img

সংবিধানে ঢোকার পথেই সীলমোহর মেরে রাখা হয়েছে

প্রকাশিত :  ১৩:২৯, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

সংবিধানে ঢোকার পথেই সীলমোহর মেরে রাখা হয়েছে

আবদুল হামিদ মাহবুব

বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে এই দেড় মাসের মত হল। এই স্বল্প সময়ে সংবিধান-সংবিধান নিয়ে এত এত কথা শুনেছি যে, সংবিধানের প্রতি একধরনের বিরক্তিই সৃষ্টি হয়ে গেছে। শেখ হাসিনার শাসনের বিগত প্রায় ১৬ বছর সংবিধান বিষয়ে যত কথা শুনেছিলাম, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর আর বর্তমান সরকারের এই দেড় মাসে যেন তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শুনে ফেললাম।

আসলে কি আমরা সংবিধান মেনেই রাষ্ট্র চালাই? শেখ হাসিনা কি সংবিধানের প্রতি অনুচ্ছেদ, ধারা, উপধারা ধরে ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন? আমার তো মনে হয়, সেটা তিনি করেননি। তার মত করে চালাতে গিয়ে যখন যে যে অংশ প্রয়োজন, তিনি সেটুকু ব্যবহার করে তার মতই চালিয়েছেন। সংবিধানের কোথাও কি লেখা আছে কলাকৌশল করে অনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে দেশ পরিচালনা করা যাবে? ২০১৪ সালে ১৫৩ আসনেই অনির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন!

২০১৮ সালে তো বিএনপিও নির্বাচনে অংশ নিল। কিন্তু এমন কৌশল করে নিশিবেলায় ভোটের কাজ সেরে ফেলা হলো। সেই সংসদ পূর্ণ মেয়াদ কাজ শেষ করল! আর ২০২৪-এ  নিজেরা নিজেরা নিজেদের মত যাকে চেয়েছেন তাকেই সংসদ সদস্য বানিয়ে এনে দেশটা নিয়ে এগোতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু ছাত্রদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে যখন বিপ্লব বলুন আর গণঅভ্যুত্থাই বলুন, সেই রূপ যখন নিলো, তখন শেখ হাসিনা শাসক ‘ইয়াজিদ’-এর সেই সীমারের মত নির্দয় হয়ে হাজারের ওপর লাশ ফেলে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করল। শরীরের অঙ্গ-পতঙ্গ হারিয়ে কত হাজার হলেন পঙ্গু।

অবশেষে শেখ হাসিনা তার সভাসদ আত্মীয়-স্বজন সবাইকে নিয়ে পালিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু সবাই রক্ষা পেল না। পাঁচশতাধিক জন সেনানিবাসে আশ্রয় নিলেন। সেনাবাহিনী তাদের প্রাণে বাঁচিয়ে দিয়ে সুযোগে সুযোগে সরে যাওয়ার পথ করে দিল! কেউ কেউ নিরাপদে সরে গেলেন। কিন্তু অনেকেই এখন জালে আটকা পড়ছেন। এইতো সেদিন দেখলাম গত সংসদের স্পিকারকে পুলিশ ধরে এনে কারাগারে পাঠালো!

আমি সংবিধান বিশেষজ্ঞ নই। কিন্তু সংবিধানের প্রসঙ্গ টেনে লেখার সূত্রপাত করেছি। আমার মত অক্ষরজ্ঞানওয়ালা বেয়াক্কেলকেও অতীতে কয়েকবার সংবিধান ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে দেশে যখন সংঘাতময় একটা অবস্থা চলছিল, তখন সেই সংবিধান ঘাঁটাঘাঁটি করে আমি লিখেছিলাম ‘সংঘাত এড়াতে একটি নির্বাচনী ফর্মূলা’। সেই লেখা প্রকাশ হওয়ার পর বেশ সাড়া পড়েছিল।

গত কদিন ধরে সংবিধান আর সংবিধান শুনতে শুনতে আবার ঘাঁটাচ্ছি। ঘাঁটাতে গিয়ে সংবিধানের প্রথম ভাগের  ‘৭খ’ পড়েই আমি থেমে গেছি। এই ‘৭খ’-তে যে কথাগুলো বলা আছে সেগুলো যদি বহাল রেখে দেওয়া হয় তাহলে এই দেশের ক্ষমতায় যে দলই যাক না কেন, সেই দলই শেখ হাসিনার মত ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠবেই। নিশ্চয়ই পাঠকরা জানতে চাচ্ছেন ‘৭খ’-তে কি আছে?

