img

নিঃশব্দে নীরব হয়ে যাওয়া এক জীবনের আলো—শিপ্রা পালের স্মৃতিতে শ্রদ্ধার ফুল

প্রকাশিত :  ০৯:৩৩, ২৭ এপ্রিল ২০২৬

নিঃশব্দে নীরব হয়ে যাওয়া এক জীবনের আলো—শিপ্রা পালের স্মৃতিতে শ্রদ্ধার ফুল

সংগ্রাম দত্ত: কিশোরগঞ্জ শহরের বত্রিশ আবাসিক এলাকার লিংক রোডের বাসিন্দা শিপ্রা পাল (৭২) ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি নিজের উপস্থিতি দিয়ে চারপাশে রেখে গেছেন শান্তি, আস্থা আর স্নেহের উষ্ণতা। ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল সকাল আনুমানিক ৭টা ৫০ মিনিটে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বিদায়ে নিভে গেছে একটি নীরব কিন্তু গভীর আলোর প্রদীপ।

পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ মা ও সহধর্মিণী। স্বামী, এক পুত্র, দুই কন্যা—সবাইকে ঘিরে তার জীবন ছিল দায়িত্ব, ভালোবাসা আর ত্যাগের এক অবিরাম অধ্যায়। দীর্ঘ জীবনের পথে তিনি সন্তানদের মানুষ করে গড়ে তুলেছেন দৃঢ় মনোবল ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে।

শুধু পরিবার নয়, কর্মজীবনেও তিনি রেখে গেছেন সুনামের ছাপ। দীর্ঘদিন কিশোরগঞ্জ জেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে সততা ও নিষ্ঠার জন্য সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন আস্থার প্রতীক। কাজের বাইরে সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁকে করে তুলেছিল এলাকাবাসীর কাছে শ্রদ্ধার পাত্র।

প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি লিভার সিরোসিসে ভুগছিলেন। শারীরিক কষ্টের মধ্যেও তিনি হার মানেননি। উন্নত চিকিৎসার আশায় ভারতের চেন্নাইয়ে গিয়েও লড়াই চালিয়ে গেছেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। কিন্তু নিয়তির কাছে শেষ পর্যন্ত থেমে যায় সেই দৃঢ় জীবনযুদ্ধ।

স্থানীয়দের কাছে শিপ্রা পাল ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি সহজ-সরল আচরণ, আন্তরিকতা ও সদা হাস্যোজ্জ্বল স্বভাব দিয়ে সবার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল পারিবারিক বন্ধনের মতোই ঘনিষ্ঠ। তাই তাঁর মৃত্যুতে শুধু পরিবার নয়, পুরো এলাকা যেন হারিয়েছে এক আপনজনকে।

জীবনের পরতে পরতে তিনি রেখে গেছেন দায়িত্ববোধ, নীরব শক্তি আর মানবিকতার দৃষ্টান্ত। শিপ্রা পালের স্মৃতি তাই থেকে যাবে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার এক নীরব ইতিহাস হয়ে।


img

নরসুন্দার তীরে শতবর্ষের মিষ্টি স্মৃতি - লক্ষ্মী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডারের অমলিন ঐতিহ্য

প্রকাশিত :  ১৮:৫৩, ২২ এপ্রিল ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:১৯, ২২ এপ্রিল ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশে কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের একরামপুর এলাকায় মৃতপ্রায় নরসুন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট এক মিষ্টির দোকান—দেখতে সাদামাটা, কিন্তু ইতিহাসে ভরপুর। ‘লক্ষ্মী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডার’ নামের এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি দোকান নয়, বরং এক শতাব্দীর স্বাদ, স্মৃতি আর ঐতিহ্যের ধারক।

