img

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: ফুটবলে গার্হস্থ্য সহিংসতা, লুকানো সংকট ও নীতিগত করণীয়

প্রকাশিত :  ১৪:০০, ২০ জুলাই ২০২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: ফুটবলে গার্হস্থ্য সহিংসতা, লুকানো সংকট ও নীতিগত করণীয়

॥ হুসনা খান হাসি ॥

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রীড়া আয়োজন। এই প্রতিযোগিতা কেবল শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়, বরং জাতীয় পরিচয়, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক সংহতির এক অনন্য প্রতীক। কোটি কোটি দর্শকের আবেগ, গণমাধ্যমের বিপুল উপস্থিতি এবং খেলোয়াড়দের অসাধারণ জনপ্রিয়তা ফুটবলকে শুধু একটি খেলা নয়, একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু এই আলো ঝলমলে বাস্তবতার আড়ালে এমন কিছু জটিল সামাজিক সংকট রয়েছে, যেগুলো নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে সীমিত। গার্হস্থ্য সহিংসতা তার অন্যতম।

গার্হস্থ্য সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সংকট, যা পরিবার, শিশু, কর্মক্ষেত্র এবং বৃহত্তর সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা যায়, ক্ষমতার অসমতা, মানসিক চাপ, রাগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং জবাবদিহির অভাব একত্রে সহিংস আচরণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। পেশাদার খেলাধুলার পরিবেশে এই ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হয় উচ্চমাত্রার প্রতিযোগিতা, চরম পারফরম্যান্সের চাপ, জনসমালোচনার ভয়, দীর্ঘ ভ্রমণ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সংকোচন এবং কখনও কখনও খ্যাতিজনিত বিশেষ সুবিধা।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণা ইঙ্গিত করে যে ক্রীড়া তারকা হওয়া নিজেই গার্হস্থ্য সহিংসতার কারণ নয়। বরং কিছু কাঠামোগত ও মনস্তাত্ত্বিক ঝুঁকির কারণে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সহিংসতার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেতে পারে। অর্থাৎ সমস্যার মূল খেলাধুলা নয়, বরং ক্ষমতার অপব্যবহার, অপর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি।

এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো “তারকাখ্যাতির সংস্কৃতি”। জনপ্রিয় খেলোয়াড়দের ঘিরে গড়ে ওঠা সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ অনেক সময় অভিযোগকে গুরুত্বহীন করে তোলে। সমর্থক, স্পন্সর, ক্লাব কিংবা গণমাধ্যমের একটি অংশ কখনও কখনও মাঠের সাফল্যকে ব্যক্তিগত আচরণের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। এর ফলে ভুক্তভোগীরা বিচারের পরিবর্তে সামাজিক অবিশ্বাস, চরিত্রহনন এবং মানসিক চাপে পড়েন। এই সংস্কৃতি অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধকে দুর্বল করে।

মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়ায় মানসিক সুস্থতা শারীরিক সক্ষমতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বহু পেশাদার খেলোয়াড় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করেন, কারণ এখনো অনেক ক্ষেত্রে এটিকে দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। ফলস্বরূপ, উদ্বেগ, হতাশা, রাগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা কিংবা সম্পর্কগত সংকট দীর্ঘদিন অমীমাংসিত থেকে যায়। তাই মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে ঐচ্ছিক সুবিধা নয়, বরং পেশাদার ক্রীড়া ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

ফিফা বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসর কেবল খেলোয়াড়দের দক্ষতার নয়, ক্রীড়া প্রশাসনের নৈতিক মানদণ্ডেরও পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা, জাতীয় ফেডারেশন এবং ক্লাবগুলোর উচিত গার্হস্থ্য সহিংসতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নীতি গ্রহণ করা, যেখানে অভিযোগ তদন্তের স্বাধীন ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ শাস্তিমূলক প্রক্রিয়া এবং ভুক্তভোগী সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা থাকবে। একই সঙ্গে খেলোয়াড়, কোচ এবং কর্মকর্তাদের জন্য বাধ্যতামূলক আচরণবিধি, লিঙ্গসমতা, সম্মানজনক সম্পর্ক এবং সহিংসতা প্রতিরোধ বিষয়ক প্রশিক্ষণ চালু করা সময়ের দাবি।

গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে খেলোয়াড়ের জনপ্রিয়তা বা ক্রীড়া সাফল্যকে কেন্দ্র করে ঘটনাকে আড়াল না করে মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক দায়িত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একইভাবে সমর্থকদেরও উপলব্ধি করতে হবে যে একজন খেলোয়াড়ের অসাধারণ পারফরম্যান্স কখনোই তার ব্যক্তিগত জীবনের সহিংস আচরণের নৈতিক বৈধতা তৈরি করতে পারে না।

বিশ্বকাপ আমাদের শিখিয়েছে, ফুটবল মানুষকে একত্রিত করতে পারে। সেই ঐক্যের শক্তিকে যদি মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় ব্যবহার করা যায়, তবে খেলাধুলা সামাজিক পরিবর্তনেরও একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। তাই ফুটবলের ভবিষ্যৎ শুধু নতুন কৌশল, উন্নত প্রযুক্তি কিংবা রেকর্ড ভাঙার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে এমন একটি ক্রীড়া সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর, যেখানে সম্মান, জবাবদিহি, লিঙ্গসমতা এবং মানবাধিকার সমানভাবে মূল্যায়িত হবে।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়। আমরা কি শুধু সেরা গোল এবং সেরা খেলোয়াড়কে উদযাপন করব, নাকি এমন একটি ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে তুলব যেখানে মাঠের বাইরেও ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং নিরাপত্তা সমান গুরুত্ব পাবে? যদি ফুটবল সত্যিই বিশ্বের খেলা হয়, তবে এর সবচেয়ে বড় জয় হবে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে প্রতিটি মানুষ সহিংসতামুক্ত, মর্যাদাপূর্ণ এবং নিরাপদ জীবনের অধিকার ভোগ করবে।

