img

সুবর্ণা ঠাকুরের মনোনয়ন: ভোট ব্যাংক ভাঙার কৌশল!

প্রকাশিত :  ০৮:৪৭, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

সুবর্ণা ঠাকুরের মনোনয়ন: ভোট ব্যাংক ভাঙার কৌশল!

আবদুল হামিদ মাহবুব

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগের পদধারী নেত্রী সুবর্ণা ঠাকুরকে বিএনপির সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনয়ন পেয়ে এতোমধ্যে প্রার্থী হয়েছেন। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তিনি পূর্বে আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত) সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন প্রতিনিধি হিসেবেও পরিচিত। এমন একজন ব্যক্তিকে বিএনপির মতো একটি প্রধান বিরোধী দল মনোনয়ন দেওয়া! এটি শুধু একটি সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এর পেছনে রাজনৈতিক কৌশল, সামাজিক বার্তা এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী হিসাব-নিকাশও জড়িত।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, বিএনপি কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে? এটি কি কেবল রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ, নাকি বৃহত্তর অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির দিকে একটি ইঙ্গিত? এসব প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে নানা জন নানাভাবে বিশ্লেষণ করছে।

আমি সরল ভাবে এখানে কিছু কথা বলছি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলবদল নতুন কোনো ঘটনা নয়। অনেক সময়ই দেখা যায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা আদর্শগত, ব্যক্তিগত বা কৌশলগত এমনকি লোভের কারণেও দল পরিবর্তন করেন। বিএনপিও অতীতে এবং বর্তমানেও বিভিন্ন সময়ে অন্যান্য দল থেকে আসা নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করেছে। এছাড়া আমাদের এখানে বদ্ধমূল ধারণা আছে, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের বৃহৎ অংশ  আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক। বিএনপির এই মনোনয়ন ভোটব্যাংক ভাঙার কৌশল হিসাবেও দেখা যেতে পারে।

সুবর্ণা ঠাকুরের ক্ষেত্রে এটা ধ্রুব সত্য তিনি পূর্বে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একটি উপজেলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছেন। তারপরও বিএনপি কেন তাকে নিলো? আমি মনে করি এটা বিএনপির দলীয় কৌশল। অতীতেও দেখেছি রাজনীতিতে থাকা দলগুলোর একটি সাধারণ কৌশল হলো, পরিচিত এবং প্রভাবশালী মুখদের দলে টেনে আনা, যাতে সংগঠন বিস্তৃত হয় এবং সামাজিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়। সুবর্ণা ঠাকুর তার সম্প্রদায়ের কাছে একজন পরিচিত মুখ। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের \'মতুয়া\' গোষ্ঠী থেকে উঠে আসা একজন প্রান্তিক মানুষ।

এই দৃষ্টিতে বিএনপি হয়তো মনে করেছে যে, তিনি শুধু একজন সংখ্যালঘু প্রতিনিধি নন, বরং তার সামাজিক পরিচিতি, অভিজ্ঞতা বা রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা দলের জন্য লাভজনক হতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অনেক সময়ই প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে বলে সমালোচনা রয়েছে।

এ অবস্থায় কোনো প্রধান দল যদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন নারীকে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দেয়, তাহলে তা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির একটি বার্তা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। বিএনপি যদি এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তাহলে এটি তাদের জন্য একটি রাজনৈতিক বার্তা—তারা সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে চায়।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও থেকে যায়, এই ধরনের মনোনয়ন কি কেবল প্রতীকী, নাকি বাস্তব ক্ষমতায়নের অংশ? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রায়ই বলেন, সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব তখনই অর্থবহ হয়, যখন তারা নীতি-নির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসন মূলত নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য তৈরি। তবে বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায়, এই আসনগুলো দলীয় আনুগত্য ও রাজনৈতিক সমীকরণের ভিত্তিতে বণ্টিত হয়।

