই রয়েছে বিখ্যাত লিবার্টি বেল। এই ঘণ্টা আমেরিকার স্বাধীনতার অন্যতম প্রতীক। কথিত আছে, স্বাধীনতার ঘোষণা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এই ঘণ্টা বাজানো হয়েছিল। যদিও ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ নিয়ে কিছু মতভেদ আছে, তবু লিবার্টি বেল স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবেই পরিচিত। ঘণ্টাটির গায়ে বড় একটি ফাটল আছে। তবু সেই ফাটল যেন ইতিহাসেরই একটি অংশ। মানুষ ঘণ্টাটি দেখতে ভিড় করছেন।অনেকে ছবি তুলছেন। অনেকে আবার শিশুদের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প বলছেন। লিবার্টি বেল শুধু স্বাধীনতার প্রতীক নয়। এটি মানুষের অধিকার ও মুক্তিরও প্রতীক। দাসপ্রথা বিরোধী আন্দোলনেও এই ঘণ্টার নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। নারীর অধিকার আন্দোলনেও এর উল্লেখ ছিল। মানুষের স্বাধীনতা ও ন্যায়ের প্রশ্ন উঠলেই লিবার্টি বেল যেন নতুন অর্থ পায়।

সংরক্ষিত সেই ঐতিহাসিক লিবার্টি বেল ( ঘণ্টি)

ফিলাডেলফিয়ায় গেলে বোঝা যায়, আমেরিকা কীভাবে নিজেদের ইতিহাসকে সংরক্ষণ করেছে।

পুরনো ভবন, রাস্তা, স্মৃতিস্তম্ভ সবই যত্নে রাখা হয়েছে। ইতিহাস এখানে শুধু বইয়ের বিষয় নয় এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

আমেরিকার স্বাধীনতার গল্পও খুব সহজ ছিল না।এক সময় এই অঞ্চল ছিল ইউরোপীয় শক্তিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্র। ব্রিটিশরা এখানে ১৩টি উপনিবেশ গড়ে তোলে। তার আগে এই ভূখণ্ডে বাস করতেন বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী।তাদের নিজস্ব সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনধারা ছিল।প্রকৃতিনির্ভর সেই জীবন ছিল ভিন্ন রকম। পরে ইউরোপীয়রা এসে ধীরে ধীরে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে আমেরিকা প্রায় ১৭০ বছর ছিল ব্রিটিশদের অধীনে। ১৬০৭ সালে ভার্জিনিয়ায় প্রথম স্থায়ী ব্রিটিশ বসতি স্থাপিত হয়। তারপর ধীরে ধীরে ব্রিটিশ প্রভাব বাড়তে থাকে।

শুরুতে উপনিবেশগুলোতে বসবাসকারী মানুষ ব্রিটিশদের বিরোধিতা করেননি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ সরকার নানা কর আরোপ করতে শুরু করে। স্ট্যাম্প অ্যাক্ট, টি অ্যাক্টসহ বিভিন্ন আইনে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা বলতেন, প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর নয়।১৭৭৩ সালের বোস্টন টি পার্টি ছিল বড় একটি ঘটনা। ব্রিটিশদের চায়ের ওপর করের প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা জাহাজের চা সমুদ্রে ফেলে দেন।এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

১৭৭৫ সালে শুরু হয় আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ।একদিকে ছিল ব্রিটিশ বাহিনী। অন্যদিকে ছিল উপনিবেশবাসীদের সেনারা। এই সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেন জর্জ ওয়াশিংটন। তবে শুধু তিনি নন, আরও অনেক নেতা স্বাধীনতার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। থমাস জেফারসন স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রের মূল খসড়া লেখেন।বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিন ছিলেন কূটনীতিক ও চিন্তাবিদ। জন অ্যাডামস স্বাধীনতার পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করেন। স্যামুয়েল অ্যাডামস জনগণকে আন্দোলনে উৎসাহ দেন।

আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন পরবর্তীতে নতুন রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই স্বাধীনতার ঘোষণা গ্রহণ করা হয়। সেই ঘোষণায় বলা হয়, মানুষ জন্মগতভাবে সমান। তাদের স্বাধীনতা ও অধিকার রয়েছে। এই চিন্তাই পরবর্তীতে পুরো বিশ্বের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রভাব ফেলেছে।

স্বাধীনতার যুদ্ধ অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়নি।

আরও কয়েক বছর যুদ্ধ চলে। শেষ পর্যন্ত ১৭৮৩ সালে প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা স্বীকার করে। এখন ২০২৬ সালে এসে সেই স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে। সারা আমেরিকায় নানা আয়োজন চলছে। বিশেষ করে ফিলাডেলফিয়ায় উৎসবের আমেজ বেশি। কারণ এই শহরই স্বাধীনতার কেন্দ্র ছিল।

রাস্তার পাশে নানা ব্যানার দেখা যায়। ঐতিহাসিক স্থানে পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে। অনেক স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা ইতিহাস জানতে আসছে।সংগীত, প্রদর্শনী, আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে বিভিন্ন জায়গায়।ফিলাডেলফিয়ায় ঘুরে আরেকটি বিষয় চোখে পড়ে। আমেরিকানরা তাদের জাতীয় ইতিহাস নিয়ে গর্ব করে। তারা নতুন প্রজন্মকে সেই ইতিহাস জানাতে চায়। এ কারণেই ঐতিহাসিক স্থানগুলো এত সুন্দরভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

লিবার্টি বেলের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, স্বাধীনতা কেবল একটি দেশের বিষয় নয়। এটি মানুষের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা। মানুষ যুগে যুগে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছে। ন্যায়বিচার ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছে। ফিলাডেলফিয়ার পুরনো রাস্তায় হাঁটলে মনে হয়, ইতিহাস যেন জীবন্ত। এখানেই স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন অনেক মানুষ। এখানেই নতুন একটি রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল। সেখান থেকে দেখা হয়েছে আমেরিকার প্রথম দিককার ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্মৃতিও। অর্থনীতি ও রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসও এখানে জড়িয়ে আছে। নতুন দেশকে শক্তিশালী করতে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি ছিল।

আমেরিকার প্রথম দিককার বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির স্মৃতিও নানা জায়গায় ছড়িয়ে আছে। সব মিলিয়ে ফিলাডেলফিয়া শুধু একটি শহর নয়। এটি যেন পুরো আমেরিকার জন্মকথা।

আজকের পৃথিবীতে স্বাধীনতার মূল্য আরও বেশি।যুদ্ধ, বৈষম্য ও সংকটের সময় মানুষ এখনো স্বাধীনতার কথাই ভাবে। এই কারণে আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০ বছর শুধু আমেরিকার জন্য নয়, বিশ্বের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত।

ফিলাডেলফিয়া ভ্রমণ তাই শুধু একটি দর্শন নয়।

এটি ইতিহাসের ভেতর দিয়ে হাঁটার মতো অভিজ্ঞতা। ইনডিপেনডেন্স হল, লিবার্টি বেল, পুরনো রাস্তা আর মানুষের ভিড়; সব মিলিয়ে মনে হয় ইতিহাস এখনো বেঁচে আছে। আড়াইশ বছর আগে যে স্বাধীনতার স্বপ্ন শুরু হয়েছিল, তার আলো আজও জ্বলছে। আর সেই আলোর অন্যতম সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক শহর ফিলাডেলফিয়া।


লেখক আবদুল হামিদ মাহবুব : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব।

মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪

ই-মেইল:  [email protected]

img

দ্বৈত নাগরিকত্ব ও জনপ্রতিনিধিত্ব: বাংলাদেশের কি নতুন করে ভাবার সময় এসেছে?

