img

বদলে যাওয়া সাংবাদিকতা: আশির দশকের সংবাদ সংগ্রহ থেকে আজকের বাস্তবতা

প্রকাশিত :  ১৫:৪৩, ২১ আগষ্ট ২০২৬

বদলে যাওয়া সাংবাদিকতা: আশির দশকের সংবাদ সংগ্রহ থেকে আজকের বাস্তবতা

সংগ্রাম দত্ত: আশির দশকের শেষ দিক। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের এক-দুই বছর আগের সময়। তখন শহর তো বটেই, গ্রামাঞ্চল এমনকি আরও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে তা সংবাদপত্রে পাঠানো ছিল একেবারেই ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা। আজকের মতো হাতের মুঠোয় মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, কম্পিউটার কিংবা মুহূর্তে সংবাদ পাঠানোর প্রযুক্তি তখন ছিল না। একজন সাংবাদিককে সংবাদ সংগ্রহ থেকে প্রকাশ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপই নিজের হাতে সম্পন্ন করতে হতো।

গ্রাম, শহর কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে খবর সংগ্রহ করে ফিরে এসে নিউজপ্রিন্টের কাগজে হাতে লিখে সংবাদ তৈরি করা হতো। এরপর তা ডাকযোগে পাঠানো ছিল সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি। মাঝেমধ্যে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেও সংবাদ পাঠানো হতো। তবে তখন কুরিয়ার খরচও কম ছিল না—প্রায় ১০ টাকা। সেই সময়ের হিসাবে এটিও ছিল যথেষ্ট ব্যয়বহুল। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ডাকযোগেই সংবাদ পাঠানো হতো।

তবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংবাদ দ্রুত পাঠানোর প্রয়োজন হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে যেত। তখন মৌলভীবাজার শহরে গিয়ে টেলিগ্রামের মাধ্যমে সংবাদ পাঠাতে হতো। শ্রীমঙ্গল শহরেও টেলিফোনে যোগাযোগের একটি ব্যবস্থা ছিল। পাবলিক টেলিফোন ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনের সময় লাইন পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। দিনের পর দিন চেষ্টা করেও সংযোগ মিলত না। হঠাৎ কখনো এক-দুবার লাইন পাওয়া গেলে সেটিই ছিল সৌভাগ্যের ব্যাপার।

ফলে একজন সাংবাদিকের কাছে একটি সংবাদ প্রকাশের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া মানেই কাজ শেষ হয়ে যাওয়া ছিল না। খবর সংগ্রহ করতে হতো মাঠে গিয়ে, ফিরে এসে সেটি লিখতে হতো হাতে, তারপর ডাকঘর কিংবা কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠাতে হতো। জরুরি সংবাদ হলে আবার ছুটতে হতো মৌলভীবাজারে টেলিগ্রাম করতে।

ইংরেজি পত্রিকায় কাজের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা ছিল। সংবাদ ইংরেজিতে লিখে হাতে তৈরি করে ডাকযোগে কিংবা কুরিয়ারে পাঠানো হতো। সংবাদ লেখার জন্য কম্পিউটার তো দূরের কথা, তখন সবার কাছে টাইপরাইটারও ছিল না। তাই হাতে লেখা সংবাদই ছিল সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান অবলম্বন।

আজকের প্রজন্মের কাছে বিষয়টি হয়তো অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সময় সাংবাদিকতা ছিল মূলত শ্রম, ধৈর্য, মেধা এবং দায়িত্ববোধের পেশা। সংবাদ প্রকাশের প্রতিটি ধাপেই সময় ও পরিশ্রম দিতে হতো। একটি সংবাদ পাঠাতে যেখানে আজ কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট, তখন সেখানে লেগে যেত ঘণ্টা, কখনো এক দিন বা তারও বেশি।

সাংবাদিকের সংখ্যাও তখনকার সময়ে তুলনামূলকভাবে কম ছিল। কিন্তু সংখ্যায় কম হলেও তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, প্রতিভাবান এবং প্রকৃত জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ। তাঁরা সাংবাদিকতাকে শুধু একটি পেশা হিসেবে দেখতেন না; সংবাদকে সত্য, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরাকে দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচনা করতেন।

সেই সময়ের সাংবাদিকদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন বিভিন্ন বড় রাজনৈতিক দলের নেতাও। এমনকি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকা অবস্থায় দু-তিনজন জনপ্রতিনিধি হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

শ্রীমঙ্গলের রাজনৈতিক নেতা রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী ১৯৮৩ সালে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতা কমলেশ ভট্টাচার্য দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শ্রীমঙ্গল পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি শুধু রাজনীতিবিদই ছিলেন না, সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বিপুল রঞ্জন চৌধুরীও শ্রীমঙ্গল পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনিও সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকতা করার সময় তাঁদের মধ্যে দলীয় পক্ষপাতিত্ব দেখা যেত না। তাঁরা ছিলেন নিরপেক্ষ, আদর্শনিষ্ঠ ও বস্তুনিষ্ঠ। সংবাদ পরিবেশনে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা ছিল সর্বজনীন। রাজনৈতিকভাবে তাঁরা বিভিন্ন দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সাংবাদিক হিসেবে তাঁদের ভূমিকা নিয়ে কখনো কেউ প্রশ্ন তোলেনি।

