img

পুঁজিবাজারে বড় চমক কি সময়ের ব্যাপার মাত্র?

প্রকাশিত :  ১৬:৫২, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

পুঁজিবাজারে বড় চমক কি সময়ের ব্যাপার মাত্র?

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের এই সময়টি বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধের মেঘ কাটিয়ে বিশ্ব আজ এক নতুন স্থিতিশীলতার সুপ্রভাতের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার পারদ নিম্নমুখী হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের উল্লেখযোগ্য পতন বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এক বিশেষ স্বস্তির বার্তা বয়ে এনেছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করতে একের পর এক তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজের আগমন এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহের শক্তিশালী অবস্থান আগামী রবিবারের পুঁজিবাজারে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বিশ্লেষণটি মূলত বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও দেশীয় সামষ্টিক অর্থনীতির নিরিখে আমাদের পুঁজিবাজারের সম্ভাব্য গতিপথকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিবর্তন ও তেলের মূল্যপ্রবণতা

বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত জ্বালানি তেলের বাজার গত কয়েক মাস ধরে যে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে এসে তা নাটকীয়ভাবে স্তিমিত হতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) দামে এখন নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। সাম্প্রতিক লেনদেনগুলোতে দেখা গেছে, ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৯৭.৯৯ ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের সেশনের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কম। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি ৯৫ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমার নিচেও অবস্থান করছে। জেপি মরগানের মতো বিশ্বখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বাভাস দিচ্ছে যে, ২০২৬ সাল জুড়ে তেলের গড় মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৬০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি চমৎকার সংকেত।

এই দরপতনের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত দুই সপ্তাহের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য একটি \'গেম চেঞ্জার\' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালী—যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী—পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন তেলের বাজারদর থেকে \'যুদ্ধ ঝুঁকি প্রিমিয়াম\' বা \'ওয়ার প্রিমিয়াম\' সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে দামের এই স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা: সংকট থেকে সম্ভাবনার দ্বারে

বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে আসার এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনায়ও এক অভাবনীয় গতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতের দুশ্চিন্তা লাঘব করে একের পর এক জ্বালানি তেল ও এলএনজিবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর এবং মহেশখালী টার্মিনালে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এটি শুধুমাত্র কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং সরকারের সুপরিকল্পিত আমদানি কৌশলেরই অংশ।

৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মালয়েশিয়া থেকে আসা দুটি বৃহৎ মাদার ট্যাংকার \'সেন্ট্রাল স্টার\' এবং \'ইস্টার্ন কুইন্স\' চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে। তারা মোট ৫১,০০০ মেট্রিক টন জ্বালানি (২৫,০০০ টন ফার্নেস অয়েল ও ২৬,০০০ টন অকটেন) বহন করে এনেছে। এছাড়া সিঙ্গাপুর থেকে আসা আরেকটি জাহাজ ২৭,০০০ টন ডিজেল খালাস করেছে। তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ১৫ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়া থেকে ৬৪,৬৭৮ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে \'মারান গ্যাস হাইড্রা\' মহেশখালীতে পৌঁছেছে এবং ১৮ এপ্রিল অ্যাঙ্গোলা থেকে আরও ৬৯,০১৫ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে \'লোবিটো\' আসার কথা রয়েছে। মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৩টি জ্বালানিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছেছে, যা দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক বিরাট স্বস্তি।

সামষ্টিক অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলো ২০২৬ সালের শুরুতেই ক্রমান্বয়ে উন্নতির শিখরে আরোহণ করছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা অর্থনীতির অন্তর্নিহিত শক্তিরই পরিচায়ক। ৭ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৩৫ বিলিয়ন ডলারে। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (এসিইউ) ও অন্যান্য বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের পরেও রিজার্ভের এই অবস্থান অত্যন্ত সন্তোষজনক।

রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রেও চলতি বছর নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। মার্চ মাসে প্রবাসীরা রেকর্ড ৩.৭৭৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা একক মাস হিসেবে এ যাবতকালের সর্বোচ্চ। এপ্রিলের প্রথমার্ধেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ১ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে ১,৭৮৮ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২১.৫ শতাংশ বেশি। এই শক্তিশালী রিজার্ভ ও রেকর্ড রেমিট্যান্সের ফলে ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে ৩.৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। একইসাথে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি (যা সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ১৪.২৪ শতাংশ) নাটকীয়ভাবে কমে ফেব্রুয়ারিতে ২.৩৯ শতাংশে নেমে আসায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বাজার স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