প্রকাশিত :  ১৬:৪১, ২৯ আগষ্ট ২০২৬

পেছনে বিখ্যাত ইনডিপেনডেন্স হল।সামনে কালো জর্জ ওয়াশিংটনের মূর্তি।তাঁর সামনে লেখকসহ তার স্ত্রী, ছেলে ও বউমা।
নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল

প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে আমরা গর্ব করি। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি। তাঁদের বিনিয়োগ, পেশাগত সাফল্য, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, জ্ঞান ও দক্ষতা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চিকিৎসক, আইনজীবী, শিক্ষক, গবেষক, উদ্যোক্তা, প্রকৌশলী, রাজনীতিবিদ কিংবা সমাজকর্মী হিসেবে তাঁরা বাংলাদেশের পরিচয় বহন করছেন।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।

একজন জন্মসূত্রে বাংলাদেশি ব্যক্তি যদি জীবনের প্রয়োজনে বিদেশে গিয়ে আরেকটি দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, তাতে কি বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার তাঁর রাজনৈতিক সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত?

প্রশ্নটি আবেগের নয়। এটি সংবিধান, নাগরিকত্ব, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, আনুগত্য এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রশ্ন।

বর্তমান সংবিধানের অবস্থান পরিষ্কার। সংবিধানের ৬৬(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিক এবং কমপক্ষে ২৫ বছর বয়সী একজন ব্যক্তি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মৌলিক যোগ্যতা রাখেন। কিন্তু ৬৬(২)(গ) বলছে, কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে কিংবা সেই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া বা সদস্য হিসেবে থাকার অযোগ্য হবেন। একই সঙ্গে ৬৬(২ক) একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমও রেখেছে: জন্মসূত্রে বাংলাদেশি কোনো ব্যক্তি দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের পর বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে সেই কারণে তাঁকে অযোগ্য বলে গণ্য করা হবে না।

অর্থাৎ বর্তমান আইনকে সরলভাবে বললে, বাংলাদেশ একজন দ্বৈত নাগরিককে তাঁর বিদেশি নাগরিকত্ব বহাল রেখে জাতীয় সংসদের সদস্য হওয়ার সুযোগ দেয় না।
এই বিধানের পেছনের যুক্তিও বোঝা কঠিন নয়।
একজন সংসদ সদস্য শুধু একটি এলাকার প্রতিনিধি নন; তিনি রাষ্ট্রের আইন প্রণেতা। জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা রয়েছে। ফলে রাষ্ট্র চাইতেই পারে যে সংসদ সদস্যের আনুগত্য যেন অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে আইনগতভাবে বিভক্ত না হয়।

এই উদ্বেগকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ২০২৬ সালের বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই উদ্বেগের সমাধান কি কেবল একটি blanket prohibition হতে হবে?

এখানেই আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

আমি নিজেও একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি। ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণের অর্থ আমার কাছে কখনো বাংলাদেশকে ত্যাগ করা ছিল না। বাংলাদেশের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা একজন মানুষের শিকড় একটি নতুন পাসপোর্ট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় না। ভাষা বদলে যায় না। পরিবার, স্মৃতি, সংস্কৃতি কিংবা দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধও অদৃশ্য হয়ে যায় না।

এই অভিজ্ঞতা শুধু একজন ব্যক্তির নয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা লাখো বাংলাদেশির জীবনেই একই বাস্তবতা রয়েছে।

তাঁরা বিদেশে থেকে দেশের পরিবারের পাশে দাঁড়ান। দেশে বাড়ি করেন, ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা করেন, দুর্যোগে অর্থ পাঠান, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলেন। কখনো কখনো নিজেদের পেশাগত সাফল্যের মাধ্যমে তাঁরা এমন একটি বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরেন, যা রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কূটনীতির বাইরেও দেশের ভাবমূর্তি শক্তিশালী করে।

তাহলে নীতিগত প্রশ্নটি একেবারেই অযৌক্তিক নয়: রাষ্ট্র যদি তাঁদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানকে স্বাগত জানায়, তাহলে তাঁদের মধ্যে কেউ যদি বাংলাদেশের জনগণের আস্থা নিয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে চান, সেখানে দ্বিতীয় নাগরিকত্ব নিজেই কেন চূড়ান্ত বাধা হয়ে থাকবে?

