img

সমাজ বদলানোর আগে নিজেকে বদলান

প্রকাশিত :  ১৫:২৯, ০১ অক্টোবর ২০২৬

সমাজ বদলানোর আগে নিজেকে বদলান

॥ হুসনা খান হাসি ॥

আমরা প্রায় সবাই একটি সুন্দর সমাজের স্বপ্ন দেখি। এমন একটি সমাজ, যেখানে অন্যায় থাকবে না, দুর্নীতি থাকবে না, মানুষ মানুষকে ঠকাবে না, কেউ কারও অধিকার হরণ করবে না। আমরা সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে কথা বলি, অন্যের ভুল ধরিয়ে দিই এবং পরিবর্তনের দাবি তুলি। কিন্তু খুব কম মানুষই নিজেকে প্রশ্ন করি, “যে পরিবর্তন আমি সমাজের কাছে চাইছি, তার কতটুকু আমি নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করছি?”

সমাজ আসলে কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। সমাজ গড়ে ওঠে মানুষকে নিয়ে। প্রতিটি মানুষ তার আচরণ, মূল্যবোধ, চিন্তা ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে সমাজের একটি অংশ হয়ে ওঠে। তাই সমাজের পরিবর্তনও শুরু হয় ব্যক্তির পরিবর্তন থেকে।

আমরা চাই সবাই সত্য কথা বলুক, কিন্তু নিজের স্বার্থে মিথ্যা বলার সময় অনেকেই বিবেককে নীরব করে দিই। আমরা চাই দুর্নীতি বন্ধ হোক, অথচ ছোটখাটো অনিয়মকে অনেক সময় “এতে কী এমন হয়েছে” বলে মেনে নিই। আমরা চাই মানুষ অন্যকে সম্মান করুক, কিন্তু মতের অমিল হলেই অন্যকে অপমান করতে দ্বিধা করি না। আমরা চাই রাস্তায় কেউ নিয়ম ভাঙবে না, অথচ নিজের প্রয়োজন হলে নিয়মকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।

এই দ্বৈত আচরণই সমাজ পরিবর্তনের পথে বড় বাধা।

অন্যের পরিবর্তনের দাবি করা সহজ, নিজের পরিবর্তন কঠিন। কারণ অন্যের ভুল আমরা বাইরে থেকে দেখতে পাই, কিন্তু নিজের ভুল স্বীকার করতে হলে তাকাতে হয় নিজের ভেতরের দিকে। নিজের অহংকার, স্বার্থপরতা, হিংসা, অসততা ও দায়িত্বহীনতার মুখোমুখি হওয়া সহজ নয়।

তবুও সত্যিকারের পরিবর্তনের শুরু সেখানেই।

একজন মানুষ যদি নিজের আচরণে সততা আনে, তাহলে তার পরিবারে তার প্রভাব পড়ে। একটি পরিবারে যদি দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সম্মান তৈরি হয়, তার প্রভাব পড়ে আশপাশের মানুষের ওপর। অসংখ্য মানুষ যখন নিজেদের ছোট ছোট জায়গা থেকে সঠিক কাজ করার চেষ্টা করে, তখন ধীরে ধীরে সামাজিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আসে।

আমরা অনেক সময় মনে করি, “আমি একা বদলে কী হবে?” কিন্তু বড় পরিবর্তন কখনো একদিনে আসে না। একটি ছোট অভ্যাস থেকে একটি বড় সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে। একজন মানুষ নিয়ম মেনে চললে হয়তো পৃথিবী বদলে যাবে না, কিন্তু সে তার সন্তানকে নিয়ম মানার শিক্ষা দিতে পারে। একজন মানুষ অন্যকে সম্মান করলে হয়তো সমাজ রাতারাতি বদলাবে না, কিন্তু তার আচরণ অন্য কারও আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।

পরিবর্তন তাই সবসময় বড় কোনো ঘোষণা দিয়ে শুরু হয় না। কখনো তা শুরু হয় একটি মিথ্যা না বলা থেকে, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা থেকে, নিজের ভুল স্বীকার করা থেকে, দায়িত্ব এড়িয়ে না যাওয়া থেকে কিংবা ক্ষমতা ও সুযোগের অপব্যবহার না করা থেকে।

