img

তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু: আমার কিছু অনুভূতির প্রকাশ

প্রকাশিত :  ০৬:১৪, ০৩ জুন ২০২৬

তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু: আমার কিছু অনুভূতির প্রকাশ

আবদুল হামিদ মাহবুব

মৃত্যু মানুষের জীবনের শেষ অধ্যায়। কিন্তু অনেক সময় মৃত্যুর পরই একজন মানুষকে নিয়ে নতুন বিতর্কের শুরু হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন ঘটনা নতুন নয়। বরং দিন দিন এটি যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। সম্প্রতি তোফায়েল আহমদের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেল, সেটিও সেই পুরোনো বাস্তবতারই নতুন সংস্করণ।

কেউ শোক প্রকাশ করেছেন। কেউ তার রাজনৈতিক জীবনের নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার কেউ এমন ভাষায় সমালোচনা করেছেন, যা একজন মৃত মানুষকে নিয়ে সভ্য সমাজে প্রত্যাশিত নয়।

একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর আমরা আসলে কী বিচার করি? তার পুরো জীবনকে, নাকি জীবনের শেষ কয়েকটি অধ্যায়কে? এইসব প্রশ্ন আমি কাকে করছি? করছি নিজেকে। নিজের বিবেককে। উত্তরটা আমাকেই দিতে হবে। আমার কাছে উত্তরগুলো এমন; মানুষ ভুল করে। ভুল-শুদ্ধ নিয়েই মানুষের জীবন। পৃথিবীর কোনো রাজনীতিবিদের জীবনই সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়। বিশেষ করে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে রাজনীতি অনেক বেশি সংঘাতপূর্ণ। এখানে সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ক্ষমতা, আন্দোলন, দলীয় বাস্তবতা, রাষ্ট্রের চাপ এবং সময়ের দাবি। ফলে রাজনৈতিক জীবনে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।

তবে একটি বিষয়ও সত্য। একজন মানুষের জীবনের মূল্যায়ন করতে হলে তার অবদান, প্রেক্ষাপট এবং সময়কে একসঙ্গে দেখতে হয়। শুধু পছন্দ বা অপছন্দের ভিত্তিতে ইতিহাস লেখা যায় না। আমি এখানে ইতিহাসও লিখছি না। আমি কেবল তোফায়েল আহমদকে নিয়ে কিছু মনের কথা তুলে ধরছি।

তোফায়েল আহমদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি শুধু একজন মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য ছিলেন না। তিনি ছিলেন ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ। সেই সময়ের ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে তার নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়। ওই সময়ের দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি ছিলেন।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে একটি বড় বাঁক। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, সেই আন্দোলনই পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের পথ তৈরি করেছিল। পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে ছাত্রসমাজের যে ভূমিকা ছিল, সেখানে তোফায়েল আহমদ ছিলেন সামনের সারির একজন সংগঠক।

স্বাধীনতার আগে তার ভূমিকা নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক নেই। বিতর্ক আছে স্বাধীনতার পরের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে। কিন্তু এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমরা প্রায়ই একজন মানুষের পুরো জীবনকে একটি মাত্র ঘটনার মধ্যে আটকে ফেলি। আবার কখনো একটি ভুল দিয়ে সব অর্জন মুছে ফেলতে চাই। অন্যদিকে একটি ভালো কাজ দিয়ে সব ভুলও ক্ষমা করে দিতে চাই। দুটিই চরমপন্থা।

একজন মানুষ একই সঙ্গে অবদানও রাখতে পারেন, আবার ভুলও করতে পারেন। ইতিহাসের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ মানুষই এমন। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আরেকটি বড় সংকট হলো প্রতিপক্ষকে অস্বীকার করার প্রবণতা। এখানে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক সময় ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ নেয়। ফলে মৃত্যুর পরও বিরোধ শেষ হয় না।

বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকে। তীব্র মতভেদও থাকে। কিন্তু একজন মানুষ মারা গেলে তার অবদানকে সম্মান করার একটি সংস্কৃতি রয়েছে। সমালোচনা তখনও হয়, কিন্তু তা হয় তথ্যের ভিত্তিতে, শালীন ভাষায়। বাংলাদেশে আমরা এখনো সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি।

