img

ডলারের আধিপত্য ধ্বংস করতে চীনের ‘ট্রেজারি–কৌশল’

প্রকাশিত :  ১৩:৩৪, ০১ জুন ২০২৬

ডলারের আধিপত্য ধ্বংস করতে চীনের ‘ট্রেজারি–কৌশল’

জাসিম আল-আজ্জাউই

 চীন যখন ২০২৬ সালের বসন্তে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সিকিউরিটিজে নিজেদের বিনিয়োগ কমাতে শুরু করল, তখন ওয়াশিংটনের মূলধারার অনেক বিশ্লেষক স্বভাবগতভাবেই একে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘রুটিন’ ঘটনা বলে আখ্যা দেন। কিন্তু তাঁদের তা করা উচিত ছিল না। যা ঘটছে, তা আসলে এক দশকব্যাপী কৌশলের চূড়ান্ত পরিণতি; একটি পরিকল্পনা, যা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সর্বোচ্চ মুহূর্তে চীন চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ গ্রহণ ব্যয়কে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

পরিসংখ্যানগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৩ সালে চীনের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে ৬৯৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে এবং পরের মাসে আরও কমে দাঁড়ায় ৬৫২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে।

শুধু ২০২৬ সালের মার্চ মাসেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট মার্কিন ট্রেজারি ধারণ ১৩৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার কমে যায়। একই সময়ে শীর্ষ ১০ বিদেশি ধারকের মধ্যে জাপান, চীন, বেলজিয়াম, কানাডা, ফ্রান্সসহ সাতটি দেশ একযোগে তাদের ঝুঁকি বা এক্সপোজার কমিয়ে আনে।

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ এল-এরিয়ান এ পরিবর্তনকে সরাসরি একটি কাঠামোগত রূপান্তর হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বাজারে চীনের অংশীদারত্ব এখন মাত্র ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ‘১৫ বছর আগে অর্জিত ২৮ শতাংশের সর্বোচ্চ অবস্থানের এক-চতুর্থাংশ মাত্র।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ধারাবাহিকভাবে নতুন ঋণপত্র ইস্যুর পরিপ্রেক্ষিতে এই পতন আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামো মূলত ধারাবাহিকভাবে আগ্রহী ঋণদাতাদের ওপর নির্ভরশীল। ওয়াশিংটন সামরিক ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ফেডারেল কর্মচারীদের বেতন এবং বৈদেশিক প্রতিশ্রুতিগুলোর অর্থায়নের জন্য নিয়মিত বাজেটঘাটতি পরিচালনা করে এবং সেই ঘাটতি পূরণ করে নতুন ঋণ ইস্যুর মাধ্যমে।

এমন পরিস্থিতিতে চীনের মতো বড় ঋণদাতা যখন পিছু হটতে শুরু করে, তখন এর গাণিতিক প্রভাব অত্যন্ত কঠোর হয়। এর ফলে ট্রেজারির সুদের হার (ইয়িল্ড) বাড়ে, পুরোনো ঋণ নবায়নের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং বিদেশি চাহিদা কমে যাওয়ায় ডলারের ওপরও চাপ সৃষ্টি হয়।

    প্রকৃত প্রশ্নটি আসলে এই নয় যে মার্কিন ডলার রাতারাতি তার বৈশ্বিক আধিপত্য হারাবে কি না। তা হবে না। আসল প্রশ্ন হলো, চীনের পদক্ষেপগুলো কি অন্য দেশগুলোকে একই সময়ে ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে সরে যেতে উৎসাহিত করবে?

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীন যখন নিজেদের ব্যাংকগুলোকে ট্রেজারি বিনিয়োগ কমানোর পরামর্শ দেয়, তখন অর্থনীতিবিদ পিটার শিফ বিষয়টি নিয়ে তাঁর স্বভাবসুলভ সরাসরি মন্তব্য করেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গবেষক ব্র্যাড সেটসারের মতে, যদি চীন তাদের পুরো ট্রেজারি পোর্টফোলিও বিক্রি করে দেয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার প্রায় ৩০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই হিসাব কেবল সরাসরি বাজারগত প্রভাবকে বিবেচনায় নেয়; অন্য বৈশ্বিক ঋণদাতাদের মধ্যে সম্ভাব্য আতঙ্ক বা চেইন-রি–অ্যাকশনের প্রভাব এতে ধরা হয়নি।

