পুঁজিবাজারের প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনতে একজন 'হিরো'র প্রয়োজন
সম্পাদকীয়
পুঁজিবাজার আসলে শুধু সূচক, লেনদেন কিংবা কিছু সংখ্যার সমষ্টি নয়। এর ভেতরে জড়িয়ে থাকে লাখো বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশা, সঞ্চয়, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। একটি প্রাণবন্ত বাজার গড়ে তুলতে হলে দরকার এমন কিছু মানুষ, যাঁদের চিন্তা, সময় ও আগ্রহ গভীরভাবে এই বাজারকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।
এই প্রসঙ্গেই উঠে আসে পুঁজিবাজারের বহুল আলোচিত নাম আবুল খায়ের, বাজারে যিনি পরিচিত 'হিরো' নামে। তাঁকে নিয়ে ভিন্নমত থাকতে পারে, বিতর্কও থাকতে পারে; তবে একটি সত্য অস্বীকারের উপায় নেই, বাজারের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের আগ্রহ ও সক্রিয় উপস্থিতি আলোচনায় একটি আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো, একজন সক্রিয় বাজারসংশ্লিষ্ট মানুষকে আমরা আসলে কোন দৃষ্টিতে দেখছি? তাঁকে দূরে ঠেলে রাখার সংস্কৃতি কি বাজারকে সত্যিই শক্তিশালী করবে, নাকি নিয়মকানুনের সীমার মধ্যে থেকে তাঁর মতো সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের শক্তিকে কাজে লাগানোই বেশি ফলদায়ক হবে?
সক্রিয় বিনিয়োগকারী যত বাড়ে, বাজার নিয়ে আলোচনা যত জমে ওঠে, কোম্পানির মৌলভিত্তি নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণে আগ্রহ যত বাড়ে, বাজারও ততই প্রাণবন্ত হওয়ার সুযোগ পায়। কেউ যদি প্রতিদিন বাজার নিয়ে ভাবেন, কোম্পানির পারফরম্যান্স অনুসরণ করেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেন, তাহলে মূল আলোচনার বিষয় হওয়া উচিত, সেই আগ্রহকে কীভাবে গঠনমূলক দিকে চালিত করা যায়।
আমরা মনে করি, কোনো সক্রিয় অংশগ্রহণকারীকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের মাপকাঠিতে নয়, বরং বাজারের নিয়ম, স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার কাঠামোর ভেতরেই মূল্যায়ন করা উচিত। নিয়ম হবে সবার জন্য সমান; কিন্তু যাঁরা সেই নিয়ম মেনে বাজারে সক্রিয় থাকেন, তাঁদের অবদানও স্বীকৃতি পাওয়া উচিত।
আবুল খায়েরকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও বাজারসংশ্লিষ্ট অনেকেই তাঁর সক্রিয়তার কথা জানেন। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব কাউকে ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করা নয়, বরং যেকোনো ইতিবাচক দিক তুলে ধরা এবং বাজারের স্বার্থে জরুরি প্রশ্নগুলো সামনে আনা।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কোনো প্রতিবেদন বা সম্পাদকীয়তে কারও ইতিবাচক ভূমিকা তুলে ধরা মানেই এই নয় যে তার বিনিময়ে কোনো সুবিধা নেওয়া হয়েছে। সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা দাঁড়িয়ে থাকে স্বাধীনতা, দায়িত্বশীলতা এবং তথ্যনির্ভরতার ওপর। আমাদের অর্থনীতিবিষয়ক প্রতিবেদনেও এই নীতি সমানভাবে অনুসৃত হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন বা বাণিজ্যিক সম্পর্ককে সংবাদ বা সম্পাদকীয় অবস্থানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়।
বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে আমরা সবসময় অগ্রাধিকার দিই। কারণ শক্তিশালী পুঁজিবাজার মানে শুধু কিছু কোম্পানির শেয়ারদর বেড়ে যাওয়া নয়; এর অর্থ বাজারে আস্থা তৈরি হওয়া, অংশগ্রহণ বাড়া, ভালো কোম্পানির যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগসংস্কৃতি গড়ে ওঠা।
এই প্রেক্ষাপটে আবুল খায়েরের মতো সক্রিয় অংশগ্রহণকারীর ভূমিকা নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। তাঁর উপস্থিতি নিয়ে কারও ভিন্নমত থাকতেই পারে, কিন্তু তাঁকে ঘিরে যে আগ্রহ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও সমীচীন নয়।
বাজারে প্রাণ ফেরাতে দরকার আস্থা, স্বচ্ছতা এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ। দরকার এমন একটি পরিবেশ, যেখানে বিনিয়োগকারী নির্দ্বিধায় মত প্রকাশ করতে পারেন, বাজার নিয়ে ভাবতে পারেন এবং নিয়ম মেনে অংশ নিতে পারেন। কাউকে অকারণে দমিয়ে রাখার বদলে নিয়মের ভেতরে থেকে ইতিবাচক শক্তিকে কাজে লাগানোই হতে পারে একটি পরিণত পুঁজিবাজারের বৈশিষ্ট্য।
কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে কেন এত কথা? উত্তরটা সহজ, ভালো কিছু চোখে পড়লে সেটি ভালো বলাই স্বাভাবিক। যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বাজারের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখেন, তাঁদের সেই দিক আলোচনায় আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
আজকের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আস্থা। বিনিয়োগকারীরা চান প্রাণবন্ত, স্বচ্ছ ও সুযোগসমৃদ্ধ একটি বাজার, যেখানে ভালো কোম্পানি প্রাপ্য মূল্যায়ন পায়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী উৎসাহ পান এবং ইতিবাচক অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ে।
তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত কে বাজারে আছেন, তা নয়; বরং বাজারকে আরও কার্যকর করার উপায় কী, সেটিই।
আবুল খায়ের যদি সত্যিই দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজার নিয়ে ভাবেন, কাজ করেন এবং সক্রিয় থাকেন, তবে তাঁর সেই আগ্রহকে বাজারের ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তরের সুযোগ আছে কি না, সেটিই এখন খতিয়ে দেখা দরকার।
কারণ পুঁজিবাজারকে প্রাণবন্ত করতে শুধু নীতিমালাই যথেষ্ট নয়; দরকার মানুষ, দরকার অংশগ্রহণ, দরকার আস্থা, আর দরকার বাজারকে ভালোবাসে এমন সক্রিয় মানুষ।
হিরো নিছক একজন ব্যক্তি। কিন্তু তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া আলোচনা আমাদের একটি বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আমরা কি সক্রিয় বাজার অংশগ্রহণকারীদের দূরে সরিয়ে রাখব, নাকি নিয়মের কাঠামোর ভেতরে রেখে তাঁদের ইতিবাচক শক্তিকে কাজে লাগাব?
শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব একটি পুঁজিবাজার গড়তে দ্বিতীয় পথটিই বিবেচনার যোগ্য।



















