img

পুঁজিবাজারে বড় চমক কি সময়ের ব্যাপার মাত্র?

প্রকাশিত :  ১৬:৫২, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

পুঁজিবাজারে বড় চমক কি সময়ের ব্যাপার মাত্র?

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের এই সময়টি বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধের মেঘ কাটিয়ে বিশ্ব আজ এক নতুন স্থিতিশীলতার সুপ্রভাতের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার পারদ নিম্নমুখী হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের উল্লেখযোগ্য পতন বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এক বিশেষ স্বস্তির বার্তা বয়ে এনেছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করতে একের পর এক তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজের আগমন এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহের শক্তিশালী অবস্থান আগামী রবিবারের পুঁজিবাজারে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বিশ্লেষণটি মূলত বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও দেশীয় সামষ্টিক অর্থনীতির নিরিখে আমাদের পুঁজিবাজারের সম্ভাব্য গতিপথকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিবর্তন ও তেলের মূল্যপ্রবণতা

বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত জ্বালানি তেলের বাজার গত কয়েক মাস ধরে যে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে এসে তা নাটকীয়ভাবে স্তিমিত হতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) দামে এখন নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। সাম্প্রতিক লেনদেনগুলোতে দেখা গেছে, ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৯৭.৯৯ ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের সেশনের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কম। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি ৯৫ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমার নিচেও অবস্থান করছে। জেপি মরগানের মতো বিশ্বখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বাভাস দিচ্ছে যে, ২০২৬ সাল জুড়ে তেলের গড় মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৬০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি চমৎকার সংকেত।

এই দরপতনের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত দুই সপ্তাহের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য একটি \'গেম চেঞ্জার\' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালী—যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী—পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন তেলের বাজারদর থেকে \'যুদ্ধ ঝুঁকি প্রিমিয়াম\' বা \'ওয়ার প্রিমিয়াম\' সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে দামের এই স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা: সংকট থেকে সম্ভাবনার দ্বারে

বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে আসার এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনায়ও এক অভাবনীয় গতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতের দুশ্চিন্তা লাঘব করে একের পর এক জ্বালানি তেল ও এলএনজিবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর এবং মহেশখালী টার্মিনালে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এটি শুধুমাত্র কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং সরকারের সুপরিকল্পিত আমদানি কৌশলেরই অংশ।

৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মালয়েশিয়া থেকে আসা দুটি বৃহৎ মাদার ট্যাংকার \'সেন্ট্রাল স্টার\' এবং \'ইস্টার্ন কুইন্স\' চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে। তারা মোট ৫১,০০০ মেট্রিক টন জ্বালানি (২৫,০০০ টন ফার্নেস অয়েল ও ২৬,০০০ টন অকটেন) বহন করে এনেছে। এছাড়া সিঙ্গাপুর থেকে আসা আরেকটি জাহাজ ২৭,০০০ টন ডিজেল খালাস করেছে। তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ১৫ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়া থেকে ৬৪,৬৭৮ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে \'মারান গ্যাস হাইড্রা\' মহেশখালীতে পৌঁছেছে এবং ১৮ এপ্রিল অ্যাঙ্গোলা থেকে আরও ৬৯,০১৫ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে \'লোবিটো\' আসার কথা রয়েছে। মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৩টি জ্বালানিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছেছে, যা দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক বিরাট স্বস্তি।

সামষ্টিক অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলো ২০২৬ সালের শুরুতেই ক্রমান্বয়ে উন্নতির শিখরে আরোহণ করছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা অর্থনীতির অন্তর্নিহিত শক্তিরই পরিচায়ক। ৭ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৩৫ বিলিয়ন ডলারে। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (এসিইউ) ও অন্যান্য বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের পরেও রিজার্ভের এই অবস্থান অত্যন্ত সন্তোষজনক।

রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রেও চলতি বছর নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। মার্চ মাসে প্রবাসীরা রেকর্ড ৩.৭৭৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা একক মাস হিসেবে এ যাবতকালের সর্বোচ্চ। এপ্রিলের প্রথমার্ধেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ১ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে ১,৭৮৮ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২১.৫ শতাংশ বেশি। এই শক্তিশালী রিজার্ভ ও রেকর্ড রেমিট্যান্সের ফলে ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে ৩.৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। একইসাথে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি (যা সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ১৪.২৪ শতাংশ) নাটকীয়ভাবে কমে ফেব্রুয়ারিতে ২.৩৯ শতাংশে নেমে আসায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বাজার স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

