img

লন্ডনের বুকে ‘দ্বিতীয় সিলেট’: টেমসপাড়ে সিলেটিদের রাজনৈতিক উত্থানের নতুন ইতিহাস

প্রকাশিত :  ০৮:৩৯, ১২ মে ২০২৬

লন্ডনের বুকে ‘দ্বিতীয় সিলেট’: টেমসপাড়ে সিলেটিদের রাজনৈতিক উত্থানের নতুন ইতিহাস

সংগ্রাম দত্ত: “লন্ডন এখন সিলেটিদের দখলে”—একসময় কথাটি ছিল অনেকটা প্রবাসী আড্ডার গর্বমিশ্রিত উচ্চারণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই কথাই এখন বাস্তবতার শক্ত ভিত পেয়েছে ব্রিটিশ রাজনীতির ময়দানে। সদ্যসমাপ্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পূর্ব লন্ডনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বরোতে রেকর্ডসংখ্যক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়া এবং দুই বাংলাদেশির নির্বাহী মেয়র পদে জয় শুধু একটি কমিউনিটির সাফল্য নয়; এটি ব্রিটেনে বাংলাদেশি অভিবাসীদের দীর্ঘ সংগ্রাম, প্রতিষ্ঠা ও প্রভাবের এক নতুন অধ্যায়।

বিশেষ করে সিলেটি কমিউনিটির এই উত্থান এখন ব্রিটিশ স্থানীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়।

বিশ্লেষকদের মতে, লন্ডনের রাজনীতিতে

বাংলাদেশিদের উপস্থিতি এখন আর প্রতীকী নয়—এটি কার্যকর ক্ষমতা ও নীতিনির্ধারণী প্রভাবের জায়গায় পৌঁছে গেছে।

পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস বরো বহুদিন ধরেই “মিনি সিলেট” নামে পরিচিত। রাস্তাঘাট, রেস্টুরেন্ট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা মসজিদ—সবখানেই রয়েছে সিলেটি সংস্কৃতির স্পষ্ট ছাপ। এবারের নির্বাচনে সেই কমিউনিটির রাজনৈতিক শক্তিও নতুনভাবে দৃশ্যমান হয়েছে।

সাবেক মেয়র লুৎফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন এসপায়ার পার্টি এই বরোতে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে। ৪৫টি কাউন্সিলর আসনের মধ্যে ৩৩টিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের জয় ব্রিটিশ স্থানীয় রাজনীতিতে এক অনন্য নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো—লুৎফুর রহমানের চতুর্থবারের মতো নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হওয়া। বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে ব্রিটিশ রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ পথচলা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

লন্ডনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ বরো নিউহামেও সৃষ্টি হয়েছে নতুন ইতিহাস। যুক্তরাজ্যের মূলধারার রাজনৈতিক দল লেবার পার্টির হয়ে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হিসেবে নির্বাহী মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন ফরহাদ হোসেন।

ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছে এই জয় শুধু একটি রাজনৈতিক পদ অর্জনের ঘটনা নয়; বরং এটি মূলধারার রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অংশগ্রহণ ও গ্রহণযোগ্যতার স্বীকৃতি।

ফরহাদ হোসেনের পাশাপাশি নিউহামে আরও ১৯ জন বাংলাদেশি কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে শিক্ষা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও স্থানীয় উন্নয়নসহ বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রভাব আরও বাড়বে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

শুধু টাওয়ার হ্যামলেটস বা নিউহাম নয়, রেডব্রিজ এবং বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহাম বরোতেও বাংলাদেশিরা নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছেন। এসব এলাকায় আরও ১০ জন বাংলাদেশি কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন।

স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষা, কমিউনিটি উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের প্রশ্নে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদের সক্রিয় ভূমিকা ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।

