img

বন্ধ হোক জাতীয় সংসদে ইংরেজির যথেচ্ছ ব‍্যবহার

প্রকাশিত :  ০৫:১০, ০২ এপ্রিল ২০২৬

বন্ধ হোক জাতীয় সংসদে ইংরেজির যথেচ্ছ ব‍্যবহার

সারওয়ার-ই আলম

জাতীয় সংসদের কয়েকটি অধিবেশন দেখে মনে হলো স্পীকার হাফিজ উদ্দিন , স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ, সংসদ সদস‍্য আ‍ন্দালিব রহমান পার্থ ও অন‍্যান‍্যরা যেন একটানা কয়েক মিনিটও বাংলায় কথা বলতে সক্ষম নন। তাঁদের ইংরেজি বলা চাই-ই চাই! এমন অনেক ইংরেজি শব্দ তাঁরা ব‍্যবহার করছেন যেসব শব্দের বহুল প্রচলিত বাংলা শব্দ রয়েছে। বাংলার প্রতি জাতীয় সংসদে স্পীকারের ও সদস‍্যদের এই অবজ্ঞা প্রদর্শন শুধু অনাকাঙ্খিত-ই নয় অগ্রহণযোগ‍্যও বটে। কারণ বাংলা এতটা পঙ্গু ভাষা নয় যে ইংরেজির ওপর ভর দিয়ে দিয়ে তাকে চলতে হবে। সংসদে তাঁদের কথা শুনে মনে হয় বাংলা একটি পঙ্গু ভাষা। ইংরেজি না বললে এর অর্থ পরিস্কার হয় না। কী দুঃখজনক! এই হলো আমাদের স্পীকার, মন্ত্রী ও সংসদ সদসদ‍্যদের দেশপ্রেম ও ভাষাপ্রেমের নমুনা। এরাই আবার সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার জন‍্য জাতিকে সবক দেবে। একদিকে আমরা বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবী করছি, অন‍্যদিকে আমাদের জাতীয় সংসদে স্পীকার ও সংসদ সদস‍্যগণ অপ্রয়োজনে ইংরেজি ব‍্যবহার করছেন। কী হাস‍্যকর ব‍্যাপারটা!

আজ এক ভিডিওতে দেখলাম, স্পীকার বলছেন— \"বিরোধী দলের সদস‍্যরা কোন সদস‍্য যখন বক্তৃতা দেয় তখন কোনো কমেন্ট করবেন না, তাকে ডিসট্রাক্ট করার চেষ্টা করবেন না, প্লিজ লিসেন টু হিম, ইউ উইল গেট ইউর টার্ণ\"।

এখানে স্পীকার কি একেবারেই অপ্রয়োজনে ইংরেজি ব‍্যবহার করলেন না? তিনি তো কোনো ইংরেজি শব্দ ব‍্যবহার না করেই উপরের কথাগুলো বিশুদ্ধ বাংলায় খুব সহজে সুন্দর করে বলতে পারতেন এভাবে— বিরোধী দলের সদস‍্যরা কোনো সদস‍্য যখন বক্তৃতা দেয় আপনারা কোনো মন্তব‍্য করবেন না। তার মনযোগ নষ্ট করার চেষ্টা করবেন না। অনুগ্রহ করে তার কথা শুনুন। আপনারাও কথা বলার সুযোগ পাবেন।

স্পীকার এভাবে বললে কতই না মধুর শোনাতো। এখানে কোন শব্দটি জটিল বা অপ্রচলিত বাংলা শব্দ? একটিও তো না। তাহলে কেন স্পীকার ডিস্ট্রাক্ট, কমেণ্ট, প্লিজ লিসেন টু হিম, ইউ উইল গেট ইউর টার্ণ ব‍্যবহার করলেন? দেশের কতজন মানুষ স্পীকারের ভাষা পুরোপুরি বুঝবেন?