পুঁজিবাজারের গতিপ্রকৃতি ও রবিবারের পূর্বাভাস

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বিগত কয়েক সপ্তাহের সংশোধন প্রক্রিয়ার পর এখন একটি শক্তিশালী ঘুরে দাঁড়ানোর (রিবাউন্ড) উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ডিএসই সূচক ৫,৬০০ পয়েন্টের ঘর স্পর্শ করার পর মুনাফা শিকারিদের চাপে কিছুটা কমলেও গড় দৈনিক লেনদেন ১,০০০ কোটি টাকার ওপরে থাকা নির্দেশ করে যে বাজারে পর্যাপ্ত তারল্য ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ রয়েছে।

আগামী রবিবার পুঁজিবাজার ইতিবাচক থাকার পেছনে তিনটি প্রধান প্রভাবক কাজ করবে বলে আমি মনে করি:

প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় তালিকাভুক্ত উৎপাদনশীল ও বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় কমে আসবে, যা সরাসরি তাদের কর্পোরেট মুনাফায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে সিমেন্ট, সিরামিক ও ওষুধ খাতের কোম্পানিগুলো এই জ্বালানি স্বস্তির বড় সুবিধাভোগী হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্বজুড়ে শান্তি আলোচনার অগ্রগতি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে \'রিস্ক-অন\' মেজাজ ফিরিয়ে এনেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারগুলোতে ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তৃতীয়ত, দেশের শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি বিনিয়োগকারীদের মনে এই বিশ্বাস জন্মাবে যে দেশের অর্থনীতি বড় কোনো ঝুঁকির মুখে নেই।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এপ্রিলের এই সময়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বিশেষ মাহেন্দ্রক্ষণ। একদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বস্তি, অন্যদিকে দেশীয় শক্তিশালী অর্থনৈতিক সূচক—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার জন্য প্রস্তুত। বিনিয়োগকারীদের ভয় কাটিয়ে যৌক্তিক ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাজারে অংশ নেওয়ার এখনই সময়। আশা করা যায়, আগামী রবিবারের লেনদেন বিনিয়োগকারীদের জন্য এক নতুন আশার আলো বয়ে আনবে এবং দেশের পুঁজিবাজার তার ইতিবাচক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে।

মতামত এর আরও খবর

img

সংবিধানে ঢোকার পথেই সীলমোহর মেরে রাখা হয়েছে

প্রকাশিত :  ১৩:২৯, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

আবদুল হামিদ মাহবুব

বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে এই দেড় মাসের মত হল। এই স্বল্প সময়ে সংবিধান-সংবিধান নিয়ে এত এত কথা শুনেছি যে, সংবিধানের প্রতি একধরনের বিরক্তিই সৃষ্টি হয়ে গেছে। শেখ হাসিনার শাসনের বিগত প্রায় ১৬ বছর সংবিধান বিষয়ে যত কথা শুনেছিলাম, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর আর বর্তমান সরকারের এই দেড় মাসে যেন তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শুনে ফেললাম।

আসলে কি আমরা সংবিধান মেনেই রাষ্ট্র চালাই? শেখ হাসিনা কি সংবিধানের প্রতি অনুচ্ছেদ, ধারা, উপধারা ধরে ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন? আমার তো মনে হয়, সেটা তিনি করেননি। তার মত করে চালাতে গিয়ে যখন যে যে অংশ প্রয়োজন, তিনি সেটুকু ব্যবহার করে তার মতই চালিয়েছেন। সংবিধানের কোথাও কি লেখা আছে কলাকৌশল করে অনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে দেশ পরিচালনা করা যাবে? ২০১৪ সালে ১৫৩ আসনেই অনির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন!