এই আসনগুলোর মাধ্যমে দলগুলো নিজেদের প্রতি অনুগত নারী নেতৃত্বকে সংসদে নিয়ে আসে। ফলে এটি শুধু নারীর ক্ষমতায়নের বিষয় নয়, বরং দলীয় ভারসাম্য রক্ষার একটি রাজনৈতিক মাধ্যমও বটে। সুবর্ণা ঠাকুরের মনোনয়ন সেই বাস্তবতারই অংশ। বিএনপি সম্ভবত তার অভিজ্ঞতা, পরিচিতি এবং রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা করে তাকে এই আসনের জন্য উপযুক্ত মনে করেছে।

বিএনপির এই সিদ্ধান্তের আরেকটি সম্ভাব্য দিক হলো ইমেজ নির্মাণ। একটি বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি সবসময়ই নিজেকে জাতীয়তাবাদী, গণতান্ত্রিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক দল হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন নারীকে মনোনয়ন দেওয়া সেই প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে। এটি আন্তর্জাতিক মহলেও একটি বার্তা দেয় যে, দলটি ধর্মীয় ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

বিশেষ করে বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবেশে যেখানে মানবাধিকার, সংখ্যালঘু অধিকার এবং নারীর অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়, সেখানে এই ধরনের সিদ্ধান্ত কূটনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে।

তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনাও অনিবার্য। অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন, যিনি পূর্বে আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত ছিলেন, তাকে মনোনয়ন দেওয়া কতটা আদর্শিকভাবে সঠিক? এটি কি রাজনৈতিক নৈতিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?আরেকটি সমালোচনা হতে পারে, এটি কি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তি, নাকি কেবল রাজনৈতিক সুবিধার জন্য প্রতীকী পদক্ষেপ? অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলো সংখ্যালঘু বা নারীদের মনোনয়ন দিলেও তাদের কার্যকর ক্ষমতা সীমিত থাকে। এছাড়া, দল পরিবর্তনের রাজনীতি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে এটি অনেক সময় জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। সাধারণ ভোটাররা প্রশ্ন করেন, রাজনৈতিক আদর্শ কি এত সহজে পরিবর্তনযোগ্য?

এই মনোনয়নের পেছনে বিএনপির কিছু কৌশলগত লক্ষ্য অবশ্যই আছে: প্রথমত, দলটি তার সাংগঠনিক ভিত্তি সম্প্রসারণ করতে চায়। বিভিন্ন সম্প্রদায় ও পটভূমির নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করে তারা একটি বহুমাত্রিক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চায়। দ্বিতীয়ত, আসন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলটি সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাতে চায়। তৃতীয়ত,পরিচিত মুখদের অন্তর্ভুক্ত করে দলটি সংসদীয় রাজনীতিতে নিজেদের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করতে চায়।

এই ধরনের মনোনয়নের ক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিক্রিয়া সাধারণত মিশ্র হয়। একদিকে অনেকে এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেন, কারণ এটি বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির প্রতীক। অন্যদিকে অনেকে এটিকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ধরনের সিদ্ধান্ত আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

সুবর্ণা ঠাকুরকে বিএনপির সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনয়ন দেওয়া একটি বহুমাত্রিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এটি শুধু একজন ব্যক্তির মনোনয়ন নয়, বরং এর মধ্যে দলীয় কৌশল, সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ইমেজ নির্মাণের মতো বিষয় জড়িত। আমি ইতিবাচক মানুষ। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির পদক্ষেপ হিসেবেও দেখার পক্ষে। আমি এখানে সুবিধাবাদের কথা বলবো না।

