img

বিভক্তির রাজনীতি নয়, এখন সময় এসেছে বাংলাদেশকে নিয়ে একসঙ্গে ভাবার

প্রকাশিত :  ১৩:৩৪, ২২ মে ২০২৬

বিভক্তির রাজনীতি নয়, এখন সময় এসেছে বাংলাদেশকে নিয়ে একসঙ্গে ভাবার

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের রাজনীতি বহু বছর ধরেই যেন এক দীর্ঘ মেরুকরণের গল্প। এখানে মতের চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে উঠেছে, যুক্তির চেয়ে উচ্চকণ্ঠের স্লোগান বেশি শোনা গেছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টেছে ভাষা, বদলেছে প্রতিশ্রুতি, কিন্তু সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা একই থেকেছে—একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ।

এই দেশের মানুষ রাজনীতির কাছে খুব জটিল কিছু চায় না। তারা চায় এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে একজন তরুণ তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পাবে, একজন কৃষক ন্যায্য মূল্য পাবে, একজন মা তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন। মানুষ এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চায়, যেখানে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করাই মূল লক্ষ্য নয়; বরং ভিন্নমতকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার মানসিকতা থাকবে।

সময়ের সঙ্গে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। এখন মানুষ কেবল বক্তৃতা শোনে না, তারা আচরণও দেখে। নেতার ভাষা, সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি—এসবও আজ রাজনৈতিক মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সেই জায়গা থেকেই সাম্প্রতিক সময়ে অনেক মানুষের ভেতরে নতুন এক প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে তারেক রহমানকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং একটি তুলনামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ভাষার প্রত্যাশাও কাজ করছে।

মানুষ আসলে এমন নেতৃত্ব খোঁজে, যা বিভক্তির দেয়ালকে আরও উঁচু না করে বরং সেতুবন্ধন তৈরি করতে চায়। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার রাজনীতি প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে না দেখে তাকে গণতান্ত্রিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখতে শেখে। জাতীয় অগ্রগতি কখনো কোনো এক দলের একার অর্জন নয়; এটি সমষ্টিগত সহযোগিতা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধের ফল।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই—আমরা এখনও অনেক সময় দেশকে নয়, দলকে আগে ভাবি। রাজনৈতিক আনুগত্য এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে নাগরিক পরিচয় আড়ালে পড়ে যায়। অথচ রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্র মানে কোটি মানুষের শ্রম, স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ভবিষ্যতের সম্মিলিত নাম। তাই মতভেদ থাকবে, সমালোচনাও থাকবে; কিন্তু সেই সমালোচনা যদি ধ্বংসের বদলে সংশোধনের পথ দেখায়, তবেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়।

বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। বিশ্ব অর্থনীতি বদলাচ্ছে, প্রযুক্তি নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে, তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক সংঘাতের পুরোনো ধারা ধরে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন। এখন প্রয়োজন এমন এক জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানবসম্পদ, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে সমান গুরুত্ব দেবে।

তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষার আধুনিকায়ন, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি এবং সহনশীল সমাজব্যবস্থা—এসব অর্জনের জন্য জাতীয় ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। কারণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রের অংশ হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী বিভাজন কখনো উন্নয়নের ভিত্তি হতে পারে না।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যে জাতি সংকীর্ণতার দেয়াল ভেঙে বৃহত্তর স্বার্থে এক হতে পেরেছে, তারাই টেকসই অগ্রগতির পথে এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ—তাদের পরিশ্রম, অভিযোজনক্ষমতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা।

এখন সময় এসেছে সেই শক্তিকে বিভক্তির রাজনীতিতে ক্ষয় না করে উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করার। কারণ শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তাদেরই মনে রাখে, যারা মানুষকে ভাঙার নয়, এক করার কথা বলেছে; যারা ক্ষমতার নয়, দেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবেছে।

img

যুদ্ধের ময়দানে উজ্জীবিত ইরানের পরমাণু স্বপ্ন: ইউরোশিয়া রিভিউ

প্রকাশিত :  ০৬:২২, ২২ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:২৭, ২২ অক্টোবর ২০২৬

একসময় ইরানের রাজনীতিতে পারমাণবিক বোমা তৈরির আলোচনা ছিল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও গোপনীয়। তবে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে টানা আট মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলেছে। এখন দেশটির নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রণেতারা প্রকাশ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি তুলছেন।

