img

সূচকের পতনের চেয়ে বড় সংকট আস্থার অবক্ষয়

প্রকাশিত :  ১১:২৯, ২২ জুন ২০২৬

✍️ নিজস্ব প্রতিবেদক

সূচকের পতনের চেয়ে বড় সংকট আস্থার অবক্ষয়

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দরপতন নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত এক যুগে বিনিয়োগকারীরা উত্থানের চেয়ে পতনের গল্পই বেশি শুনেছেন। তবু প্রতি বড় দরপতনের দিন আমাদের সামনে নতুন করে একটি প্রশ্ন হাজির হয়—সমস্যাটা কী কেবল বাজারের, নাকি এর পেছনে অর্থনীতি, নীতি এবং আস্থার আরও গভীর সংকট কাজ করছে?

সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৮৫ পয়েন্টের বেশি হারিয়েছে। এক দিনে শতাংশ দেড় ভাগের বেশি পতন নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু উদ্বেগের প্রকৃত কারণ সূচকের পতন নয়; বরং বাজারের সামগ্রিক চিত্র। অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমেছে, লেনদেনের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও প্রকট হয়েছে।

পুঁজিবাজার মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বিনিয়োগকারী যখন বিশ্বাস করেন যে অর্থনীতি স্থিতিশীল, নীতিনির্ধারকরা সুস্পষ্ট অবস্থানে আছেন এবং বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তখন তিনি বিনিয়োগে আগ্রহী হন। বিপরীতে অনিশ্চয়তা বাড়লে তিনি অপেক্ষার পথ বেছে নেন। বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে সেই অপেক্ষার প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বিষয়। তেলের দাম, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের দুর্বলতার ব্যাখ্যা কেবল বাইরের ঘটনায় খুঁজলে ভুল হবে। কারণ আমাদের বাজার বহুদিন ধরেই তারল্যসংকট, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণের সমস্যায় ভুগছে।

সোমবারের বাজারে তারল্যসংকটের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিপুল অঙ্কের সরকারি সুকুক ইস্যুর কারণে আর্থিক খাতের একটি বড় অংশের অর্থ শেয়ারবাজারের বাইরে চলে গেছে। এটি সাময়িক ঘটনা হলেও এর মধ্য দিয়ে একটি পুরোনো বাস্তবতা আবার সামনে এসেছে—বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনও পর্যাপ্ত দীর্ঘমেয়াদি তহবিল আকর্ষণ করতে পারেনি। ফলে সামান্য চাপ এলেই বাজার নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারি বাজারের জন্য ইতিবাচক বার্তা। কারসাজি ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তবে এটিও সত্য যে দীর্ঘদিন ধরে বাজারের একটি অংশ অস্বাভাবিক লেনদেন ও জল্পনানির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল। ফলে নজরদারি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অর্থের একটি অংশ বাজার ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। এটিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং দীর্ঘমেয়াদে এটি বাজারকে আরও সুস্থ ও স্বচ্ছ করে তুলতে পারে।

ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর অনেক শেয়ারের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছু কোম্পানির শেয়ারে বড় ধরনের দরপতন দেখা গেলেও বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী এটি অস্বাভাবিক নয়। দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে আটকে রাখা দাম একসময় বাস্তবতার মুখোমুখি হবেই।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কোথায়?

প্রথমত, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যেন মনে করেন, এখানে নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য এবং কারসাজিকারীরা কোনোভাবেই পার পাবে না। দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে, শক্তিশালী পেনশন ফান্ড, মিউচুয়াল ফান্ড এবং দীর্ঘমেয়াদি তহবিল ছাড়া স্থিতিশীল পুঁজিবাজার গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনার উদ্যোগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগকারীদের সামনে মানসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ যত বাড়বে, বাজার তত শক্তিশালী হবে।

স্বল্পমেয়াদে সূচক আরও কিছুটা ওঠানামা করতে পারে। সেটি বাজারের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হলে সূচকের দৈনিক ওঠানামার বাইরে গিয়ে মূল সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে।

কারণ পুঁজিবাজার কেবল কিছু শেয়ারের দর বাড়া–কমার নাম নয়। এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। আর সেই আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরলে সূচকের কয়েক পয়েন্ট পতনের চেয়েও বড় ক্ষতি হয়ে যায়।

দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

img

ইরান চুক্তি: ট্রাম্পের অতি উচ্চাশার পরিণতি যেমন হলো

প্রকাশিত :  ১৩:৩৬, ১৮ জুন ২০২৬

একটি প্রচলিত সামরিক প্রবাদে বলা হয়, ‘শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার পর কোনো যুদ্ধপরিকল্পনাই আর আগের মতো থাকে না।’ ইরানকে ঘিরে ডোনাল্ড ট্রাম্পও উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নিয়ে অভিযান শুরু করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া এবং হিজবুল্লাহ ও হামাসসহ আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থন বন্ধ করা।