আরেকদিন দেখলাম শিক্ষামন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় বলছেন— \"অ‍্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ব‍্যাপার অ‍্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ওয়েতে হবে। লিভ ইট টু আস। আমরা তো কাজ করছি। লটারি ইজ নট অ‍্যা সলিউশন ফর অ‍্যাডমিশন। অ‍্যাবসোলিউটলি। আপনি মেধাকে কোন ব‍্যারোমিটারে জাস্টিফাই করবেন সেটা পরের ব‍্যাপার\"।

শিক্ষামন্ত্রীর মুখে এটা কোন ভাষা? না বাংলা, না ইংরেজি। শিক্ষামন্ত্রী এভাবে কথা বলে কী দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাইলেন? তিনি কি বাংলা ভুলে গেছেন, না কি ইংরেজি শব্দ ব‍্যবহার না করলে তাঁর কথাগুলো মানুষ বুঝবেন না?

আচ্ছা দেখা যাক, কোনো জটিল ও অপ্রচলিত বাংলা শব্দ ব‍্যবহার না করে তাঁর কথাগুলো বিশুদ্ধ বাংলায় কীভাবে বলা যায়। কথাগুলো এরকম হতে পারতো— প্রশাসনিক ব‍্যাপার প্রশাসনিক উপায়েই হবে। বিষয়টি আমাদের ওপর ছেড়ে দিন। আমরাতো কাজ করছি। লটারী ভর্তি পদ্ধতির সমাধান নয়। একদমই না। আপনি মেধাকে কীভাবে মূল‍্যায়ণ (বা যাচাই, বা বিচার) করবেন সেটা পরের ব‍্যাপার।

— শিক্ষামন্ত্রী ইংরেজি ব‍্যবহার না করে কথাগুলো এভাবে বিশুদ্ধ বাংলায় বললে কি জনগণের বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হতো? নিশ্চয় নয়। এখানে একটিও তো জটিল বা অপ্রচলিত বাংলা শব্দ ব‍্যবহার করতে হয়নি। জনগণ এসব শব্দের সঙ্গে পরিচিত। নিশ্চয় তিনিও। তাহলে শিক্ষামন্ত্রী কেন তাঁর বক্তব‍্যে যথেচ্ছা ইংরেজী শব্দ ব‍্যবহার করলেন? এটা কি তাঁর ভাষাপ্রেমের অভাব, না কি নিজেকে উচ্চশিক্ষিত জাহির করার চেষ্টা?

দু\'জন সংসদ সদস‍্য— আন্দালিব রহমান পার্থ ও সালাউদ্দিন আহমেদ সংসদে কথা বলার সময় প্রায় পঞ্চাশ ভাগ কথাই ইংরেজীতে বলেন। কখনো পুরো বাক‍্য আবার কখনো বাংলার সঙ্গে একেবারে দরকার ছাড়া একটি ইংরেজি শব্দ ঢুকিয়ে দেন।

যেমন একটি ভিডিওতে দেখলাম আন্দালিব রহমান পার্থ বলছেন— \"আন্ডারমাইন দ‍্য প্রভিশন অব দ‍্য আদেশ। আমি কামিং টু দ‍্য পয়েন্ট। চারটা প্রভিশন যে দেওয়া আছে। আসুন সংবিধানটাকে রেসপেক্ট করি, জুলাই সনদটাকেও রেসপেক্ট করি\"।

কী হলো তাঁর এই কথা? এখানে আন্ডারমাইন কেন বলতে হবে? অবজ্ঞা বললে কি ক্ষতি হতো? প্রভিশন কেন বলতে হবে? নিয়ম বা বিধান বললে ক্ষতি কী? অব দ‍্য আদেশ— এটা কোন ভাষা? আমি কামিং টু দ‍্য পয়েণ্ট। ভাষার এই মিশ্রণটা কতটা দরকারী ছিল? আমি মূল প্রসঙ্গে আসছি বললেই তো যথেষ্ট ছিল। আবার তিনি বললেন— আসুন সংবিধানকে রেসপেক্ট করি। অথচ রিসপেক্ট শব্দের কী সুন্দর বাংলাই না রয়েছে— শ্রদ্ধা। উনি বলতে পারতেন আসুন সংবিধানকে শ্রদ্ধা করি। সংসদ সদস‍্য একদিকে বলছেন সংবিধানকে \' রেসপেক্ট\' করার জন‍্য, অথচ নিজে মাতৃভাষাটাকেই \' রেসপেক্ট\' করছেন না। বিষয়টি কি স্ববিরোধী নয়?