অথচ এই দেশেই একদিন সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একটি ধর্মীয় ফতোয়া ছিল আইন, যেখানে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি বা সংরক্ষণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে তেহরান বিশ্ববাসীকে এটাই বোঝানোর চেষ্টা করেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক কাজের জন্য। কিন্তু যুদ্ধের কালো মেঘ সেই পুরোনো ধারণাকে এক নিমিষে উড়িয়ে দিয়েছে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের প্রথম দফার আকস্মিক আঘাতেই কেঁপে উঠেছিল ইরান। সেই হামলায় শুধু সামরিক বা পারমাণবিক স্থাপনাই ধ্বংস হয়নি, প্রাণ হারিয়েছেন খেসারত দেওয়া বহু সাধারণ নাগরিক এবং খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব। যদিও পরবর্তী সময়ে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক তৎপরতা কমিয়ে এনে নৌ-অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপের পথ বেছে নিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে উল্টো নতুন হামলার হুমকি দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের সাফ কথা, চুক্তি করতে হলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে।

আর ঠিক এ অনিশ্চিত ও চরম অস্তিত্বের সংকটের মাঝেই তেহরানের অন্দরে শুরু হয়েছে তীব্র দন্তনখ লড়াই। একপক্ষ বলছে, পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ইরান এরই মধ্যে অনেক চড়া মূল্য চুকিয়ে ফেলেছে। পার্লামেন্ট সদস্য আহমাদ বাখশায়্যাশ আরদেস্তানি কিংবা মহসেন রেজাইয়ের মতো শীর্ষ নিরাপত্তা কর্তারা মনে করেন, এখন আর পিছু হটার সময় নেই; বরং শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে পরমাণু অস্ত্র অর্জনের পথেই হাঁটা উচিত।

রক্ষণশীল বিশ্লেষক দাউদ মোদাররেসিয়ানের ভাষায়, একটি পরমাণু বোমা অর্জন করা আজকের দিনে রুটি-রুজির চেয়েও বড় ও জরুরি প্রয়োজন, যা দেশের টিকে থাকার একমাত্র নিশ্চয়তা। তারা ট্রাম্পের সেই পুরোনো কথারই প্রতিধ্বনি করেন, যেখানে উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের উদাহরণ টেনে ট্রাম্প বলেছিলেন, কারও হাতে ১১টি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠেও রয়েছে শক্ত যুক্তি। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবের এই চিন্তার তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে আছে, তাদের পরমাণু বোমার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, একটি বোমা বড়জোর ৫০ থেকে ১ লাখ মানুষের প্রাণ নিতে পারে, কিন্তু হরমুজ প্রণালি আটকে দিলে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও কোটি কোটি মানুষের জীবন জিম্মি করা সম্ভব। সাংবাদিক সিনা জাহানি কিংবা বিশ্লেষক আমির আলী আবুলফাতদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর এ উন্মাদনা সরাসরি ইসরায়েলের ফাঁদে পা দেওয়ার শামিল। বোমা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকান বোমায় দেশের বাকি অবকাঠটুকুও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে, এমন আত্মঘাতী পথ কোনো সুরক্ষাই দিতে পারে না।

কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, ইরান কি চাইলেও এখন বোমা বানাতে পারবে? যুদ্ধের আগুনে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মূল অবকাঠামো আজ প্রায় পঙ্গু। নাতানজ ও ফরদোর মতো প্রধান ভূগর্ভস্থ প্লান্টগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তবে সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ দশমিক ১৯ কেজি ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে এই বিশাল মজুতের সঠিক হদিস তাদের জানা নেই।

মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দাবি, গ্রানাইট পাথরের ৮০ থেকে ১০০ মিটার গভীরে অবস্থিত গোপন ও সুরক্ষিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ সুড়ঙ্গে হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ ও এই ইউরেনিয়াম লুকিয়ে ফেলেছে তেহরান। আর এ কারণেই ট্রাম্প সম্প্রতি হুংকার ছেড়েছেন, আমাদের হয়তো সেখানেই গিয়ে অভিযান চালাতে হতে পারে!

তাত্ত্বিকভাবে, ওই গোপন মজুতের নাগাল পেলে সামান্য সেন্ট্রিফিউজ দিয়েই অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়াম বানিয়ে ফেলা সম্ভব। ইরান যদিও যুদ্ধ বন্ধের বিনিময়ে এই মজুত হালকা বা পাতলা করার প্রস্তাব দিয়েছে, তবুও ওয়াশিংটনের কড়া নজর এবং পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের হিমশীতল পাহাড়ের আড়ালে এখন ঝুলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তথা গোটা বিশ্বের ভাগ্য।