২০১৮ সালে তো বিএনপিও নির্বাচনে অংশ নিল। কিন্তু এমন কৌশল করে নিশিবেলায় ভোটের কাজ সেরে ফেলা হলো। সেই সংসদ পূর্ণ মেয়াদ কাজ শেষ করল! আর ২০২৪-এ  নিজেরা নিজেরা নিজেদের মত যাকে চেয়েছেন তাকেই সংসদ সদস্য বানিয়ে এনে দেশটা নিয়ে এগোতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু ছাত্রদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে যখন বিপ্লব বলুন আর গণঅভ্যুত্থাই বলুন, সেই রূপ যখন নিলো, তখন শেখ হাসিনা শাসক ‘ইয়াজিদ’-এর সেই সীমারের মত নির্দয় হয়ে হাজারের ওপর লাশ ফেলে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করল। শরীরের অঙ্গ-পতঙ্গ হারিয়ে কত হাজার হলেন পঙ্গু।

অবশেষে শেখ হাসিনা তার সভাসদ আত্মীয়-স্বজন সবাইকে নিয়ে পালিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু সবাই রক্ষা পেল না। পাঁচশতাধিক জন সেনানিবাসে আশ্রয় নিলেন। সেনাবাহিনী তাদের প্রাণে বাঁচিয়ে দিয়ে সুযোগে সুযোগে সরে যাওয়ার পথ করে দিল! কেউ কেউ নিরাপদে সরে গেলেন। কিন্তু অনেকেই এখন জালে আটকা পড়ছেন। এইতো সেদিন দেখলাম গত সংসদের স্পিকারকে পুলিশ ধরে এনে কারাগারে পাঠালো!

আমি সংবিধান বিশেষজ্ঞ নই। কিন্তু সংবিধানের প্রসঙ্গ টেনে লেখার সূত্রপাত করেছি। আমার মত অক্ষরজ্ঞানওয়ালা বেয়াক্কেলকেও অতীতে কয়েকবার সংবিধান ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে দেশে যখন সংঘাতময় একটা অবস্থা চলছিল, তখন সেই সংবিধান ঘাঁটাঘাঁটি করে আমি লিখেছিলাম ‘সংঘাত এড়াতে একটি নির্বাচনী ফর্মূলা’। সেই লেখা প্রকাশ হওয়ার পর বেশ সাড়া পড়েছিল।

গত কদিন ধরে সংবিধান আর সংবিধান শুনতে শুনতে আবার ঘাঁটাচ্ছি। ঘাঁটাতে গিয়ে সংবিধানের প্রথম ভাগের  ‘৭খ’ পড়েই আমি থেমে গেছি। এই ‘৭খ’-তে যে কথাগুলো বলা আছে সেগুলো যদি বহাল রেখে দেওয়া হয় তাহলে এই দেশের ক্ষমতায় যে দলই যাক না কেন, সেই দলই শেখ হাসিনার মত ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠবেই। নিশ্চয়ই পাঠকরা জানতে চাচ্ছেন ‘৭খ’-তে কি আছে?

‘৭খ’-তে আছে “সংবিধানে ১৪২ অনুচ্ছেদে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথম ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, নবম-ক ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সাপেক্ষে তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ সমূহের বিধানাবলী সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপণ, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোন পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য হইবে।”

যেসব বিষয় “সংশোধন অযোগ্য হইবে” উল্লেখ করে সংবিধানে ঢোকার পথেই সীলমোহর মেরে রাখা হয়েছে, সেগুলো আর এখানে দিলাম না। দিলে এই লেখা অনেক বড় হয়ে যাবে। আমি মনে করি আমার এই লেখার পাঠক সকলেই ‘গুগল’ সার্চ করতে জানেন। কেউ যদি পুরোটা পড়তে চান, তবে গুগলে সার্চ করে সংবিধানের সেই অংশগুলো পড়ে নেবেন।  

