img

ব্যারিস্টার সারা হোসেন: মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও সাহসী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল প্রতীক

প্রকাশিত :  ১৬:৪৮, ১৭ মে ২০২৬

ব্যারিস্টার সারা হোসেন: মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও সাহসী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল প্রতীক

সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশের আইন ও মানবাধিকার অঙ্গনে ব্যারিস্টার সারা হোসেন এমন এক নাম, যিনি প্রজ্ঞা, মানবিকতা ও সাহসিকতার সমন্বয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ন্যায়বিচারের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে। তিনি শুধু একজন খ্যাতিমান আইনজীবী নন; বরং সমাজের নিপীড়িত, প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকারের পক্ষে নির্ভীক কণ্ঠস্বর।

বিশেষ করে নারী অধিকার, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও আইনি সংস্কারে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম তাঁকে দেশ-বিদেশে এনে দিয়েছে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুক্তির ভাষায় লড়েছেন, তেমনি মানবিক মূল্যবোধের প্রশ্নে থেকেছেন আপসহীন।

১৯৬৩ সালে এক প্রগতিশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সারা হোসেন। তাঁর পিতা ড. কামাল হোসেন বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম প্রধান প্রণেতা, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। মাতা হামিদা হোসেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক ও মানবাধিকারকর্মী।

পরিবারের এই মূল্যবোধনির্ভর পরিবেশ থেকেই তিনি ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর স্বামী ডেভিড বার্গম্যান একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী, যিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধবিষয়ক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য পরিচিত।

সারা হোসেন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াধাম কলেজ (Wadham College) থেকে আইনশাস্ত্রে স্নাতক (অনার্স) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে অনারেবল সোসাইটি অব মিডল টেম্পল থেকে ‘কল টু দ্য বার’ সম্পন্ন করে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

বাংলাদেশে ফিরে তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন। ১৯৯২ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে এবং ২০০৮ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ২০২১ সালে তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে ‘সিনিয়র অ্যাডভোকেট’ হিসেবে স্বীকৃতি পান।

বর্তমানে তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ আইন প্রতিষ্ঠান ‘ড. কামাল হোসেন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’-এর পার্টনার ও ডেপুটি হেড অব চেম্বার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ব্যারিস্টার সারা হোসেনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর মানবাধিকারভিত্তিক আইনি সংগ্রাম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর সম্মানসূচক নির্বাহী পরিচালক হিসেবে বিনা পারিশ্রমিকে (Pro bono) কাজ করে যাচ্ছেন।

এ ছাড়া তিনি আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। আন্তর্জাতিক আইন কমিশন (ICJ)-এর কমিশনার হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে আন্তর্জাতিক আইন সমিতির (ILA) মানবাধিকার কমিটির সদস্য এবং Women’s Initiatives for Gender Justice-এর উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করছেন।

নারীর প্রতি সহিংসতা, সংখ্যালঘু অধিকার, পারিবারিক নির্যাতন, পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসিত।

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় ব্যারিস্টার সারা হোসেনের বেশ কিছু অবদান ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।

গ্রামীণ সমাজে ফতোয়ার নামে নারীদের অমানবিক শাস্তি ও সামাজিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ আইনি লড়াই পরিচালনা করেন। তাঁর এই ভূমিকা নারীর অধিকার রক্ষায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের ওপর চালু থাকা অপমানজনক ও অমানবিক ‘টু-ফিঙ্গার টেস্ট’ পদ্ধতি নিষিদ্ধ করার আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই আইনি বিজয় নারীর মর্যাদা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০১০ সালের ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন’-এর খসড়া প্রণয়নে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। এই আইন বাংলাদেশের নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের কার্যকর প্রয়োগে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ মানবাধিকার আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ব্যারিস্টার সারা হোসেন শুধু বাংলাদেশের পরিসরেই সীমাবদ্ধ নন; আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গনেও তিনি একটি পরিচিত ও সম্মানিত নাম।

জুলাই ২০১৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর অভিযানে ফিলিস্তিনি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গঠিত তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতি হিসেবে তাঁকে নিয়োগ দেয়। কমিশনের অন্য সদস্য ছিলেন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ডেভিড ক্রেন ও কারি বেটি মুরঙ্গি।