এ প্রশ্ন করার অর্থ বর্তমান সংবিধান অমান্য করার আহ্বান নয়।

বরং উল্টো।
আইনের শাসনের অর্থ হলো বর্তমান আইন যতদিন বহাল আছে, তা মানতে হবে। আবার সাংবিধানিক গণতন্ত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো আইনকে প্রশ্ন করা, পর্যালোচনা করা এবং পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া।

সংবিধান কোনো মৃত দলিল নয়।

রাষ্ট্র ও সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে বহু দেশেই সংবিধান পরিবর্তিত হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানও স্বাধীনতার পর বহুবার সংশোধিত হয়েছে।

অতএব প্রশ্নটি হওয়া উচিত: দ্বৈত নাগরিকদের জনপ্রতিনিধিত্বের বর্তমান নিষেধাজ্ঞা কি বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাস্তবতার সঙ্গে সর্বোত্তমভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

স্থানীয় সরকারেও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন

এই আলোচনায় বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থাও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদের নির্বাচিত পদগুলোর যোগ্যতা ও অযোগ্যতা জাতীয় সংসদের অনুচ্ছেদ ৬৬ দিয়ে নয়, পৃথক পৃথক আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে।

স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ২৬ ধারায় চেয়ারম্যান বা সদস্য হতে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া, ন্যূনতম ২৫ বছর বয়স এবং সংশ্লিষ্ট ভোটার তালিকায় নাম থাকার শর্ত রয়েছে। একই ধারায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ বা হারানোকে অযোগ্যতার কারণ করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদ আইনেও চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া এবং নাগরিকত্ব পরিত্যাগ বা হারানোকে অযোগ্যতার কারণ হিসেবে রাখা হয়েছে। 

একই ধরনের ভাষা পাওয়া যায় পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রেও। মেয়র ও কাউন্সিলরকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হয় এবং বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ বা হারালে তিনি অযোগ্য হন। জেলা পরিষদ আইনেও চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার শর্ত এবং নাগরিকত্ব পরিত্যাগ বা হারানোর অযোগ্যতা রয়েছে। 

এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য লক্ষণীয়।

জাতীয় সংসদের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৬৬(২)(গ) সরাসরি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জনের বিষয়টি উল্লেখ করে। কিন্তু উপরোক্ত স্থানীয় সরকার আইনগুলোর সংশ্লিষ্ট ধারায় ব্যবহৃত ভাষা মূলত বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া এবং বাংলাদেশের নাগরিকত্ব “পরিত্যাগ” বা “হারানো”কে কেন্দ্র করে।
তবে এই ভাষাগত পার্থক্য থেকে সরাসরি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নিরাপদ নয় যে, বিদেশি নাগরিকত্বধারী প্রত্যেক দ্বৈত বাংলাদেশি ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। নাগরিকত্ব আইন, ভোটার নিবন্ধন, নির্বাচনী বিধিমালা এবং প্রযোজ্য অন্যান্য আইনি শর্তও বিবেচনায় আসতে পারে।

বরং এই পার্থক্যটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিত্বের বিভিন্ন স্তরে নাগরিকত্বের প্রশ্নে আমাদের আইনি কাঠামো কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?

