img

ব্যারিস্টার সারা হোসেন: মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও সাহসী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল প্রতীক

প্রকাশিত :  ১৬:৪৮, ১৭ মে ২০২৬

ব্যারিস্টার সারা হোসেন: মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও সাহসী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল প্রতীক

সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশের আইন ও মানবাধিকার অঙ্গনে ব্যারিস্টার সারা হোসেন এমন এক নাম, যিনি প্রজ্ঞা, মানবিকতা ও সাহসিকতার সমন্বয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ন্যায়বিচারের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে। তিনি শুধু একজন খ্যাতিমান আইনজীবী নন; বরং সমাজের নিপীড়িত, প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকারের পক্ষে নির্ভীক কণ্ঠস্বর।

বিশেষ করে নারী অধিকার, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও আইনি সংস্কারে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম তাঁকে দেশ-বিদেশে এনে দিয়েছে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুক্তির ভাষায় লড়েছেন, তেমনি মানবিক মূল্যবোধের প্রশ্নে থেকেছেন আপসহীন।

১৯৬৩ সালে এক প্রগতিশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সারা হোসেন। তাঁর পিতা ড. কামাল হোসেন বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম প্রধান প্রণেতা, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। মাতা হামিদা হোসেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক ও মানবাধিকারকর্মী।

পরিবারের এই মূল্যবোধনির্ভর পরিবেশ থেকেই তিনি ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর স্বামী ডেভিড বার্গম্যান একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী, যিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধবিষয়ক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য পরিচিত।

সারা হোসেন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াধাম কলেজ (Wadham College) থেকে আইনশাস্ত্রে স্নাতক (অনার্স) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে অনারেবল সোসাইটি অব মিডল টেম্পল থেকে ‘কল টু দ্য বার’ সম্পন্ন করে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

বাংলাদেশে ফিরে তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন। ১৯৯২ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে এবং ২০০৮ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ২০২১ সালে তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে ‘সিনিয়র অ্যাডভোকেট’ হিসেবে স্বীকৃতি পান।

বর্তমানে তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ আইন প্রতিষ্ঠান ‘ড. কামাল হোসেন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’-এর পার্টনার ও ডেপুটি হেড অব চেম্বার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ব্যারিস্টার সারা হোসেনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর মানবাধিকারভিত্তিক আইনি সংগ্রাম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর সম্মানসূচক নির্বাহী পরিচালক হিসেবে বিনা পারিশ্রমিকে (Pro bono) কাজ করে যাচ্ছেন।

এ ছাড়া তিনি আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। আন্তর্জাতিক আইন কমিশন (ICJ)-এর কমিশনার হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে আন্তর্জাতিক আইন সমিতির (ILA) মানবাধিকার কমিটির সদস্য এবং Women’s Initiatives for Gender Justice-এর উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করছেন।

নারীর প্রতি সহিংসতা, সংখ্যালঘু অধিকার, পারিবারিক নির্যাতন, পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসিত।

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় ব্যারিস্টার সারা হোসেনের বেশ কিছু অবদান ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।

গ্রামীণ সমাজে ফতোয়ার নামে নারীদের অমানবিক শাস্তি ও সামাজিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ আইনি লড়াই পরিচালনা করেন। তাঁর এই ভূমিকা নারীর অধিকার রক্ষায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের ওপর চালু থাকা অপমানজনক ও অমানবিক ‘টু-ফিঙ্গার টেস্ট’ পদ্ধতি নিষিদ্ধ করার আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই আইনি বিজয় নারীর মর্যাদা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০১০ সালের ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন’-এর খসড়া প্রণয়নে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। এই আইন বাংলাদেশের নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের কার্যকর প্রয়োগে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ মানবাধিকার আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ব্যারিস্টার সারা হোসেন শুধু বাংলাদেশের পরিসরেই সীমাবদ্ধ নন; আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গনেও তিনি একটি পরিচিত ও সম্মানিত নাম।

জুলাই ২০১৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর অভিযানে ফিলিস্তিনি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গঠিত তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতি হিসেবে তাঁকে নিয়োগ দেয়। কমিশনের অন্য সদস্য ছিলেন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ডেভিড ক্রেন ও কারি বেটি মুরঙ্গি।