জাতীয় সংসদে এ ধরণের মিশ্র ভাষার ব‍্যবহার কিছুতেই গ্রহণযোগ‍্য হতে পারে না। এতে ভাষার সৌন্দর্যহানি হয়। উদাহরণ দিলে ভুরি ভুরি দেওয়া যাবে। সংসদের অধিবেশনগুলো দেখলেই এর প্রমাণ মিলবে। একজন নাগরিক হিসেবে স্পীকার ও সংসদ সদস‍্যদেরকে বিনীতভাবে বলতে চাই— আপনারা এ দেশের সাধারণ জনগণের প্রতিনিধি। তাই জাতীয় সংসদে ইংরেজিতে নয়, এলিটদের ভাষায় নয়, জনগণের ভাষায় কথা বলুন। বাংলার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করুন। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করুন। এটা আপনাদের পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়, এটা আপনাদের নৈতিক দায়িত্ব।

স্পীকার ও সংসদ সদস‍্যদের মনে রাখা উচিত যে তাঁরা প্রতিনিধিত্ব করেন দেশের মানুষকে। সুতরাং তাঁদের ভাষাও হওয়া উচিত জনগণের ভাষা। নিজেরা ইংরেজি জানেন বলে কথায় কথায় ইংরেজি ঝাড়ার জায়গা সংসদ নয়, সেটা ব‍্যক্তিগত পরিসরে করতে পারেন। তাই এমন একটা বিধান করা জরুরি যে স্পীকার ও সংসদ সদস‍্যরা অপ্রয়োজনে সংসদে ইংরেজি শব্দ ব‍্যবহার করতে পারবেন না। সংসদের ভাষা হবে বাংলা। যেসব শব্দের বাংলা পরিভাষা নেই সেসব শব্দের কথা ভিন্ন। যেসব শব্দকে বাংলায় আত্তীকরণ করা হয়েছে সেসব শব্দ অবশ‍্যই ব‍্যবহার করা যাবে। তাই বলে পারিবারিক পরিবেশে, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে নিজেদের খেয়ালখুশী মতো যেভাবে বাংলার সঙ্গে ইংরেজি মিশিয়ে আমরা কথা বলি, জাতীয় সংসদের মতো দেশের একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে দাঁড়িয়ে সেভাবে, অর্থাৎ যেটাকে অনেকে বলে \'বাংলিশ\' ভাষায় কথা বলা ঠিক নয়। এতে একদিকে যেমন ভাষার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়, অপরদিকে ভাষা শহীদদের প্রতিও অসম্মান জানানো হয়। জনগণ নিশ্চয় জাতীয় সংসদে জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে তা আশা করেন না!

সারওয়ার-ই আলম: ইলফোর্ড, লণ্ডন, ১ এপ্রিল ২০২৬
img

মুহম্মদ জাফর ইকবাল দুবছর কই ছিলেন?

প্রকাশিত :  ১৫:৪২, ২৫ জুলাই ২০২৬

আবদুল হামিদ মাহবুব

বাংলাদেশের সাহিত্য, বিজ্ঞানচর্চা ও শিশু-কিশোর সাহিত্যের জগতে মুহম্মদ জাফর ইকবাল একটি অত্যন্ত পরিচিত নাম। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি অসংখ্য তরুণ-তরুণীকে বই পড়তে শিখিয়েছেন, বিজ্ঞানমনস্ক হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সাহিত্যের ভাষায় তুলে ধরেছেন। ঠিক এই কারণেই তার প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে একটি অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি এবং সেখানে দেওয়া বক্তব্য নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হচ্ছে; গত দুই বছর তিনি কোথায় ছিলেন?

