img

ক্ষমতা নয়, জবাবদিহিতাই গণতন্ত্রের শক্তি: ব্রিটিশ সংসদীয় নৈতিকতার পাঠ

প্রকাশিত :  ১৯:০২, ০৯ জুলাই ২০২৬

ক্ষমতা নয়, জবাবদিহিতাই গণতন্ত্রের শক্তি: ব্রিটিশ সংসদীয় নৈতিকতার পাঠ

নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল

গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় তখন, যখন একজন জনপ্রিয় নেতাকেও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।

কারণ প্রকৃত গণতন্ত্র শুধু জনগণের ভোটে ক্ষমতায় যাওয়ার নাম নয়; বরং ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা কতটা স্বচ্ছতা, নৈতিকতা এবং জবাবদিহিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, সেটিই একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার প্রকৃত মাপকাঠি।

যুক্তরাজ্যের সংসদীয় সংস্কৃতি এই দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এখানে কোনো রাজনীতিবিদ যত জনপ্রিয়ই হোন না কেন, তাঁর আর্থিক স্বচ্ছতা, আচরণ এবং দায়িত্ব পালনের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে নাইজেল ফারাজকে ঘিরে রাজনৈতিক অর্থায়ন ও সংসদীয় নৈতিকতা নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটি আবারও একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে।

গণতন্ত্রে জনপ্রিয়তা কি জবাবদিহির বিকল্প হতে পারে?

একজন আইনবিদ হিসেবে আমার উত্তর স্পষ্ট-না।

জনপ্রিয়তা একজন রাজনীতিবিদকে জনগণের সমর্থন দিতে পারে, কিন্তু আইনের শাসনের বাইরে কোনো বিশেষ অধিকার দিতে পারে না।

অভিযোগ, তদন্ত ও প্রমাণ: আইনের মৌলিক শিক্ষা

আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোর একটি হলো-অভিযোগ এবং অপরাধ এক বিষয় নয়।

কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে। তদন্ত হতে পারে। গণমাধ্যমে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা ন্যায়বিচারের মূলনীতির পরিপন্থী।

যুক্তরাজ্যের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির শক্তি এখানেই। এখানে তদন্ত একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার নয়।

একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, জনআস্থা রক্ষার জন্য ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

ব্রিটিশ সংসদীয় নৈতিকতার ভিত্তি:

যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সের সংসদ সদস্যদের জন্য “Code of Conduct for Members of Parliament” রয়েছে। এই নীতিমালার উদ্দেশ্য হলো সংসদ সদস্যদের আচরণে সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের আস্থা বজায় রাখা।

এই নৈতিক কাঠামোর পেছনে রয়েছে বিখ্যাত Nolan Principles:

Selflessness (নিঃস্বার্থতা), Integrity (সততা), Objectivity (নিরপেক্ষতা),Accountability (জবাবদিহিতা), Openness (স্বচ্ছতা),Honesty (সততা),Leadership (নৈতিক নেতৃত্ব)

এই নীতিগুলো শুধু কাগজে লেখা কিছু নিয়ম নয়; এগুলো ব্রিটিশ জনজীবনের নৈতিক ভিত্তি।

সংসদ সদস্যরা কীভাবে জবাবদিহির আওতায় থাকেন?

যুক্তরাজ্যে সংসদ সদস্যদের নির্দিষ্ট আর্থিক স্বার্থ, উপহার এবং বাইরের আয়ের বিষয় প্রকাশ করতে হয়।

এর উদ্দেশ্য হলো জনগণ যেন জানতে পারেন, কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি এমন কোনো আর্থিক সম্পর্কের মধ্যে আছেন কি না যা তাঁর দায়িত্ব পালনে প্রভাব ফেলতে পারে।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন-স্বচ্ছতা দাবি করা মানেই কাউকে অপরাধী বলা নয়।

বরং স্বচ্ছতা এমন একটি ব্যবস্থা, যা অপ্রয়োজনীয় সন্দেহ কমায় এবং জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করে।

রাজনৈতিক অর্থায়ন: গণতন্ত্রের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

রাজনৈতিক দল পরিচালনার জন্য অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু অর্থের উৎস যদি অস্পষ্ট হয়, তাহলে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

এই কারণেই যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক অনুদান ও অর্থায়নের ওপর নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে।

গণতন্ত্রে জনগণের অধিকার শুধু ভোট দেওয়া নয়; বরং তারা জানার অধিকার রাখেন-তাদের প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কীভাবে অর্থায়িত হচ্ছে।

কারণ অর্থ এবং ক্ষমতার সম্পর্ক সবসময়ই জনস্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

গণমাধ্যম ও আইনের ভারসাম্য:

একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে,নীতিনির্ধারকদের জবাবদিহির মধ্যে রাখে এবং জনগণের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে।

তবে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মূলনীতি হলো-প্রমাণের আগে রায় নয়।

একজন সাংবাদিক প্রশ্ন তুলতে পারেন, বিশ্লেষণ করতে পারেন, তথ্য প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু আদালতের ভূমিকা পালন করতে পারেন না।

