img

লন্ডনের বুকে ‘দ্বিতীয় সিলেট’: টেমসপাড়ে সিলেটিদের রাজনৈতিক উত্থানের নতুন ইতিহাস

প্রকাশিত :  ০৮:৩৯, ১২ মে ২০২৬

লন্ডনের বুকে ‘দ্বিতীয় সিলেট’: টেমসপাড়ে সিলেটিদের রাজনৈতিক উত্থানের নতুন ইতিহাস

সংগ্রাম দত্ত: “লন্ডন এখন সিলেটিদের দখলে”—একসময় কথাটি ছিল অনেকটা প্রবাসী আড্ডার গর্বমিশ্রিত উচ্চারণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই কথাই এখন বাস্তবতার শক্ত ভিত পেয়েছে ব্রিটিশ রাজনীতির ময়দানে। সদ্যসমাপ্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পূর্ব লন্ডনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বরোতে রেকর্ডসংখ্যক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়া এবং দুই বাংলাদেশির নির্বাহী মেয়র পদে জয় শুধু একটি কমিউনিটির সাফল্য নয়; এটি ব্রিটেনে বাংলাদেশি অভিবাসীদের দীর্ঘ সংগ্রাম, প্রতিষ্ঠা ও প্রভাবের এক নতুন অধ্যায়।

বিশেষ করে সিলেটি কমিউনিটির এই উত্থান এখন ব্রিটিশ স্থানীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়।

বিশ্লেষকদের মতে, লন্ডনের রাজনীতিতে

বাংলাদেশিদের উপস্থিতি এখন আর প্রতীকী নয়—এটি কার্যকর ক্ষমতা ও নীতিনির্ধারণী প্রভাবের জায়গায় পৌঁছে গেছে।

পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস বরো বহুদিন ধরেই “মিনি সিলেট” নামে পরিচিত। রাস্তাঘাট, রেস্টুরেন্ট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা মসজিদ—সবখানেই রয়েছে সিলেটি সংস্কৃতির স্পষ্ট ছাপ। এবারের নির্বাচনে সেই কমিউনিটির রাজনৈতিক শক্তিও নতুনভাবে দৃশ্যমান হয়েছে।

সাবেক মেয়র লুৎফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন এসপায়ার পার্টি এই বরোতে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে। ৪৫টি কাউন্সিলর আসনের মধ্যে ৩৩টিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের জয় ব্রিটিশ স্থানীয় রাজনীতিতে এক অনন্য নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো—লুৎফুর রহমানের চতুর্থবারের মতো নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হওয়া। বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে ব্রিটিশ রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ পথচলা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

লন্ডনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ বরো নিউহামেও সৃষ্টি হয়েছে নতুন ইতিহাস। যুক্তরাজ্যের মূলধারার রাজনৈতিক দল লেবার পার্টির হয়ে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হিসেবে নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন ফরহাদ হোসেন।

ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছে এই জয় শুধু একটি রাজনৈতিক পদ অর্জনের ঘটনা নয়; বরং এটি মূলধারার রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অংশগ্রহণ ও গ্রহণযোগ্যতার স্বীকৃতি।

ফরহাদ হোসেনের পাশাপাশি নিউহামে আরও ১৯ জন বাংলাদেশি কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে শিক্ষা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও স্থানীয় উন্নয়নসহ বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রভাব আরও বাড়বে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

শুধু টাওয়ার হ্যামলেটস বা নিউহাম নয়, রেডব্রিজ এবং বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহাম বরোতেও বাংলাদেশিরা নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছেন। এসব এলাকায় আরও ১০ জন বাংলাদেশি কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন।

স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষা, কমিউনিটি উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের প্রশ্নে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদের সক্রিয় ভূমিকা ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।

বাংলাদেশের মধ্যে সিলেট বিভাগের মানুষের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক বহু পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে নাবিক হিসেবে সিলেটিদের ইংল্যান্ডে যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তীতে তা পরিবারভিত্তিক স্থায়ী বসবাসে রূপ নেয়। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শ্রমবাজারের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বিপুলসংখ্যক সিলেটি লন্ডনে পাড়ি জমান।

ক্রমে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, ট্রাভেল, আমদানি-রপ্তানি এবং সম্পত্তি খাতে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন তারা। এরপর আসে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম—যারা শিক্ষা, আইন, চিকিৎসা, গণমাধ্যম ও রাজনীতিতে প্রবেশ করে ব্রিটিশ সমাজে নতুন পরিচয় গড়ে তোলে।

এই কারণেই বাংলাদেশের সিলেটকে অনেকে “দ্বিতীয় লন্ডন” বলে অভিহিত করেন। এখনও সিলেট অঞ্চলের বহু পরিবারে বিদেশ, বিশেষ করে লন্ডনকেন্দ্রিক স্বপ্ন জীবনের বড় অংশ জুড়ে থাকে।