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুহম্মদ জাফর ইকবালকে আর দেশের জনপরিসরে এক্কেবারেই দেখা যায়নি। এরপরও দীর্ঘ সময় তিনি প্রকাশ্যে ছিলেন না। হঠাৎ করেই ২০২৬ সালের  ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে এক অনুষ্ঠানে তাকে দেখা গেল। সেখানে তিনি নিজেই বলেন, তারা গত দুই বছর ধরে ‘নির্বাসনে’ আছেন। এই একটি শব্দই জনমনে নতুন কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। কারণ ‘নির্বাসন’ সাধারণত এমন একটি অবস্থা বোঝায়, যেখানে রাষ্ট্র কাউকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে অথবা দেশে ফিরে আসার সুযোগ সীমিত করে। কিন্তু মুহম্মদ জাফর ইকবালের ক্ষেত্রে এমন কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বা প্রজ্ঞাপনের তথ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।

এই কারণেই প্রশ্ন উঠছে, তিনি কি স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়েছেন, নাকি এমন কোনো বাস্তবতা ছিল যা তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছে? যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তাহলে সেটি কী? আবার যদি তিনি নিজ সিদ্ধান্তে বিদেশে অবস্থান করে থাকেন, তাহলে তাকে ‘নির্বাসিত’ বলা কতটা যথাযথ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় তার একটি সংক্ষিপ্ত লেখা বিশেষ বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। সেখানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের একটি স্লোগানের অংশবিশেষ উল্লেখ করে লিখেছিলেন, \"ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার বিশ্ববিদ্যালয়, আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়। তবে আমি মনে হয় আর কোনোদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চাইব না। ছাত্র-ছাত্রীদের দেখলেই মনে হবে, এরাই হয়তো সেই \'রাজাকার\'। আর যে কয়দিন বেঁচে আছি, আমি কোনো রাজাকারের মুখ দেখতে চাই না। একটাই তো জীবন। সেই জীবনে আবার কেন নতুন করে রাজাকারদের দেখতে হবে?\" তার এই মন্তব্য অনেকের কাছে অত্যন্ত আপত্তিকর মনে হয়েছে। কারণ আন্দোলনের স্লোগান ছিল, \"তুমি কে? আমি কে? রাজাকার রাজাকার।\" পরের অংশ ছিল; \"কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার স্বৈরাচার।\" তিনি শিক্ষার্থীদের স্লোগানের প্রথম অংশ নিয়ে সমালোচনা করে শিক্ষার্থীদের কাছে বিরাগভাজন হন। কিন্তু দ্বিতীয় অংশ স্বৈরাচারের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার পেছনে কি রহস্য ছিল? যা তিনি কোন সময়েই খোলাসা করেননি। তার সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি তখনকার সরকারের অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই বক্তব্য দিয়েছিলেন।

এরপর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। আন্দোলনে বহু মানুষের মৃত্যু হয়, রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে এবং শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারান। কিন্তু এই পুরো সময়ে মুহম্মদ জাফর ইকবালের কাছ থেকে সেই হত্যাকাণ্ড, রক্তপাত কিংবা পরবর্তী বাস্তবতা নিয়ে তেমন কোনো প্রকাশ্য মন্তব্য শোনা যায়নি। অনেকেই মনে করেন, তার নীরবতা ছিল বিস্ময়কর। আবার অন্যদের মতে, তিনি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা অন্য কোনো কারণে প্রকাশ্যে আসেননি। কোন ব্যাখ্যাটি সত্য, সেটি একমাত্র তিনিই স্পষ্ট করতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বাংলাদেশ একদিন আবার একাত্তরের আদর্শে ফিরে যাবে। তিনি আরও বলেন, ইতিহাসকে ‘রিসেট বাটন’ টিপে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তার এই বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার দীর্ঘদিনের অবস্থানই প্রতিফলিত হয়েছে। কারণ তার সাহিত্যজীবনের বড় একটি অংশজুড়েই মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন ছিল।

কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে। যে মানুষটি শিশু-কিশোরদের দেশপ্রেমের শিক্ষা দিয়েছেন, তিনি কেন এমন একটি সময়ে দেশ ছেড়ে গেলেন, যখন দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল? যদি তিনি সত্যিই নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করে থাকেন, তাহলে সেই অভিজ্ঞতার কথা খোলাখুলিভাবে বলা কি উচিত নয়? আর যদি তিনি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে বিদেশে থাকেন, তাহলে সেটিও স্পষ্ট করে জানানো দরকার। কারণ জনপরিসরের একজন মানুষের নীরবতা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় জল্পনা-কল্পনার জন্ম দেয়।