‘৭খ’-তে আছে “সংবিধানে ১৪২ অনুচ্ছেদে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথম ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, নবম-ক ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সাপেক্ষে তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ সমূহের বিধানাবলী সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপণ, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোন পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য হইবে।”

যেসব বিষয় “সংশোধন অযোগ্য হইবে” উল্লেখ করে সংবিধানে ঢোকার পথেই সীলমোহর মেরে রাখা হয়েছে, সেগুলো আর এখানে দিলাম না। দিলে এই লেখা অনেক বড় হয়ে যাবে। আমি মনে করি আমার এই লেখার পাঠক সকলেই ‘গুগল’ সার্চ করতে জানেন। কেউ যদি পুরোটা পড়তে চান, তবে গুগলে সার্চ করে সংবিধানের সেই অংশগুলো পড়ে নেবেন।  

সংবিধানে লিখে রাখা এই সাড়ে পাঁচ লাইন সারা সংবিধানের রক্ষক হয়ে আছে! এবার একজন সাধারন মানুষ হিসাবে ভাবুন, সংবিধানের এই অংশ থাকা অবস্থায় কোন পরিষদের কি ক্ষমতা আছে সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন কিংবা সংশোধন ঘটানোর? আমি জানিনা আমাদের আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবী প্রস্তাব আলোচনার জন্য উত্থাপিত হলে, তিনি এত এত বই সামনে আনার জন্য বলেছিলেন কেন? তিনি যখন ‘জুলাই সনদ’ প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখলেন, তখন তো আমার মনে হল বক্তব্যটি তিনি সংসদে নয় পল্টন ময়দানে দিচ্ছেন। তিনি যেসব বইয়ের কথা বলেছিলেন, এমন কি মদীনা সনদের প্রসঙ্গ থেকেও তো তেমন কোনো উদ্ধৃতি দিতে দেখলাম না! তাহলে কি একজন আমজনতা হিসেবে ধরে নেব, আমাদের লেখালেখির শুরুর দিকে কোনো কোনো বন্ধু ইংরেজি সাহিত্যের বই বগলে নিয়ে ঘুরাঘুরি করতো। তারা আমাদের বোঝাত ওইসব ইংরেজি বই তারা পড়ে নতুন নতুন সাহিত্য শিখছে। আমরা তাদের আঁতেল বলতাম! আইনমন্ত্রী তার পাণ্ডিত্য দেশবাসীকে জানান দেওয়ার জন্য কি ওইসব বইয়ের কথা বলেছিলেন?

আমি জানি এই আইনমন্ত্রী খুবই পণ্ডিত একজন মানুষ। আইনের এমন কোন বিষয় নেই, যা তিনি জানেন না। তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু যেসব বইয়ের কথা বললেন, অথচ তার বক্তব্যেই সেসব বই থেকে তেমন কিছুই উদ্ধৃত হলো না! তাই আমি প্রসঙ্গটি টেনে আনলাম।

গত (০৭ এপ্রিল ২০২৬) মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন কেন অপরিহার্য?’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধে বিচারপতি এম এ মতিন আমাদের আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দেন। প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুযায়ী বিচারপতি এম এ মতিন বলেন, ‘শোনা যাচ্ছে, জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী সংসদ সদস্যগণকে হবস পড়ার উপদেশ দিয়েছেন। হবসের দর্শন হচ্ছে দেশের শাসক হবেন এমন একজন, যিনি হবেন সর্বশক্তিমান এবং সকল আইনের ঊর্ধ্বে। যেমন রোমান সম্রাটরা ছিল। হবসের দর্শন অনুসরণ করে সে যুগে স্বৈরাচার জন্ম নিয়েছিল। আমরা কি আবার স্বৈরশাসক চাচ্ছি?’

প্রবন্ধে বলা হয়, আগের আইনমন্ত্রীরা শেখ হাসিনাকে হবস পড়িয়েছিলেন। তাঁকে জন অস্টিনের ‘কমান্ড থিওরি’ ভালো করে পড়িয়েছিলেন। ফলে তাঁকে শেখানো হয়েছে শাসকের আদেশই আইন। অথচ অস্টিনের জায়গা এইচ এল হার্ট দখল করার পর ইউরোপের আইনের জগতে সন্নিবেশিত হয়, আদেশ নয়, বিধিই আইন। কিন্তু হাসিনাকে সেই আইন পড়ানো হয়নি। হাসিনাসহ তাঁর আইনমন্ত্রী ‘হায়ার ল’ অমান্য করেছিলেন। তাঁরা আজ কোথায়?