এর একটি কারণ গণতান্ত্রিক চর্চার দুর্বলতা। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেরও বেশি সময় পরও আমরা গণতন্ত্রকে পুরোপুরি একটি সংস্কৃতিতে রূপ দিতে পারিনি। নির্বাচন হয়েছে। সরকার বদল হয়েছে। আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু সহনশীলতা খুব বেশি গড়ে ওঠেনি। ফলে রাজনৈতিক মতভেদকে আমরা প্রায়ই ব্যক্তিগত বিদ্বেষে পরিণত করি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। আগে কোনো মন্তব্য একটি নির্দিষ্ট আড্ডা বা পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। এখন একটি পোস্ট কয়েক মিনিটেই হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তথ্যের সঙ্গে গুজবও ছড়ায়। সত্যের সঙ্গে মিথ্যাও হাঁটে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় যাচাই করার প্রয়োজনও অনুভব করি না। একটি পোস্ট দেখলাম। সেটি আমাদের পছন্দ হলো। সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার করে দিলাম। যেন তথ্য নয়, অনুভূতিই সত্যের একমাত্র মানদণ্ড। ফলে একজন মৃত মানুষকে নিয়েও অসংখ্য অপপ্রচার ছড়িয়ে পড়ে।

তোফায়েল আহমদের মৃত্যুর ঘটনাটি আবারও আমাদের সামনে সেই প্রশ্ন তুলেছে; আমরা কি ইতিহাসকে পড়ছি, নাকি শুধু প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি?

একজন রাজনৈতিক নেতার সমালোচনা অবশ্যই করা যাবে। গণতন্ত্রে সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সমালোচনা আর কুৎসা এক জিনিস নয়। মতভেদ আর বিদ্বেষও এক নয়। একজন মানুষকে মূল্যায়ন করতে হলে তার জীবনকে সম্পূর্ণ দেখতে হবে। কোথায় তিনি সফল ছিলেন, কোথায় ব্যর্থ ছিলেন, কী অবদান রেখেছেন, কী ভুল করেছেন—সবকিছুই আলোচনায় আসতে পারে। কিন্তু সেটি হতে হবে তথ্যের ভিত্তিতে।

কারণ ইতিহাস প্রতিশোধের জায়গা নয়। ইতিহাস বিচার করে সময়, প্রেক্ষাপট এবং কাজকে। আজ তোফায়েল আহমদ নেই। তার রাজনৈতিক জীবনের বিতর্কও থাকবে। সমর্থকরা তার অর্জনের কথা বলবেন। সমালোচকরা তার সীমাবদ্ধতার কথা তুলবেন। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাসে তার একটি অধ্যায় রয়েছে। সেই অধ্যায় মুছে ফেলা যাবে না। যেমন তার রাজনৈতিক জীবনের বিতর্কও মুছে ফেলা যাবে না।

সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা মানুষকে সাদা বা কালো রঙে দেখে না। তারা দেখে পূর্ণ মানুষ হিসেবে। গুণ ও সীমাবদ্ধতার সমন্বয়ে। আমাদেরও সেই শিক্ষা দরকার। কারণ আজ আমরা তোফায়েল আহমদকে নিয়ে কথা বলছি। কাল অন্য কাউকে নিয়ে বলব। একদিন আমাদের নিজেদের জীবনও অন্যরা মূল্যায়ন করবে।

সেদিন আমরা কী চাইব? আমাদের ভুলগুলোই শুধু মনে রাখা হোক, নাকি আমাদের ভালো কাজগুলোকেও স্মরণ করা হোক? এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো বলে দেবে আমরা কতটা সভ্য হয়েছি।

তোফায়েল আহমদের মৃত্যু তাই শুধু একজন রাজনীতিকের বিদায় নয়। এটি আমাদের সমাজের সামনে ধরা একটি আয়না। সেই আয়নায় আমরা একজন মানুষকে যতটা দেখি, তার চেয়েও বেশি দেখি নিজেদের। প্রশ্ন এখন একটাই; আমরা কি সেই আয়নায় তাকানোর সাহস রাখি?


লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব।
মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪
ই-মেইল:  [email protected]

মতামত এর আরও খবর

img

ডলারের আধিপত্য ধ্বংস করতে চীনের ‘ট্রেজারি–কৌশল’

প্রকাশিত :  ১৩:৩৪, ০১ জুন ২০২৬

জাসিম আল-আজ্জাউই

 চীন যখন ২০২৬ সালের বসন্তে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সিকিউরিটিজে নিজেদের বিনিয়োগ কমাতে শুরু করল, তখন ওয়াশিংটনের মূলধারার অনেক বিশ্লেষক স্বভাবগতভাবেই একে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘রুটিন’ ঘটনা বলে আখ্যা দেন। কিন্তু তাঁদের তা করা উচিত ছিল না। যা ঘটছে, তা আসলে এক দশকব্যাপী কৌশলের চূড়ান্ত পরিণতি; একটি পরিকল্পনা, যা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সর্বোচ্চ মুহূর্তে চীন চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ গ্রহণ ব্যয়কে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

পরিসংখ্যানগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৩ সালে চীনের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে ৬৯৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে এবং পরের মাসে আরও কমে দাঁড়ায় ৬৫২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে।

শুধু ২০২৬ সালের মার্চ মাসেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট মার্কিন ট্রেজারি ধারণ ১৩৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার কমে যায়। একই সময়ে শীর্ষ ১০ বিদেশি ধারকের মধ্যে জাপান, চীন, বেলজিয়াম, কানাডা, ফ্রান্সসহ সাতটি দেশ একযোগে তাদের ঝুঁকি বা এক্সপোজার কমিয়ে আনে।

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এল-এরিয়ান এ পরিবর্তনকে সরাসরি একটি কাঠামোগত রূপান্তর হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বাজারে চীনের অংশীদারত্ব এখন মাত্র ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ‘১৫ বছর আগে অর্জিত ২৮ শতাংশের সর্বোচ্চ অবস্থানের এক-চতুর্থাংশ মাত্র।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ধারাবাহিকভাবে নতুন ঋণপত্র ইস্যুর পরিপ্রেক্ষিতে এই পতন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামো মূলত ধারাবাহিকভাবে আগ্রহী ঋণদাতাদের ওপর নির্ভরশীল। ওয়াশিংটন সামরিক ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ফেডারেল কর্মচারীদের বেতন এবং বৈদেশিক প্রতিশ্রুতিগুলোর অর্থায়নের জন্য নিয়মিত বাজেটঘাটতি পরিচালনা করে এবং সেই ঘাটতি পূরণ করে নতুন ঋণ ইস্যুর মাধ্যমে।

এমন পরিস্থিতিতে চীনের মতো বড় ঋণদাতা যখন পিছু হটতে শুরু করে, তখন এর গাণিতিক প্রভাব অত্যন্ত কঠোর হয়। এর ফলে ট্রেজারির সুদের হার (ইয়িল্ড) বাড়ে, পুরোনো ঋণ নবায়নের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং বিদেশি চাহিদা কমে যাওয়ায় ডলারের ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়।

    প্রকৃত প্রশ্নটি আসলে এই নয় যে মার্কিন ডলার রাতারাতি তার বৈশ্বিক আধিপত্য হারাবে কি না। তা হবে না। আসল প্রশ্ন হলো, চীনের পদক্ষেপগুলো কি অন্য দেশগুলোকে একই সময়ে ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে সরে যেতে উৎসাহিত করবে?