আমরা সমাজের নেতাদের কাছে জবাবদিহি চাই, যা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের কাছেও জবাবদিহি করতে হবে। আমরা নাগরিক হিসেবে কী করছি, কর্মক্ষেত্রে কীভাবে আচরণ করছি, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করছি, দুর্বল মানুষের প্রতি আমাদের মনোভাব কেমন, এবং নিজের সুবিধার জন্য আমরা কতটা অন্যায়কে মেনে নিচ্ছি, এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

সমাজকে পরিবর্তন করার দায়িত্ব শুধু কোনো সরকার, প্রতিষ্ঠান বা নেতার নয়। সমাজের প্রতিটি মানুষের আচরণ সেই সমাজের চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখে। তাই পরিবর্তনের দাবি করার পাশাপাশি পরিবর্তনের অংশ হওয়াও জরুরি।

নিজেকে পরিবর্তন করার অর্থ নিজের পরিচয় মুছে ফেলা নয়। বরং নিজের দুর্বলতাগুলোকে চিনে সেগুলো সংশোধন করার চেষ্টা করা। নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া। নিজের স্বাধীনতার সঙ্গে অন্যের অধিকারের কথাও মনে রাখা। নিজের স্বার্থের পাশাপাশি বৃহত্তর স্বার্থের কথাও বিবেচনা করা।

আমরা যদি প্রত্যেকে অন্যকে বদলানোর আগে নিজেকে একবার প্রশ্ন করি, তাহলে হয়তো অনেক সমস্যার শুরুতেই সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

সমাজ বদলানোর কথা বলা সহজ, কিন্তু নিজের অভ্যাস, চিন্তা ও আচরণ বদলানোই সবচেয়ে কঠিন কাজ। আমরা প্রায়ই অন্যের ভুলের হিসাব রাখি, কিন্তু নিজের ভুলের সামনে দাঁড়াতে চাই না। অথচ একটি সমাজের চরিত্র গড়ে ওঠে তার মানুষের চরিত্র দিয়ে। তাই সমাজের পরিবর্তন কোনো দূরের স্বপ্ন নয়, এর শুরু আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত থেকে।

আমরা যদি সততার কথা বলি, তবে নিজের জীবনে সততাকে জায়গা দিতে হবে। আমরা যদি ন্যায়বিচার চাই, তবে নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধেও ন্যায়ের পাশে দাঁড়াতে হবে। আমরা যদি সম্মান চাই, তবে অন্যকেও সম্মান করতে হবে। আমরা যদি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ চাই, তবে নিজেদের সুবিধার জন্য অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

শুধু অন্যকে বদলানোর অপেক্ষায় থাকলে পরিবর্তন কখনো সম্পূর্ণ হবে না। পরিবর্তনের প্রথম দায়িত্বটি নিজের কাঁধে নিতে হবে। কারণ একটি ভালো সমাজ তৈরি হয় হাজারো বড় বক্তৃতায় নয়, বরং লাখো মানুষের ছোট ছোট সঠিক কাজের মাধ্যমে।

তাই সমাজকে প্রশ্ন করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন। অন্যের ভুল ধরার আগে নিজের ভুল দেখুন। পরিবর্তনের দাবি তোলার আগে পরিবর্তনের উদাহরণ হয়ে উঠুন।

মনে রাখুন, সমাজের পরিবর্তনের জন্য হয়তো আপনার হাতে পুরো পৃথিবী নেই, কিন্তু আপনার নিজের আচরণটি আপনার হাতেই আছে। আর সেই একটি পরিবর্তনই হতে পারে আরও অনেক পরিবর্তনের শুরু।

সমাজ বদলানোর অপেক্ষা করবেন না। নিজেকে বদলান, নিজের চারপাশ বদলান, তারপর দেখুন পরিবর্তনের ঢেউ কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

কার্যকর করণীয় সংক্ষেপে:-

সমাজ পরিবর্তনের শুরু হোক নিজের কাছ থেকে। এজন্য:

১- নিজের ভুল স্বীকার করুন এবং তা সংশোধনের চেষ্টা করুন।

২-অসততা ও অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবেন না, ছোট হলেও।