এ ছাড়া জাতিসংঘের বিভিন্ন বিশেষ মিশন, আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন ও নারী অধিকারবিষয়ক বৈশ্বিক উদ্যোগেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

মানবাধিকার ও নারী অধিকার রক্ষায় অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৬ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। সেই সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি তাঁর হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন।

এ ছাড়া—

২০০৮ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম তাঁকে ‘ইয়ং গ্লোবাল লিডার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

২০০৭ সালে নিউইয়র্কভিত্তিক দ্য এশিয়া সোসাইটি তাঁকে ‘এশিয়া ২১ ফেলো’ নির্বাচিত করে।

২০০৫ সালে মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে অবদানের জন্য তিনি ‘অনন্যা শীর্ষ দশ’ সম্মাননা লাভ করেন।

ব্যারিস্টার সারা হোসেন কেবল আদালতের একজন সফল আইনজীবী নন; তিনি মানবিক সাহস, ন্যায়বোধ ও সামাজিক দায়িত্বশীলতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

যেখানে সমাজে এখনো বৈষম্য, সহিংসতা ও কুসংস্কারের অন্ধকার রয়ে গেছে, সেখানে তিনি দাঁড়িয়েছেন ন্যায়বিচারের আলোকবর্তিকা হয়ে। নিপীড়িত মানুষের পক্ষে তাঁর দৃঢ় অবস্থান এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে আপসহীন মনোভাব তাঁকে বাংলাদেশের আইনি অঙ্গনের এক চিরস্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

কালো কোটের আড়ালে তিনি ধারণ করেন এক গভীর মানবিক হৃদয়—যা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর, কিন্তু ন্যায়ের পক্ষে কোমল ও সহমর্মী। তাঁর কর্ম, সংগ্রাম ও আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দীর্ঘদিন অনুপ্রাণিত করবে।


মতামত এর আরও খবর

img

ফিলাডেলফিয়ার গৃহহীন আর নেশাগ্রস্ত মানুষের কথা

প্রকাশিত :  ০৮:৩১, ১৬ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৯:২১, ১৬ মে ২০২৬

ফিলাডেলফিয়ার কেনসিংটনে সড়কের পাশে থাকা গৃহহীন নেশাগ্রস্ত কয়েকজন।

আবদুল হামিদ মাহবুব

আমি বাংলাদেশের মানুষ। আমার একমাত্র সন্তান টেম্পল ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছে। সেই সুবাদে আমাকে যুক্তরাষ্ট্র আসতে হয়। আমার থাকা হয় ছেলের সাথেই, ফিলাডেলফিয়া শহরে। বাংলাদেশে আমি একজন পেশাদার সাংবাদিক ছিলাম। ৪৪ বছর সাংবাদিকতা করেছি। বর্তমানে রিপোটিং পেশা থেকে অবসর নিয়েছি। তবে দেশের সংবাদপত্রে মাঝেমধ্যে কলাম লিখি। সেই কারণে এই লেখার অবতারণা।

আমার প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্র সফর ছিল ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে। যদিও আমি আনুষ্ঠানিক ভাবে সাংবাদিকতা থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছি, তথাপি লেখালেখি ছাড়তে পারিনি। তাই ওই সময়ে প্রথম লেখাটি লিখেছিলাম দেশের প্রধানতম সংবাদপত্র 'ইত্তেফাক'-এ। শিরোনাম ছিল 'উন্নত দেশের হালচাল'। সেই লেখা ছাপা হয়েছিল ২০২৪ সালের ২৩ নভেম্বর। লেখার মূল বিষয় ছিল, গৃহহীন ও মাদকাসক্ত নেশাগ্রস্তদের কথা। সেই লেখা বেরোনোর পর বাঙালি কমিউনিটির কেউ কেউ আমাকে ব্যাঙ্গ করেছিলেন। এবার এসে যখন ফেসবুক স্ক্রল করছি, সামনে আসলো ফিলাডেলফিয়া মেয়র শেরেল পার্কারের বক্তব্য। তার সেই বক্তব্য থেকে এই সিটিতে হোমলেস ও নেশাগ্রস্ত মানুষ সম্পর্কে অনেক তথ্য পেয়ে গেলাম। এই ডিজিটাল যুগে গুগল সার্চ করায় আরো কিছু তথ্য সামনে আসলো। তাই আবারও সেই একই বিষয় নিয়েই লিখছি।