একসময় ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের পরিচয় সীমাবদ্ধ ছিল রেস্টুরেন্ট ব্যবসা কিংবা নিম্ন আয়ের অভিবাসী সম্প্রদায় হিসেবে। কিন্তু গত দুই দশকে সেই চিত্র দ্রুত বদলেছে।

এখন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট, সিটি কাউন্সিল, শিক্ষা বোর্ড, পুলিশ প্রশাসন এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়ছে। নতুন প্রজন্মের সিলেটি তরুণরা নিজেদের পরিচয়কে আর শুধু অভিবাসী পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছেন না; বরং তারা ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবেই নেতৃত্বের জায়গা তৈরি করছেন।

সিলেট অঞ্চলে বিদেশমুখী প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই একটি সামাজিক বাস্তবতা। পরিবারে একজন প্রবাসী থাকা যেন সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয় অনেক ক্ষেত্রে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক, বিয়েশাদি এবং অর্থনৈতিক সংযোগ সিলেটের সমাজব্যবস্থায় বিশেষ প্রভাব ফেলেছে।

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে বদলে গেছে গ্রামের অর্থনীতি, গড়ে উঠেছে আধুনিক বাড়িঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা। ফলে লন্ডন এবং সিলেটের মধ্যে এক ধরনের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বহুসাংস্কৃতিক সমাজে নিজেদের শিকড় ধরে রেখে মূলধারার রাজনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

স্থানীয় উন্নয়ন, বর্ণবাদ মোকাবিলা, তরুণদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, সামাজিক সম্প্রীতি—এসব প্রশ্নে বাংলাদেশি জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর নেতৃত্ব এখন সময়ের দাবি।

লন্ডনের রাজনীতিতে আজ যে শক্ত অবস্থানে বাংলাদেশিরা পৌঁছেছেন, তার পেছনে রয়েছে কয়েক প্রজন্মের শ্রম, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ। সিলেটের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে টেমসপাড়ে পৌঁছানো মানুষের গল্প এখন শুধু অভিবাসনের গল্প নয়; এটি প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতায়ন এবং আত্মপরিচয়ের গল্প।

দুই বাংলাদেশি মেয়র এবং ৮০ জন কাউন্সিলরের এই সাফল্য হয়তো একটি নির্বাচনের পরিসংখ্যান মাত্র। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি কমিউনিটির শতবর্ষী যাত্রার বিজয়গাথা—যেখানে সুরমা ও কুশিয়ারার জল মিশে গেছে টেমসের স্রোতে।


img

উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ভঙ্গুর অর্থনীতি ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিত :  ১০:৩১, ০২ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১০:৩৭, ০২ মে ২০২৬

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

ঢাকা, ২ মে ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের অবসান ঘটিয়ে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় বসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনীতি এবং উত্তাল বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সংকট নতুন এই প্রশাসনের সামনে এক পর্বতসম চ্যালেঞ্জ দাঁড় করিয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা এবং আগামীকালের পুঁজিবাজারের গতিপথ নিয়ে একটি নিবিড় বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।

সামষ্টিক অর্থনীতি: ভঙ্গুর উত্তরণের রূপরেখা

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে এক অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাত্র ৩.৯৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ধাক্কা কাটিয়ে সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে এই যাত্রার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের স্থবিরতা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশ প্রাক্কলন করলেও বিশ্বব্যাংক কিছুটা রক্ষণশীল অবস্থান নিয়ে ৩.৯ শতাংশের পূর্বাভাস দিয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির মাত্র ২২.৪৮ শতাংশে নেমে আসা এবং ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট এই বিনিয়োগ মন্দাকে আরও ঘনীভূত করেছে।

সাধারণ মানুষের জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয়। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.৭১ শতাংশে দাঁড়ালেও এটি সাধারণ ভোক্তাদের জন্য খুব বেশি স্বস্তি বয়ে আনে নি। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.২৪ শতাংশে নামলেও অ-খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.০৯ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে, যা পরিবহন, গৃহায়ণ ও পরিষেবা খাতের উচ্চমূল্যকে নির্দেশ করে। আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। যেখানে ভারত (২.৭%) ও শ্রীলঙ্কা (০.৬%) তাদের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো ৯ শতাংশের কাছাকাছি সীমায় আটকে আছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছে, কারণ মজুরি বৃদ্ধির হার (৮.০৯%) এখনো জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে।