তিনি জন লকের একটি মতবাদকে উদ্ধৃত করে বলেন, শাসক যখন নির্যাতক হয়ে যায়, তখন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে সরিয়ে দেওয়া মানুষের স্রষ্টা প্রদত্ত অধিকার।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে যে তিনজন রাষ্ট্রচিন্তাবিদের ‘সামাজিক চুক্তি মতবাদ’ নিয়ে আলোচনা এসেছে, তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:

ইংরেজ দার্শনিক থমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লেভিয়াথান’ (১৬৫১)। তিনি মনে করতেন, মানুষ জন্মগতভাবে স্বার্থপর ও বিশৃঙ্খল। তাই সমাজকে শান্ত রাখতে একজন ‘নিরঙ্কুশ’ বা সর্বশক্তিমান শাসকের প্রয়োজন। তাঁর মতে, জনগণ নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে শাসকের কাছে সব ক্ষমতা সঁপে দেয় এবং শাসকের আদেশ অমান্য করার অধিকার তাদের থাকে না।

ইংল্যান্ডের চিকিৎসক এবং দার্শনিক জন লককে (১৬৩২-১৭০৪) বলা হয় ‘উদারতাবাদের জনক’। তাঁর প্রধান কাজ ‘টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্ট’ (১৬৮৯)। হবসের উল্টো পথে হেঁটে লক বলেন, মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার হলো প্রাকৃতিক বা জন্মগত অধিকার। সরকার গঠিত হয় জনগণের সম্মতিতে এই অধিকারগুলো রক্ষার জন্য। যদি কোনো শাসক এই অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হন বা অত্যাচারী হন, তবে সেই সরকারকে উৎখাত করার অধিকার জনগণের রয়েছে।

জেনেভায় জন্ম নেওয়া জঁ-জাক রুশো (১৭১২-১৭৭৮) একজন ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ (১৭৬২) গ্রন্থের জন্য বিশ্বখ্যাত। তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়, কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলিত।’ রুশোর মতে, রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া উচিত ‘সাধারণ ইচ্ছা’ বা জনগণের সামষ্টিক মতের ভিত্তিতে। তাঁর এই দর্শনেই আধুনিক গণতন্ত্র ও ফরাসি বিপ্লবের বীজ নিহিত ছিল।’

সংসদে বিএনপি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালিত হবে। আমাদের  আইনমন্ত্রীও একই কথা বলেছেন। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে সংবিধানে ‘৭খ’ বহাল থাকা অবস্থায় কি করে মূল (জুলাই জাতীয় সনদে থাকা) জায়গাগুলোতে পরিবর্তন কিংবা সংশোধন আনবেন? শেখ হাসিনা কিন্তু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে দিয়ে কুটিল বুদ্ধিতে খুবই জটিল ভাবে সংবিধান সংশোধন করিয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দিয়েও সংবিধানের মূল বিষয়গুলো সংশোধনের পথ বন্ধ করে রেখেছে। অবশ্য বর্তমান সংসদের কাছে গণভোটের ফলাফল আছে। এই ফলাফল জনগণের অভিমতের প্রকাশ। এটাকে মূল্যায়ন করেই একমাত্র সংবিধানের ভিতরে প্রবেশ করার পথ খুলতে হবে। আর সংবিধান এভাবে রেখেই যদি বর্তমান সরকার এগোতে চায়, তা হলে শেখ হাসিনার মত যখন প্রয়োজন, সংবিধানের যে অংশ পক্ষে পাওয়া যাবে, সে অংশ মানব। আর যে অংশ পক্ষে পাওয়া যাবেনা সেটা লংঘন করব!

উপরের শেষ দুই বাক্যের মতোই কি দেশটা চলবে? যদি এভাবে চলে; তাহলে আগামীতেও আমরা দেখব রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফ্যাসিস্ট বসে আছে। জনতা কি তখন চুপ করে থাকবে? নব্বই এবং চব্বিশ বুঝিয়ে দিয়েছে একটা সময় পর্যন্ত আমজনতাকে ঠেকিয়ে রাখা যায়। কিন্তু কোনো না কোনো সময় এই জনতা বিস্ফোরণে গর্জে উঠে সব তোলপাড় করে দেয়। আমরা কি একটা স্থিতিশীল রাষ্ট্রের পথে হাঁটবো না? এই দেশের মানুষ কি কেবল নব্বই কিংবা চব্বিশ ঘটানো নিয়েই ব্যস্ত থাকবে?