বহু বছর ধরে চীন নীরবে একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। তাদের লক্ষ্য হলো, যদি কখনো তারা মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে বা তা থেকে সরে আসতে চায়, তাহলে যেন নিজেদের অর্থনীতি কোনো বড় ধাক্কা না খায়। এটিকে এমনভাবে ভাবা যায় যে চীন একটি সম্পূর্ণ নতুন আর্থিক ‘এলাকা’ গড়ে তুলছে, যাতে ভবিষ্যতে আর যুক্তরাষ্ট্রের ‘বাড়িতে’ বসবাস করতে না হয়। তারা এটি যেভাবে করছে:

বৈশ্বিক অবকাঠামো তৈরির ‘মহাযাত্রা’: চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) নামে একটি বিশাল প্রকল্প শুরু করেছে, যা ১৪০টির বেশি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে। সারা বিশ্বে সড়ক, বন্দর, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে তারা প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। উদ্দেশ্য হলো, এসব দেশ যেন যুক্তরাষ্ট্রের ডলার ব্যবহার না করেও সরাসরি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারে।

নিজস্ব আন্তর্জাতিক অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা: চীন সীমান্তের বাইরে লেনদেনের জন্য সিআইপিএস নামে নিজস্ব অর্থ প্রদানের নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ২৪ দশমিক ৪৭ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ চীনা মুদ্রা ইউয়ানে লেনদেন সম্পন্ন হয়, যা আগের বছরের তুলনায় ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এর পাশাপাশি চীন বিশ্বের ৪০টির বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বিশেষ মুদ্রা বিনিময় (কারেন্সি সোয়াপ) চুক্তি করেছে।

বন্ধুদের সঙ্গে ডলারবিহীন বাণিজ্য: এটি আর কেবল তাত্ত্বিক পরিকল্পনা নয়; বাস্তবেও এর প্রয়োগ শুরু হয়ে গেছে। বর্তমানে চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার প্রায় ৯৫ শতাংশ বাণিজ্য তাদের নিজস্ব স্থানীয় মুদ্রায় সম্পন্ন হয়। একইভাবে ২০২৪ সালে ব্রাজিল ও চীনের মধ্যকার প্রায় অর্ধেক বাণিজ্য ইউয়ানে পরিচালিত হয়েছে।

বিকল্প অর্থনৈতিক জোট গঠন: চীন ব্রিকস জোট সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই জোটে এখন সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও ইথিওপিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ তেলসমৃদ্ধ ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দেশ যুক্ত হয়েছে। এই দেশগুলোকে একত্র করার মাধ্যমে চীন একটি সমান্তরাল বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামোগত ভিত্তি নির্মাণ করছে; অর্থাৎ যদি কখনো মার্কিন নেতৃত্বাধীন আর্থিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে কিংবা চীন ইচ্ছাকৃতভাবে সেই ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তাদের কাছে ইতোমধ্যেই একটি বিকল্প বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক প্রস্তুত থাকবে, যা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতে পারবে।

এসব কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটি ধারাবাহিক কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ; প্রথমে বিকল্প পথ বা ‘প্রস্থানদ্বার’ তৈরি করা, তারপর ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, যেখানে মার্কিন ট্রেজারি বাজারে একটি বড় পদক্ষেপ নেওয়া যাবে—যার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বার্তা হবে অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু এর ফলে চীনের নিজের অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর ক্ষতি হবে না।

এই কৌশলের অংশ হিসেবেই পিপল’স ব্যাংক অব চায়না তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমশ সোনার দিকে সরিয়ে নিয়েছে। টানা ১৫ মাস ধরে সোনা কেনার পর চীনের স্বর্ণ মজুত রেকর্ড ২ হাজার ৩০৮ টনে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতির উদ্দেশ্য, স্পষ্টভাবে চীনের অর্থনীতিকে ‘নিষেধাজ্ঞা-প্রতিরোধী’ (স্যাংশন প্রুফ) করে তোলা। ২০২২ সালে রাশিয়ার সম্পদ জব্দ করার অভিজ্ঞতার সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।