এ ছাড়া জাতিসংঘের বিভিন্ন বিশেষ মিশন, আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন ও নারী অধিকারবিষয়ক বৈশ্বিক উদ্যোগেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

মানবাধিকার ও নারী অধিকার রক্ষায় অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৬ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। সেই সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি তাঁর হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন।

এ ছাড়া—

২০০৮ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম তাঁকে ‘ইয়ং গ্লোবাল লিডার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

২০০৭ সালে নিউইয়র্কভিত্তিক দ্য এশিয়া সোসাইটি তাঁকে ‘এশিয়া ২১ ফেলো’ নির্বাচিত করে।

২০০৫ সালে মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে অবদানের জন্য তিনি ‘অনন্যা শীর্ষ দশ’ সম্মাননা লাভ করেন।

ব্যারিস্টার সারা হোসেন কেবল আদালতের একজন সফল আইনজীবী নন; তিনি মানবিক সাহস, ন্যায়বোধ ও সামাজিক দায়িত্বশীলতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

যেখানে সমাজে এখনো বৈষম্য, সহিংসতা ও কুসংস্কারের অন্ধকার রয়ে গেছে, সেখানে তিনি দাঁড়িয়েছেন ন্যায়বিচারের আলোকবর্তিকা হয়ে। নিপীড়িত মানুষের পক্ষে তাঁর দৃঢ় অবস্থান এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে আপসহীন মনোভাব তাঁকে বাংলাদেশের আইনি অঙ্গনের এক চিরস্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

কালো কোটের আড়ালে তিনি ধারণ করেন এক গভীর মানবিক হৃদয়—যা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর, কিন্তু ন্যায়ের পক্ষে কোমল ও সহমর্মী। তাঁর কর্ম, সংগ্রাম ও আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দীর্ঘদিন অনুপ্রাণিত করবে।


img

দ্বৈত নাগরিকত্ব ও জনপ্রতিনিধিত্ব: বাংলাদেশের কি নতুন করে ভাবার সময় এসেছে?

প্রকাশিত :  ১৬:৪১, ২৯ আগষ্ট ২০২৬

নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল

প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে আমরা গর্ব করি। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি। তাঁদের বিনিয়োগ, পেশাগত সাফল্য, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, জ্ঞান ও দক্ষতা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চিকিৎসক, আইনজীবী, শিক্ষক, গবেষক, উদ্যোক্তা, প্রকৌশলী, রাজনীতিবিদ কিংবা সমাজকর্মী হিসেবে তাঁরা বাংলাদেশের পরিচয় বহন করছেন।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।

একজন জন্মসূত্রে বাংলাদেশি ব্যক্তি যদি জীবনের প্রয়োজনে বিদেশে গিয়ে আরেকটি দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, তাতে কি বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার তাঁর রাজনৈতিক সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত?

প্রশ্নটি আবেগের নয়। এটি সংবিধান, নাগরিকত্ব, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, আনুগত্য এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রশ্ন।

বর্তমান সংবিধানের অবস্থান পরিষ্কার। সংবিধানের ৬৬(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিক এবং কমপক্ষে ২৫ বছর বয়সী একজন ব্যক্তি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মৌলিক যোগ্যতা রাখেন। কিন্তু ৬৬(২)(গ) বলছে, কোনো ব্যক্তি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করলে কিংবা সেই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া বা সদস্য হিসেবে থাকার অযোগ্য হবেন। একই সঙ্গে ৬৬(২ক) একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রমও রেখেছে: জন্মসূত্রে বাংলাদেশি কোনো ব্যক্তি দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের পর বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে সেই কারণে তাঁকে অযোগ্য বলে গণ্য করা হবে না।

অর্থাৎ বর্তমান আইনকে সরলভাবে বললে, বাংলাদেশ একজন দ্বৈত নাগরিককে তাঁর বিদেশি নাগরিকত্ব বহাল রেখে জাতীয় সংসদের সদস্য হওয়ার সুযোগ দেয় না।
এই বিধানের পেছনের যুক্তিও বোঝা কঠিন নয়।
একজন সংসদ সদস্য শুধু একটি এলাকার প্রতিনিধি নন; তিনি রাষ্ট্রের আইন প্রণেতা। জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা রয়েছে। ফলে রাষ্ট্র চাইতেই পারে যে সংসদ সদস্যের আনুগত্য যেন অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে আইনগতভাবে বিভক্ত না হয়।

এই উদ্বেগকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ২০২৬ সালের বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই উদ্বেগের সমাধান কি কেবল একটি blanket prohibition হতে হবে?