তবে সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম স্বস্তির জায়গা হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রিজার্ভ ৩৫.১১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয় এবং মার্চ মাসে তা ৩৪.১২ বিলিয়ন ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ মার্চ মাসে ৩.৭৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোয় বহিঃখাতের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে। মুদ্রার বিনিময় হার প্রতি ডলারে ১২২.৬২ টাকার আশপাশে স্থিতিশীল রয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের 'ক্রলিং পেগ' পদ্ধতির সুফল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে যখন দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো এক বিশাল সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের পূর্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সংস্কারের সূচনা করেছিল, তা এগিয়ে নেওয়া ও জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই এই সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার সময় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা এবং গুমসংক্রান্ত অপরাধের সংজ্ঞাসংবলিত ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ তামাদি বা বাতিল হয়ে যাওয়া নিয়ে দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকার একে আইনি অসংগতি দূর করার প্রক্রিয়া বললেও প্রধান বিরোধী দলগুলো একে গণতান্ত্রিক সংস্কারের পরিপন্থী হিসেবে অভিহিত করেছে।

রাজনৈতিক মেরুকরণের পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতের ক্ষত এখনো অত্যন্ত গভীর। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬.৪ ট্রিলিয়ন টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৫.৭৩ শতাংশ। খেলাপি ঋণ আদায় ও ব্যাংকিং সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ানো সম্ভব হবে না, যা সরাসরি জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে।

১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচি ও সাফল্য

ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এই কর্মসূচির আওতায় ইতিমধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রায় ৩৭ হাজার ৮১৪টি নিম্ন আয়ের পরিবারকে মাসিকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। কৃষকদের জন্য 'ফার্মার কার্ড' এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া শিক্ষাখাতে 'ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব' এবং ৮ হাজার ২৩২টি মাদ্রাসায় ফ্রি ওয়াই-ফাই নিশ্চিত করার কাজ চলমান রয়েছে। তবে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে থাকায় (মার্চে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৬২.৯ শতাংশ অর্জিত) এই বিপুল ব্যয়ের সংস্থান করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জ্বালানি সংকট ও বৈশ্বিক চাপের কালো মেঘ

২০২৬ সালের বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দেশে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই সংকটের কারণে শিল্পকারখানাগুলোতে প্রতিদিন ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে, যা তৈরি পোশাক রপ্তানিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। সরকার জ্বালানি ভর্তুকি বাবদ মার্চ মাসে এক মাসেই ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যা বাজেটে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

আগামী ২৪ নভেম্বর ২০২৬-এ বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণ করবে। এই উত্তরণের পর বাংলাদেশ বর্তমানে প্রাপ্ত প্রায় ৭০ শতাংশ রপ্তানি সুবিধা হারাবে। নতুন সরকারকে অতি দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে জিএসপি+ বা সমজাতীয় চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে; অন্যথায় টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাত প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাবে।

আগামীকাল রোববার (৩ মে ২০২৬) পুঁজিবাজারের পূর্বাভাস

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘকাল ধরেই বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটে ভুগছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর বাজার নিম্নমুখী ছিল। আগামীকাল ৩ মে ২০২৬, সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন শুরু হবে। গত ৩০ এপ্রিল ডিএসই ব্রড ইনডেক্স ৫,২৮৬.৮৮ পয়েন্টে অবস্থান করছিল।

আগামীকালের বাজার মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। প্রথমত, গত সপ্তাহের শেষ দিকে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মুনাফা সংগ্রহের (প্রফিট বুকিং) যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা আগামীকালও অব্যাহত থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার ১০ শতাংশের উপরে থাকায় বড় বিনিয়োগকারীরা ইক্যুইটি বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। তৃতীয়ত, জ্বালানি সংকটের খবর এবং লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা উৎপাদনমুখী বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

সেক্টরভিত্তিক সম্ভাবনা ও পূর্বাভাস:

ব্যাংকিং খাতে যমুনা ব্যাংক বা ব্র্যাক ব্যাংকের ভালো লভ্যাংশ ঘোষণার কারণে এই খাতটি স্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, জ্বালানি সংকটের কারণে সিমেন্ট ও টেক্সটাইল খাতের শেয়ারগুলো চাপে থাকতে পারে। আগামীকালের সেশনে বাজার ৯৫ শতাংশ সম্ভাবনা সতর্কাবস্থায় (কশাস মোড) থাকবে। দিনের শেষে সূচক ২০ থেকে ৩০ পয়েন্টের সংশোধনী (কারেকশন) দেখতে পারে এবং লেনদেনের পরিমাণ ৭০০ থেকে ৮৫০ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ডিএসই সূচকটি চলতি প্রান্তিকের শেষে ৭,২৩৪ পয়েন্টের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগোলেও স্বল্পমেয়াদী অস্থিরতা কাটতে সময় লাগবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য পরামর্শ হলো, পেনাল্টি শেয়ার এড়িয়ে শক্তিশালী মৌলভিত্তিসম্পন্ন ডিভিডেন্ড-পেওয়ারি শেয়ারে নজর দেওয়া।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ক্রান্তিকাল পার করছে। নতুন সরকারের সংস্কার পদক্ষেপ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে আসার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর টেকসই উন্নয়ন।

মতামত এর আরও খবর