সব মিলিয়ে, এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত প্রভাব বোঝা যাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, সুবর্ণা ঠাকুর সংসদে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, এবং বিএনপি সত্যিই কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে, তার ওপর।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব। 

img

জেনেভা ক্যাম্প: অপরাধের জন্মভূমি নয়, অবহেলার দীর্ঘ ছায়া

প্রকাশিত :  ১২:৩৭, ৩১ জুলাই ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের নাম উচ্চারিত হলেই সাধারণ মানুষের মনে দুটি বিপরীত ছবি ভেসে ওঠে। একদিকে আছে সরু গলি, মাদক, সংঘর্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও অপরাধের সংবাদ। অন্যদিকে আছে এমন এক জনগোষ্ঠী, যারা পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে অস্থায়ী আশ্রয়কে স্থায়ী জীবনে পরিণত করতে বাধ্য হয়েছে। প্রথম ছবিটি প্রতিদিনের সংবাদে দেখা যায়; দ্বিতীয় ছবিটি খুব কমই আলোচনায় আসে। অথচ এই দ্বিতীয় ছবিটি না বুঝলে প্রথমটির ব্যাখ্যাও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

জেনেভা ক্যাম্পের সংকট কেবল একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, কেবল একটি বস্তির সমস্যা নয়, আবার কেবল একটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সমস্যাও নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, ইতিহাস, নগর পরিকল্পনা, নাগরিক অধিকার, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং মানবিক দায়বদ্ধতার একটি দীর্ঘস্থায়ী পরীক্ষা। যে পরীক্ষায় আমরা আংশিক সফল হলেও এখনো পূর্ণ নম্বর অর্জন করতে পারিনি।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারতের বিহারসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু উর্দুভাষী মুসলিম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। এরপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাদের জীবনে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করে। যুদ্ধকালীন সময়ে এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, আবার অনেকে নিরপেক্ষ থেকেছিল বা সংঘাতের শিকার হয়েছিল। স্বাধীনতার পর পুরো সম্প্রদায়টি রাজনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। বহু মানুষ তাদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা ও সামাজিক অবস্থান হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হন।

১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের উদ্যোগে মোহাম্মদপুরে একটি অস্থায়ী আশ্রয়শিবির প্রতিষ্ঠিত হয়। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের সদর দপ্তর থাকায় সেটি পরিচিতি পায় \"জেনেভা ক্যাম্প\" নামে। তখন কেউ কল্পনাও করেনি, কয়েক মাস বা কয়েক বছরের জন্য গড়ে ওঠা এই আশ্রয় একসময় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকবে। একটি অস্থায়ী মানবিক উদ্যোগ ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী নগর-অবরুদ্ধ এলাকায় পরিণত হয়।

আজকের জেনেভা ক্যাম্প বাংলাদেশের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা। বিভিন্ন জরিপে এর আয়তন ও জনসংখ্যার কিছু পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই এখানে মানুষের ঘনত্ব অস্বাভাবিকভাবে বেশি। অতি ক্ষুদ্র কক্ষে পাঁচ থেকে দশজন পর্যন্ত মানুষ বসবাস করেন। সরু গলিতে সূর্যের আলো প্রবেশ করে না। খোলা ড্রেন, অপর্যাপ্ত শৌচাগার, নিরাপদ পানির সংকট এবং অগ্নিকাণ্ডের স্থায়ী ঝুঁকি প্রতিদিনের বাস্তবতা।

এই পরিবেশে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর পৃথিবী কেমন হয়? সে কি খেলার মাঠ দেখে? সে কি পর্যাপ্ত আলো-বাতাসে পড়াশোনা করতে পারে? সে কি এমন একটি পরিবেশ পায়, যেখানে নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করা সম্ভব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের বিব্রত করে।

শিক্ষা সংকট এখানে একটি মৌলিক বাস্তবতা। অধিকাংশ পরিবারে উর্দু ভাষা ব্যবহৃত হলেও বিদ্যালয়ের শিক্ষা বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক। ফলে বহু শিশু শুরু থেকেই ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক বৈষম্য, পরিচয় নিয়ে সংকোচ এবং নানা ধরনের বুলিং। ফলাফল অনেক শিশু বিদ্যালয়ে টিকে থাকতে পারে না। একটি প্রজন্ম যখন শিক্ষার বাইরে চলে যায়, তখন পরবর্তী প্রজন্মের দারিদ্র্যও প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়।