সংবিধানে লিখে রাখা এই সাড়ে পাঁচ লাইন সারা সংবিধানের রক্ষক হয়ে আছে! এবার একজন সাধারন মানুষ হিসাবে ভাবুন, সংবিধানের এই অংশ থাকা অবস্থায় কোন পরিষদের কি ক্ষমতা আছে সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন কিংবা সংশোধন ঘটানোর? আমি জানিনা আমাদের আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবী প্রস্তাব আলোচনার জন্য উত্থাপিত হলে, তিনি এত এত বই সামনে আনার জন্য বলেছিলেন কেন? তিনি যখন ‘জুলাই সনদ’ প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখলেন, তখন তো আমার মনে হল বক্তব্যটি তিনি সংসদে নয় পল্টন ময়দানে দিচ্ছেন। তিনি যেসব বইয়ের কথা বলেছিলেন, এমন কি মদীনা সনদের প্রসঙ্গ থেকেও তো তেমন কোনো উদ্ধৃতি দিতে দেখলাম না! তাহলে কি একজন আমজনতা হিসেবে ধরে নেব, আমাদের লেখালেখির শুরুর দিকে কোনো কোনো বন্ধু ইংরেজি সাহিত্যের বই বগলে নিয়ে ঘুরাঘুরি করতো। তারা আমাদের বোঝাত ওইসব ইংরেজি বই তারা পড়ে নতুন নতুন সাহিত্য শিখছে। আমরা তাদের আঁতেল বলতাম! আইনমন্ত্রী তার পাণ্ডিত্য দেশবাসীকে জানান দেওয়ার জন্য কি ওইসব বইয়ের কথা বলেছিলেন?

আমি জানি এই আইনমন্ত্রী খুবই পণ্ডিত একজন মানুষ। আইনের এমন কোন বিষয় নেই, যা তিনি জানেন না। তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু যেসব বইয়ের কথা বললেন, অথচ তার বক্তব্যেই সেসব বই থেকে তেমন কিছুই উদ্ধৃত হলো না! তাই আমি প্রসঙ্গটি টেনে আনলাম।

গত (০৭ এপ্রিল ২০২৬) মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন কেন অপরিহার্য?’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধে বিচারপতি এম এ মতিন আমাদের আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দেন। প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুযায়ী বিচারপতি এম এ মতিন বলেন, ‘শোনা যাচ্ছে, জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী সংসদ সদস্যগণকে হবস পড়ার উপদেশ দিয়েছেন। হবসের দর্শন হচ্ছে দেশের শাসক হবেন এমন একজন, যিনি হবেন সর্বশক্তিমান এবং সকল আইনের ঊর্ধ্বে। যেমন রোমান সম্রাটরা ছিল। হবসের দর্শন অনুসরণ করে সে যুগে স্বৈরাচার জন্ম নিয়েছিল। আমরা কি আবার স্বৈরশাসক চাচ্ছি?’

প্রবন্ধে বলা হয়, আগের আইনমন্ত্রীরা শেখ হাসিনাকে হবস পড়িয়েছিলেন। তাঁকে জন অস্টিনের ‘কমান্ড থিওরি’ ভালো করে পড়িয়েছিলেন। ফলে তাঁকে শেখানো হয়েছে শাসকের আদেশই আইন। অথচ অস্টিনের জায়গা এইচ এল হার্ট দখল করার পর ইউরোপের আইনের জগতে সন্নিবেশিত হয়, আদেশ নয়, বিধিই আইন। কিন্তু হাসিনাকে সেই আইন পড়ানো হয়নি। হাসিনাসহ তাঁর আইনমন্ত্রী ‘হায়ার ল’ অমান্য করেছিলেন। তাঁরা আজ কোথায়?

তিনি জন লকের একটি মতবাদকে উদ্ধৃত করে বলেন, শাসক যখন নির্যাতক হয়ে যায়, তখন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে সরিয়ে দেওয়া মানুষের স্রষ্টা প্রদত্ত অধিকার।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে যে তিনজন রাষ্ট্রচিন্তাবিদের ‘সামাজিক চুক্তি মতবাদ’ নিয়ে আলোচনা এসেছে, তাঁদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:

ইংরেজ দার্শনিক থমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯) আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘লেভিয়াথান’ (১৬৫১)। তিনি মনে করতেন, মানুষ জন্মগতভাবে স্বার্থপর ও বিশৃঙ্খল। তাই সমাজকে শান্ত রাখতে একজন ‘নিরঙ্কুশ’ বা সর্বশক্তিমান শাসকের প্রয়োজন। তাঁর মতে, জনগণ নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে শাসকের কাছে সব ক্ষমতা সঁপে দেয় এবং শাসকের আদেশ অমান্য করার অধিকার তাদের থাকে না।