পুঁজিবাজারের গতিপ্রকৃতি ও রবিবারের পূর্বাভাস

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বিগত কয়েক সপ্তাহের সংশোধন প্রক্রিয়ার পর এখন একটি শক্তিশালী ঘুরে দাঁড়ানোর (রিবাউন্ড) উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ডিএসই সূচক ৫,৬০০ পয়েন্টের ঘর স্পর্শ করার পর মুনাফা শিকারিদের চাপে কিছুটা কমলেও গড় দৈনিক লেনদেন ১,০০০ কোটি টাকার ওপরে থাকা নির্দেশ করে যে বাজারে পর্যাপ্ত তারল্য ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ রয়েছে।

আগামী রবিবার পুঁজিবাজার ইতিবাচক থাকার পেছনে তিনটি প্রধান প্রভাবক কাজ করবে বলে আমি মনে করি:

প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় তালিকাভুক্ত উৎপাদনশীল ও বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় কমে আসবে, যা সরাসরি তাদের কর্পোরেট মুনাফায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে সিমেন্ট, সিরামিক ও ওষুধ খাতের কোম্পানিগুলো এই জ্বালানি স্বস্তির বড় সুবিধাভোগী হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্বজুড়ে শান্তি আলোচনার অগ্রগতি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে \'রিস্ক-অন\' মেজাজ ফিরিয়ে এনেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারগুলোতে ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তৃতীয়ত, দেশের শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি বিনিয়োগকারীদের মনে এই বিশ্বাস জন্মাবে যে দেশের অর্থনীতি বড় কোনো ঝুঁকির মুখে নেই।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এপ্রিলের এই সময়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বিশেষ মাহেন্দ্রক্ষণ। একদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বস্তি, অন্যদিকে দেশীয় শক্তিশালী অর্থনৈতিক সূচক—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার জন্য প্রস্তুত। বিনিয়োগকারীদের ভয় কাটিয়ে যৌক্তিক ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাজারে অংশ নেওয়ার এখনই সময়। আশা করা যায়, আগামী রবিবারের লেনদেন বিনিয়োগকারীদের জন্য এক নতুন আশার আলো বয়ে আনবে এবং দেশের পুঁজিবাজার তার ইতিবাচক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে।

মতামত এর আরও খবর

img

ডলারের আধিপত্য ধ্বংস করতে চীনের ‘ট্রেজারি–কৌশল’

প্রকাশিত :  ১৩:৩৪, ০১ জুন ২০২৬

জাসিম আল-আজ্জাউই

 চীন যখন ২০২৬ সালের বসন্তে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সিকিউরিটিজে নিজেদের বিনিয়োগ কমাতে শুরু করল, তখন ওয়াশিংটনের মূলধারার অনেক বিশ্লেষক স্বভাবগতভাবেই একে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘রুটিন’ ঘটনা বলে আখ্যা দেন। কিন্তু তাঁদের তা করা উচিত ছিল না। যা ঘটছে, তা আসলে এক দশকব্যাপী কৌশলের চূড়ান্ত পরিণতি; একটি পরিকল্পনা, যা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সর্বোচ্চ মুহূর্তে চীন চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ গ্রহণ ব্যয়কে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

পরিসংখ্যানগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৩ সালে চীনের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে ৬৯৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে এবং পরের মাসে আরও কমে দাঁড়ায় ৬৫২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে।

শুধু ২০২৬ সালের মার্চ মাসেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট মার্কিন ট্রেজারি ধারণ ১৩৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার কমে যায়। একই সময়ে শীর্ষ ১০ বিদেশি ধারকের মধ্যে জাপান, চীন, বেলজিয়াম, কানাডা, ফ্রান্সসহ সাতটি দেশ একযোগে তাদের ঝুঁকি বা এক্সপোজার কমিয়ে আনে।

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এল-এরিয়ান এ পরিবর্তনকে সরাসরি একটি কাঠামোগত রূপান্তর হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বাজারে চীনের অংশীদারত্ব এখন মাত্র ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ‘১৫ বছর আগে অর্জিত ২৮ শতাংশের সর্বোচ্চ অবস্থানের এক-চতুর্থাংশ মাত্র।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ধারাবাহিকভাবে নতুন ঋণপত্র ইস্যুর পরিপ্রেক্ষিতে এই পতন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামো মূলত ধারাবাহিকভাবে আগ্রহী ঋণদাতাদের ওপর নির্ভরশীল। ওয়াশিংটন সামরিক ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ফেডারেল কর্মচারীদের বেতন এবং বৈদেশিক প্রতিশ্রুতিগুলোর অর্থায়নের জন্য নিয়মিত বাজেটঘাটতি পরিচালনা করে এবং সেই ঘাটতি পূরণ করে নতুন ঋণ ইস্যুর মাধ্যমে।

এমন পরিস্থিতিতে চীনের মতো বড় ঋণদাতা যখন পিছু হটতে শুরু করে, তখন এর গাণিতিক প্রভাব অত্যন্ত কঠোর হয়। এর ফলে ট্রেজারির সুদের হার (ইয়িল্ড) বাড়ে, পুরোনো ঋণ নবায়নের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং বিদেশি চাহিদা কমে যাওয়ায় ডলারের ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়।

    প্রকৃত প্রশ্নটি আসলে এই নয় যে মার্কিন ডলার রাতারাতি তার বৈশ্বিক আধিপত্য হারাবে কি না। তা হবে না। আসল প্রশ্ন হলো, চীনের পদক্ষেপগুলো কি অন্য দেশগুলোকে একই সময়ে ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে সরে যেতে উৎসাহিত করবে?