এটিও ভবিষ্যৎ আইন সংস্কারের আলোচনার অংশ হতে পারে।

বরং প্রবাসীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার একটি বাস্তবসম্মত সূচনাবিন্দুও হতে পারে। একজন মানুষ যদি তাঁর জন্মস্থান, ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা কিংবা শহরের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাস্তব সম্পর্ক বজায় রাখেন, এলাকার উন্নয়নে কাজ করেন এবং স্থানীয় জনগণ তাঁকে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিতে চান, তাহলে তাঁর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

অবশ্যই সেখানে বাস্তব সংযোগের প্রশ্ন থাকবে। প্রয়োজনে ন্যূনতম বসবাসের সময়, সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার হওয়া, সম্পদ ও বিদেশি স্বার্থের ঘোষণা এবং স্বার্থের সংঘাতবিষয়ক কঠোর নিয়ম বিবেচনা করা যেতে পারে।

পৃথিবীতে একটিমাত্র মডেল নেই

এই আলোচনায় একটি তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিজে Westminster Parliament-এ নির্বাচিত হওয়ার স্বয়ংক্রিয় বাধা নয়। UK Parliament-এর যোগ্যতার নিয়ম অনুযায়ী ব্রিটিশ নাগরিকের পাশাপাশি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী Republic of Ireland এবং Commonwealth-এর নাগরিকও House of Commons নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য নাগরিকত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশের তুলনায় ভিন্ন একটি মডেল অনুসরণ করে। 

আর সাম্প্রতিক স্কটিশ অভিজ্ঞতা আরও আকর্ষণীয়।

স্কটল্যান্ড রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত একটি নীতি গ্রহণ করেছে। Scottish Elections (Representation and Reform) Act 2025-এর মাধ্যমে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের Scottish Parliament ও Scottish local government নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করা হয়েছে। আইনের ব্যাখ্যামূলক নথিতেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে এই সংস্কারের উদ্দেশ্য foreign nationals with leave to remain-কে candidacy rights দেওয়া। 

এর বাস্তব উদাহরণও ইতিমধ্যে দেখা গেছে। ২০২৬ সালের Scottish Parliament নির্বাচনে ভারতীয় নাগরিক Q Manivannan Scottish Greens-এর প্রার্থী হিসেবে Edinburgh & Lothians East থেকে নির্বাচিত হন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচিত হওয়ার সময় তিনি ভারতীয় নাগরিক এবং যুক্তরাজ্যে student visa-তে অবস্থান করছিলেন। 

এই উদাহরণটির তাৎপর্য অনেক।

কারণ এখানে শুধু দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্ন নয়; স্কটল্যান্ড আরও এক ধাপ এগিয়ে বৈধভাবে সেখানে বসবাসকারী একজন বিদেশি নাগরিককেও জনগণের ভোটে আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দিয়েছে।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান অনেক কঠোর। অস্ট্রেলিয়ার সংবিধানের ৪৪ ধারায় বিদেশি নাগরিকত্বের কারণে ফেডারেল পার্লামেন্টের সদস্যপদে অযোগ্যতা সৃষ্টি হতে পারে। ২০১৭ সালের বহুল আলোচিত citizenship crisis-এ একাধিক নির্বাচিত রাজনীতিক এই বিধানের কারণে সমস্যায় পড়েছিলেন।

ভারত আবার অন্য একটি মডেল অনুসরণ করে। ভারত পূর্ণ দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকার করে না। Overseas Citizen of India বা OCI মর্যাদা পূর্ণ ভারতীয় নাগরিকত্ব নয় এবং এর সঙ্গে জাতীয় রাজনৈতিক অধিকারও আসে না।
অর্থাৎ পৃথিবীতে একটিমাত্র মডেল নেই।
কোনো দেশ দ্বৈত নাগরিককে সংসদে সুযোগ দেয়।
কোনো দেশ দেয় না।
আবার কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা বৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিককেও নির্দিষ্ট আইনসভায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।

প্রতিটি রাষ্ট্র তার ইতিহাস, নিরাপত্তা, অভিবাসন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তিতে নিজস্ব ব্যবস্থা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশেরও তাই নিজের বাস্তবতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে।
আমার মত হলো, এই প্রশ্নে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা ও সম্পূর্ণ উন্মুক্ততার মাঝখানে একটি মধ্যপন্থা নিয়ে অন্তত আলোচনা হতে পারে।