এই ভারসাম্যই একটি সুস্থ গণতন্ত্রের পরিচয়।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে রাজনৈতিক বিতর্কে একটি সমস্যা দেখা যায়-অভিযোগ উঠলেই মানুষ রাজনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী বিভক্ত হয়ে যায়।

এক পক্ষ অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য মনে করে।

অন্য পক্ষ কোনো যাচাই ছাড়াই সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু একটি পরিণত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এর চেয়ে ভিন্ন।

সেখানে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে আবেগ নয়, প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে জনপ্রিয়তা নয়, আইনের শাসন শেষ কথা।

পরিশেষে বলতে হয়,ক্ষমতা মানুষকে সাময়িকভাবে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু জবাবদিহিতাই একটি গণতন্ত্রকে দীর্ঘস্থায়ী করে।

একজন প্রধানমন্ত্রী, একজন সংসদ সদস্য কিংবা একজন জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা কেউই জনগণের আস্থা এবং আইনের শাসনের ঊর্ধ্বে নন।

ব্রিটিশ সংসদীয় সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, গণতন্ত্র শুধু কে ক্ষমতায় যাবে সেই প্রশ্ন নয়; বরং ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরা কতটা নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার নেতাদের জনপ্রিয়তায় নয়, বরং তার প্রতিষ্ঠানগুলোর সততা, স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতিতে।


নূর আলম সিদ্দিকী রাসেল: আইনবিদ, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
img

গাজায় ইসরায়েলি নিষ্ঠুরতা ও ভারতের নীরবতা: সোনিয়া গান্ধী

প্রকাশিত :  ০৬:৫১, ০১ জুলাই ২০২৬

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন অভিযোগ করেছিল, গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। ২০২৬ সালের জুনে একই কমিশন, যার নেতৃত্বে বর্তমানে ভারতের সাবেক বিচারপতি এস মুরলীধর রয়েছেন, আবারও দাবি করেছে যে গাজার শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেষ্টা করছে ইসরায়েল।

৯৪ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনটি পড়া সত্যিই এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। ইসরায়েল গাজায় যে চরম ধ্বংসযজ্ঞ ও পরিকল্পিত গণহত্যা চালাচ্ছে, তার রোমহর্ষ বিবরণ রয়েছে এতে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত ২০ হাজার শিশু নিহত এবং আরও ৪৪ হাজার শিশু আহত হয়েছে, যাদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছে। শিশুদের ওপর এই হামলা কোনো দুর্ঘটনাবশত ঘটনা নয়, এটি একটি পরিকল্পিত কৌশল। হতাহত ব্যক্তিদের শতকরা ২৭ ভাগই শিশু। নিহত অনেক ছেলের মাথায় ও ঘাড়ে গুলির ক্ষত পাওয়া গেছে।

গাজার ৯৭ শতাংশ স্কুল ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। শিশু হাসপাতালসহ স্বাস্থ্য অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ায় গর্ভপাত এবং সন্তান প্রসবজনিত জটিলতা ৩০০ শতাংশ বেড়েছে।

হামাস কর্তৃক ইসরায়েলের ওপর চালানো হামলার পর আড়াই বছর পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাল্টা জবাব ছিল চরম নিষ্ঠুর ও বর্বরতায় ভরা। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু থেকে শুরু করে তাঁর মন্ত্রিসভার শীর্ষ সদস্যরা গাজাকে ‘সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ’ ও ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করার ডাক দিয়েছেন। তাঁরা ফিলিস্তিনিদের ‘পশু’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন যে তাদের ‘বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই’। এমনকি গাজা থেকে ‘লাখ লাখ মানুষের পালিয়ে যাওয়াকেই’ তাঁরা নিজেদের সাফল্য হিসেবে দেখছেন।

এমন স্পষ্ট গণহত্যামূলক অভিপ্রায় থাকা সত্ত্বেও, ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অকুণ্ঠ সমর্থন ইসরায়েলকে এই নিষ্ঠুর অভিযান চালিয়ে যেতে সাহায্য করছে। তবে বিশ্বের বাকি দেশগুলোর বিবেক এবার জেগে উঠেছে।

আমেরিকার ভেটো ও বাধার কারণে জাতিসংঘ কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে না পারলেও, এর সংস্থাগুলো ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধের নথিপত্র তৈরিতে চমৎকার ভূমিকা পালন করেছে। পশ্চিমা ব্লকের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত শীর্ষ দেশগুলো—যেমন ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া—ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, অথচ কয়েক দশক ধরে তারা ফিলিস্তিন ইস্যুতে উদাসীন ছিল। 

দক্ষিণ আফ্রিকা, যার সঙ্গে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের সংহতির ইতিহাস রয়েছে, তারা ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের দায়ে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আদালতে দাঁড় করিয়েছে। ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ ইসরায়েলে অস্ত্র বিক্রি সীমিত করেছে এবং লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশ সম্পর্ক ছিন্ন বা সীমিত করেছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এমনকি ইসরায়েলি রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছেন। ভারতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এমন বহু দেশ গাজায় ইসরায়েলের এই কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।