এখানেই আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

আমি নিজেও একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি। ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণের অর্থ আমার কাছে কখনো বাংলাদেশকে ত্যাগ করা ছিল না। বাংলাদেশের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা একজন মানুষের শিকড় একটি নতুন পাসপোর্ট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় না। ভাষা বদলে যায় না। পরিবার, স্মৃতি, সংস্কৃতি কিংবা দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধও অদৃশ্য হয়ে যায় না।

এই অভিজ্ঞতা শুধু একজন ব্যক্তির নয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা লাখো বাংলাদেশির জীবনেই একই বাস্তবতা রয়েছে।

তাঁরা বিদেশে থেকে দেশের পরিবারের পাশে দাঁড়ান। দেশে বাড়ি করেন, ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা করেন, দুর্যোগে অর্থ পাঠান, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলেন। কখনো কখনো নিজেদের পেশাগত সাফল্যের মাধ্যমে তাঁরা এমন একটি বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরেন, যা রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কূটনীতির বাইরেও দেশের ভাবমূর্তি শক্তিশালী করে।

তাহলে নীতিগত প্রশ্নটি একেবারেই অযৌক্তিক নয়: রাষ্ট্র যদি তাঁদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানকে স্বাগত জানায়, তাহলে তাঁদের মধ্যে কেউ যদি বাংলাদেশের জনগণের আস্থা নিয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে চান, সেখানে দ্বিতীয় নাগরিকত্ব নিজেই কেন চূড়ান্ত বাধা হয়ে থাকবে?

এ প্রশ্ন করার অর্থ বর্তমান সংবিধান অমান্য করার আহ্বান নয়।

বরং উল্টো।
আইনের শাসনের অর্থ হলো বর্তমান আইন যতদিন বহাল আছে, তা মানতে হবে। আবার সাংবিধানিক গণতন্ত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো আইনকে প্রশ্ন করা, পর্যালোচনা করা এবং পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া।

সংবিধান কোনো মৃত দলিল নয়।

রাষ্ট্র ও সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে বহু দেশেই সংবিধান পরিবর্তিত হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানও স্বাধীনতার পর বহুবার সংশোধিত হয়েছে।

অতএব প্রশ্নটি হওয়া উচিত: দ্বৈত নাগরিকদের জনপ্রতিনিধিত্বের বর্তমান নিষেধাজ্ঞা কি বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাস্তবতার সঙ্গে সর্বোত্তমভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

স্থানীয় সরকারেও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন

এই আলোচনায় বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থাও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদের নির্বাচিত পদগুলোর যোগ্যতা ও অযোগ্যতা জাতীয় সংসদের অনুচ্ছেদ ৬৬ দিয়ে নয়, পৃথক পৃথক আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে।

স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ২৬ ধারায় চেয়ারম্যান বা সদস্য হতে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া, ন্যূনতম ২৫ বছর বয়স এবং সংশ্লিষ্ট ভোটার তালিকায় নাম থাকার শর্ত রয়েছে। একই ধারায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ বা হারানোকে অযোগ্যতার কারণ করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদ আইনেও চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া এবং নাগরিকত্ব পরিত্যাগ বা হারানোকে অযোগ্যতার কারণ হিসেবে রাখা হয়েছে। 

একই ধরনের ভাষা পাওয়া যায় পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রেও। মেয়র ও কাউন্সিলরকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হয় এবং বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ বা হারালে তিনি অযোগ্য হন। জেলা পরিষদ আইনেও চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার শর্ত এবং নাগরিকত্ব পরিত্যাগ বা হারানোর অযোগ্যতা রয়েছে। 

এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আইনি পার্থক্য লক্ষণীয়।

জাতীয় সংসদের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৬৬(২)(গ) সরাসরি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জনের বিষয়টি উল্লেখ করে। কিন্তু উপরোক্ত স্থানীয় সরকার আইনগুলোর সংশ্লিষ্ট ধারায় ব্যবহৃত ভাষা মূলত বাংলাদেশের নাগরিক হওয়া এবং বাংলাদেশের নাগরিকত্ব “পরিত্যাগ” বা “হারানো”কে কেন্দ্র করে।
তবে এই ভাষাগত পার্থক্য থেকে সরাসরি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নিরাপদ নয় যে, বিদেশি নাগরিকত্বধারী প্রত্যেক দ্বৈত বাংলাদেশি ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। নাগরিকত্ব আইন, ভোটার নিবন্ধন, নির্বাচনী বিধিমালা এবং প্রযোজ্য অন্যান্য আইনি শর্তও বিবেচনায় আসতে পারে।

বরং এই পার্থক্যটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিত্বের বিভিন্ন স্তরে নাগরিকত্বের প্রশ্নে আমাদের আইনি কাঠামো কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?

এটিও ভবিষ্যৎ আইন সংস্কারের আলোচনার অংশ হতে পারে।

বরং প্রবাসীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার একটি বাস্তবসম্মত সূচনাবিন্দুও হতে পারে। একজন মানুষ যদি তাঁর জন্মস্থান, ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা কিংবা শহরের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাস্তব সম্পর্ক বজায় রাখেন, এলাকার উন্নয়নে কাজ করেন এবং স্থানীয় জনগণ তাঁকে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিতে চান, তাহলে তাঁর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

অবশ্যই সেখানে বাস্তব সংযোগের প্রশ্ন থাকবে। প্রয়োজনে ন্যূনতম বসবাসের সময়, সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার হওয়া, সম্পদ ও বিদেশি স্বার্থের ঘোষণা এবং স্বার্থের সংঘাতবিষয়ক কঠোর নিয়ম বিবেচনা করা যেতে পারে।

পৃথিবীতে একটিমাত্র মডেল নেই

এই আলোচনায় একটি তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিজে Westminster Parliament-এ নির্বাচিত হওয়ার স্বয়ংক্রিয় বাধা নয়। UK Parliament-এর যোগ্যতার নিয়ম অনুযায়ী ব্রিটিশ নাগরিকের পাশাপাশি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী Republic of Ireland এবং Commonwealth-এর নাগরিকও House of Commons নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য নাগরিকত্বের প্রশ্নে বাংলাদেশের তুলনায় ভিন্ন একটি মডেল অনুসরণ করে। 

আর সাম্প্রতিক স্কটিশ অভিজ্ঞতা আরও আকর্ষণীয়।

স্কটল্যান্ড রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত একটি নীতি গ্রহণ করেছে। Scottish Elections (Representation and Reform) Act 2025-এর মাধ্যমে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকদের Scottish Parliament ও Scottish local government নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করা হয়েছে। আইনের ব্যাখ্যামূলক নথিতেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে এই সংস্কারের উদ্দেশ্য foreign nationals with leave to remain-কে candidacy rights দেওয়া। 

এর বাস্তব উদাহরণও ইতিমধ্যে দেখা গেছে। ২০২৬ সালের Scottish Parliament নির্বাচনে ভারতীয় নাগরিক Q Manivannan Scottish Greens-এর প্রার্থী হিসেবে Edinburgh & Lothians East থেকে নির্বাচিত হন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচিত হওয়ার সময় তিনি ভারতীয় নাগরিক এবং যুক্তরাজ্যে student visa-তে অবস্থান করছিলেন। 

এই উদাহরণটির তাৎপর্য অনেক।

কারণ এখানে শুধু দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্ন নয়; স্কটল্যান্ড আরও এক ধাপ এগিয়ে বৈধভাবে সেখানে বসবাসকারী একজন বিদেশি নাগরিককেও জনগণের ভোটে আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দিয়েছে।

অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান অনেক কঠোর। অস্ট্রেলিয়ার সংবিধানের ৪৪ ধারায় বিদেশি নাগরিকত্বের কারণে ফেডারেল পার্লামেন্টের সদস্যপদে অযোগ্যতা সৃষ্টি হতে পারে। ২০১৭ সালের বহুল আলোচিত citizenship crisis-এ একাধিক নির্বাচিত রাজনীতিক এই বিধানের কারণে সমস্যায় পড়েছিলেন।

