img

সিলেটের রেলপথে আটকে থাকা প্রতিশ্রুতি: ৩ সেপ্টেম্বরও পেরোল, টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস কোথায়?

প্রকাশিত :  ১৫:৫৯, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সিলেটের রেলপথে আটকে থাকা প্রতিশ্রুতি: ৩ সেপ্টেম্বরও পেরোল, টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস কোথায়?
সংগ্রাম দত্ত

সিলেটবাসীর কাছে রেল এখন যেন প্রতিশ্রুতির আরেক নাম। কখনো নতুন আন্তনগর ট্রেন চালুর ঘোষণা, কখনো ডাবল লাইন নির্মাণের আশ্বাস, আবার কখনো সিলেট–জাফলং রেলসড়ক কিংবা ময়মনসিংহ–সিলেট সরাসরি রেল যোগাযোগের পরিকল্পনা—বছরের পর বছর ধরে এসব কথা শুনে আসছেন এই অঞ্চলের মানুষ। কিন্তু ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব যেন ক্রমেই বাড়ছে।

সর্বশেষ আলোচনায় ছিল ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’। সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল, এই ট্রেন ঢাকার সঙ্গে সিলেটের রেল যোগাযোগকে আরও দ্রুত ও আধুনিক করবে। সিলেট-৬ আসনের এমপি এমরান আহমদ চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে সংসদে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেট–ঢাকা রেলপথে ‘টাঙ্গুয়া’ নামে নতুন একটি ট্রেন চালু হবে।

কথা ছিল মে ও জুন মাসে। নির্ধারিত ৩ সেপ্টেম্বরও পেরিয়ে গেছে। কিন্তু ট্রেন চালুর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকেও নতুন ট্রেন চালুর বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—সংসদে নির্দিষ্ট তারিখ দিয়ে যে ট্রেন চালুর কথা বলা হয়েছিল, সেই টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস কোথায়?
সিলেট-৬ আসনের এমপি এমরান আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি আবার সংসদে তুলবেন।

সিলেটের রেল যোগাযোগের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি হলো একক রেললাইন। ২০১৯ সালে আখাউড়া–সিলেট রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করার প্রকল্পের ঘোষণা সিলেটবাসীর মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করেছিল। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা ও সিলেটের মধ্যে রেলযাত্রা আরও দ্রুত, নিরাপদ ও আধুনিক হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু অর্থসংকটের কারণে প্রকল্পটি স্থগিত রয়েছে। ফলে সিলেটের সঙ্গে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও যোগাযোগকেন্দ্রগুলোর রেলসংযোগের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নও থমকে আছে।

এই রেলপথ শুধু ঢাকা–সিলেট যাতায়াতের বিষয় নয়। এর সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ভারতের আগরতলার সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের বিষয়টিও যুক্ত। ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত না হওয়ায় আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

ময়মনসিংহ ও সিলেটের মানুষের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক। দুই অঞ্চলের মানুষের আত্মীয়তা যেমন গভীর, তেমনি পণ্যবাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগও রয়েছে।

তবু দুই বিভাগকে সরাসরি রেলপথে যুক্ত করা যায়নি।

২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহে এক জনসভায় তৎকালীন ধর্মমন্ত্রী প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান বলেছিলেন, “ময়মনসিংহ–সিলেট রেলপথে শিগগিরই আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হবে।”

এরপর ২০১৯ সালে সিলেট–চট্টগ্রাম এবং ময়মনসিংহ–সিলেট রুটে নতুন দুটি আন্তনগর ট্রেন চালুর পরিকল্পনার কথা জানায় রেলওয়ে। ওই সময় ইন্দোনেশিয়ার PT INKA থেকে আধুনিক কোচও আমদানি করা হয়। এসব কোচের একটি অংশ ওই রুটে ব্যবহারের কথা ছিল।

কিন্তু ঘোষণার পর বছর পেরিয়েছে। ট্রেন আর চালু হয়নি।

২০২১ সালের ৯ অক্টোবর রাজধানীর বেইলি রোডের অফিসার্স ক্লাবে বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমন্বয় পরিষদের বার্ষিক সম্মেলনে তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানিয়েছিলেন, ময়মনসিংহের সঙ্গে সিলেটের সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনে জরিপ চলছে।