চারদিন আগে দেওয়া মেয়র শেরেল পার্কারের বক্তব্য থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের  ফিলাডেলফিয়া শহরটি আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। নগরীর রাজপথ, রেলস্টেশন, পার্ক কিংবা সেতুর নিচে বসবাসকারী মানুষদের উপস্থিতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো দৃশ্য নয়; বরং এটি শহরের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া একটি বড় নগর সংকট।

এই প্রেক্ষাপটে ফিলাডেলফিয়া সিটি কর্তৃপক্ষ হোটেল কক্ষের ওপর কর বৃদ্ধি করে সেই অর্থ গৃহহীন মানুষের সহায়তায় ব্যয় করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা শুধু একটি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি নগর প্রশাসনের সামাজিক দায়বদ্ধতারও বহিঃপ্রকাশ।

মেয়র প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই কর বৃদ্ধির মাধ্যমে বছরে প্রায় ২ কোটি ডলার রাজস্ব আসবে। ২০০ ডলারের একটি হোটেল কক্ষের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৪ ডলার কর দিতে হবে। শুনতে সামান্য মনে হলেও, এই অর্থ দিয়ে নতুন আশ্রয়কেন্দ্র, পুনর্বাসন সেবা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং রাস্তার মানুষের কাছে পৌঁছানোর কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া সিটি মেয়র শেরেল পার্কার গৃহহীন ও নেশাগ্রস্তদের পুন:বাসন বিষয়ে বক্তব্য রাখছেন। 

ফিলাডেলফিয়ার বাস্তবতা বোঝার জন্য শহরটির সামগ্রিক চিত্র জানা জরুরি। মার্কিন আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শহরটির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ লাখ ৭৪ হাজার। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ বৃহত্তম শহর। শহরের আয়তন প্রায় ১৪২ বর্গমাইল বা ৩৬৭ বর্গকিলোমিটার। 

এই বিশাল নগরীতে রয়েছে লাখ লাখ আবাসিক ইউনিট। শহরের মোট হাউজিং ইউনিটের সংখ্যা প্রায় সাত লাখের কাছাকাছি। এর মধ্যে প্রায় ৫২ শতাংশ মানুষ নিজেদের মালিকানাধীন ঘরে বসবাস করেন। বাকিরা ভাড়াটিয়া। তবে আবাসন ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকায় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য শহরে টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠছে। 

ফিলাডেলফিয়ার অর্থনীতি ঐতিহাসিকভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন এবং ছোট ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। “দ্য পিউ চ্যারিটেবল ট্রাস্টস এবং স্টেট অব দ্য সিটি টুয়েন্টি টোয়েন্টি-ফাইভ” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরের মোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ৯২ শতাংশই ছোট ব্যবসা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাত শহরের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের উৎস। 

কিন্তু এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি শহরে বৈষম্যও স্পষ্ট। কয়েক বছর আগেও ফিলাডেলফিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দরিদ্র বড় শহর বলা হতো। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দারিদ্র্যের হার কিছুটা কমেছে, তারপরও শহরের প্রায় প্রতি পাঁচজনের একজন এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন। 

এই দারিদ্র্য, উচ্চ ভাড়া, মাদকাসক্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকট মিলেই গৃহহীনতার সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, শহরে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ৫ হাজার ৫০০–এর বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ মানুষ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকলেও বাকিরা এখনো রাজপথে, অস্থায়ী তাঁবুতে বা অনিরাপদ স্থানে জীবন কাটাচ্ছেন। 

ফিলাডেলফিয়ার কেনসিংটন এলাকার পরিস্থিতি বিশেষভাবে আলোচিত। মাদক সংকট, বেকারত্ব এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে গৃহহীন মানুষের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায়ই অভিযোগ করেন; রাস্তায় মাদক সেবন, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং অনিরাপত্তা তাদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করছে। অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শুধু উচ্ছেদ নয়; প্রয়োজন স্থায়ী পুনর্বাসন এবং চিকিৎসা সহায়তা। 