আরেকটি বিষয় জনমনে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কোন আইনি মর্যাদায় অবস্থান করছেন? তিনি কি পর্যটক ভিসায় আছেন, কোনো দীর্ঘমেয়াদি ভিসায় আছেন, স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে আছেন, নাকি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক? এ বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য প্রকাশ্যে নেই। ফলে বিভিন্ন ধরনের গুঞ্জন শোনা গেলেও সেগুলোকে তথ্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। তার ঘনিষ্ঠজন কিংবা তিনি নিজেই যদি এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দেন, তাহলে এই বিতর্কের অবসান হতে পারে।

একইভাবে বহুদিন ধরেই একটি প্রশ্ন আলোচনায় রয়েছে; মুহম্মদ জাফর ইকবাল কি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন? তিনি দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা ও কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু নাগরিকত্ব নিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে নেই। তাই এটি নিয়ে অনুমান করার চেয়ে তথ্যের অপেক্ষা করাই যুক্তিযুক্ত।

নিউ জার্সির অনুষ্ঠানে তার স্ত্রী অধ্যাপক ইয়াসমিন হকও বলেন, তারা ‘দেশহীন’ অবস্থায় আছেন। এই বক্তব্যও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ ‘দেশহীন’ শব্দটির একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক ও আইনি অর্থ রয়েছে। তারা কি সেই অর্থে দেশহীন, নাকি এটি কেবল মানসিক বেদনার প্রকাশ?সেটিও স্পষ্ট নয়। একইভাবে ‘নির্বাসন’ শব্দটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, নাকি আইনি বাস্তবতা বোঝাতে; সেটিও ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

মুহম্মদ জাফর ইকবালের সমালোচনা করা যেমন একজন নাগরিকের অধিকার, তেমনি তার দীর্ঘ সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিষয়ক অবদান অস্বীকার করাও ন্যায়সঙ্গত হবে না। তিনি এমন একজন লেখক, যার বই পড়ে বহু তরুণ বিজ্ঞানকে ভালোবেসেছে, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জেনেছে এবং যুক্তিবাদী চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। সেই কারণেই তার কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। একজন জনপ্রিয় লেখকের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাখ্যার দাবি তৈরি করে।

আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি রাজনৈতিক নয়, ব্যক্তিগতও নয়; বরং জনস্বার্থের। দুই বছর তিনি কোথায় ছিলেন? কী পরিস্থিতিতে দেশ ছাড়লেন? বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে কী স্ট্যাটাসে আছেন? তিনি কি আবার বাংলাদেশে ফিরবেন? যদি ফিরতে চান, তাহলে কবে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানার আগ্রহ অস্বাভাবিক নয়। কারণ তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের অন্যতম পরিচিত মুখ।

বিতর্কের চেয়ে স্বচ্ছতা সবসময় বেশি শক্তিশালী। মুহম্মদ জাফর ইকবাল যদি নিজেই এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেন, তাহলে হয়তো অনেক বিতর্কের অবসান হবে। কারণ গুজবের চেয়ে সত্য সবসময় বেশি গ্রহণযোগ্য। একজন লেখকের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভাষা, আর সেই ভাষায় নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে বলার সাহসও তারই থাকা উচিত।

আজকের বাংলাদেশে মতের ভিন্নতা থাকবে, রাজনৈতিক অবস্থানও ভিন্ন হবে। কিন্তু একজন লেখক, একজন শিক্ষক এবং একজন জনবুদ্ধিজীবী হিসেবে মুহম্মদ জাফর ইকবালের কাছে মানুষ যে জবাবদিহির প্রত্যাশা করবে, সেটিও অস্বাভাবিক নয়। প্রশ্ন করা গণতন্ত্রের অংশ, আবার সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াও জনজীবনের অংশ। এখন অপেক্ষা শুধু একটাই; তিনি কি নিজেই এই নীরবতার অবসান ঘটাবেন?


লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব  ও  যুগ্ম সাধারণ  সম্পাদক, মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল। মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪, ই-মেইল:  [email protected]

মতামত এর আরও খবর