img

বন্ধ হোক জাতীয় সংসদে ইংরেজির যথেচ্ছ ব‍্যবহার

প্রকাশিত :  ০৫:১০, ০২ এপ্রিল ২০২৬

বন্ধ হোক জাতীয় সংসদে ইংরেজির যথেচ্ছ ব‍্যবহার

সারওয়ার-ই আলম

জাতীয় সংসদের কয়েকটি অধিবেশন দেখে মনে হলো স্পীকার হাফিজ উদ্দিন , স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ, সংসদ সদস‍্য আ‍ন্দালিব রহমান পার্থ ও অন‍্যান‍্যরা যেন একটানা কয়েক মিনিটও বাংলায় কথা বলতে সক্ষম নন। তাঁদের ইংরেজি বলা চাই-ই চাই! এমন অনেক ইংরেজি শব্দ তাঁরা ব‍্যবহার করছেন যেসব শব্দের বহুল প্রচলিত বাংলা শব্দ রয়েছে। বাংলার প্রতি জাতীয় সংসদে স্পীকারের ও সদস‍্যদের এই অবজ্ঞা প্রদর্শন শুধু অনাকাঙ্খিত-ই নয় অগ্রহণযোগ‍্যও বটে। কারণ বাংলা এতটা পঙ্গু ভাষা নয় যে ইংরেজির ওপর ভর দিয়ে দিয়ে তাকে চলতে হবে। সংসদে তাঁদের কথা শুনে মনে হয় বাংলা একটি পঙ্গু ভাষা। ইংরেজি না বললে এর অর্থ পরিস্কার হয় না। কী দুঃখজনক! এই হলো আমাদের স্পীকার, মন্ত্রী ও সংসদ সদসদ‍্যদের দেশপ্রেম ও ভাষাপ্রেমের নমুনা। এরাই আবার সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার জন‍্য জাতিকে সবক দেবে। একদিকে আমরা বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবী করছি, অন‍্যদিকে আমাদের জাতীয় সংসদে স্পীকার ও সংসদ সদস‍্যগণ অপ্রয়োজনে ইংরেজি ব‍্যবহার করছেন। কী হাস‍্যকর ব‍্যাপারটা!

আজ এক ভিডিওতে দেখলাম, স্পীকার বলছেন— \"বিরোধী দলের সদস‍্যরা কোন সদস‍্য যখন বক্তৃতা দেয় তখন কোনো কমেন্ট করবেন না, তাকে ডিসট্রাক্ট করার চেষ্টা করবেন না, প্লিজ লিসেন টু হিম, ইউ উইল গেট ইউর টার্ণ\"।

এখানে স্পীকার কি একেবারেই অপ্রয়োজনে ইংরেজি ব‍্যবহার করলেন না? তিনি তো কোনো ইংরেজি শব্দ ব‍্যবহার না করেই উপরের কথাগুলো বিশুদ্ধ বাংলায় খুব সহজে সুন্দর করে বলতে পারতেন এভাবে— বিরোধী দলের সদস‍্যরা কোনো সদস‍্য যখন বক্তৃতা দেয় আপনারা কোনো মন্তব‍্য করবেন না। তার মনযোগ নষ্ট করার চেষ্টা করবেন না। অনুগ্রহ করে তার কথা শুনুন। আপনারাও কথা বলার সুযোগ পাবেন।

স্পীকার এভাবে বললে কতই না মধুর শোনাতো। এখানে কোন শব্দটি জটিল বা অপ্রচলিত বাংলা শব্দ? একটিও তো না। তাহলে কেন স্পীকার ডিস্ট্রাক্ট, কমেণ্ট, প্লিজ লিসেন টু হিম, ইউ উইল গেট ইউর টার্ণ ব‍্যবহার করলেন? দেশের কতজন মানুষ স্পীকারের ভাষা পুরোপুরি বুঝবেন?

আরেকদিন দেখলাম শিক্ষামন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় বলছেন— \"অ‍্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ব‍্যাপার অ‍্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ওয়েতে হবে। লিভ ইট টু আস। আমরা তো কাজ করছি। লটারি ইজ নট অ‍্যা সলিউশন ফর অ‍্যাডমিশন। অ‍্যাবসোলিউটলি। আপনি মেধাকে কোন ব‍্যারোমিটারে জাস্টিফাই করবেন সেটা পরের ব‍্যাপার\"।

শিক্ষামন্ত্রীর মুখে এটা কোন ভাষা? না বাংলা, না ইংরেজি। শিক্ষামন্ত্রী এভাবে কথা বলে কী দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাইলেন? তিনি কি বাংলা ভুলে গেছেন, না কি ইংরেজি শব্দ ব‍্যবহার না করলে তাঁর কথাগুলো মানুষ বুঝবেন না?