আমি এই লেখা যখন লিখছি আমার মাথায় গুনগুন করছে লালনের সেই বিখ্যাত একটি চরণ, ‘সময় গেলে সাধন হবে না’। বিষয় সংবিধান; কিন্তু মাথায় কেনো ‘সময় গেলে সাধন হবে না’ ঘুরছে বুঝতে পারছি না! আমার মনে হচ্ছে; আমরা কেবল সময়কে যেতেই দিচ্ছি, যেতেই দিচ্ছি! আমরা কি সময় যেতেই দেবো? এভাবে যেতেই দেবো? সময় যেতে যেতে আমরা কোন সীমানায় গিয়ে পৌঁছাবো? তাই বলি সকলের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।  

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব। সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রকাশিত গ্রন্থ: ‘গণমাধ্যম সাংবাদিকতা দেশ দশের আমার কথা’।


আবদুল হামিদ মাহবুব: মৌলভীবাজার,  ই-মেইল:  ahmahbub@gmail.com

মতামত এর আরও খবর

img

দুর্ভোগে অতিষ্ঠ আমি, আমার এই প্যাঁচাল

প্রকাশিত :  ০৬:৩৬, ০৯ এপ্রিল ২০২৬

আবদুল হামিদ মাহবুব

পৃথিবী সব সময়ই অস্থির। কোথাও না কোথাও কিছু একটা ঘটতেই থাকে। আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনী কি শোনা যাচ্ছে? আগাম কেউই কিছু বলতে পারবেনা, হুট করে কখন কি ঘটে যাবে।ওইসব বড় বড় মাথাদের বিষয়। একজন সাধারন মানুষ হিসাবে আমার সমস্যা, আমার কাছে বড় বিষয়। হয়তো দেশের অন্য কোন নাগরিক, তার কাছে তার নিজের সমস্যা আমার সমস্যা থেকেও আরো অনেক বড় মনে হতে পারে। আমি লিখতে পারি, তাই সেটা প্রকাশ করি। সেই সমস্যাগ্রস্ত নাগরিক হয়তো লিখার অভ্যাস গড়ে তুলেননি। সে কারণে তার সমস্যাটা চাপা পড়ে থাকে। আমার কথাগুলো পাঠক সাধারণের ভালো নাও লাগতে পারে। কিন্তু পাঠকের সামনে প্রকাশ করতে না পারলে আমার ভেতর অস্বস্তিক কাজ করবে। তাই এই প্যাঁচাল লিখছি। 

আমার পাঠক জানেন, আমি মফস্বলের বাসিন্দা।আগে মৌলভীবাজার পৌরসভার ভিতরেই নিজেদের বাসায় বসবাস করতাম। কিন্তু বর্ষায় জলাবদ্ধতার সমস্যার কারণে প্রায় আড়াই বছর হলো শহরের লাগোয়া পাহাড়ি এলাকায় বাসা নিয়ে চলে এসেছি।শহরের কোলাহলমুক্ত পরিবেশে সবুজের কাছাকাছি থাকায় মন ফুরফুরে থাকে ঠিকই। কিন্তু এতদিন শহরে থাকায় সেই প্রিয় শহরের কথা ভুলতে পারিনা। প্রতিদিন সম্ভব না হলেও, অন্তত সপ্তাহে একদিন শহরের সাথে যোগাযোগ রাখতে চেষ্টা করি।

মাসের প্রথম দিন ব্যাংকে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম। যাওয়ার পথে আমাদের পৌরসভায় (মৌলভীবাজার পৌরসভা) ঢুকলাম। চার মাস আগে গিয়ে একবার বলে এসেছিলাম, মৌলভীবাজার সরকারি মহাবিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশ হয়ে যাওয়া সড়কখানার বেহাল দশার কথা। এই সড়ক বড়বাড়ি হয়ে সোনাপুর পর্যন্ত পৌরসভার অংশ। কয়েক বছর ধরে এই সড়কে কোন রক্ষণাবেক্ষণ কাজ হচ্ছে না। আমি সহ এলাকায় বসবাস করা অনেক সরকারি কর্মকর্তা ওই সড়ক দিয়ে আসা-যাওয়া করেন। আর কেউ বেহাল দশা দেখেন কিনা আমি জানিনা! এই সড়ক দিয়ে যেতে যেতে পড়েছে কমলগঞ্জ উপজেলায় কালেঙ্গা। সেই কালেঙ্গায় প্রায় ৪০ সহস্র মানুষের বসবাস। বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের মানুষ। সবাইকে এই সড়ক দিয়ে আসা-যাওয়া করতে হয়। প্রতিদিন সিএনজি চলে কয়েকশত। বাস ট্রাকও চলে। মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সিবাজার, রহিমপুর, শমশেরনগর, পতনউষার এই ইউনিয়ন গুলোর কিছু অংশের মানুষ জেলা শহরের সাথে যোগাযোগের বাইপাস হিসাবে এই সড়ক ব্যবহার করেন। একজন পীর সাহেবের মাজার আছে কালেঙ্গায়। সেই মাজারে প্রতিদিন দেশের দূরদূরান্ত থেকে লোক আসেন বড় বড় কোচ (বাস) ভাড়া করে। এই সড়ক নিয়ে স্থানীয় সরকার (এলজিইডি) ও পৌরসভার মধ্যে টানা-হেচড়া ছিল দীর্ঘদিন। আমি নিজেও খুঁজে পাচ্ছিলাম না এই সড়কের মূল মালিক কারা?