প্রথমত, একজন প্রার্থীর সব নাগরিকত্ব, বিদেশি পাসপোর্ট, বিদেশে আর্থিক স্বার্থ, ব্যবসা, সম্পত্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত সম্পর্ক বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার আগে কঠোর conflict-of-interest ব্যবস্থা থাকতে পারে।
তৃতীয়ত, সংবেদনশীল জাতীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা যাচাই বা বিশেষ বিধিনিষেধ রাখা যেতে পারে।

চতুর্থত, সংসদ সদস্য এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কিছু সাংবিধানিক পদের নিয়ম এক হওয়া আবশ্যক নয়। উদাহরণ হিসেবে রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবিধান নিজেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার একটি শর্ত করেছে। ফলে Article 66 পরিবর্তিত হলে তার প্রভাব রাষ্ট্রপতির যোগ্যতার ওপরও পড়তে পারে। একইভাবে সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের বাইরের যে সীমিতসংখ্যক ব্যক্তিকে মন্ত্রী করা যায়, তাঁদেরও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হয়।

সুতরাং বিষয়টি শুধু সংসদ সদস্য নির্বাচন নয়; পুরো সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই কারণেই কোনো পরিবর্তন হলে তা আবেগের ভিত্তিতে নয়, গভীর সাংবিধানিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
বিরোধী যুক্তিগুলোর দিকেও তাকাতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আনুগত্য।

একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে দুই রাষ্ট্রের নাগরিক হলে সংকটের মুহূর্তে তাঁর আনুগত্য কোথায় থাকবে?
এ প্রশ্ন সহজ নয়।
তবে নাগরিকত্ব এবং আনুগত্য সব সময় একই জিনিসও নয়। একটি মানুষ একাধিক দেশের সঙ্গে আইনি সম্পর্ক রাখতে পারেন, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান নির্ধারিত হয় তাঁর কাজ, স্বচ্ছতা এবং দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে।

একজন একক নাগরিকত্বধারী রাজনীতিকও বিদেশি স্বার্থের প্রভাবে থাকতে পারেন।
আবার একজন দ্বৈত নাগরিক জীবনভর বাংলাদেশের স্বার্থে কাজ করতে পারেন।

তাই শুধু পাসপোর্টের সংখ্যা দিয়ে আনুগত্যের নিখুঁত পরীক্ষা করা সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নও বৈধ।
দ্বিতীয় আপত্তি হতে পারে-প্রবাসীরা দেশের দৈনন্দিন বাস্তবতা থেকে দূরে থাকেন।
এখানেও যৌক্তিকতা আছে।
যিনি বছরের পর বছর বিদেশে থেকেছেন, তাঁর বাংলাদেশের স্থানীয় সমস্যা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সীমিত হতে পারে।
কিন্তু এর সমাধানও সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নয়। বসবাসের ন্যূনতম সময়, নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে বাস্তব সম্পর্ক, দেশে কর ও সম্পদের স্বচ্ছতা কিংবা নির্দিষ্ট residency requirement নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

গণতন্ত্রে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিচারক ভোটার।
কেউ বিদেশে থেকেছেন বলেই যদি তাঁর এলাকার মানুষ তাঁকে বিশ্বাস না করেন, তাঁরা তাঁকে ভোট দেবেন না।
কিন্তু যদি এলাকার মানুষ তাঁর যোগ্যতা, সততা ও অভিজ্ঞতায় আস্থা রেখে তাঁকে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিতে চান, তখন রাষ্ট্রের ভূমিকা কতটা সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত-এ প্রশ্নের উত্তর নতুন করে ভাবা যেতে পারে।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীদের দেশের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। আমরা তাঁদের বলি দেশে বিনিয়োগ করতে। আমরা তাঁদের দক্ষতা দেশে কাজে লাগাতে চাই। আমরা চাই তাঁরা বিদেশে বাংলাদেশের পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকা রাখুন।

তাহলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা উঠলেই তাঁদের শুধু বিদেশি নাগরিক হিসেবে দেখা কিছুটা সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে।
একজন মানুষের হাতে ব্রিটিশ, আমেরিকান, কানাডিয়ান বা অন্য কোনো দেশের পাসপোর্ট থাকা মানেই তিনি বাংলাদেশবিরোধী-এমন ধারণা ন্যায়সংগত নয়।
একইভাবে, দ্বৈত নাগরিক বলেই কাউকে কোনো যাচাই ছাড়াই জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ দেওয়াও যথেষ্ট নয়।
দুই অবস্থানের মাঝখানেই সম্ভবত ভবিষ্যতের বাস্তবসম্মত সমাধান রয়েছে।
আমার প্রস্তাব কোনো ব্যক্তিবিশেষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য সংবিধান পরিবর্তন নয়।

এটি কোনো দলীয় প্রশ্নও নয়।
আজ একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশির ক্ষেত্রে বিষয়টি উঠতে পারে; কাল কানাডিয়ান-বাংলাদেশি, আমেরিকান-বাংলাদেশি কিংবা অস্ট্রেলিয়ান-বাংলাদেশির ক্ষেত্রেও উঠতে পারে।
এটি মূলত প্রশ্ন-বাংলাদেশ তার বৈশ্বিক নাগরিকদের কীভাবে দেখে?
শুধু রেমিট্যান্স পাঠানো মানুষ হিসেবে?

নাকি দেশের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বেরও সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে?

আমাদের প্রজন্ম এমন এক সময়ে বাস করছে, যখন মানুষ এক দেশে জন্মায়, অন্য দেশে পড়াশোনা করে, তৃতীয় দেশে কাজ করে এবং একই সঙ্গে নিজের জন্মভূমির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখে।
রাষ্ট্রের ধারণাও তাই বদলাচ্ছে।

Diaspora এখন আর কেবল বিদেশে থাকা নাগরিকদের একটি গোষ্ঠী নয়; অনেক দেশের জন্য এটি অর্থনীতি, কূটনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং soft power-এর গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
বাংলাদেশও এই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
তাই আমি মনে করি, Article 66-এর বর্তমান বিধান নিয়ে একটি শান্ত, দলনিরপেক্ষ ও বিশেষজ্ঞভিত্তিক জাতীয় আলোচনা হতে পারে।

বর্তমান আইন যতদিন আছে, অবশ্যই সেটি মানতে হবে।
কিন্তু আইন নিয়ে প্রশ্ন তোলা আইনবিরোধিতা নয়।
বরং একটি পরিণত গণতন্ত্রের লক্ষণ হলো-রাষ্ট্রের স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং নাগরিকের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মধ্যে আরও ভালো ভারসাম্য সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন করার সাহস রাখা।
একজন মানুষের হাতে দুটি পাসপোর্ট থাকতে পারে।
তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতাও দুটি দেশের হতে পারে।
কিন্তু তাঁর শিকড়, স্মৃতি কিংবা মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসাকে একটি পাসপোর্টের সংখ্যায় মাপা যায় না।
বাংলাদেশ যদি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তার মানুষদের সত্যিকার অর্থে জাতীয় সম্পদ মনে করে, তাহলে ভবিষ্যতে তাঁদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়েও নতুন করে ভাবা অযৌক্তিক হবে না।

প্রশ্নটি তাই শুধু দ্বৈত নাগরিকের অধিকার নিয়ে নয়।
প্রশ্নটি আরও বড়-একুশ শতকের বাংলাদেশ তার প্রবাসীদের শুধু দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশি হিসেবে দেখবে, নাকি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের সক্রিয় অংশীদার হিসেবেও দেখতে প্রস্তুত হবে?

নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল: লেখক, আইনবিদ, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

মতামত এর আরও খবর