ইংল্যান্ডের চিকিৎসক এবং দার্শনিক জন লককে (১৬৩২-১৭০৪) বলা হয় ‘উদারতাবাদের জনক’। তাঁর প্রধান কাজ ‘টু ট্রিটিজেস অব গভর্নমেন্ট’ (১৬৮৯)। হবসের উল্টো পথে হেঁটে লক বলেন, মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার হলো প্রাকৃতিক বা জন্মগত অধিকার। সরকার গঠিত হয় জনগণের সম্মতিতে এই অধিকারগুলো রক্ষার জন্য। যদি কোনো শাসক এই অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হন বা অত্যাচারী হন, তবে সেই সরকারকে উৎখাত করার অধিকার জনগণের রয়েছে।

জেনেভায় জন্ম নেওয়া জঁ-জাক রুশো (১৭১২-১৭৭৮) একজন ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি ‘দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ (১৭৬২) গ্রন্থের জন্য বিশ্বখ্যাত। তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষ স্বাধীন হয়ে জন্মায়, কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলিত।’ রুশোর মতে, রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া উচিত ‘সাধারণ ইচ্ছা’ বা জনগণের সামষ্টিক মতের ভিত্তিতে। তাঁর এই দর্শনেই আধুনিক গণতন্ত্র ও ফরাসি বিপ্লবের বীজ নিহিত ছিল।’

সংসদে বিএনপি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালিত হবে। আমাদের  আইনমন্ত্রীও একই কথা বলেছেন। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে সংবিধানে ‘৭খ’ বহাল থাকা অবস্থায় কি করে মূল (জুলাই জাতীয় সনদে থাকা) জায়গাগুলোতে পরিবর্তন কিংবা সংশোধন আনবেন? শেখ হাসিনা কিন্তু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে দিয়ে কুটিল বুদ্ধিতে খুবই জটিল ভাবে সংবিধান সংশোধন করিয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দিয়েও সংবিধানের মূল বিষয়গুলো সংশোধনের পথ বন্ধ করে রেখেছে। অবশ্য বর্তমান সংসদের কাছে গণভোটের ফলাফল আছে। এই ফলাফল জনগণের অভিমতের প্রকাশ। এটাকে মূল্যায়ন করেই একমাত্র সংবিধানের ভিতরে প্রবেশ করার পথ খুলতে হবে। আর সংবিধান এভাবে রেখেই যদি বর্তমান সরকার এগোতে চায়, তা হলে শেখ হাসিনার মত যখন প্রয়োজন, সংবিধানের যে অংশ পক্ষে পাওয়া যাবে, সে অংশ মানব। আর যে অংশ পক্ষে পাওয়া যাবেনা সেটা লংঘন করব!

উপরের শেষ দুই বাক্যের মতোই কি দেশটা চলবে? যদি এভাবে চলে; তাহলে আগামীতেও আমরা দেখব রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফ্যাসিস্ট বসে আছে। জনতা কি তখন চুপ করে থাকবে? নব্বই এবং চব্বিশ বুঝিয়ে দিয়েছে একটা সময় পর্যন্ত আমজনতাকে ঠেকিয়ে রাখা যায়। কিন্তু কোনো না কোনো সময় এই জনতা বিস্ফোরণে গর্জে উঠে সব তোলপাড় করে দেয়। আমরা কি একটা স্থিতিশীল রাষ্ট্রের পথে হাঁটবো না? এই দেশের মানুষ কি কেবল নব্বই কিংবা চব্বিশ ঘটানো নিয়েই ব্যস্ত থাকবে?

আমি এই লেখা যখন লিখছি আমার মাথায় গুনগুন করছে লালনের সেই বিখ্যাত একটি চরণ, ‘সময় গেলে সাধন হবে না’। বিষয় সংবিধান; কিন্তু মাথায় কেনো ‘সময় গেলে সাধন হবে না’ ঘুরছে বুঝতে পারছি না! আমার মনে হচ্ছে; আমরা কেবল সময়কে যেতেই দিচ্ছি, যেতেই দিচ্ছি! আমরা কি সময় যেতেই দেবো? এভাবে যেতেই দেবো? সময় যেতে যেতে আমরা কোন সীমানায় গিয়ে পৌঁছাবো? তাই বলি সকলের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।  

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব। সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রকাশিত গ্রন্থ: ‘গণমাধ্যম সাংবাদিকতা দেশ দশের আমার কথা’।


আবদুল হামিদ মাহবুব: মৌলভীবাজার,  ই-মেইল:  ahmahbub@gmail.com

মতামত এর আরও খবর