১৯১৬ সালে ব্রিটিশ ভারতের সময় যাত্রা শুরু হয় এই দোকানের। প্রতিষ্ঠাতা আনন্দ চন্দ্র বসাকের হাত ধরে শুরু হওয়া এই পথচলা আজও অব্যাহত রয়েছে তাঁর বংশধরদের হাতেই। বর্তমানে দোকানটি পরিচালনা করছেন অলক বসাক ও তাঁর বড় ভাই মানিক চন্দ্র বসাক। তিন প্রজন্ম ধরে একই স্বাদ আর সুনাম ধরে রাখার এই গল্প কিশোরগঞ্জবাসীর কাছে এক গর্বের বিষয়।

দোকানটিতে ঢুকলে চোখে পড়ে পরিচিত সব মিষ্টির সারি—রসগোল্লা, চমচম, কালোজাম, জিলাপি, সন্দেশ, কাঁচাগোল্লা। পুরোনো দিনের লম্বা কাঁচের আলমারিতে সাজানো মিষ্টিগুলো যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একপাশে কয়েকটি টেবিল, আর নিরিবিলি আড্ডার জন্য ছোট দুটি কেবিন—এখানেই জমে ওঠে শহরের নানান গল্প।

অলক বসাক জানান, একসময় নরসুন্দা নদী ছিল খরস্রোতা, আর দোকানে জ্বলত তেলের বাতি। তখনকার দিনে রসগোল্লা, কাঁচাগোল্লা, রসমঞ্জুরী আর বাদশাভোগ ছিল প্রধান আকর্ষণ। বড় আকারের বাদশাভোগের একটি মিষ্টির দাম ছিল মাত্র আট আনা। ব্রিটিশ আমলে কিশোরগঞ্জের সুগারমিল ও পাটকলের বিদেশি কর্মকর্তারাও করাচি ফেরার সময় এই দোকানের মিষ্টি নিতে ভুলতেন না।

সময় বদলেছে, বদলেছে দাম আর পরিবেশ, কিন্তু স্বাদে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বর্তমানে রসগোল্লা থেকে শুরু করে রসমঞ্জুরী, মালাইকারী, দই, সন্দেশ—সবই পাওয়া যায় এখানে সাশ্রয়ী দামে। প্রতিদিন প্রায় আড়াই থেকে তিন মণ মিষ্টি তৈরি হয়, আর ঈদের সময় সেই পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।

শুধু মিষ্টি নয়, সকালের নাস্তার জন্যও এই দোকান সমান জনপ্রিয়। ভোরের হাঁটা শেষে অনেকেই এখানে বসেন পরোটা-ভাজি আর চায়ের আড্ডায়। ষাটোর্ধ্ব শাহজাহান সাহেব বলেন, “ছোটবেলা থেকে এই দোকানের সঙ্গে সম্পর্ক। এখনও মেয়ের জন্য এলাচ দেওয়া রসগোল্লা নিয়ে যাই, আর গিন্নির জন্য কাঁচাগোল্লা।”

ক্রেতাদের কাছে এই দোকানের প্রতি টান শুধু স্বাদের জন্য নয়, বরং স্মৃতির জন্যও। রোকেয়া সুলতানা জানান, পরিবারের যেকোনো অনুষ্ঠানের জন্য মিষ্টি কিনতে হলে তাদের প্রথম পছন্দ এই লক্ষ্মী নারায়ণই।

এমনকি দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদও ছাত্রজীবনে নিয়মিত এখানে আসতেন বলে জানান দোকান মালিকরা।

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এই প্রতিষ্ঠান প্রমাণ করে—স্বাদ যদি সত্যিকারের হয়, তবে সময় তাকে মুছে দিতে পারে না। অলক বসাকের স্বপ্ন, এই ঐতিহ্য যেন আরও শত বছর ধরে একইভাবে বেঁচে থাকে, নতুন প্রজন্মের হাত ধরে।

কিশোরগঞ্জের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা লক্ষ্মী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডার তাই শুধু একটি দোকান নয়—এটি এক জীবন্ত ঐতিহ্যের নাম।


মতামত এর আরও খবর