তিনি আরও বলেছিলেন, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ থেকে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার উড়ালসড়ক নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। হাওরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
কিন্তু এসব ঘোষণার পরও মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

বর্তমানে সিলেট থেকে ময়মনসিংহ যেতে যাত্রীদের ঘুরপথে যেতে হয়। কখনো ঢাকা, কখনো ভৈরব হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে সময় লাগে প্রায় ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা।
অথচ সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু করা গেলে এই যাত্রা প্রায় ৭ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব হতো।
অর্থাৎ একটি রেললাইন শুধু দুই শহরের দূরত্ব কমাত না; কমাত সময়, পরিবহন ব্যয় এবং মানুষের দুর্ভোগও। একই সঙ্গে ময়মনসিংহ ও সিলেটের ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও সামাজিক যোগাযোগ আরও গতিশীল হতে পারত।

সিলেটের রেল যোগাযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক হতাশার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ‘টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেস’।
২০২৩ সালে অনুমোদন পাওয়া এই ট্রেনকে ঘিরে সিলেটবাসীর প্রত্যাশা ছিল অনেক। আধুনিক, ননস্টপ ও আন্তর্জাতিক মানের সেবা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ঢাকার সঙ্গে সিলেটের দ্রুত রেল যোগাযোগে এটি নতুন দিগন্ত খুলবে—এমন আশাই করেছিলেন যাত্রীরা।
কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা, ইঞ্জিনের স্বল্পতা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে ট্রেনটি চালু হয়নি।

এরপর মে ও জুন মাসে বিষয়টি আবার সামনে আসে। সিলেট-৬ আসনের এমপি এমরান আহমদ চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী সংসদে জানান, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেট–ঢাকা রেলপথে ‘টাঙ্গুয়া’ নামে নতুন ট্রেন চালু হবে।
কিন্তু ৩ সেপ্টেম্বর পেরিয়ে গেলেও টাঙ্গুয়া এক্সপ্রেসের কোনো দেখা নেই।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টও নতুন ট্রেন চালুর বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। ফলে সংসদে ঘোষিত নির্দিষ্ট তারিখও যখন পার হয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—ঘোষণাটি কি কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

শুধু নতুন ট্রেন নয়, বিদ্যমান আন্তনগর ট্রেনের সেবাও নিয়ে সিলেটবাসীর অভিযোগের শেষ নেই।
সিলেট থেকে ঢাকাগামী আন্তনগর ট্রেনগুলোতে পথে বিভিন্ন স্টেশনে ব্যাপক যাত্রী ওঠানামার কারণে অনেক সময় ট্রেনের ভেতরে চলাচলের জায়গা থাকে না। আশুগঞ্জ, ভৈরব বাজার, নরসিংদীসহ বিভিন্ন স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠায় সিলেট থেকে যাত্রা করা অনেক যাত্রীকে দীর্ঘ পথ দাঁড়িয়ে যেতে হয়—এমন অভিযোগ রয়েছে।
এ নিয়ে সম্প্রতি সিলেটবাসী মানববন্ধনও করেছেন। তাঁদের দাবি, ঢাকা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের দিকে যাওয়ার পথে আন্তনগর ট্রেনের স্টপেজ কমানো হোক, যাতে দীর্ঘ দূরত্বের যাত্রীরা তুলনামূলক স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।

সিলেটবাসীর বক্তব্য, আন্তনগর ট্রেনের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো দ্রুত ও তুলনামূলক আরামদায়ক যাত্রা। কিন্তু পথে অতিরিক্ত স্টপেজ ও যাত্রী ওঠানামার কারণে সেই সুবিধা অনেকটাই নষ্ট হচ্ছে।

সিলেট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা শ্রীমঙ্গল। চা-বাগান, পাহাড়, বনাঞ্চল, হাওর ও বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে শ্রীমঙ্গল দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য।