৩-প্রত্যেক মানুষকে সম্মান করুন, মতপার্থক্য থাকলেও।

৪-নিজের দায়িত্ব নিজে পালন করুন এবং অন্যের ওপর চাপিয়ে দেবেন না।

৫-সমালোচনার আগে আত্মসমালোচনা করুন।

৬-পরিবার থেকেই ভালো আচরণের চর্চা শুরু করুন এবং নিজে উদাহরণ তৈরি করুন।

৭-সামাজিক নিয়ম ও অন্যের অধিকারকে সম্মান করুন।

৮-অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করে সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিবাদ করুন।

-৯প্রতিদিন নিজের কাজ ও আচরণ মূল্যায়ন করুন।

১০-ভালো কাজকে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করুন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, আমরাই সমাজ। তাই সমাজ বদলানোর অপেক্ষা না করে আজ থেকেই নিজেকে বদলানোর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করুন: “আমি যে সমাজ চাই, সেই সমাজ গঠনে আজ আমি কী করছি?”

হুসনা খান হাসি 
০১/১০/২০২৬
লন্ডন, ইউকে

মতামত এর আরও খবর

img

যে ভুলের কারণে হারতে যাচ্ছেন ট্রাম্প

প্রকাশিত :  ০৮:১৫, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৮:২২, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডেভিড ওয়ালেস-ওয়েলস

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নেতৃত্বে ইরানে হামলার ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে। এদিকে জ্বালানি খরচের প্রতিবাদে বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লেও যুদ্ধের বেশিরভাগ সময়ের মতোই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এখনো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বাড়তি গ্যাসের দাম এবং খানিকটা মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়া লাগলেও বসন্তের সময় অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে যেসব বিকট সতর্কবার্তা আমরা শুনেছিলাম, সে তুলনায় অর্থনৈতিক প্রভাবটি কিছুটা সামলে নেওয়া গেছে বলেই মনে হয়। শুল্ক আরোপের মতোই এ যুদ্ধও দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

তবে রাজনীতির সমীকরণ কিন্তু একেবারেই ভিন্ন। সেখানে যুদ্ধের প্রভাব প্রথম থেকেই বেশ স্পষ্ট এবং ট্রাম্পের গলায় ঝুলে থাকা অসংখ্য কলঙ্কের মধ্যে এটিই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক যুদ্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের ভূমিকা সমর্থন করেন।

কিন্তু তার চেয়েও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো—মার্কিন নাগরিকেরা তাঁদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে যে বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন, তাতেও যুদ্ধের একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে তাঁরা মনে করেন। ১০ জনের মধ্যে ৮ জন মার্কিন নাগরিক বলছেন, এ যুদ্ধের কারণেই তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে।

লেবার ডে পার হতেই শরতের নির্বাচনের চিত্রটা দ্রুত স্পষ্ট হতে শুরু করে—এমনটাই মনে করছেন রাজনীতিবিষয়ক বিশ্লেষকেরা। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম কয়েক সপ্তাহের জনমত জরিপ থেকে যা দেখা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত পরিষ্কার—একটি বড় ধরনের ডেমোক্রেটিক বা ‘ব্লু ওয়েভ’-এর সুস্পষ্ট পূর্বাভাস।

জরিপের গড় হিসাব বলছে, ২০১৮ সালের সেই ঐতিহাসিক নির্বাচনের চেয়েও এ দফায় ডেমোক্র্যাটরা অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছেন। আমার কাছে যেসব তথ্য রয়েছে, তা নির্দেশ করে যে কানসাস, আইওয়া, সাউথ ক্যারোলাইনা ও ফ্লোরিডার মতো জায়গায় সিনেট আসনগুলোর ভাগ্য এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত এবং ডেমোক্র্যাটদের হাতের মুঠোয় চলে আসতে পারে।

অবশ্য নির্বাচন এখনো কয়েক সপ্তাহ দূরে। রিপাবলিকানদের হাতে বিপুল পরিমাণ নির্বাচনী তহবিল রয়েছে এবং ডেমোক্রেটিক সিনেট জয়ের পথটি দূর থেকে সব সময়ই এক ঝুঁকিপূর্ণ সরু দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটার মতোই মনে হতো।