এমনকি রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও তাঁদের মধ্যে ছিল পারস্পরিক রাজনৈতিক শিষ্টাচার। সাংবাদিকতা ও রাজনীতিকে তাঁরা এক করে ফেলেননি। সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয়কে সংবাদ পরিবেশনের ওপর প্রভাব ফেলতে দেননি

শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাব গঠনের ক্ষেত্রেও এই সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শুরু থেকেই যাঁরা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন, তাঁদের নেতৃত্বে ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রেসক্লাবের খাজনা নিজেরাই পরিশোধ করেছেন। প্রেসক্লাবের খাজনা তাঁরা কখনো বকেয়া রাখেননি।

এরশাদ সাহেবের আমলে একবার একজন মন্ত্রী প্রেসক্লাবের নামে কিছু অর্থ বরাদ্দ করেছিলেন। তবে তৎকালীন সময়ের বিবেচনায় সেই অর্থের পরিমাণ ছিল যৎসামান্য। প্রেসক্লাব পরিচালনা কিংবা এর দায়-দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সেই সামান্য সরকারি সহায়তার ওপর তাঁরা নির্ভরশীল ছিলেন না। নিজেদের সামর্থ্য ও দায়িত্ববোধ থেকেই তাঁরা প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রেখেছিলেন।

সেই সময়ের সাংবাদিকতা ছিল প্রযুক্তিবিহীন, কিন্তু দায়িত্ববোধে সমৃদ্ধ। যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা ছিল, সংবাদ পাঠানো ছিল কষ্টসাধ্য, তথ্য সংগ্রহে ছিল নানা ঝুঁকি ও প্রতিবন্ধকতা। তবু সাংবাদিকেরা সংবাদ সংগ্রহ করতেন, যাচাই করতেন, হাতে লিখতেন এবং নানা কষ্ট করে তা পত্রিকা অফিসে পৌঁছে দিতেন।

আজ প্রযুক্তি সাংবাদিকতার কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে ছবি, ভিডিও, সংবাদ কিংবা সরাসরি সম্প্রচার পাঠানো সম্ভব। তথ্যের প্রবাহ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত। কিন্তু প্রযুক্তির এই বিপুল সুবিধার সঙ্গে সাংবাদিকতার মান, দায়িত্ববোধ ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নটিও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আর বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতার নানা চিত্রের কথা শুনলে অনেক সময় সত্যিই গা শিউরে ওঠে। সংবাদপেশার প্রতি মানুষের যে আস্থা একসময় ছিল, নানা কারণে সেই আস্থায় এখন ভাটা পড়েছে। সাংবাদিকতার সঙ্গে যখন ব্যক্তিস্বার্থ, রাজনৈতিক পক্ষপাত, বাণিজ্যিক চাপ কিংবা নানা অনিয়মের অভিযোগ জড়িয়ে পড়ে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন সাংবাদিকের বিশ্বাসযোগ্যতা নয়—পুরো পেশাটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এ কারণেই আজ মানুষের একটি বড় অংশ সাংবাদিকতার প্রতি আগের মতো আস্থা রাখতে পারছে না। অথচ সাংবাদিকতার মূল শক্তি প্রযুক্তি নয়, সংবাদমাধ্যমের ভবন নয়, কিংবা বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ও নয়। এর মূল শক্তি হলো বিশ্বাস।

আশির দশকের সেই সাংবাদিকদের হাতে ছিল না আধুনিক প্রযুক্তি, ছিল না দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ। ছিল শুধু কলম, কাগজ, তথ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সত্য প্রকাশের অঙ্গীকার। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাঁরা যে আস্থা তৈরি করেছিলেন, সেটিই ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় অর্জন।

সময়ের সঙ্গে সাংবাদিকতার প্রযুক্তি বদলেছে, সংবাদ পাঠানোর পদ্ধতি বদলেছে, সংবাদমাধ্যমের কাঠামো বদলেছে। কিন্তু সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তটি বদলায়নি—সত্য, নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা এবং মানুষের আস্থা।

সেই জায়গাটিতেই হয়তো আজকের সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।


মতামত এর আরও খবর

img

মালয়েশিয়ার বাজার খুলেছে, আমাদের প্রস্তুতি কোথায়?

প্রকাশিত :  ১৯:২৫, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ২০:৪৩, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

দীর্ঘ অপেক্ষার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য আবার খুলেছে। সেখানে কর্মী নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে, নিয়োগকর্তারা কোটার অনুমোদন নিচ্ছেন, চাহিদাপত্র দিচ্ছেন। অথচ বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় গতি নেই। বিদেশের দরজা খোলার পরও যদি দেশের প্রশাসনিক দরজায় কর্মীদের আটকে থাকতে হয়, তাহলে শ্রমবাজার খোলার সুফল যাবে কোথায়?

