img

নরসুন্দার তীরে শতবর্ষের মিষ্টি স্মৃতি - লক্ষ্মী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডারের অমলিন ঐতিহ্য

প্রকাশিত :  ১৮:৫৩, ২২ এপ্রিল ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:১৯, ২২ এপ্রিল ২০২৬

নরসুন্দার তীরে শতবর্ষের মিষ্টি স্মৃতি - লক্ষ্মী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডারের অমলিন ঐতিহ্য

সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশে কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের একরামপুর এলাকায় মৃতপ্রায় নরসুন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট এক মিষ্টির দোকান—দেখতে সাদামাটা, কিন্তু ইতিহাসে ভরপুর। ‘লক্ষ্মী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডার’ নামের এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি দোকান নয়, বরং এক শতাব্দীর স্বাদ, স্মৃতি আর ঐতিহ্যের ধারক।

১৯১৬ সালে ব্রিটিশ ভারতের সময় যাত্রা শুরু হয় এই দোকানের। প্রতিষ্ঠাতা আনন্দ চন্দ্র বসাকের হাত ধরে শুরু হওয়া এই পথচলা আজও অব্যাহত রয়েছে তাঁর বংশধরদের হাতেই। বর্তমানে দোকানটি পরিচালনা করছেন অলক বসাক ও তাঁর বড় ভাই মানিক চন্দ্র বসাক। তিন প্রজন্ম ধরে একই স্বাদ আর সুনাম ধরে রাখার এই গল্প কিশোরগঞ্জবাসীর কাছে এক গর্বের বিষয়।

দোকানটিতে ঢুকলে চোখে পড়ে পরিচিত সব মিষ্টির সারি—রসগোল্লা, চমচম, কালোজাম, জিলাপি, সন্দেশ, কাঁচাগোল্লা। পুরোনো দিনের লম্বা কাঁচের আলমারিতে সাজানো মিষ্টিগুলো যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একপাশে কয়েকটি টেবিল, আর নিরিবিলি আড্ডার জন্য ছোট দুটি কেবিন—এখানেই জমে ওঠে শহরের নানান গল্প।

অলক বসাক জানান, একসময় নরসুন্দা নদী ছিল খরস্রোতা, আর দোকানে জ্বলত তেলের বাতি। তখনকার দিনে রসগোল্লা, কাঁচাগোল্লা, রসমঞ্জুরী আর বাদশাভোগ ছিল প্রধান আকর্ষণ। বড় আকারের বাদশাভোগের একটি মিষ্টির দাম ছিল মাত্র আট আনা। ব্রিটিশ আমলে কিশোরগঞ্জের সুগারমিল ও পাটকলের বিদেশি কর্মকর্তারাও করাচি ফেরার সময় এই দোকানের মিষ্টি নিতে ভুলতেন না।

সময় বদলেছে, বদলেছে দাম আর পরিবেশ, কিন্তু স্বাদে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বর্তমানে রসগোল্লা থেকে শুরু করে রসমঞ্জুরী, মালাইকারী, দই, সন্দেশ—সবই পাওয়া যায় এখানে সাশ্রয়ী দামে। প্রতিদিন প্রায় আড়াই থেকে তিন মণ মিষ্টি তৈরি হয়, আর ঈদের সময় সেই পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।

শুধু মিষ্টি নয়, সকালের নাস্তার জন্যও এই দোকান সমান জনপ্রিয়। ভোরের হাঁটা শেষে অনেকেই এখানে বসেন পরোটা-ভাজি আর চায়ের আড্ডায়। ষাটোর্ধ্ব শাহজাহান সাহেব বলেন, “ছোটবেলা থেকে এই দোকানের সঙ্গে সম্পর্ক। এখনও মেয়ের জন্য এলাচ দেওয়া রসগোল্লা নিয়ে যাই, আর গিন্নির জন্য কাঁচাগোল্লা।”