কিন্তু ট্রাম্প দিন দিন অজনপ্রিয় হয়ে পড়ছেন এবং তাঁর গ্রাফ নিচের দিকে নামছে। তরুণ, কৃষ্ণাঙ্গ ও অশ্বেতকায় ভোটারদের রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার যে বহুচর্চিত পুনর্গঠনের কথা বলা হচ্ছিল, তা এই দফায় কোথাও দেখা যাচ্ছে না।

আসলে সেই পরিবর্তন আদৌ সত্যি ছিল, নাকি স্রেফ একটা সাময়িক বিভ্রান্তি বা মরীচিকা ছিল, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের আর ইমেজ সংকটে ভোগা কোনো দল বলে মনে হচ্ছে না; সাধারণ জরিপগুলোয় তারা ধারাবাহিকভাবে ওপরের দিকে উঠছে এবং নির্দিষ্ট প্রার্থীর নাম ঘোষণা করার পর তাদের পারফরম্যান্স আরও ভালো দেখাচ্ছে।

তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের চূড়ান্ত লড়াইয়ে ট্রাম্পের যেসব স্পষ্ট দুর্বলতা রয়েছে—তাঁর নগ্ন দুর্নীতি, অভিবাসন নিয়ে কঠোরতা, নামমাত্র আইনি অর্জন এবং দেশের সিংহভাগ মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ত্বরান্বিতকারীদের পক্ষে অবলীলায় অবস্থান নেওয়া—সেগুলোর মধ্যে ইরান যুদ্ধ যেভাবে আলাদা হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি চমকপ্রদ মনে হয়েছে।

হয়তো আমার অবাক হওয়া উচিত নয়। সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই সংঘাত ছিল একটি চরম অপমানজনক ব্যাপার। বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও শক্তিশালী সামরিক বাহিনীকে এক অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র শক্তির সস্তা ড্রোন এবং ক্ষণস্থায়ী মিসাইলের সামনে পিছু হটতে হয়েছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছে, ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং সাম্প্রতিক রিপোর্টগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আসল সংখ্যাটি আরও বেশি হতে পারে।

মার্কিন নাগরিকদের জীবন বাঁচাতে আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটিগুলো খালি করতে হয়েছে, দেশের ক্ষেপণাস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টরের মজুত মারাত্মকভাবে কমে গেছে এবং মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর ভেতরের পরিস্থিতি বিশ্বমঞ্চে এক লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে পরিণত হয়েছে।

কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের মতে, এই সামরিক অভিযানের কারণে পেন্টাগনের ইতিমধ্যে ৩৮ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়ে গেছে এবং প্রতি মাসে এই খরচের খাতা কেবলই বাড়ছে। শুরুতেই এ যুদ্ধকে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল, কমপক্ষে তা-ই ছিল জনমত। আর এখন মনে হচ্ছে, এটি একটি চিরন্তন ও অন্তহীন যুদ্ধ।

সামরিক দিকটি তো গেল। দেশের ভেতরে, যুদ্ধের এই ছয় মাসে মার্কিন নাগরিকেরা জ্বালানির জন্য ইতিমধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অতিরিক্ত অর্থ গুনেছেন, যা সংঘাত না থাকলে দিতে হতো না। ট্রাম্পের নামে চাপানো এই অতিরিক্ত মূল্যকে বার্ষিক হিসাবে রূপান্তর করলে তা যুক্তরাষ্ট্রের মোট জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের সমান।

সিবিওর অনুমান, এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির এক-তৃতীয়াংশের বেশি সরাসরি এই যুদ্ধের ফল। সমস্যাটি এতটাই বড় আকার ধারণ করেছে যে প্রেসিডেন্টের নিজের হাতে নিযুক্ত ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান সুদের হার না কমিয়ে উল্টো বাড়িয়ে দিয়েছেন। যুদ্ধবিরোধী অবস্থান বজায় রাখার ট্রাম্পের যে তথাকথিত প্রতিশ্রুতি ছিল, তা ভঙ্গ করা নিয়ে তো অনেক কথাই হয়েছে।

কিন্তু তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতি কমানোর যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা ভেঙে চুরমার হয়েছে। ফলে ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য কতটা মারাত্মক ও ক্ষতিকর হতে পারে, তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে।