ভারত আবার অন্য একটি মডেল অনুসরণ করে। ভারত পূর্ণ দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকার করে না। Overseas Citizen of India বা OCI মর্যাদা পূর্ণ ভারতীয় নাগরিকত্ব নয় এবং এর সঙ্গে জাতীয় রাজনৈতিক অধিকারও আসে না।
অর্থাৎ পৃথিবীতে একটিমাত্র মডেল নেই।
কোনো দেশ দ্বৈত নাগরিককে সংসদে সুযোগ দেয়।
কোনো দেশ দেয় না।
আবার কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা বৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিককেও নির্দিষ্ট আইনসভায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে।

প্রতিটি রাষ্ট্র তার ইতিহাস, নিরাপত্তা, অভিবাসন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তিতে নিজস্ব ব্যবস্থা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশেরও তাই নিজের বাস্তবতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে।
আমার মত হলো, এই প্রশ্নে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা ও সম্পূর্ণ উন্মুক্ততার মাঝখানে একটি মধ্যপন্থা নিয়ে অন্তত আলোচনা হতে পারে।

প্রথমত, একজন প্রার্থীর সব নাগরিকত্ব, বিদেশি পাসপোর্ট, বিদেশে আর্থিক স্বার্থ, ব্যবসা, সম্পত্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত সম্পর্ক বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার আগে কঠোর conflict-of-interest ব্যবস্থা থাকতে পারে।
তৃতীয়ত, সংবেদনশীল জাতীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট দায়িত্বের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা যাচাই বা বিশেষ বিধিনিষেধ রাখা যেতে পারে।

চতুর্থত, সংসদ সদস্য এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কিছু সাংবিধানিক পদের নিয়ম এক হওয়া আবশ্যক নয়। উদাহরণ হিসেবে রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংবিধান নিজেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার একটি শর্ত করেছে। ফলে Article 66 পরিবর্তিত হলে তার প্রভাব রাষ্ট্রপতির যোগ্যতার ওপরও পড়তে পারে। একইভাবে সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের বাইরের যে সীমিতসংখ্যক ব্যক্তিকে মন্ত্রী করা যায়, তাঁদেরও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হয়।

সুতরাং বিষয়টি শুধু সংসদ সদস্য নির্বাচন নয়; পুরো সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই কারণেই কোনো পরিবর্তন হলে তা আবেগের ভিত্তিতে নয়, গভীর সাংবিধানিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
বিরোধী যুক্তিগুলোর দিকেও তাকাতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আনুগত্য।

একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে দুই রাষ্ট্রের নাগরিক হলে সংকটের মুহূর্তে তাঁর আনুগত্য কোথায় থাকবে?
এ প্রশ্ন সহজ নয়।
তবে নাগরিকত্ব এবং আনুগত্য সব সময় একই জিনিসও নয়। একটি মানুষ একাধিক দেশের সঙ্গে আইনি সম্পর্ক রাখতে পারেন, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান নির্ধারিত হয় তাঁর কাজ, স্বচ্ছতা এবং দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে।

একজন একক নাগরিকত্বধারী রাজনীতিকও বিদেশি স্বার্থের প্রভাবে থাকতে পারেন।
আবার একজন দ্বৈত নাগরিক জীবনভর বাংলাদেশের স্বার্থে কাজ করতে পারেন।

তাই শুধু পাসপোর্টের সংখ্যা দিয়ে আনুগত্যের নিখুঁত পরীক্ষা করা সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নও বৈধ।
দ্বিতীয় আপত্তি হতে পারে-প্রবাসীরা দেশের দৈনন্দিন বাস্তবতা থেকে দূরে থাকেন।
এখানেও যৌক্তিকতা আছে।
যিনি বছরের পর বছর বিদেশে থেকেছেন, তাঁর বাংলাদেশের স্থানীয় সমস্যা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সীমিত হতে পারে।
কিন্তু এর সমাধানও সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নয়। বসবাসের ন্যূনতম সময়, নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে বাস্তব সম্পর্ক, দেশে কর ও সম্পদের স্বচ্ছতা কিংবা নির্দিষ্ট residency requirement নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