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীন যখন নিজেদের ব্যাংকগুলোকে ট্রেজারি বিনিয়োগ কমানোর পরামর্শ দেয়, তখন অর্থনীতিবিদ পিটার শিফ বিষয়টি নিয়ে তাঁর স্বভাবসুলভ সরাসরি মন্তব্য করেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গবেষক ব্র্যাড সেটসারের মতে, যদি চীন তাদের পুরো ট্রেজারি পোর্টফোলিও বিক্রি করে দেয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার প্রায় ৩০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই হিসাব কেবল সরাসরি বাজারগত প্রভাবকে বিবেচনায় নেয়; অন্য বৈশ্বিক ঋণদাতাদের মধ্যে সম্ভাব্য আতঙ্ক বা চেইন-রি–অ্যাকশনের প্রভাব এতে ধরা হয়নি।

বহু বছর ধরে চীন নীরবে একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। তাদের লক্ষ্য হলো, যদি কখনো তারা মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে বা তা থেকে সরে আসতে চায়, তাহলে যেন নিজেদের অর্থনীতি কোনো বড় ধাক্কা না খায়। এটিকে এমনভাবে ভাবা যায় যে চীন একটি সম্পূর্ণ নতুন আর্থিক ‘এলাকা’ গড়ে তুলছে, যাতে ভবিষ্যতে আর যুক্তরাষ্ট্রের ‘বাড়িতে’ বসবাস করতে না হয়। তারা এটি যেভাবে করছে:

বৈশ্বিক অবকাঠামো তৈরির ‘মহাযাত্রা’: চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) নামে একটি বিশাল প্রকল্প শুরু করেছে, যা ১৪০টির বেশি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে। সারা বিশ্বে সড়ক, বন্দর, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে তারা প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। উদ্দেশ্য হলো, এসব দেশ যেন যুক্তরাষ্ট্রের ডলার ব্যবহার না করেও সরাসরি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারে।

নিজস্ব আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা: চীন সীমান্তের বাইরে লেনদেনের জন্য সিআইপিএস নামে নিজস্ব অর্থ প্রদানের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ২৪ দশমিক ৪৭ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ চীনা মুদ্রা ইউয়ানে লেনদেন সম্পন্ন হয়, যা আগের বছরের তুলনায় ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এর পাশাপাশি চীন বিশ্বের ৪০টির বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বিশেষ মুদ্রা বিনিময় (কারেন্সি সোয়াপ) চুক্তি করেছে।

বন্ধুদের সঙ্গে ডলারবিহীন বাণিজ্য: এটি আর কেবল তাত্ত্বিক পরিকল্পনা নয়; বাস্তবেও এর প্রয়োগ শুরু হয়ে গেছে। বর্তমানে চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার প্রায় ৯৫ শতাংশ বাণিজ্য তাদের নিজস্ব স্থানীয় মুদ্রায় সম্পন্ন হয়। একইভাবে ২০২৪ সালে ব্রাজিল ও চীনের মধ্যকার প্রায় অর্ধেক বাণিজ্য ইউয়ানে পরিচালিত হয়েছে।

বিকল্প অর্থনৈতিক জোট গঠন: চীন ব্রিকস জোট সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই জোটে এখন সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও ইথিওপিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ তেলসমৃদ্ধ ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দেশ যুক্ত হয়েছে। এই দেশগুলোকে একত্র করার মাধ্যমে চীন একটি সমান্তরাল বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামোগত ভিত্তি নির্মাণ করছে; অর্থাৎ যদি কখনো মার্কিন নেতৃত্বাধীন আর্থিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা চীন ইচ্ছাকৃতভাবে সেই ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তাদের কাছে ইতোমধ্যেই একটি বিকল্প বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক প্রস্তুত থাকবে, যা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতে পারবে।

এসব কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটি ধারাবাহিক কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ; প্রথমে বিকল্প পথ বা ‘প্রস্থানদ্বার’ তৈরি করা, তারপর ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, যেখানে মার্কিন ট্রেজারি বাজারে একটি বড় পদক্ষেপ নেওয়া যাবে—যার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা হবে অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু এর ফলে চীনের নিজের অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর ক্ষতি হবে না।

এই কৌশলের অংশ হিসেবেই পিপল’স ব্যাংক অব চায়না তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমশ সোনার দিকে সরিয়ে নিয়েছে। টানা ১৫ মাস ধরে সোনা কেনার পর চীনের স্বর্ণ মজুত রেকর্ড ২ হাজার ৩০৮ টনে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতির উদ্দেশ্য, স্পষ্টভাবে চীনের অর্থনীতিকে ‘নিষেধাজ্ঞা-প্রতিরোধী’ (স্যাংশন প্রুফ) করে তোলা। ২০২২ সালে রাশিয়ার সম্পদ জব্দ করার অভিজ্ঞতার সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।