আচ্ছা দেখা যাক, কোনো জটিল ও অপ্রচলিত বাংলা শব্দ ব‍্যবহার না করে তাঁর কথাগুলো বিশুদ্ধ বাংলায় কীভাবে বলা যায়। কথাগুলো এরকম হতে পারতো— প্রশাসনিক ব‍্যাপার প্রশাসনিক উপায়েই হবে। বিষয়টি আমাদের ওপর ছেড়ে দিন। আমরাতো কাজ করছি। লটারী ভর্তি পদ্ধতির সমাধান নয়। একদমই না। আপনি মেধাকে কীভাবে মূল‍্যায়ণ (বা যাচাই, বা বিচার) করবেন সেটা পরের ব‍্যাপার।

— শিক্ষামন্ত্রী ইংরেজি ব‍্যবহার না করে কথাগুলো এভাবে বিশুদ্ধ বাংলায় বললে কি জনগণের বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হতো? নিশ্চয় নয়। এখানে একটিও তো জটিল বা অপ্রচলিত বাংলা শব্দ ব‍্যবহার করতে হয়নি। জনগণ এসব শব্দের সঙ্গে পরিচিত। নিশ্চয় তিনিও। তাহলে শিক্ষামন্ত্রী কেন তাঁর বক্তব‍্যে যথেচ্ছা ইংরেজী শব্দ ব‍্যবহার করলেন? এটা কি তাঁর ভাষাপ্রেমের অভাব, না কি নিজেকে উচ্চশিক্ষিত জাহির করার চেষ্টা?

দু\'জন সংসদ সদস‍্য— আন্দালিব রহমান পার্থ ও সালাউদ্দিন আহমেদ সংসদে কথা বলার সময় প্রায় পঞ্চাশ ভাগ কথাই ইংরেজীতে বলেন। কখনো পুরো বাক‍্য আবার কখনো বাংলার সঙ্গে একেবারে দরকার ছাড়া একটি ইংরেজি শব্দ ঢুকিয়ে দেন।

যেমন একটি ভিডিওতে দেখলাম আন্দালিব রহমান পার্থ বলছেন— \"আন্ডারমাইন দ‍্য প্রভিশন অব দ‍্য আদেশ। আমি কামিং টু দ‍্য পয়েন্ট। চারটা প্রভিশন যে দেওয়া আছে। আসুন সংবিধানটাকে রেসপেক্ট করি, জুলাই সনদটাকেও রেসপেক্ট করি\"।

কী হলো তাঁর এই কথা? এখানে আন্ডারমাইন কেন বলতে হবে? অবজ্ঞা বললে কি ক্ষতি হতো? প্রভিশন কেন বলতে হবে? নিয়ম বা বিধান বললে ক্ষতি কী? অব দ‍্য আদেশ— এটা কোন ভাষা? আমি কামিং টু দ‍্য পয়েণ্ট। ভাষার এই মিশ্রণটা কতটা দরকারী ছিল? আমি মূল প্রসঙ্গে আসছি বললেই তো যথেষ্ট ছিল। আবার তিনি বললেন— আসুন সংবিধানকে রেসপেক্ট করি। অথচ রিসপেক্ট শব্দের কী সুন্দর বাংলাই না রয়েছে— শ্রদ্ধা। উনি বলতে পারতেন আসুন সংবিধানকে শ্রদ্ধা করি। সংসদ সদস‍্য একদিকে বলছেন সংবিধানকে \' রেসপেক্ট\' করার জন‍্য, অথচ নিজে মাতৃভাষাটাকেই \' রেসপেক্ট\' করছেন না। বিষয়টি কি স্ববিরোধী নয়?

জাতীয় সংসদে এ ধরণের মিশ্র ভাষার ব‍্যবহার কিছুতেই গ্রহণযোগ‍্য হতে পারে না। এতে ভাষার সৌন্দর্যহানি হয়। উদাহরণ দিলে ভুরি ভুরি দেওয়া যাবে। সংসদের অধিবেশনগুলো দেখলেই এর প্রমাণ মিলবে। একজন নাগরিক হিসেবে স্পীকার ও সংসদ সদস‍্যদেরকে বিনীতভাবে বলতে চাই— আপনারা এ দেশের সাধারণ জনগণের প্রতিনিধি। তাই জাতীয় সংসদে ইংরেজিতে নয়, এলিটদের ভাষায় নয়, জনগণের ভাষায় কথা বলুন। বাংলার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করুন। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করুন। এটা আপনাদের পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়, এটা আপনাদের নৈতিক দায়িত্ব।