প্রতিদিন দেশি-বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা রয়েছে এখানে। রাধানগরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনকেন্দ্র। পাশাপাশি লেবু, আনারস, কাঁঠাল ও চা-বাগানের বিস্তৃত চাষাবাদকে ঘিরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতি। এসব খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শত শত মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন।
ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাধানগরের নামও। ১৭৮ বিঘা জমির ডলুছড়া পাহাড় ব্রিটিশ শাসনামলে শ্রীমঙ্গলের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও দানবীর রাধা নাথ দেব চৌধুরী কিনেছিলেন। পরে তিনি জমিটি তাঁর চার সন্তানের মধ্যে বণ্টন করেন। তাঁদের কেউ কেউ জমি বিক্রি করেন, আর অবশিষ্ট জমির একটি অংশ সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন কারণে হাতছাড়া হয়ে যায়। তাঁর নাম থেকেই গড়ে ওঠে ‘রাধানগর’, যা বর্তমানে সিলেট বিভাগের অন্যতম উন্নত ও সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে পরিচিত।

এত সম্ভাবনার পরও শ্রীমঙ্গলসহ সিলেট বিভাগের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে ঘিরে আধুনিক রেলসেবা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবাসী ও অর্থনৈতিক অঞ্চল। বিপুল প্রবাসী আয়, চা শিল্প, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং পর্যটন—সব মিলিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে এ অঞ্চলের গুরুত্ব উল্লেখযোগ্য।
জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দি, লালাখান কিংবা শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান—প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রই দেশের পর্যটন খাতকে আরও বড় করার সম্ভাবনা রাখে। কিন্তু আধুনিক ও দ্রুত রেল যোগাযোগের অভাব সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর পথে একটি বড় সীমাবদ্ধতা।
ঢাকা থেকে সিলেটগামী ট্রেনগুলোর অনেকগুলো এখনো পুরোনো ইঞ্জিননির্ভর। কোথাও কোথাও রেলের গতিবেগ ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটারের নিচে নেমে আসে। ফলে সড়কপথের যানজট ও দীর্ঘ যাত্রার বিকল্প হিসেবে যে রেলকে আরও কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে সময়সাশ্রয়ী বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।

২০১৭ থেকে শুরু করে পরবর্তী বছরগুলোতে সিলেটের রেল যোগাযোগ নিয়ে একের পর এক ঘোষণা এসেছে। নতুন ট্রেন, ডাবল লাইন, সরাসরি ময়মনসিংহ–সিলেট রেল যোগাযোগ, সিলেট–জাফলং রেলসড়ক—প্রতিটি উদ্যোগই মানুষের মনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
কিন্তু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবায়নের দূরত্ব দিন দিন স্পষ্ট হয়েছে।

সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষ মানববন্ধন, মিছিল, সভা ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে রেল যোগাযোগ উন্নয়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের বক্তব্য এখন অনেকটা অভিন্ন—আর ঘোষণা নয়, এবার তাঁরা বাস্তব কাজ দেখতে চান।
কারণ একটি ট্রেন শুধু কয়েকশ যাত্রীকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায় না। একটি কার্যকর রেলপথের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের সময়, ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, কর্মসংস্থান এবং একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতি।

৩ সেপ্টেম্বর পেরিয়ে গেছে। সংসদে ঘোষিত তারিখও এখন অতীত। অথচ সিলেটবাসীর অপেক্ষা শেষ হয়নি।
তাঁরা আর নতুন কোনো তারিখ শুনতে চান না। তাঁরা দেখতে চান ট্রেন। দেখতে চান আধুনিক রেললাইন। চান দ্রুতগামী ও নির্ভরযোগ্য রেলসেবা।
সিলেটের রেলপথ যেন আর প্রতিশ্রুতির স্টেশনে দাঁড়িয়ে না থাকে—এটাই এখন এই অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা।

img

যুদ্ধের ময়দানে উজ্জীবিত ইরানের পরমাণু স্বপ্ন: ইউরোশিয়া রিভিউ

প্রকাশিত :  ০৬:২২, ২২ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ০৬:২৭, ২২ অক্টোবর ২০২৬

একসময় ইরানের রাজনীতিতে পারমাণবিক বোমা তৈরির আলোচনা ছিল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও গোপনীয়। তবে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে টানা আট মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলেছে। এখন দেশটির নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রণেতারা প্রকাশ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি তুলছেন।