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীন যখন নিজেদের ব্যাংকগুলোকে ট্রেজারি বিনিয়োগ কমানোর পরামর্শ দেয়, তখন অর্থনীতিবিদ পিটার শিফ বিষয়টি নিয়ে তাঁর স্বভাবসুলভ সরাসরি মন্তব্য করেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গবেষক ব্র্যাড সেটসারের মতে, যদি চীন তাদের পুরো ট্রেজারি পোর্টফোলিও বিক্রি করে দেয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার প্রায় ৩০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই হিসাব কেবল সরাসরি বাজারগত প্রভাবকে বিবেচনায় নেয়; অন্য বৈশ্বিক ঋণদাতাদের মধ্যে সম্ভাব্য আতঙ্ক বা চেইন-রি–অ্যাকশনের প্রভাব এতে ধরা হয়নি।

বহু বছর ধরে চীন নীরবে একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। তাদের লক্ষ্য হলো, যদি কখনো তারা মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে বা তা থেকে সরে আসতে চায়, তাহলে যেন নিজেদের অর্থনীতি কোনো বড় ধাক্কা না খায়। এটিকে এমনভাবে ভাবা যায় যে চীন একটি সম্পূর্ণ নতুন আর্থিক ‘এলাকা’ গড়ে তুলছে, যাতে ভবিষ্যতে আর যুক্তরাষ্ট্রের ‘বাড়িতে’ বসবাস করতে না হয়। তারা এটি যেভাবে করছে:

বৈশ্বিক অবকাঠামো তৈরির ‘মহাযাত্রা’: চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) নামে একটি বিশাল প্রকল্প শুরু করেছে, যা ১৪০টির বেশি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে। সারা বিশ্বে সড়ক, বন্দর, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে তারা প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। উদ্দেশ্য হলো, এসব দেশ যেন যুক্তরাষ্ট্রের ডলার ব্যবহার না করেও সরাসরি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারে।

নিজস্ব আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা: চীন সীমান্তের বাইরে লেনদেনের জন্য সিআইপিএস নামে নিজস্ব অর্থ প্রদানের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ২৪ দশমিক ৪৭ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ চীনা মুদ্রা ইউয়ানে লেনদেন সম্পন্ন হয়, যা আগের বছরের তুলনায় ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এর পাশাপাশি চীন বিশ্বের ৪০টির বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বিশেষ মুদ্রা বিনিময় (কারেন্সি সোয়াপ) চুক্তি করেছে।

বন্ধুদের সঙ্গে ডলারবিহীন বাণিজ্য: এটি আর কেবল তাত্ত্বিক পরিকল্পনা নয়; বাস্তবেও এর প্রয়োগ শুরু হয়ে গেছে। বর্তমানে চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার প্রায় ৯৫ শতাংশ বাণিজ্য তাদের নিজস্ব স্থানীয় মুদ্রায় সম্পন্ন হয়। একইভাবে ২০২৪ সালে ব্রাজিল ও চীনের মধ্যকার প্রায় অর্ধেক বাণিজ্য ইউয়ানে পরিচালিত হয়েছে।

বিকল্প অর্থনৈতিক জোট গঠন: চীন ব্রিকস জোট সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই জোটে এখন সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও ইথিওপিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ তেলসমৃদ্ধ ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দেশ যুক্ত হয়েছে। এই দেশগুলোকে একত্র করার মাধ্যমে চীন একটি সমান্তরাল বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামোগত ভিত্তি নির্মাণ করছে; অর্থাৎ যদি কখনো মার্কিন নেতৃত্বাধীন আর্থিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা চীন ইচ্ছাকৃতভাবে সেই ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তাদের কাছে ইতোমধ্যেই একটি বিকল্প বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক প্রস্তুত থাকবে, যা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতে পারবে।

এসব কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটি ধারাবাহিক কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ; প্রথমে বিকল্প পথ বা ‘প্রস্থানদ্বার’ তৈরি করা, তারপর ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, যেখানে মার্কিন ট্রেজারি বাজারে একটি বড় পদক্ষেপ নেওয়া যাবে—যার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা হবে অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু এর ফলে চীনের নিজের অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর ক্ষতি হবে না।