লন্ডন, যুক্তরাজ্য
১৯/০৭২০২৬
img

যুদ্ধের ময়দানে উজ্জীবিত ইরানের পরমাণু স্বপ্ন: ইউরোশিয়া রিভিউ

প্রকাশিত :  ০৬:২২, ২২ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:২৭, ২২ অক্টোবর ২০২৬

একসময় ইরানের রাজনীতিতে পারমাণবিক বোমা তৈরির আলোচনা ছিল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও গোপনীয়। তবে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে টানা আট মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলেছে। এখন দেশটির নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রণেতারা প্রকাশ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি তুলছেন।

অথচ এই দেশেই একদিন সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একটি ধর্মীয় ফতোয়া ছিল আইন, যেখানে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি বা সংরক্ষণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে তেহরান বিশ্ববাসীকে এটাই বোঝানোর চেষ্টা করেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক কাজের জন্য। কিন্তু যুদ্ধের কালো মেঘ সেই পুরোনো ধারণাকে এক নিমিষে উড়িয়ে দিয়েছে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের প্রথম দফার আকস্মিক আঘাতেই কেঁপে উঠেছিল ইরান। সেই হামলায় শুধু সামরিক বা পারমাণবিক স্থাপনাই ধ্বংস হয়নি, প্রাণ হারিয়েছেন খেসারত দেওয়া বহু সাধারণ নাগরিক এবং খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব। যদিও পরবর্তী সময়ে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক তৎপরতা কমিয়ে এনে নৌ-অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপের পথ বেছে নিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে উল্টো নতুন হামলার হুমকি দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের সাফ কথা, চুক্তি করতে হলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে।

আর ঠিক এ অনিশ্চিত ও চরম অস্তিত্বের সংকটের মাঝেই তেহরানের অন্দরে শুরু হয়েছে তীব্র দন্তনখ লড়াই। একপক্ষ বলছে, পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ইরান এরই মধ্যে অনেক চড়া মূল্য চুকিয়ে ফেলেছে। পার্লামেন্ট সদস্য আহমাদ বাখশায়্যাশ আরদেস্তানি কিংবা মহসেন রেজাইয়ের মতো শীর্ষ নিরাপত্তা কর্তারা মনে করেন, এখন আর পিছু হটার সময় নেই; বরং শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে পরমাণু অস্ত্র অর্জনের পথেই হাঁটা উচিত।

রক্ষণশীল বিশ্লেষক দাউদ মোদাররেসিয়ানের ভাষায়, একটি পরমাণু বোমা অর্জন করা আজকের দিনে রুটি-রুজির চেয়েও বড় ও জরুরি প্রয়োজন, যা দেশের টিকে থাকার একমাত্র নিশ্চয়তা। তারা ট্রাম্পের সেই পুরোনো কথারই প্রতিধ্বনি করেন, যেখানে উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের উদাহরণ টেনে ট্রাম্প বলেছিলেন, কারও হাতে ১১টি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠেও রয়েছে শক্ত যুক্তি। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবের এই চিন্তার তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে আছে, তাদের পরমাণু বোমার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, একটি বোমা বড়জোর ৫০ থেকে ১ লাখ মানুষের প্রাণ নিতে পারে, কিন্তু হরমুজ প্রণালি আটকে দিলে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও কোটি কোটি মানুষের জীবন জিম্মি করা সম্ভব। সাংবাদিক সিনা জাহানি কিংবা বিশ্লেষক আমির আলী আবুলফাতদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর এ উন্মাদনা সরাসরি ইসরায়েলের ফাঁদে পা দেওয়ার শামিল। বোমা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকান বোমায় দেশের বাকি অবকাঠটুকুও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে, এমন আত্মঘাতী পথ কোনো সুরক্ষাই দিতে পারে না।

কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, ইরান কি চাইলেও এখন বোমা বানাতে পারবে? যুদ্ধের আগুনে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মূল অবকাঠামো আজ প্রায় পঙ্গু। নাতানজ ও ফরদোর মতো প্রধান ভূগর্ভস্থ প্লান্টগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তবে সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ দশমিক ১৯ কেজি ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে এই বিশাল মজুতের সঠিক হদিস তাদের জানা নেই।

মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দাবি, গ্রানাইট পাথরের ৮০ থেকে ১০০ মিটার গভীরে অবস্থিত গোপন ও সুরক্ষিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ সুড়ঙ্গে হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ ও এই ইউরেনিয়াম লুকিয়ে ফেলেছে তেহরান। আর এ কারণেই ট্রাম্প সম্প্রতি হুংকার ছেড়েছেন, আমাদের হয়তো সেখানেই গিয়ে অভিযান চালাতে হতে পারে!

তাত্ত্বিকভাবে, ওই গোপন মজুতের নাগাল পেলে সামান্য সেন্ট্রিফিউজ দিয়েই অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়াম বানিয়ে ফেলা সম্ভব। ইরান যদিও যুদ্ধ বন্ধের বিনিময়ে এই মজুত হালকা বা পাতলা করার প্রস্তাব দিয়েছে, তবুও ওয়াশিংটনের কড়া নজর এবং পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের হিমশীতল পাহাড়ের আড়ালে এখন ঝুলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তথা গোটা বিশ্বের ভাগ্য।