এখন যে চুক্তির (সমঝোতা স্মারক) দোহাই দিয়ে ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন, সেখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে লিখিত শর্ত নেই। ইরান কেবল পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে তেহরানের চাপে চুক্তিতে লেবাননকেও যুক্ত করা হয়েছে। যেটিকে বড় জয় হিসেবে দেখছে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ।

যুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা ছিল হরমুজ প্রণালি। এই জলপথ পুনরায় খুলতে গিয়েই ট্রাম্প প্রশাসন তাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের লক্ষ্যগুলো থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। ট্রাম্পের ভাষায়, এটি না করলে বিশ্ববাসী মন্দার পরিণতি ভোগ করতো।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ফেলো ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বারবারা লিফ বলছেন, ওয়াশিংটন ইরান সম্পর্কে খুবই অবাস্তব মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে যুদ্ধে নেমেছিল। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিতে হামলার জন্য ইরান কতটুকু প্রস্তুত তা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা একেবারে ভুল ছিল।

বারবারা বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র দ্রুতই বিষয়টি বুঝতে পারে। আমেরিকান ভোক্তাদের পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রভাব ছড়িয়ে পড়ায় এই যুদ্ধ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে গেছে।

এখন ট্রাম্প একটি জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন লিফ। তিনি বলেন, যুদ্ধ যদি প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহেই শেষ হতো, তাহলে ট্রাম্পের হাতে অনেক বেশি প্রভাব ও কূটনৈতিক চাপ তৈরির সুযোগ থাকতো। এখন তিনি সেগুলোর অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছেন।

বর্তমানে ট্রাম্পের নিজের রাজনৈতিক দলের নেতারাই এই চুক্তিকে মানতে পারছেন না। এরইমধ্যে লুইজিয়ানার বিদায়ী সিনেটর বিল ক্যাসিডি চুক্তিকে ‘কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বাজে কূটনীতি’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘কবরে শুয়ে রিগানও (রোনাল্ড রিগান) এ নিয়ে অস্বস্তিতে পড়বেন।’ রিগান যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকান পার্টির নেতা ছিলেন।

বিল ক্যাসিডি বলছেন, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। তারা হরমুজ প্রণালির কার্যকারিতাও বুঝে গেছে। ভবিষ্যতে নিঃসন্দেহে এই কৌশল কাজে লাগাবে। পাশাপশি এই চুক্তির আওতায় ইরান নতুন অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ পাবে। উত্তর ক্যারোলিনার রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিসের কাছেও এটি ভালো চুক্তি বলে মনে হয়নি।

ট্রাম্প বহু বছর ধরে ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ বা জেসিপিওএ নিয়ে সমালোচনা করে আসছেন। তাঁর অভিযোগ, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ঠেকাতে ইরানকে ঘুষ দিয়েছিলেন। কিন্তু নতুন চুক্তি দেখাচ্ছে, এতে ইরানকে আরও বেশি অর্থ দেওয়ার সম্ভাবনা আছে। 

চুক্তির বিভিন্ন দফার মধ্যে আছে- আর্থিক প্রণোদনা, লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে সমর্থন এবং হরমুজ প্রণালি পরিচালনার ভবিষ্যৎ ঠিক করতে ওমান ও ইরানকে যৌথভাবে কাজের সুযোগ দেওয়া।

সমঝোতা স্মারকের নথি হাতে মাসুদ পেজেশকিয়ান (বাঁয়ে) ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

সমঝোতা স্মারকের নথি হাতে মাসুদ পেজেশকিয়ান (বাঁয়ে) ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

চুক্তিতে উল্লেখ থাকা ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ছাড়ের বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘এটা আমাদের অর্থ নয়, এটা তাদের অর্থ। আমরা একটি নির্দিষ্ট সময়ে এটি আটকে দিয়েছিলাম। আমাদের এটি ফিরিয়ে দিতে হবে।’ পাশাপাশি তাঁর বক্তব্যে ইরানের কথার প্রতিধ্বনিও আছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরবের কাছে যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে পারে, তাহলে ইরানেরও সে দাবি করার যুক্তি আছে।

ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সম্ভাবনা নিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘অন্যদের কাছে এটি আছে, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর কাছেও এটি আছে। এ অবস্থায় তাদের (ইরান) বিদ্যুৎ উৎপাদন সংক্রান্ত কাজে এটি (ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ) ব্যবহার করতে না দিলে বিষয়টা খুব কঠোর হয়ে যায়। এখানে কিছুটা কমন সেন্স ব্যবহার করতে হবে।’

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এই সমঝোতা স্মারক একটি বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত। যেটির লক্ষ্য ছিল- রাজনৈতিক মূল্য দিতে হলেও সংঘাত যত দ্রুত সম্ভব শেষ করতে হবে। বারবারা লিফ বলছেন, একটি অযৌক্তিক যুদ্ধ শেষ হতে দেখাটা স্বস্তির। তবে পরে যে আবার যুদ্ধ শুরু হবে না- চুক্তিতে সে নিশ্চয়তা বেশ কম।