বাংলাদেশের মধ্যে সিলেট বিভাগের মানুষের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক বহু পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে নাবিক হিসেবে সিলেটিদের ইংল্যান্ডে যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তীতে তা পরিবারভিত্তিক স্থায়ী বসবাসে রূপ নেয়। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শ্রমবাজারের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বিপুলসংখ্যক সিলেটি লন্ডনে পাড়ি জমান।

ক্রমে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, ট্রাভেল, আমদানি-রপ্তানি এবং সম্পত্তি খাতে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন তারা। এরপর আসে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম—যারা শিক্ষা, আইন, চিকিৎসা, গণমাধ্যম ও রাজনীতিতে প্রবেশ করে ব্রিটিশ সমাজে নতুন পরিচয় গড়ে তোলে।

এই কারণেই বাংলাদেশের সিলেটকে অনেকে “দ্বিতীয় লন্ডন” বলে অভিহিত করেন। এখনও সিলেট অঞ্চলের বহু পরিবারে বিদেশ, বিশেষ করে লন্ডনকেন্দ্রিক স্বপ্ন জীবনের বড় অংশ জুড়ে থাকে।

একসময় ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের পরিচয় সীমাবদ্ধ ছিল রেস্টুরেন্ট ব্যবসা কিংবা নিম্ন আয়ের অভিবাসী সম্প্রদায় হিসেবে। কিন্তু গত দুই দশকে সেই চিত্র দ্রুত বদলেছে।

এখন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট, সিটি কাউন্সিল, শিক্ষা বোর্ড, পুলিশ প্রশাসন এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়ছে। নতুন প্রজন্মের সিলেটি তরুণরা নিজেদের পরিচয়কে আর শুধু অভিবাসী পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছেন না; বরং তারা ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবেই নেতৃত্বের জায়গা তৈরি করছেন।

সিলেট অঞ্চলে বিদেশমুখী প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই একটি সামাজিক বাস্তবতা। পরিবারে একজন প্রবাসী থাকা যেন সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয় অনেক ক্ষেত্রে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক, বিয়েশাদি এবং অর্থনৈতিক সংযোগ সিলেটের সমাজব্যবস্থায় বিশেষ প্রভাব ফেলেছে।

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে বদলে গেছে গ্রামের অর্থনীতি, গড়ে উঠেছে আধুনিক বাড়িঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা। ফলে লন্ডন এবং সিলেটের মধ্যে এক ধরনের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বহুসাংস্কৃতিক সমাজে নিজেদের শিকড় ধরে রেখে মূলধারার রাজনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

স্থানীয় উন্নয়ন, বর্ণবাদ মোকাবিলা, তরুণদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, সামাজিক সম্প্রীতি—এসব প্রশ্নে বাংলাদেশি জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর নেতৃত্ব এখন সময়ের দাবি।

লন্ডনের রাজনীতিতে আজ যে শক্ত অবস্থানে বাংলাদেশিরা পৌঁছেছেন, তার পেছনে রয়েছে কয়েক প্রজন্মের শ্রম, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ। সিলেটের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে টেমসপাড়ে পৌঁছানো মানুষের গল্প এখন শুধু অভিবাসনের গল্প নয়; এটি প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতায়ন এবং আত্মপরিচয়ের গল্প।

দুই বাংলাদেশি মেয়র এবং ৮০ জন কাউন্সিলরের এই সাফল্য হয়তো একটি নির্বাচনের পরিসংখ্যান মাত্র। কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি কমিউনিটির শতবর্ষী যাত্রার বিজয়গাথা—যেখানে সুরমা ও কুশিয়ারার জল মিশে গেছে টেমসের স্রোতে।


img

সূচকের পতনের চেয়ে বড় সংকট আস্থার অবক্ষয়

প্রকাশিত :  ১১:২৯, ২২ জুন ২০২৬

✍️ নিজস্ব প্রতিবেদক

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দরপতন নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত এক যুগে বিনিয়োগকারীরা উত্থানের চেয়ে পতনের গল্পই বেশি শুনেছেন। তবু প্রতি বড় দরপতনের দিন আমাদের সামনে নতুন করে একটি প্রশ্ন হাজির হয়—সমস্যাটা কী কেবল বাজারের, নাকি এর পেছনে অর্থনীতি, নীতি এবং আস্থার আরও গভীর সংকট কাজ করছে?

সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৮৫ পয়েন্টের বেশি হারিয়েছে। এক দিনে শতাংশ দেড় ভাগের বেশি পতন নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু উদ্বেগের প্রকৃত কারণ সূচকের পতন নয়; বরং বাজারের সামগ্রিক চিত্র। অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমেছে, লেনদেনের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও প্রকট হয়েছে।

পুঁজিবাজার মূলত আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বিনিয়োগকারী যখন বিশ্বাস করেন যে অর্থনীতি স্থিতিশীল, নীতিনির্ধারকরা সুস্পষ্ট অবস্থানে আছেন এবং বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তখন তিনি বিনিয়োগে আগ্রহী হন। বিপরীতে অনিশ্চয়তা বাড়লে তিনি অপেক্ষার পথ বেছে নেন। বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে সেই অপেক্ষার প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বিষয়। তেলের দাম, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের দুর্বলতার ব্যাখ্যা কেবল বাইরের ঘটনায় খুঁজলে ভুল হবে। কারণ আমাদের বাজার বহুদিন ধরেই তারল্যসংকট, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণের সমস্যায় ভুগছে।

সোমবারের বাজারে তারল্যসংকটের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিপুল অঙ্কের সরকারি সুকুক ইস্যুর কারণে আর্থিক খাতের একটি বড় অংশের অর্থ শেয়ারবাজারের বাইরে চলে গেছে। এটি সাময়িক ঘটনা হলেও এর মধ্য দিয়ে একটি পুরোনো বাস্তবতা আবার সামনে এসেছে—বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনও পর্যাপ্ত দীর্ঘমেয়াদি তহবিল আকর্ষণ করতে পারেনি। ফলে সামান্য চাপ এলেই বাজার নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নজরদারি বাজারের জন্য ইতিবাচক বার্তা। কারসাজি ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তবে এটিও সত্য যে দীর্ঘদিন ধরে বাজারের একটি অংশ অস্বাভাবিক লেনদেন ও জল্পনানির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল। ফলে নজরদারি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অর্থের একটি অংশ বাজার ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। এটিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং দীর্ঘমেয়াদে এটি বাজারকে আরও সুস্থ ও স্বচ্ছ করে তুলতে পারে।

ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর অনেক শেয়ারের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদে কিছু কোম্পানির শেয়ারে বড় ধরনের দরপতন দেখা গেলেও বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী এটি অস্বাভাবিক নয়। দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে আটকে রাখা দাম একসময় বাস্তবতার মুখোমুখি হবেই।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কোথায়?

প্রথমত, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যেন মনে করেন, এখানে নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য এবং কারসাজিকারীরা কোনোভাবেই পার পাবে না। দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে, শক্তিশালী পেনশন ফান্ড, মিউচুয়াল ফান্ড এবং দীর্ঘমেয়াদি তহবিল ছাড়া স্থিতিশীল পুঁজিবাজার গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনার উদ্যোগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগকারীদের সামনে মানসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ যত বাড়বে, বাজার তত শক্তিশালী হবে।

স্বল্পমেয়াদে সূচক আরও কিছুটা ওঠানামা করতে পারে। সেটি বাজারের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হলে সূচকের দৈনিক ওঠানামার বাইরে গিয়ে মূল সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে।

কারণ পুঁজিবাজার কেবল কিছু শেয়ারের দর বাড়া–কমার নাম নয়। এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। আর সেই আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরলে সূচকের কয়েক পয়েন্ট পতনের চেয়েও বড় ক্ষতি হয়ে যায়।