img

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি : সরকার আরও ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি নিতে পারত

প্রকাশিত :  ০৬:২১, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৮:৫৫, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি : সরকার আরও ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি নিতে পারত

দেশে যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, তখনই বাড়ানো হয়েছে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম। এর প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে পড়তে পারে। আবার কিছু পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে এবং সময়ের ব্যবধানে এর প্রভাব দৃশ্যমান হতে পারে।

তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে পরিবহন খাতে। বিশেষ করে গণপরিবহনে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং এর চাপ সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে। বর্তমানে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এমনিতেই অনেক বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বাড়লে তাদের ওপর চাপ আরও বাড়বে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরোক্ষ প্রভাবও রয়েছে। কৃষিতে জ্বালানি ব্যবহারের খরচ বাড়বে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। কলকারখানায় উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। এসব প্রভাব হয়তো সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হবে না। কিন্তু ধীরে ধীরে পণ্যের দামে তার প্রভাব পড়তে পারে।

সরকারের দিক থেকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্য ভর্তুকির চাপ কমানো। সরকারকে জ্বালানি খাতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ভর্তুকির বোঝা কমানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে কোন জ্বালানির দাম কতটুকু বাড়ানো হবে, তাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সব জ্বালানি তেলের ব্যবহারকারী এবং ব্যবহারক্ষেত্র এক নয়।

পেট্রোল ও অকটেন তুলনামূলক উচ্চ আয়ের মানুষ বেশি ব্যবহার করেন। অবশ্য মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ অকটেন ব্যবহার করে, বিশেষ করে বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং সেবায় মোটরসাইকেল ব্যবহৃত হয়। ডিজেল গণপরিবহনে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। একটি বাসে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব একসঙ্গে অনেক মানুষের ওপর পড়ে। একই সঙ্গে কৃষি এবং শিল্প-কারখানায় ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে। কেরোসিনের ক্ষেত্রেও নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যবহার বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

আমার মনে হয়, সরকার চাইলে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আরও ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি নিতে পারত। ডিজেল ও কেরোসিনের দাম না বাড়িয়ে অথবা খুব কম বাড়িয়ে পেট্রোল ও অকটেনের দাম তুলনামূলক বেশি বাড়ানো যেত। এখনও বিষয়টি সরকার পুনর্বিবেচনা করতে পারে। এতে ভর্তুকি কমানোর লক্ষ্য পুরোপুরি হয়তো অর্জিত হয়তো হবে না, কিন্তু সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কম রাখা সম্ভব হবে।

সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করছে; একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। তাই ভর্তুকির সুবিধা কারা পাচ্ছে, তাও দেখতে হবে। আমাদের সমাজে আয়বৈষম্য অনেক বেশি। জ্বালানি তেলের ভর্তুকির সুবিধা যেমন উচ্চআয়ের মানুষ পান, তেমনি নিম্নআয়ের মানুষও পান। ফলে ঢালাওভাবে সব ধরনের জ্বালানির দাম একইভাবে বাড়ানো হলে প্রশ্ন আসে— নিম্নআয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব কি যথেষ্ট বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে? জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তাই সামাজিক বৈষম্য এবং মানুষের আয়স্তর বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। 

এর সঙ্গে এবার আরেকটি বিষয় যুক্ত হয়েছে— সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো। শুধু পে স্কেল নিজে মূল্যস্ফীতির ওপর খুব বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করি না। কারণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার তুলনায় খুব বেশি নয়। কিন্তু নতুন পে স্কেল এবং একই সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি—এ দুটি ঘটনা একসঙ্গে মানুষের মধ্যে একটি ‘ইনফ্লেশনারি এক্সপেক্টেশন’ বা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রত্যাশা তৈরি করতে পারে।

মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা তৈরি হলে তা বাজারের স্বাভাবিক আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। যেমন আমি যদি চালের ব্যবসায়ী হই এবং মনে করি, সামনে চালের দাম আরও বাড়বে, তাহলে আজই সব চাল বিক্রি না করে কিছুদিন ধরে রাখতে চাইতে পারি। একইভাবে আমি যদি পেঁয়াজের ব্যবসায়ী হই এবং মনে করি, সামনে পেঁয়াজের দাম বাড়বে, তাহলে বিক্রি না করে কিছুদিন মজুত রাখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তখন স্বাভাবিক বাজার ব্যবস্থার বাইরে কৃত্রিমভাবে পণ্য ধরে রাখার প্রবণতা তৈরি হয়। এর ফলে মূল্য আরও বাড়তে পারে।

আরেকটি বড় বিষয় হচ্ছে, সরকারি ব্যয়ের অপচয় কমানো জরুরি। প্রয়োজনীয় ব্যয় অবশ্যই করতে হবে। তবে অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। অনেক সরকারি অফিসে অতিরিক্ত সাজসজ্জা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। জেলা শহরের অফিস, সরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও এমন উদাহরণ রয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা, সরকারি সফর, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তাও পর্যালোচনা করা দরকার। পে স্কেলের মাধ্যমে সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিশ্চিত করতে হবে। 

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, সিপিডি 

মতামত এর আরও খবর

img

পুঁজিবাজারের প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনতে একজন 'হিরো'র প্রয়োজন

প্রকাশিত :  ১৯:৪৬, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:৪৮, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

​সম্পাদকীয়

​পুঁজিবাজার আসলে শুধু সূচক, লেনদেন কিংবা কিছু সংখ্যার সমষ্টি নয়। এর ভেতরে জড়িয়ে থাকে লাখো বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশা, সঞ্চয়, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। একটি প্রাণবন্ত বাজার গড়ে তুলতে হলে দরকার এমন কিছু মানুষ, যাঁদের চিন্তা, সময় ও আগ্রহ গভীরভাবে এই বাজারকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।

​এই প্রসঙ্গেই উঠে আসে পুঁজিবাজারের বহুল আলোচিত নাম আবুল খায়ের, বাজারে যিনি পরিচিত 'হিরো' নামে। তাঁকে নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে, বিতর্কও থাকতে পারে; তবে একটি সত্য অস্বীকারের উপায় নেই, বাজারের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের আগ্রহ ও সক্রিয় উপস্থিতি আলোচনায় একটি আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

​এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, একজন সক্রিয় বাজারসংশ্লিষ্ট মানুষকে আমরা আসলে কোন দৃষ্টিতে দেখছি? তাঁকে দূরে ঠেলে রাখার সংস্কৃতি কি বাজারকে সত্যিই শক্তিশালী করবে, নাকি নিয়মকানুনের সীমার মধ্যে থেকে তাঁর মতো সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের শক্তিকে কাজে লাগানোই বেশি ফলদায়ক হবে?

​সক্রিয় বিনিয়োগকারী যত বাড়ে, বাজার নিয়ে আলোচনা যত জমে ওঠে, কোম্পানির মৌলভিত্তি নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণে আগ্রহ যত বাড়ে, বাজারও ততই প্রাণবন্ত হওয়ার সুযোগ পায়। কেউ যদি প্রতিদিন বাজার নিয়ে ভাবেন, কোম্পানির পারফরম্যান্স অনুসরণ করেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেন, তাহলে মূল আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত, সেই আগ্রহকে কীভাবে গঠনমূলক দিকে চালিত করা যায়।

​আমরা মনে করি, কোনো সক্রিয় অংশগ্রহণকারীকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের মাপকাঠিতে নয়, বরং বাজারের নিয়ম, স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার কাঠামোর ভেতরেই মূল্যায়ন করা উচিত। নিয়ম হবে সবার জন্য সমান; কিন্তু যাঁরা সেই নিয়ম মেনে বাজারে সক্রিয় থাকেন, তাঁদের অবদানও স্বীকৃতি পাওয়া উচিত।