ক্রেতাদের কাছে এই দোকানের প্রতি টান শুধু স্বাদের জন্য নয়, বরং স্মৃতির জন্যও। রোকেয়া সুলতানা জানান, পরিবারের যেকোনো অনুষ্ঠানের জন্য মিষ্টি কিনতে হলে তাদের প্রথম পছন্দ এই লক্ষ্মী নারায়ণই।

এমনকি দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদও ছাত্রজীবনে নিয়মিত এখানে আসতেন বলে জানান দোকান মালিকরা।

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এই প্রতিষ্ঠান প্রমাণ করে—স্বাদ যদি সত্যিকারের হয়, তবে সময় তাকে মুছে দিতে পারে না। অলক বসাকের স্বপ্ন, এই ঐতিহ্য যেন আরও শত বছর ধরে একইভাবে বেঁচে থাকে, নতুন প্রজন্মের হাত ধরে।

কিশোরগঞ্জের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা লক্ষ্মী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডার তাই শুধু একটি দোকান নয়—এটি এক জীবন্ত ঐতিহ্যের নাম।


img

সাংবাদিক রাষ্ট্রের কর্মচারী নন

প্রকাশিত :  ১১:০০, ০৬ জুন ২০২৬

আবদুল হামিদ মাহবুব

সম্প্রতি বরগুনা জেলা প্রশাসনের একটি চিঠি সাংবাদিক মহলে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। চিঠিতে জেলার কর্মরত সাংবাদিকদের প্রতি মাসের প্রথম রবিবার জেলা প্রশাসকের কাছে জেলার বিভিন্ন সমস্যা, অনিয়ম, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়েছে। নির্দেশটি জেলা প্রশাসকের। আর চিঠি ইস্যু করেছেন একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র মোঃ সোহেল রেজা। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বরগুনা জেলা প্রশাসনের জারিকৃত চিঠির বিষয় নিয়ে ইতোমধ্যে একটি তথ্যবহুল আলোচনা লিখেছেন। যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার সাথে যুক্ত,  এরা হয়তো সেটা দেখেছেন। আমি এখানে সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু কথা তুলে ধরছি সকল পাঠকের জানার জন্য। পাশাপাশি আমাদের সাংবাদিক বন্ধুদেরও বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

বরগুনা জেলা প্রশাসনের চিঠিটি দেখে অনেকের কাছে প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির একটি উদ্যোগ এটি। কিন্তু বিষয়টি গভীরভাবে ভাবলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। সাংবাদিক কি প্রশাসনের কাছে নিয়মিত রিপোর্ট দেওয়ার মানুষ? সাংবাদিক কি প্রশাসনের অনানুষ্ঠানিক তথ্য সংগ্রহকারী? নাকি তাঁর প্রধান দায়িত্ব জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা?

সাংবাদিকতার মূল দর্শন বলছে, সংবাদমাধ্যমের জন্ম হয়েছে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার জন্য। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের বাইরে এটি একটি স্বাধীন সামাজিক শক্তি। এর প্রধান কাজ হলো জনস্বার্থ রক্ষা করা, দুর্নীতি ও অনিয়ম তুলে ধরা এবং ক্ষমতার ব্যবহার সম্পর্কে জনগণকে সচেতন রাখা।

সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিক নীতিমালায় বারবার বলা হয়েছে, সাংবাদিকের প্রথম দায়িত্ব সত্যের প্রতি এবং তাঁর প্রথম আনুগত্য জনগণের প্রতি। কারণ সাংবাদিক কোনো সরকারি কর্মকর্তা নন। তিনি জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করেন। তাঁর দায়িত্ব সত্য তথ্য সংগ্রহ করা, যাচাই করা এবং জনগণের সামনে তুলে ধরা।