এখানে ঝুঁকি শুধু অর্থের প্রবাহে নয়; বরং চীনের এই পদক্ষেপ অন্য দেশগুলোকে একই পথ অনুসরণ করার মনস্তাত্ত্বিক অনুমতি দিতে পারে। জাপান উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে; উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো নীরবে তাদের সম্পদ বৈচিত্র্যময় করছে; আর দীর্ঘদিন ধরে ডলারকেন্দ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার বিষয়ে সতর্ক থাকা তথাকথিত ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো ক্রমেই ওয়াশিংটনের মুদ্রানীতির আধিপত্য থেকে প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব খুঁজছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ)  তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মার্কিন ডলারের অংশীদারত্ব নেমে এসেছে ৫৭ দশমিক ৮ শতাংশে, যেখানে ২০০১ সালে তা ছিল ৭২ শতাংশ। একই সময়ে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তিন বছর ধরে প্রতিবছর এক হাজার টনের বেশি স্বর্ণ ক্রয় করেছে।

প্রকৃত প্রশ্নটি আসলে এই নয় যে মার্কিন ডলার রাতারাতি তার বৈশ্বিক আধিপত্য হারাবে কি না। তা হবে না। আসল প্রশ্ন হলো, চীনের পদক্ষেপগুলো কি অন্য দেশগুলোকে একই সময়ে ডলারভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে সরে যেতে উৎসাহিত করবে?

এই মুহূর্তে অনেক দেশ দ্বিধাগ্রস্ত। কিন্তু তারা যদি বুঝতে পারে যে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো নিরাপদ, তাহলে সেটিই একটি ভবিষ্যদ্বাণীতে পরিণত হতে পারে। প্রথম কয়েকটি ‘ডমিনো’ যখন পড়ে যাবে, তখন বাকিগুলোও একে একে অনুসরণ করবে।

ওয়াশিংটনের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাস্তবে রাজনৈতিক বক্তব্যে যতটা বড় করে দেখানো হয়, ততটা নয়। চীনের বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তার অভিঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাপর্যায়ে মূল্য, করপোরেট মুনাফা এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর সরাসরি পড়বে।

অ্যাপল, নাইকি ও টেসলার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো গভীরভাবে চীনা উৎপাদন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া ইউএস–চায়না ইকোনিমক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশন ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছে যে বেইজিংয়ের হাতে এসব পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত করার সক্ষমতা ক্রমশ বাড়ছে।

চীনকে আবার ট্রেজারি কেনায় ফিরিয়ে আনা বা বিক্রি বন্ধ করতে বাধ্য করার জন্য হয় এমন বাজার-প্রণোদনা প্রয়োজন, যা ওয়াশিংটন বর্তমানে দিতে পারছে না; অথবা এমন চাপ প্রয়োগের ব্যবস্থা প্রয়োজন, যার সবচেয়ে বড় মূল্য পরিশোধ করতে হবে মার্কিন ভোক্তাদেরই।

২০২৬ সালের বসন্তে সংঘটিত ব্যাপক বাজারপতন হয়তো একক কোনো বিস্ফোরণ নয়, যা মার্কিন ডলারকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় সতর্কসংকেত। বহু বছর ধরেই যাঁরা মনোযোগ দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন, তাঁরা এই প্রবণতা আসতে দেখেছেন।

আগামী দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা চীনের পরবর্তী পদক্ষেপ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, জাপান, সৌদি আরব এবং গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ কি এই মুহূর্তকে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিন্যাসের উপযুক্ত সময় হিসেবে দেখবে? যদি তারা তা–ই করে, তাহলে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ গতিপথ দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।

    জাসিম আল-আজ্জাউই এমবিসি গ্রুপ, আবুধাবি টিভি এবং আল–জাজিরা ইংলিশে সংবাদ উপস্থাপক, অনুষ্ঠান সঞ্চালক এবং নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।


(মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া)

মতামত এর আরও খবর

img

দুই সপ্তাহের মধ্যে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে : রিজভী

প্রকাশিত :  ১৯:০৪, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সম্পাদকীয় কলাম