মোদি সরকারের এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা শুধু নৈতিকভাবেই ভুল নয়, বরং ভারতের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের দিক থেকেও এর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। আমরা এমন এক সময়ে ইসরায়েলের কৌশলগত বলয়ের দিকে আরও ঝুঁকে পড়ছি, যখন সারা বিশ্ব তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান জনরোষ এবং গাজায় চালানো এই বর্বরতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের মাঝেও ভারত কেবলই নীরব। বিচারপতি মুরলীধরের এই প্রতিবেদন, যা বিশ্বজুড়ে গাজা গণহত্যার বিরুদ্ধে নতুন করে আলোচনা ও আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে, তা নিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকার সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। অবশ্য এটি মোটেও অবাক হওয়ার মতো বিষয় নয়। মনে রাখা দরকার, ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার আগে বিজেপির নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশ কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন বিচারপতি মুরলীধর। এর পরপরই তাঁকে দিল্লি হাইকোর্ট থেকে বদলি করা হয়েছিল।

ভারত ঐতিহাসিকভাবে উপনিবেশবাদ-বিরোধী সংহতি, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক শান্তির পক্ষে এক অনন্য কণ্ঠস্বর ছিল। কিন্তু আজ বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুনের লঙ্ঘন, গ্লোবাল সাউথের মানুষের কষ্ট এবং গাজা ও পশ্চিম তীরে মানবতাবোধের চরম অবমাননার পরও ভারতের এই নীরবতা সত্যিই এক ব্যতিক্রমী ও দুঃখজনক ঘটনা।

পাঁচ বছরের শিশু হিন্দ রজবের করুণ গল্পটি গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার এক নির্মম প্রতীক। গাজা শহর থেকে পরিবারের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাদের গাড়ি লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বাহিনী ৩৩৫টি গুলি চালায়। এতে তার পরিবারের ছয় সদস্যই নিহত হন। উদ্ধারকারীদের আসার অপেক্ষায় হিন্দ ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ির ভেতরে স্বজনদের লাশের মাঝে আটকে ছিল। শেষ পর্যন্ত দুই উদ্ধারকর্মীসহ তাকেও হত্যা করা হয়।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের নাগরিকদের মতো ভারতের নাগরিকদেরও হিন্দ রজব এবং গাজার অসংখ্য শিশুর এই গল্প জানার অধিকার আছে। অথচ, ইসরায়েলের অনুভূতিতে যাতে আঘাত না লাগে, সে জন্য এই বিষয়ক একটি চলচ্চিত্র ভারতে মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়েছিল। অবশেষে জনগণের তীব্র চাপের মুখে তা প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

মোদি সরকারের এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা শুধু নৈতিকভাবেই ভুল নয়, বরং ভারতের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের দিক থেকেও এর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই। আমরা এমন এক সময়ে ইসরায়েলের কৌশলগত বলয়ের দিকে আরও ঝুঁকে পড়ছি, যখন সারা বিশ্ব তাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

এই যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে এবং ইরানের ওপর ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে হত্যার মাত্র কয়েক দিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ইসরায়েল সফর ইতিহাসে একটি বিভ্রান্তিকর কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে। এর ফলে ফিলিস্তিন, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ঐতিহাসিক বন্ধুদের কাছ থেকে আমরা নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছি।

আমরা বিশ্বজনমত থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। আর এই সুযোগে পাকিস্তানের মতো একটি দেশ, যারা নিজেরা সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য পরিচিত, তারা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে এগিয়ে এসেছে—যে ভূমিকার দাবিদার ঐতিহাসিকভাবে সবার বন্ধু হিসেবে ভারতেরই হওয়ার কথা ছিল। নিজেদের নৈতিকতা ও কৌশলগত স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে আমরা কেবল প্রধানমন্ত্রী মোদি ও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মধ্যকার বন্ধুত্বটুকুই পেয়েছি। অথচ সেই নেতানিয়াহু আজ খোদ আমেরিকাসহ পুরো বিশ্বেই সমালোচিত।

ভারতের জাতীয়তাবোধের চেতনা দাবি করে যে আমরা যেন আমাদের ফিলিস্তিনি ভাইবোনদের পক্ষে কথা বলি, যাঁদের সন্তানদের এভাবে নির্মমভাবে টার্গেট করা হচ্ছে। দেশের জাতীয় স্বার্থের জন্যও ইসরায়েলি গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড এবং পশ্চিম তীরে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদ করার বিরুদ্ধে যে বিশ্বজনমত তৈরি হয়েছে, ভারত যেন তার সঙ্গে সুর মেলায়। মোদি সরকারের এই অনড় নীরবতার কোনো যৌক্তিক বা নৈতিক ব্যাখ্যা নেই।

সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির চেয়ারপারসন