এই কৌশলের অংশ হিসেবেই পিপল’স ব্যাংক অব চায়না তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমশ সোনার দিকে সরিয়ে নিয়েছে। টানা ১৫ মাস ধরে সোনা কেনার পর চীনের স্বর্ণ মজুত রেকর্ড ২ হাজার ৩০৮ টনে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতির উদ্দেশ্য, স্পষ্টভাবে চীনের অর্থনীতিকে ‘নিষেধাজ্ঞা-প্রতিরোধী’ (স্যাংশন প্রুফ) করে তোলা। ২০২২ সালে রাশিয়ার সম্পদ জব্দ করার অভিজ্ঞতার সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।

এখানে ঝুঁকি শুধু অর্থের প্রবাহে নয়; বরং চীনের এই পদক্ষেপ অন্য দেশগুলোকে একই পথ অনুসরণ করার মনস্তাত্ত্বিক অনুমতি দিতে পারে। জাপান উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে; উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো নীরবে তাদের সম্পদ বৈচিত্র্যময় করছে; আর দীর্ঘদিন ধরে ডলারকেন্দ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার বিষয়ে সতর্ক থাকা তথাকথিত ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো ক্রমেই ওয়াশিংটনের মুদ্রানীতির আধিপত্য থেকে প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব খুঁজছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ)  তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মার্কিন ডলারের অংশীদারত্ব নেমে এসেছে ৫৭ দশমিক ৮ শতাংশে, যেখানে ২০০১ সালে তা ছিল ৭২ শতাংশ। একই সময়ে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তিন বছর ধরে প্রতিবছর এক হাজার টনের বেশি স্বর্ণ ক্রয় করেছে।

প্রকৃত প্রশ্নটি আসলে এই নয় যে মার্কিন ডলার রাতারাতি তার বৈশ্বিক আধিপত্য হারাবে কি না। তা হবে না। আসল প্রশ্ন হলো, চীনের পদক্ষেপগুলো কি অন্য দেশগুলোকে একই সময়ে ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে সরে যেতে উৎসাহিত করবে?

এই মুহূর্তে অনেক দেশ দ্বিধাগ্রস্ত। কিন্তু তারা যদি বুঝতে পারে যে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো নিরাপদ, তাহলে সেটিই একটি ভবিষ্যদ্বাণীতে পরিণত হতে পারে। প্রথম কয়েকটি ‘ডমিনো’ যখন পড়ে যাবে, তখন বাকিগুলোও একে একে অনুসরণ করবে।

ওয়াশিংটনের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাস্তবে রাজনৈতিক বক্তব্যে যতটা বড় করে দেখানো হয়, ততটা নয়। চীনের বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তার অভিঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাপর্যায়ে মূল্য, করপোরেট মুনাফা এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর সরাসরি পড়বে।

অ্যাপল, নাইকি ও টেসলার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো গভীরভাবে চীনা উৎপাদন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া ইউএস–চায়না ইকোনিমক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশন ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছে যে বেইজিংয়ের হাতে এসব পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত করার সক্ষমতা ক্রমশ বাড়ছে।

চীনকে আবার ট্রেজারি কেনায় ফিরিয়ে আনা বা বিক্রি বন্ধ করতে বাধ্য করার জন্য হয় এমন বাজার-প্রণোদনা প্রয়োজন, যা ওয়াশিংটন বর্তমানে দিতে পারছে না; অথবা এমন চাপ প্রয়োগের ব্যবস্থা প্রয়োজন, যার সবচেয়ে বড় মূল্য পরিশোধ করতে হবে মার্কিন ভোক্তাদেরই।

২০২৬ সালের বসন্তে সংঘটিত ব্যাপক বাজারপতন হয়তো একক কোনো বিস্ফোরণ নয়, যা মার্কিন ডলারকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় সতর্কসংকেত। বহু বছর ধরেই যাঁরা মনোযোগ দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন, তাঁরা এই প্রবণতা আসতে দেখেছেন।

আগামী দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা চীনের পরবর্তী পদক্ষেপ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, জাপান, সৌদি আরব এবং গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ কি এই মুহূর্তকে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিন্যাসের উপযুক্ত সময় হিসেবে দেখবে? যদি তারা তা–ই করে, তাহলে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ গতিপথ দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।

    জাসিম আল-আজ্জাউই এমবিসি গ্রুপ, আবুধাবি টিভি এবং আল–জাজিরা ইংলিশে সংবাদ উপস্থাপক, অনুষ্ঠান সঞ্চালক এবং নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।


(মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া)

মতামত এর আরও খবর