দুই সপ্তাহ তথা সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।

রিজভী বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনে বিএনপি আজকে ক্ষমতায় এসেছে। ক্ষমতায় এসেই জনগণের কাছে প্রদত্ত অঙ্গীকার রক্ষায় তারেক রহমান নিরলস পরিশ্রম করছেন, দিন-রাত কাজ করছেন।

দলের চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চ্যালেঞ্জ না থাকলে সেটি মোকাবিলা করে ভালো কিছু করার মধ্যে তো কোনো কৃতিত্ব নেই! নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ আছে, ষড়যন্ত্র আছে, চক্রান্ত আছে, কিন্তু সেগুলোকে মোকাবিলা করেই তারেক রহমান সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, কাজ করে যাচ্ছেন এবং তার অঙ্গীকারগুলো—ফার্মারস কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনের ভাতা, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছেন।

বিদ্যুৎ-জ্বালানির সংকটে বিএনপি বা সরকার দায়ী নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই সংকট একটি বৈশ্বিক সংকট। আমেরিকা-ইরানের যুদ্ধ...হরমুজ প্রণালি জাহাজ আসতে পারছে না। জ্বালানি আসতে পারছে না। দুএকটা জাহাজ যখন আসার চেষ্টা করেছে, সেখানে বোম পড়েছে। তারপরেও তো তিনি (তারেক রহমান) বসে নেই! জ্বালানি-বিদ্যুতের বাজেটের উপরে ৪০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে তিনি গ্যাসের সংকট সমাধান করছেন।’

মহেশখালীতে এফএসআরইউর কারিগরি ত্রুটি মেরামত সম্পন্ন হয়েছে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, ‘এখন রিগ্যাসিফিকেশন শুরু হয়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম অথবা দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত থাকবে এবং বিদ্যুৎ থাকবে। তার কিছু আলামত আমরা দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং সব সংকট মোকাবিলা করে তারেক রহমান দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, এগিয়ে নিয়ে যাবেন।’

দল ও সরকার দুটি পৃথক সত্তা, অথচ সরকার চালাতে গিয়ে দল হিসেবে বিএনপি পৃথক থাকতে পারছে না—গণমাধ্যমকর্মীরা এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘এটি একটি ভেক টার্ম।’

রিজভী বলেন, ‘জনগণ পার্টিকে ভোট দিয়েছে, পার্টি সরকার গঠন করেছে। সরকারের মন্ত্রীরা সব বিএনপির নেতা। অধিকাংশই বিএনপির নেতা। তাহলে পার্টিকে যখন ভোট দিয়েছে, নির্বাচিত করেছে, পার্টির লোকরাই তো সরকার পরিচালনা করবে! এটার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।’

‘আমরা বারবার বলেছি, তৃণমূলের সদস্য থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিএনপির সমস্ত নেতাকর্মী সরকারের অংশ। সরকারের সব কর্মসূচি, যেটা জনকল্যাণে-জনস্বার্থে বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেগুলো আমাদের নেতাকর্মীরা ভালো করে জনগণকে অবহিত করবে। এর মধ্যে কোনো বৈসাদৃশ্য নেই, কোনো বৈশব্দ নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘পার্টি পার্টির জায়গায় আছে, সরকার সরকারের জায়গায় আছে। কিন্তু সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আছে বিএনপি এবং বিএনপির লোক। সুতরাং দলের লোকরাই তো মন্ত্রী হবে, চিফ হুইপ হবে। চিফ হুইপ ভাইস চেয়ারম্যান কাকে করবে? অন্য দেশ থেকে ধার করে আনবে, না অন্য পার্টি থেকে ধার করে আনবে? দলের লোকরাই হবে।’

‘এটা (দল ও সরকার দুটি পৃথক সত্তা) একটা কথা ছুড়ে দিয়েছে, এটা একটা ভেক টার্ম। এটার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নাই। পার্টিতে যারা দায়িত্ব পালন করছেন, তারা পার্টির দায়িত্ব পালন করবেন এবং সরকারেও যারা মন্ত্রী আছেন, তারা মন্ত্রিত্বের ফাঁকে পার্টির যে দায়িত্ব তাদের ওপর আছে, তার পদ অনুযায়ী সেই দায়িত্ব পালন করবেন,’ বলেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।