​আবুল খায়েরকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও বাজারসংশ্লিষ্ট অনেকেই তাঁর সক্রিয়তার কথা জানেন। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব কাউকে ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করা নয়, বরং যেকোনো ইতিবাচক দিক তুলে ধরা এবং বাজারের স্বার্থে জরুরি প্রশ্নগুলো সামনে আনা।

​এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কোনো প্রতিবেদন বা সম্পাদকীয়তে কারও ইতিবাচক ভূমিকা তুলে ধরা মানেই এই নয় যে তার বিনিময়ে কোনো সুবিধা নেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা দাঁড়িয়ে থাকে স্বাধীনতা, দায়িত্বশীলতা এবং তথ্যনির্ভরতার ওপর। আমাদের অর্থনীতিবিষয়ক প্রতিবেদনেও এই নীতি সমানভাবে অনুসৃত হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন বা বাণিজ্যিক সম্পর্ককে সংবাদ বা সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়।

​বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে আমরা সবসময় অগ্রাধিকার দিই। কারণ শক্তিশালী পুঁজিবাজার মানে শুধু কিছু কোম্পানির শেয়ারদর বেড়ে যাওয়া নয়; এর অর্থ বাজারে আস্থা তৈরি হওয়া, অংশগ্রহণ বাড়া, ভালো কোম্পানির যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগসংস্কৃতি গড়ে ওঠা।

​এই প্রেক্ষাপটে আবুল খায়েরের মতো সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর ভূমিকা নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। তাঁর উপস্থিতি নিয়ে কারও ভিন্নমত থাকতেই পারে, কিন্তু তাঁকে ঘিরে যে আগ্রহ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও সমীচীন নয়।

​বাজারে প্রাণ ফেরাতে দরকার আস্থা, স্বচ্ছতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ। দরকার এমন একটি পরিবেশ, যেখানে বিনিয়োগকারী নির্দ্বিধায় মত প্রকাশ করতে পারেন, বাজার নিয়ে ভাবতে পারেন এবং নিয়ম মেনে অংশ নিতে পারেন। কাউকে অকারণে দমিয়ে রাখার বদলে নিয়মের ভেতরে থেকে ইতিবাচক শক্তিকে কাজে লাগানোই হতে পারে একটি পরিণত পুঁজিবাজারের বৈশিষ্ট্য।

​কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে কেন এত কথা? উত্তরটা সহজ, ভালো কিছু চোখে পড়লে সেটি ভালো বলাই স্বাভাবিক। যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বাজারের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখেন, তাঁদের সেই দিক আলোচনায় আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

​আজকের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আস্থা। বিনিয়োগকারীরা চান প্রাণবন্ত, স্বচ্ছ ও সুযোগসমৃদ্ধ একটি বাজার, যেখানে ভালো কোম্পানি প্রাপ্য মূল্যায়ন পায়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী উৎসাহ পান এবং ইতিবাচক অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ে।

​তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত কে বাজারে আছেন, তা নয়; বরং বাজারকে আরও কার্যকর করার উপায় কী, সেটিই।

​আবুল খায়ের যদি সত্যিই দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজার নিয়ে ভাবেন, কাজ করেন এবং সক্রিয় থাকেন, তবে তাঁর সেই আগ্রহকে বাজারের ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তরের সুযোগ আছে কি না, সেটিই এখন খতিয়ে দেখা দরকার।

​কারণ পুঁজিবাজারকে প্রাণবন্ত করতে শুধু নীতিমালাই যথেষ্ট নয়; দরকার মানুষ, দরকার অংশগ্রহণ, দরকার আস্থা, আর দরকার বাজারকে ভালোবাসে এমন সক্রিয় মানুষ।

​হিরো নিছক একজন ব্যক্তি। কিন্তু তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া আলোচনা আমাদের একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আমরা কি সক্রিয় বাজার অংশগ্রহণকারীদের দূরে সরিয়ে রাখব, নাকি নিয়মের কাঠামোর ভেতরে রেখে তাঁদের ইতিবাচক শক্তিকে কাজে লাগাব?

​শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব একটি পুঁজিবাজার গড়তে দ্বিতীয় পথটিই বিবেচনার যোগ্য।