গণতন্ত্রে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিচারক ভোটার।
কেউ বিদেশে থেকেছেন বলেই যদি তাঁর এলাকার মানুষ তাঁকে বিশ্বাস না করেন, তাঁরা তাঁকে ভোট দেবেন না।
কিন্তু যদি এলাকার মানুষ তাঁর যোগ্যতা, সততা ও অভিজ্ঞতায় আস্থা রেখে তাঁকে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিতে চান, তখন রাষ্ট্রের ভূমিকা কতটা সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত-এ প্রশ্নের উত্তর নতুন করে ভাবা যেতে পারে।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীদের দেশের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। আমরা তাঁদের বলি দেশে বিনিয়োগ করতে। আমরা তাঁদের দক্ষতা দেশে কাজে লাগাতে চাই। আমরা চাই তাঁরা বিদেশে বাংলাদেশের পক্ষে ইতিবাচক ভূমিকা রাখুন।

তাহলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা উঠলেই তাঁদের শুধু বিদেশি নাগরিক হিসেবে দেখা কিছুটা সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে।
একজন মানুষের হাতে ব্রিটিশ, আমেরিকান, কানাডিয়ান বা অন্য কোনো দেশের পাসপোর্ট থাকা মানেই তিনি বাংলাদেশবিরোধী-এমন ধারণা ন্যায়সংগত নয়।
একইভাবে, দ্বৈত নাগরিক বলেই কাউকে কোনো যাচাই ছাড়াই জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ দেওয়াও যথেষ্ট নয়।
দুই অবস্থানের মাঝখানেই সম্ভবত ভবিষ্যতের বাস্তবসম্মত সমাধান রয়েছে।
আমার প্রস্তাব কোনো ব্যক্তিবিশেষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য সংবিধান পরিবর্তন নয়।

এটি কোনো দলীয় প্রশ্নও নয়।
আজ একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশির ক্ষেত্রে বিষয়টি উঠতে পারে; কাল কানাডিয়ান-বাংলাদেশি, আমেরিকান-বাংলাদেশি কিংবা অস্ট্রেলিয়ান-বাংলাদেশির ক্ষেত্রেও উঠতে পারে।
এটি মূলত প্রশ্ন-বাংলাদেশ তার বৈশ্বিক নাগরিকদের কীভাবে দেখে?
শুধু রেমিট্যান্স পাঠানো মানুষ হিসেবে?

নাকি দেশের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বেরও সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে?

আমাদের প্রজন্ম এমন এক সময়ে বাস করছে, যখন মানুষ এক দেশে জন্মায়, অন্য দেশে পড়াশোনা করে, তৃতীয় দেশে কাজ করে এবং একই সঙ্গে নিজের জন্মভূমির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখে।
রাষ্ট্রের ধারণাও তাই বদলাচ্ছে।

Diaspora এখন আর কেবল বিদেশে থাকা নাগরিকদের একটি গোষ্ঠী নয়; অনেক দেশের জন্য এটি অর্থনীতি, কূটনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং soft power-এর গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
বাংলাদেশও এই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
তাই আমি মনে করি, Article 66-এর বর্তমান বিধান নিয়ে একটি শান্ত, দলনিরপেক্ষ ও বিশেষজ্ঞভিত্তিক জাতীয় আলোচনা হতে পারে।

বর্তমান আইন যতদিন আছে, অবশ্যই সেটি মানতে হবে।
কিন্তু আইন নিয়ে প্রশ্ন তোলা আইনবিরোধিতা নয়।
বরং একটি পরিণত গণতন্ত্রের লক্ষণ হলো-রাষ্ট্রের স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং নাগরিকের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মধ্যে আরও ভালো ভারসাম্য সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন করার সাহস রাখা।
একজন মানুষের হাতে দুটি পাসপোর্ট থাকতে পারে।
তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতাও দুটি দেশের হতে পারে।
কিন্তু তাঁর শিকড়, স্মৃতি কিংবা মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসাকে একটি পাসপোর্টের সংখ্যায় মাপা যায় না।
বাংলাদেশ যদি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তার মানুষদের সত্যিকার অর্থে জাতীয় সম্পদ মনে করে, তাহলে ভবিষ্যতে তাঁদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়েও নতুন করে ভাবা অযৌক্তিক হবে না।

প্রশ্নটি তাই শুধু দ্বৈত নাগরিকের অধিকার নিয়ে নয়।
প্রশ্নটি আরও বড়-একুশ শতকের বাংলাদেশ তার প্রবাসীদের শুধু দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশি হিসেবে দেখবে, নাকি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের সক্রিয় অংশীদার হিসেবেও দেখতে প্রস্তুত হবে?

নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল: লেখক, আইনবিদ, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।