পূর্বে একবার এই সড়কের কাজ করিয়েছে মৌলভীবাজার পৌরসভা। আরেকবার এই সড়কে কাজ করায় স্থানীয় সরকার অর্থাৎ এলজিইডি। খোঁজখবর নিয়ে জেনেছিলাম দুই কর্তৃপক্ষই তখন কাজ করিয়েছিল তাদের তহবিলের খরচ দেখানোর জন্য। হায়রে লুটপাট! বিপত্তি এখান থেকেই শুরু হয়।

সেই চার মাস আগে গিয়ে জানতে পেরেছিলাম পৌরসভা এলজিইডির সাথে একটা সমোঝতা  করতে পেরেছে। তারাই এখন সড়কের উন্নয়নের কাজ করাবে। এর জন্য পাঁচ কোটি টাকার একটি প্রকল্প তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। আজও যখন গিয়ে কথা বললাম, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী সেই পুরনো বয়ান শোনালেন। এখনো প্রকল্প অনুমোদন হয়ে আসেনি, তাই কিছু করতে পারছেন না। মধ্যে কিছু ইট দিয়ে মেরামতের চেষ্টা করা হয়েছিল। অত্যধিক ভারী গাড়ির চাকায় পীষ্ঠ হতে হতে সেই সব ইটের অস্তিত্ব প্রায় শেষ হয়ে গেছে। পুরো রাস্তা বড় বড় গর্ত হয়ে আছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে এই সড়ক দিয়ে মানুষ পায়ে হেঁটেও চলতে পারবে কিনা আমার সন্দেহ আছে! বর্ষার আগে সড়কটি আদৌ মেরামত হবে কিনা এই এলাকার মানুষ সন্দিহান। মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে জেলা প্রশাসন-সহ (পৌর প্রশাসক) কর্তৃপক্ষ এই সড়কের প্রতি সুনজর দেবেন এটাই কাম্য। ইতোমধ্যে আমরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি সম্মানিত সংসদ সদস্যদেরও পেয়েগেছি। এই সড়কের অংশ পড়েছে সংসদীয় আসন মৌলভীবাজার-৩ ও মৌলভীবাজার-৪-এ। দুই আসনের সংসদ সদস্য উদ্যোমী ব্যক্তি। আমি দুজনকেই ভালো ভাবে জানি। এই লেখা তাদের নজরে গেলে নিশ্চয় সুদৃষ্টি দেবেন। এই সুযোগে আমি নির্বাচিত সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান ও মুজিবুর রহমান চৌধুরীকে অভিনন্দন জানিয়ে তাদের সাফল্য কমনা করছি।

সড়কের কথা বললাম। এখন বলি মৌলভীবাজার পৌরসভার প্রাণ প্রবাহ যার মাধ্যমে রক্ষা হয় সেই \'কোদালিছড়ার\' কথা। গত ক\'মাস ধরে \'কোদালিছড়া\'য়ও স্রোত নেই। ছড়ার পুরো পানি বদ্ধ হয়ে আছে। ময়লা আবর্জনা পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কারণ এই ছড়ার ভাটিতে পাঁচটি স্থানে বাঁধ দিয়ে রাখা হয়েছে। কৃষকরা \'কোদালিছড়া\'র পানি দিয়ে বোরো চাষের জন্য এইসব বাঁধ দিয়েছেন। বৃষ্টি নেমে গেছে যদিও; পুরোদমে বর্ষা নামার আগে এই বাঁধগুলো পুরো কেটে না দিলে পৌর শহরের অধিকাংশ এলাকার ঘরবাড়ি প্লাবিত হতে পারে। গত বছরও এমন হয়েছিলো।