প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর সরকারি উদ্যোগটি আশাব্যঞ্জক। কর্মীদের ব্যয় নিয়োগকর্তারা বহন করবেন, এমন ব্যবস্থা হলে বিদেশে যাওয়ার জন্য ঋণ করে বা জমি বিক্রি করে অর্থ জোগাড় করা পরিবারগুলোর ওপর চাপ কমবে। কিন্তু নীতি যতই ভালো হোক, বাস্তবায়ন ধীর হলে তার সুফল থাকে না। এখন সেটিই বড় উদ্বেগের বিষয়।

মালয়েশিয়ার অংশে নিয়োগের প্রস্তুতি এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশে অনুমোদন, যাচাই, বহির্গমন ছাড়পত্র ও অন্যান্য প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই কর্মীদের সুরক্ষা ও নিয়ম মানা নিশ্চিত করা। কিন্তু সুরক্ষার নামে যদি এমন ব্যবস্থা তৈরি হয়, যেখানে একটি আবেদন কোথায় আটকে আছে তা কর্মী নিজেই জানেন না, তাহলে সেটি সুশাসনের লক্ষণ নয়।

এখানে বোয়েসেলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বোয়েসেলের দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ অভিবাসন, স্বচ্ছতা ও নিয়ম মেনে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির শক্তিশালী ভূমিকা থাকা দরকার। কিন্তু তদারকি ও সমন্বয়ের বদলে যদি পুরো প্রক্রিয়ার ওপর অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়, তাহলে গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই থাকবে, তবে সেই নিয়ন্ত্রণ যেন কর্মী পাঠানোর পথে বাধা না হয়।

বৈধ বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ক্ষেত্রেও ভারসাম্য জরুরি। অনিয়ম করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, এতে দ্বিমত নেই। কিন্তু বৈধ এজেন্সিগুলোর সক্ষমতাকে কাজে না লাগিয়ে সবকিছু একটি কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল করলে প্রশাসনিক চাপ বাড়বে। বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারের মূল কাজ হওয়া উচিত নিয়ম নির্ধারণ, নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের অতীত আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ও অনিয়মের অভিযোগের কারণে এই বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার পর এবার স্বচ্ছ ও সিন্ডিকেটমুক্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ এসেছে। কিন্তু পুরোনো অনিয়ম ঠেকাতে গিয়ে যদি নতুন আমলাতান্ত্রিক জট তৈরি হয়, তাহলে কর্মীদের দুর্ভোগের ধরন বদলাবে, দুর্ভোগ কমবে না।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সময়। মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তারা অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করবেন না। বাংলাদেশ সময়মতো কর্মী দিতে না পারলে তারা অন্য দেশ থেকে কর্মী নেবে। ভারত, নেপাল, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ এ সুযোগ নিতে প্রস্তুত। একটি শ্রমবাজারে সুযোগ হারানো মানে শুধু কয়েক হাজার চাকরি হারানো নয়। এর সঙ্গে হারাতে হয় ভবিষ্যৎ রেমিট্যান্সের সম্ভাবনাও।

একজন প্রবাসী কর্মীর পাঠানো অর্থ তাঁর পরিবারের কাছে জীবনের অবলম্বন। সেই অর্থে ঋণ পরিশোধ হয়, সন্তানের পড়াশোনা চলে, ঘর তৈরি হয়, চিকিৎসার খরচ মেটে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে ভূমিকা রাখে। তাই বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অকারণ বিলম্বকে কেবল দাপ্তরিক সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

আরেকটি ঝুঁকি আরও গুরুতর। সরকারি প্রক্রিয়া যত জটিল হয়, দালালের প্রভাব তত বাড়ে। কর্মী যখন সরকারি ব্যবস্থায় দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পান না, তখন তিনি অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। সেখান থেকেই প্রতারণা ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়। নিরাপদ অভিবাসনের লক্ষ্য তখন ব্যর্থ হয়।

এখন সরকারের সামনে তাই কাজ একটাই: প্রক্রিয়ার জট খুলতে হবে। বোয়েসেলকে কার্যকর সমন্বয় ও তদারকির ভূমিকায় রেখে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে নির্ধারিত নিয়মে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। বিএমইটির ক্লিয়ারেন্স, ভিসা ও বহির্গমন প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা দরকার। আবেদন কোন পর্যায়ে আছে, কোথায় আটকে আছে, কেন আটকে আছে, তা কর্মীর জানার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

এ জন্য পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়বে, ফাইল আটকে রাখার সুযোগ কমবে এবং দালালনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে এখন আর নতুন ঘোষণা দরকার নেই। দরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর বাস্তবায়ন। বিদেশের নিয়োগকর্তা প্রস্তুত, কর্মীরা অপেক্ষায়। বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা যদি এখনও ধীরগতির থাকে, তবে এই সুযোগ অন্যরা নিয়ে নেবে।

আমরা যেন আবারও শ্রমবাজার হারিয়ে পরে কারণ খুঁজতে না বসি। কারণ এবার সমস্যাটি বাজার বন্ধ হওয়া নয়। বাজার খোলা থাকার পরও কর্মী পাঠাতে না পারার ঝুঁকি।

মালয়েশিয়ার দরজা খুলেছে। এখন বাংলাদেশের কাজ হলো, নিজের দরজাটা সময়মতো খুলে দেওয়া।