অথচ এই দেশেই একদিন সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একটি ধর্মীয় ফতোয়া ছিল আইন, যেখানে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি বা সংরক্ষণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে তেহরান বিশ্ববাসীকে এটাই বোঝানোর চেষ্টা করেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক কাজের জন্য। কিন্তু যুদ্ধের কালো মেঘ সেই পুরোনো ধারণাকে এক নিমিষে উড়িয়ে দিয়েছে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের প্রথম দফার আকস্মিক আঘাতেই কেঁপে উঠেছিল ইরান। সেই হামলায় শুধু সামরিক বা পারমাণবিক স্থাপনাই ধ্বংস হয়নি, প্রাণ হারিয়েছেন খেসারত দেওয়া বহু সাধারণ নাগরিক এবং খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব। যদিও পরবর্তী সময়ে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক তৎপরতা কমিয়ে এনে নৌ-অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপের পথ বেছে নিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে উল্টো নতুন হামলার হুমকি দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের সাফ কথা, চুক্তি করতে হলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে।

আর ঠিক এ অনিশ্চিত ও চরম অস্তিত্বের সংকটের মাঝেই তেহরানের অন্দরে শুরু হয়েছে তীব্র দন্তনখ লড়াই। একপক্ষ বলছে, পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ইরান এরই মধ্যে অনেক চড়া মূল্য চুকিয়ে ফেলেছে। পার্লামেন্ট সদস্য আহমাদ বাখশায়্যাশ আরদেস্তানি কিংবা মহসেন রেজাইয়ের মতো শীর্ষ নিরাপত্তা কর্তারা মনে করেন, এখন আর পিছু হটার সময় নেই; বরং শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে পরমাণু অস্ত্র অর্জনের পথেই হাঁটা উচিত।

রক্ষণশীল বিশ্লেষক দাউদ মোদাররেসিয়ানের ভাষায়, একটি পরমাণু বোমা অর্জন করা আজকের দিনে রুটি-রুজির চেয়েও বড় ও জরুরি প্রয়োজন, যা দেশের টিকে থাকার একমাত্র নিশ্চয়তা। তারা ট্রাম্পের সেই পুরোনো কথারই প্রতিধ্বনি করেন, যেখানে উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের উদাহরণ টেনে ট্রাম্প বলেছিলেন, কারও হাতে ১১টি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠেও রয়েছে শক্ত যুক্তি। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবের এই চিন্তার তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে আছে, তাদের পরমাণু বোমার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, একটি বোমা বড়জোর ৫০ থেকে ১ লাখ মানুষের প্রাণ নিতে পারে, কিন্তু হরমুজ প্রণালি আটকে দিলে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও কোটি কোটি মানুষের জীবন জিম্মি করা সম্ভব। সাংবাদিক সিনা জাহানি কিংবা বিশ্লেষক আমির আলী আবুলফাতদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর এ উন্মাদনা সরাসরি ইসরায়েলের ফাঁদে পা দেওয়ার শামিল। বোমা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকান বোমায় দেশের বাকি অবকাঠটুকুও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে, এমন আত্মঘাতী পথ কোনো সুরক্ষাই দিতে পারে না।

কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, ইরান কি চাইলেও এখন বোমা বানাতে পারবে? যুদ্ধের আগুনে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মূল অবকাঠামো আজ প্রায় পঙ্গু। নাতানজ ও ফরদোর মতো প্রধান ভূগর্ভস্থ প্লান্টগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তবে সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ দশমিক ১৯ কেজি ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে এই বিশাল মজুতের সঠিক হদিস তাদের জানা নেই।

মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দাবি, গ্রানাইট পাথরের ৮০ থেকে ১০০ মিটার গভীরে অবস্থিত গোপন ও সুরক্ষিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ সুড়ঙ্গে হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ ও এই ইউরেনিয়াম লুকিয়ে ফেলেছে তেহরান। আর এ কারণেই ট্রাম্প সম্প্রতি হুংকার ছেড়েছেন, আমাদের হয়তো সেখানেই গিয়ে অভিযান চালাতে হতে পারে!

তাত্ত্বিকভাবে, ওই গোপন মজুতের নাগাল পেলে সামান্য সেন্ট্রিফিউজ দিয়েই অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়াম বানিয়ে ফেলা সম্ভব। ইরান যদিও যুদ্ধ বন্ধের বিনিময়ে এই মজুত হালকা বা পাতলা করার প্রস্তাব দিয়েছে, তবুও ওয়াশিংটনের কড়া নজর এবং পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের হিমশীতল পাহাড়ের আড়ালে এখন ঝুলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তথা গোটা বিশ্বের ভাগ্য।