২০০৩ এবং ২০০৮ সালের ঐতিহাসিক আদালতের রায়ে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার স্বীকৃতি পায়। এটি ছিল বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। অনেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছেন, ভোটার হয়েছেন এবং নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

কিন্তু নাগরিকত্বের আইনি স্বীকৃতি এবং নাগরিকত্বের বাস্তব অভিজ্ঞতা এক বিষয় নয়।

কোনো নাগরিক যদি পরিচয়পত্র পান, কিন্তু চাকরি পেতে ঠিকানার কারণে বৈষম্যের শিকার হন, তাহলে তিনি কাগজে নাগরিক হলেও বাস্তবে সমান সুযোগ পান না। যদি ব্যাংক ঋণ পেতে অসুবিধা হয়, ব্যবসার লাইসেন্স পেতে বাধা আসে অথবা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি হয়, তাহলে সেই নাগরিকত্ব অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

এখানে একটি বিষয় সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। অনেক সময় বলা হয়, ক্যাম্পের ঠিকানার কারণে সবাই পাসপোর্ট পান না বা সব আবেদন আটকে যায়। বাস্তবে এ ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বিভিন্ন ব্যক্তি ও মানবাধিকার সংগঠন উল্লেখ করেছে, তবে প্রতিটি আবেদন একইভাবে নিষ্পত্তি হয় এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তাই যেসব প্রশাসনিক বাধা বাস্তবে বিদ্যমান, সেগুলো নীতিগতভাবে পর্যালোচনা করে সমাধান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

জেনেভা ক্যাম্প নিয়ে জনমনে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় অপরাধ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন সময়ে এখানে অভিযান চালিয়েছে, অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করেছে এবং অপরাধী গ্রেপ্তার করেছে। এসব ঘটনা বাস্তব। কিন্তু এখানেই আলোচনার সমাপ্তি ঘটলে একটি বড় ভুল হবে।

অপরাধ কখনোই কোনো জাতিগত পরিচয়ের বৈশিষ্ট্য নয়। অপরাধ সৃষ্টি হয় সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক এবং স্থানিক নানা কারণের সমন্বয়ে। জেনেভা ক্যাম্পে দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, সীমিত শিক্ষা, ঘনবসতি, অপর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা এবং সংগঠিত অপরাধচক্রের প্রভাব একত্রে একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করেছে। এই বাস্তবতা স্বীকার করেও একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে ক্যাম্পের অধিকাংশ মানুষ সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাঁরা মোটর মেকানিক, দর্জি, বাবুর্চি, চালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গৃহকর্মী কিংবা কারুশিল্পী। অল্পসংখ্যক অপরাধীর কারণে পুরো সম্প্রদায়কে অপরাধী হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের অন্যান্য ঘনবসতিপূর্ণ দরিদ্র এলাকাতেও আমরা একই বাস্তবতা দেখেছি। যেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি দুর্বল, শিক্ষার সুযোগ সীমিত এবং কর্মসংস্থানের পথ সংকুচিত, সেখানে সংঘবদ্ধ অপরাধ সহজেই শেকড় গাড়ে। তাই কেবল অভিযান চালিয়ে সমস্যার উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও মূল কারণ দূর করা যায় না।

এখানে রাষ্ট্রের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে। প্রথম পথটি কেবল নিরাপত্তাকেন্দ্রিক অভিযান, গ্রেপ্তার, নজরদারি। দ্বিতীয় পথটি নিরাপত্তার পাশাপাশি সামাজিক বিনিয়োগের শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং আইনের সমান প্রয়োগ। দীর্ঘমেয়াদে দ্বিতীয় পথটিই কার্যকর।