এ পরিস্থিতি নতুন এবং তা কেবল ট্রাম্পের জন্যই নতুন নয়।

বহু দশক ধরে দূরপ্রাচ্যে যুদ্ধ চালানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র খুব একটা সফল না হলেও নিজ দেশের ভেতরের রাজনৈতিক ধাক্কা বা প্রতিক্রিয়া নিয়ে বেশি চিন্তা না করেই যুদ্ধ শুরু করার মতো এক অন্ধ আত্মবিশ্বাস তাদের ছিল।

এক অর্থে এটিই ছিল দেশটির আসল সামরিক পরাশক্তি বা অহংকার। তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া এই সমীকরণকে ব্যাপকভাবে বদলে দিয়েছে।

প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার রেটিং দেখলেই এ প্রবণতা খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। সামগ্রিকভাবে চলতি বছরের বসন্তে যুদ্ধের সূচনা হওয়ার ঠিক পরপরই তাঁর রেটিংয়ে একটি বড় পতন ঘটে। মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর তাঁর জনপ্রিয়তার গ্রাফ আরও অনেক কিছু উন্মোচন করে।

এসব ইস্যুতে ট্রাম্পের নিট জনপ্রিয়তা একধাক্কায় পাহাড় থেকে খাদে পড়ার মতো ২৫ পয়েন্ট নিচে নেমে যায়।  

কয়েক মাস পর ট্রাম্পের অনুগত ভোটাররাও দেশের অর্থনীতি নিয়ে বেশ হতাশ অনুভব করছেন। গত জানুয়ারিতে ৭২ শতাংশ রিপাবলিকান ভোটার বলেছিলেন যে তাঁরা মনে করেন, আগের বছরের তুলনায় অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে এসে সেই সংখ্যা ৪০ পয়েন্টেরও বেশি কমে মাত্র ২৯ শতাংশে নেমে এসেছে।

মার্কিন অর্থনীতির প্রাথমিক সূচকগুলো—কম বেকারত্ব, তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি এবং চাঙা শেয়ারবাজার—এবং দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অর্থনীতিকে দেখার যে মানসিকতা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গড়ে উঠেছে, তা বিবেচনায় নিলে এই রেটিংয়ের সংখ্যাগুলোকে অত্যন্ত কম বলতে হবে।

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, বাইডেন আমলে উদারপন্থী বিশ্লেষকেরা বছরের পর বছর ধরে তথাকথিত ‘ভাইব-সিশন’, অর্থাৎ প্রচলিত অর্থনৈতিক সূচকগুলোর চেয়ে জনগণের অর্থনৈতিক অনুভূতি যে কতটা অন্ধকার ছিল, তার ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছেন।

এখন ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও সেই মানসিক অনুভূতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে এবং এই পতনের বড় একটি অংশ সরাসরি যুক্ত হয়ে আছে ইরানের সঙ্গে।

পরিস্থিতি হয়তো আরও খারাপের দিকে যেতে চলেছে। ছয় মাস ধরে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবগুলোকে কয়েকটি আনুকূল্যপূর্ণ কারণ সামাল দিয়ে রেখেছিল। তবুও গ্যাসের দাম বাড়ার সংকেত সব দেয়াল ভেঙে সামনে চলে এসেছে। ফেব্রুয়ারির পর থেকে গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ডিজেলের দাম এখন গ্যালনপ্রতি সাড়ে ৬ ডলারে ঠেকেছে।

জুলাই মাসে চীনের জ্বালানি আমদানি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে; যদিও তা যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সৌদি আরব লোহিত সাগরের দিকে তেল ডাইভার্ট করার জন্য যে পাইপলাইন ব্যবহার করছিল, হুতিরা তা উড়িয়ে দিয়েছে এবং ক্ষতির কারণে দেশটি ইউরোপে তাদের কিছু চালান বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে তেলের মজুত, যার অনেকটাই ইতিমধ্যে ঐতিহাসিক সর্বনিম্নে রয়েছে, তা দ্রুত খালি হওয়ার শেষ সীমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে জেপি মরগান একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে সতর্ক করে দিয়েছে যে আসন্ন শরতের এই বিশৃঙ্খলা সামাল দেওয়ার কোনো মানচিত্র বা স্পষ্ট পথ তাদের জানা নেই। নির্বাচনের বাকি আর দুই মাসেরও কম সময়।