এই বাঁধগুলো অপসারণের বিষয়েও পৌর কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বললাম। কিন্তু জানলাম যেটা, সেটা হচ্ছে; বাঁধ তো পৌরসভার ভেতরে নয়, সেগুলো পড়েছে মোস্তফাপুর ও গিয়াসনগর ইউনিয়নে। এখানে পৌর কর্তৃপক্ষের কিছু করণীয় নেই। তা হলে বাঁধ অপসারণ কে করবে এখন? বর্ষার বৃষ্টি নামার আগে এইসব বাঁধ অপসারিত না হলে শহরের সৈয়ারপুর, ফাটাবিল, গীর্জাপাড়া, আরামবাগ, কলিমাবাদ, কাঁজিরগাও, বেরিরচর,গোবিন্দশ্রী, ধরকাপন, চৌমুহনা, পশ্চিমবাজার, এলাকার মানুষের কপালে দুর্ভোগ আছে। জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসাবে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন, একসময়ে জনপ্রিয় ছাত্র নেতা মৌলভীবাজার সরকারি মহাবিদ্যালয়ের নির্বাচিত ভিপি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আমার খুবই প্রিয়জন মিজানুর রহমান মিজান। উনাকে এবিষয়ে দৃষ্টি দেওয়ার অনুরোধ করছি। কোদালিছড়ার পানি প্রবাহ ঠিক না করলে তিনিও শহরের যে এলাকায় বসবাস করেন সে এলাকার মানুষও দুর্ভোগে পড়বে।

গত বছর বৃষ্টির জমাট পানিতে তলিয়ে অনেক দোকান মালিকের লক্ষ লক্ষ টাকার মালামাল নষ্ট হয়েছিল। অনেক বাসা বাড়ির আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড়, বইপত্র, জরুরী কাগজ বিনষ্ট হয়েছে। এবারও কি তাহলে সেই অবস্থাই হবে? সময় থাকতে সংশ্লিষ্টরা সজাগ হন। আমার এই লেখা পড়ে কেউ কেউ হয়তো ক্ষুব্ধ হবে, কেউ কেউ গালিও দেবেন। বলবেন বর্ষার খবর নেই, এখন কেনো এসব লেখা?

পৌরসভা থেকে বের হয়ে ব্যাংকের কাজ সেরে হাঁটতে হাঁটতে চৌমহনা পর্যন্ত গিয়েছিলাম। সেখানে দৈনিক সমকাল প্রতিনিধি নুরুল ইসলামকে পেলাম। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতা বিভাগে লেখাপড়া করা মানুষ। মফস্বলে থেকে সাংবাদিকতাই করছে। তার সাথে ছিল ডেইলি স্টারের মিন্টু দেশোয়াল। তাদেরকেও জানিয়ে আসলাম এই সমস্যার কথা। মিন্টু তার স্বভাব সুলভ হাঃ হাঃ করে হাসি দিয়েই গেল। বললাম খোঁজখবর নিয়ে নিউজ করার জন্য। করবে কিনা জানিনা! অবশ্য তাদের সাথে আমার আরো অনেক প্রসঙ্গে কথা হয়েছে। রাজনীতিসহ আমার ইদানিংকালের লেখালেখির ধরনধারণ বাদ যায়নি।

দীপ্ত টিভির তরুণ এক সাংবাদিকের সাথেও পরিচয় হলো। সিনিয়র হিসেবে তাকেও কিছু \'ছবক\' দিলাম। বললাম বাবার টাকা পয়সা থাকলে সাংবাদিকতা পেশায় থাকো, না হয় অন্য কিছু করার চিন্তা মাথায় রাখো। চাঁদাবাজ সাংবাদিক হয়ো না। সে অবশ্য জানিয়েছে, সরকারি চাকরির চেষ্টায় আছে। শুনে আমার ভালো লাগলো।

দুর্ভোগে অতিষ্ঠ আমি। তাই আমার এই প্যাঁচাল। এটা কারো ভালো লাগার কথা নয়। তাই এখানেই থামি। ধৈর্য নিয়ে যারা পড়বেন, সবাই ভালো থাকবেন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব। সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রকাশিত গ্রন্থ: ‘গণমাধ্যম সাংবাদিকতা দেশ দশের আমার কথা’।

মতামত এর আরও খবর