এখানে ঝুঁকি শুধু অর্থের প্রবাহে নয়; বরং চীনের এই পদক্ষেপ অন্য দেশগুলোকে একই পথ অনুসরণ করার মনস্তাত্ত্বিক অনুমতি দিতে পারে। জাপান উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে; উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো নীরবে তাদের সম্পদ বৈচিত্র্যময় করছে; আর দীর্ঘদিন ধরে ডলারকেন্দ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার বিষয়ে সতর্ক থাকা তথাকথিত ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো ক্রমেই ওয়াশিংটনের মুদ্রানীতির আধিপত্য থেকে প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব খুঁজছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ)  তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মার্কিন ডলারের অংশীদারত্ব নেমে এসেছে ৫৭ দশমিক ৮ শতাংশে, যেখানে ২০০১ সালে তা ছিল ৭২ শতাংশ। একই সময়ে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তিন বছর ধরে প্রতিবছর এক হাজার টনের বেশি স্বর্ণ ক্রয় করেছে।

প্রকৃত প্রশ্নটি আসলে এই নয় যে মার্কিন ডলার রাতারাতি তার বৈশ্বিক আধিপত্য হারাবে কি না। তা হবে না। আসল প্রশ্ন হলো, চীনের পদক্ষেপগুলো কি অন্য দেশগুলোকে একই সময়ে ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে সরে যেতে উৎসাহিত করবে?

এই মুহূর্তে অনেক দেশ দ্বিধাগ্রস্ত। কিন্তু তারা যদি বুঝতে পারে যে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো নিরাপদ, তাহলে সেটিই একটি ভবিষ্যদ্বাণীতে পরিণত হতে পারে। প্রথম কয়েকটি ‘ডমিনো’ যখন পড়ে যাবে, তখন বাকিগুলোও একে একে অনুসরণ করবে।

ওয়াশিংটনের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাস্তবে রাজনৈতিক বক্তব্যে যতটা বড় করে দেখানো হয়, ততটা নয়। চীনের বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তার অভিঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাপর্যায়ে মূল্য, করপোরেট মুনাফা এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর সরাসরি পড়বে।

অ্যাপল, নাইকি ও টেসলার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো গভীরভাবে চীনা উৎপাদন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া ইউএস–চায়না ইকোনিমক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশন ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছে যে বেইজিংয়ের হাতে এসব পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত করার সক্ষমতা ক্রমশ বাড়ছে।

চীনকে আবার ট্রেজারি কেনায় ফিরিয়ে আনা বা বিক্রি বন্ধ করতে বাধ্য করার জন্য হয় এমন বাজার-প্রণোদনা প্রয়োজন, যা ওয়াশিংটন বর্তমানে দিতে পারছে না; অথবা এমন চাপ প্রয়োগের ব্যবস্থা প্রয়োজন, যার সবচেয়ে বড় মূল্য পরিশোধ করতে হবে মার্কিন ভোক্তাদেরই।

২০২৬ সালের বসন্তে সংঘটিত ব্যাপক বাজারপতন হয়তো একক কোনো বিস্ফোরণ নয়, যা মার্কিন ডলারকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় সতর্কসংকেত। বহু বছর ধরেই যাঁরা মনোযোগ দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন, তাঁরা এই প্রবণতা আসতে দেখেছেন।

আগামী দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা চীনের পরবর্তী পদক্ষেপ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, জাপান, সৌদি আরব এবং গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ কি এই মুহূর্তকে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিন্যাসের উপযুক্ত সময় হিসেবে দেখবে? যদি তারা তা–ই করে, তাহলে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ গতিপথ দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।

    জাসিম আল-আজ্জাউই এমবিসি গ্রুপ, আবুধাবি টিভি এবং আল–জাজিরা ইংলিশে সংবাদ উপস্থাপক, অনুষ্ঠান সঞ্চালক এবং নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।


(মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া)

মতামত এর আরও খবর