জেনেভা ক্যাম্পের পুনর্বাসন নিয়ে বহু বছর ধরেই আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু পরিকল্পনা যত হয়েছে, বাস্তবায়ন তত এগোয়নি। অথচ এই সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়।

প্রথমত, একটি সমন্বিত নগর পুনর্গঠন পরিকল্পনা প্রয়োজন। বর্তমান অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ আবাসন ধাপে ধাপে পরিকল্পিত বহুতল আবাসনে রূপান্তর করা যেতে পারে। কোথায় পুনর্বাসন হবে, কীভাবে হবে, কী ধরনের মালিকানা কাঠামো থাকবে এসব বিষয়ে অধিবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হবে সফলতার শর্ত।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা হতে হবে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। ভাষাগত সহায়তা, ঝরে পড়া রোধ, উপবৃত্তি, কারিগরি শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষায় বিশেষ সহায়তা ছাড়া প্রজন্মগত দারিদ্র্যের চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।

তৃতীয়ত, কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ক্যাম্পের বহু পরিবার কাবাব, বেকারি, বেনারসি, কারচুপি, টেইলারিং ও বিভিন্ন কারুশিল্পে দক্ষ। এসব ঐতিহ্যবাহী দক্ষতাকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে হাজারো তরুণের জন্য বৈধ আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

চতুর্থত, প্রশাসনিক সেবা আরও সহজলভ্য করতে হবে। নাগরিকত্বের স্বীকৃতি বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা জরুরি। পরিচয়পত্র, জন্ম নিবন্ধন, ব্যাংকিং সেবা, ব্যবসায়িক নিবন্ধন এবং অন্যান্য সরকারি সেবায় অযৌক্তিক বাধা থাকলে তা দ্রুত দূর করতে হবে।

পঞ্চমত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কেবল অভিযান নয়, কমিউনিটি পুলিশিং, মাদক নিরাময়, কিশোর পুনর্বাসন এবং সামাজিক নেতৃত্ব গড়ে তোলার উদ্যোগ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধে জড়িয়ে পড়া তরুণদের জন্য দ্বিতীয় সুযোগ সৃষ্টি না করলে নতুন প্রজন্মও একই চক্রে আটকে পড়বে।

জেনেভা ক্যাম্পের প্রশ্নে আমাদের ভাষাও সংযত হওয়া দরকার। কোনো সম্প্রদায়কে সামগ্রিকভাবে \"অপরাধপ্রবণ\" বলে চিহ্নিত করা ন্যায্য নয়। অপরাধী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, কিন্তু নিরীহ মানুষকে সেই পরিচয়ের বোঝা বহন করতে বাধ্য করা উচিত নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেমন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তেমনি বৈষম্যহীন নাগরিক মর্যাদাও নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর বহু জটিল মানবিক সংকট মোকাবিলা করেছে। জেনেভা ক্যাম্প সেই দীর্ঘ ইতিহাসের একটি অধ্যায়, যার সমাপ্তি এখনো লেখা হয়নি। পাঁচ দশকের অস্থায়ী জীবন আর অস্থায়ী থাকতে পারে না। একটি শিশুর জন্ম যেন আর সংকীর্ণ অন্ধকার গলিতে ভবিষ্যৎ হারানোর প্রতীক না হয়।

জেনেভা ক্যাম্পকে আমরা চাইলে কেবল অপরাধের মানচিত্রে দেখতে পারি। আবার চাইলে এটিকে একটি অসমাপ্ত রাষ্ট্রনৈতিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখতে পারি। দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গিটিই আমাদের আরও মানবিক, আরও ন্যায়ভিত্তিক এবং আরও দূরদর্শী রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যাবে।

একটি রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার অর্থনীতির আকারে নয়, বরং সে কতটা দক্ষতার সঙ্গে প্রান্তিক মানুষকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে পারে তার মধ্যেও নিহিত থাকে। জেনেভা ক্যাম্পের ভবিষ্যৎ সেই পরীক্ষারই আরেকটি নাম।

মতামত এর আরও খবর