গণমাধ্যমকে দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার একটি স্বাধীন ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়। এই স্বাধীনতাই সংবাদমাধ্যমের শক্তি। যদি সংবাদমাধ্যম প্রশাসনিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয় বা সে রকম ধারণা তৈরি হয়, তাহলে তার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সংবাদমাধ্যমের অন্যতম প্রধান ভূমিকা হলো প্রহরীর ভূমিকা পালন করা। অর্থাৎ ক্ষমতা কোথায় কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কোথাও অনিয়ম হচ্ছে কি না, জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না; এসব বিষয়ে নজর রাখা। একজন সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে পর্যবেক্ষণ করা, প্রশ্ন তোলা এবং তথ্য প্রকাশ করা। প্রশাসনের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন জমা দেওয়া নয়।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা আচরণবিধিতেও সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ, সত্য ও নির্ভুল সংবাদ পরিবেশন এবং তথ্য যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে। কোথাও বলা নেই যে সাংবাদিকরা কোনো সরকারি কর্মকর্তার কাছে নিয়মিত প্রশাসনিক রিপোর্ট জমা দেবেন। এ কারণেই বরগুনা জেলা প্রশাসনের চিঠিটি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যে সাংবাদিক প্রশাসনের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করবেন, তিনি যদি একই সঙ্গে প্রশাসনের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদনও দেন, তাহলে তাঁর স্বাধীন অবস্থান কোথায় থাকবে?

রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ ও তদারকি ব্যবস্থা রয়েছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করে। ফলে জেলার পরিস্থিতি জানার জন্য সাংবাদিকদের প্রশাসনিক রিপোর্টদাতা হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তা কতটা যৌক্তিক, সেটি ভেবে দেখার বিষয়।

এ ধরনের উদ্যোগ থেকে কয়েকটি বাস্তব সমস্যা তৈরি হতে পারে। আমার বিবেচনায় সেগুলো হচ্ছে, সাধারণ মানুষের কাছে সাংবাদিকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, তথ্যদাতা বা অনিয়ম সম্পর্কে অবহিত ব্যক্তিরা সাংবাদিকের কাছে তথ্য দিতে দ্বিধা করতে পারেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। কারণ প্রশাসনের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক রিপোর্টিং সম্পর্ক সাংবাদিককে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলতে পারে এবং পেশাগত স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তবে এটাও সত্য যে জেলা প্রশাসনের উদ্দেশ্য হয়তো জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ করা। কিন্তু গণতান্ত্রিক সমাজে শুধু উদ্দেশ্য নয়, পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন চাইলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করতে পারে, সংবাদ সম্মেলন করতে পারে, বিভিন্ন বিষয়ে মতামত নিতে পারে কিংবা জনগণের সমস্যা নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা আয়োজন করতে পারে। এসব উদ্যোগ গণতান্ত্রিক ও ইতিবাচক। কিন্তু সাংবাদিকদের কাছ থেকে নিয়মিত প্রশাসনিক প্রতিবেদন আহ্বান করা সাংবাদিকতার স্বাধীন ভূমিকা সম্পর্কে একটি ভুল ধারণার প্রতিফলন বলে মনে হয়।

প্রশাসনের উপলব্ধি করা দরকার, সাংবাদিক রাষ্ট্রের শত্রু নন, আবার রাষ্ট্রের কর্মচারীও নন। তিনি জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। একজন স্বাধীন সাংবাদিক অনেক সময় ক্ষমতাসীনদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারেন, কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য তিনি অপরিহার্য। কারণ স্বাধীন সাংবাদিকতাই অনিয়ম উন্মোচন করে, দুর্নীতি প্রকাশ করে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।

বরগুনা জেলা প্রশাসনের চিঠিটি হয়তো সদিচ্ছা থেকেই জারি করা হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে এটি একটি বিতর্কিত বার্তা বহন করে। সাংবাদিককে প্রশাসনের মাসিক রিপোর্টদাতায় পরিণত করা যায় না।

সাংবাদিক জনগণের প্রতিনিধি। তাঁর কাজ জনগণের পক্ষে সত্য তুলে ধরা, ক্ষমতার ওপর নজর রাখা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। প্রশাসন ও গণমাধ্যম; উভয়ই রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে তাদের ভূমিকা এক নয়। সেই ভিন্নতাকে সম্মান করাই একটি পরিণত গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব।
মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪, ই-মেইল:  [email protected]

মতামত এর আরও খবর