এখানেই সিটি প্রশাসনের নতুন করনীতির গুরুত্ব। শহর কর্তৃপক্ষ মনে করছে, পর্যটন খাত থেকে সামান্য অতিরিক্ত কর নিয়ে সেই অর্থ সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করা হলে পুরো নগরই লাভবান হবে। কারণ গৃহহীনতা কেবল মানবিক সমস্যা নয়; এটি জননিরাপত্তা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

তবে এই নীতির সমালোচনাও রয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, অতিরিক্ত হোটেল কর পর্যটন খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। পর্যটকরা অন্য শহর বেছে নিতে পারেন। বিশেষ করে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি কিংবা বোস্টনের মতো শহরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় থাকা ফিলাডেলফিয়ার জন্য এটি একটি ঝুঁকি।

কিন্তু পাল্টা যুক্তিও শক্তিশালী। যদি অতিরিক্ত ৪ ডলার কর দিয়ে রাজপথে বসবাসকারী একজন মানুষকে আশ্রয়, চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া যায়, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে শহরের জন্য অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক হতে পারে। কারণ গৃহহীনতা কমলে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়, আইনশৃঙ্খলা ব্যয় এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিও কমে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো; গৃহহীনতা শুধু বাসস্থান না থাকা নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি মানসিক অসুস্থতা, পারিবারিক সহিংসতা, চাকরি হারানো, আসক্তি কিংবা স্বাস্থ্য সংকটের ফল। ফলে শুধু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সমন্বিত নগরনীতি।

ফিলাডেলফিয়া প্রশাসন বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রের শয্যা বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। মেয়র শেরেল পার্কার প্রশাসন ইতোমধ্যে নতুন রিকভারি সেন্টার চালু করেছে, যেখানে শতাধিক মানুষের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকবে। 

বিশ্বের বড় শহরগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, গৃহহীনতা মোকাবিলায় 'আগে বাসস্থান' নীতি কার্যকর হতে পারে। অর্থাৎ একজন মানুষকে আগে নিরাপদ বাসস্থানে নিয়ে আসতে হবে; এরপর তার চিকিৎসা, কর্মসংস্থান কিংবা পুনর্বাসনের পরিকল্পনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

ফিলাডেলফিয়ার নতুন করনীতি সেই পথেই একটি পদক্ষেপ হতে পারে। যদিও এটি পুরো সমস্যার সমাধান নয়, তবে নগর প্রশাসনের একটি স্পষ্ট বার্তা রয়েছে; রাজপথে মানুষ পড়ে থাকবে আর শহর চোখ বন্ধ করে থাকবে, সেই সময় শেষ হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের নগরীগুলোর জন্যও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার বিষয় হতে পারে। ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা সিলেটেও গৃহহীন ও ভাসমান মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু অধিকাংশ সময় বিষয়টি দান-খয়রাত বা মৌসুমি শীতবস্ত্র বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনায় গৃহহীন মানুষের জন্য আবাসন, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং কর্মসংস্থান অন্তর্ভুক্ত হয় না।

ফিলাডেলফিয়ার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, একটি শহর যদি সত্যিই মানবিক হতে চায়, তাহলে তাকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ভেতরেও সামাজিক ন্যায়বিচারের জায়গা তৈরি করতে হবে। শহরের হোটেল, ব্যবসা, পর্যটন এবং উন্নয়ন; সবকিছু তখনই অর্থবহ, যখন সেই শহরে কোনো মানুষকে ফুটপাথে রাত কাটাতে না হয়।

পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ নগরী শুধু উন্নত অবকাঠামো দিয়ে তৈরি হয় না; বরং এটি তৈরি হয় নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত করার মাধ্যমে। আর সেই কারণেই ফিলাডেলফিয়ার নতুন করনীতি এখন শুধু একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং নগর সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।



লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব।

[email protected]











মতামত এর আরও খবর