স্পীকার ও সংসদ সদস‍্যদের মনে রাখা উচিত যে তাঁরা প্রতিনিধিত্ব করেন দেশের মানুষকে। সুতরাং তাঁদের ভাষাও হওয়া উচিত জনগণের ভাষা। নিজেরা ইংরেজি জানেন বলে কথায় কথায় ইংরেজি ঝাড়ার জায়গা সংসদ নয়, সেটা ব‍্যক্তিগত পরিসরে করতে পারেন। তাই এমন একটা বিধান করা জরুরি যে স্পীকার ও সংসদ সদস‍্যরা অপ্রয়োজনে সংসদে ইংরেজি শব্দ ব‍্যবহার করতে পারবেন না। সংসদের ভাষা হবে বাংলা। যেসব শব্দের বাংলা পরিভাষা নেই সেসব শব্দের কথা ভিন্ন। যেসব শব্দকে বাংলায় আত্তীকরণ করা হয়েছে সেসব শব্দ অবশ‍্যই ব‍্যবহার করা যাবে। তাই বলে পারিবারিক পরিবেশে, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে নিজেদের খেয়ালখুশী মতো যেভাবে বাংলার সঙ্গে ইংরেজি মিশিয়ে আমরা কথা বলি, জাতীয় সংসদের মতো দেশের একটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে দাঁড়িয়ে সেভাবে, অর্থাৎ যেটাকে অনেকে বলে \'বাংলিশ\' ভাষায় কথা বলা ঠিক নয়। এতে একদিকে যেমন ভাষার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হয়, অপরদিকে ভাষা শহীদদের প্রতিও অসম্মান জানানো হয়। জনগণ নিশ্চয় জাতীয় সংসদে জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে তা আশা করেন না!

সারওয়ার-ই আলম: ইলফোর্ড, লণ্ডন, ১ এপ্রিল ২০২৬

মতামত এর আরও খবর

img

পুঁজিবাজারে বড় চমক কি সময়ের ব্যাপার মাত্র?

প্রকাশিত :  ১৬:৫২, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের এই সময়টি বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধের মেঘ কাটিয়ে বিশ্ব আজ এক নতুন স্থিতিশীলতার সুপ্রভাতের অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার পারদ নিম্নমুখী হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যের উল্লেখযোগ্য পতন বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এক বিশেষ স্বস্তির বার্তা বয়ে এনেছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করতে একের পর এক তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজের আগমন এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহের শক্তিশালী অবস্থান আগামী রবিবারের পুঁজিবাজারে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বিশ্লেষণটি মূলত বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও দেশীয় সামষ্টিক অর্থনীতির নিরিখে আমাদের পুঁজিবাজারের সম্ভাব্য গতিপথকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিবর্তন ও তেলের মূল্যপ্রবণতা

বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত জ্বালানি তেলের বাজার গত কয়েক মাস ধরে যে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে এসে তা নাটকীয়ভাবে স্তিমিত হতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (ক্রুড অয়েল) দামে এখন নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। সাম্প্রতিক লেনদেনগুলোতে দেখা গেছে, ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৯৭.৯৯ ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের সেশনের তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ কম। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি ৯৫ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমার নিচেও অবস্থান করছে। জেপি মরগানের মতো বিশ্বখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বাভাস দিচ্ছে যে, ২০২৬ সাল জুড়ে তেলের গড় মূল্য ব্যারেলপ্রতি ৬০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি চমৎকার সংকেত।

এই দরপতনের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পাদিত দুই সপ্তাহের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য একটি \'গেম চেঞ্জার\' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালী—যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী—পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীরা এখন তেলের বাজারদর থেকে \'যুদ্ধ ঝুঁকি প্রিমিয়াম\' বা \'ওয়ার প্রিমিয়াম\' সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে দামের এই স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা: সংকট থেকে সম্ভাবনার দ্বারে

বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে আসার এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ব্যবস্থাপনায়ও এক অভাবনীয় গতিশীলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খাতের দুশ্চিন্তা লাঘব করে একের পর এক জ্বালানি তেল ও এলএনজিবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর এবং মহেশখালী টার্মিনালে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এটি শুধুমাত্র কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং সরকারের সুপরিকল্পিত আমদানি কৌশলেরই অংশ।

৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মালয়েশিয়া থেকে আসা দুটি বৃহৎ মাদার ট্যাংকার \'সেন্ট্রাল স্টার\' এবং \'ইস্টার্ন কুইন্স\' চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে। তারা মোট ৫১,০০০ মেট্রিক টন জ্বালানি (২৫,০০০ টন ফার্নেস অয়েল ও ২৬,০০০ টন অকটেন) বহন করে এনেছে। এছাড়া সিঙ্গাপুর থেকে আসা আরেকটি জাহাজ ২৭,০০০ টন ডিজেল খালাস করেছে। তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ১৫ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়া থেকে ৬৪,৬৭৮ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে \'মারান গ্যাস হাইড্রা\' মহেশখালীতে পৌঁছেছে এবং ১৮ এপ্রিল অ্যাঙ্গোলা থেকে আরও ৬৯,০১৫ মেট্রিক টন এলএনজি নিয়ে \'লোবিটো\' আসার কথা রয়েছে। মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৩টি জ্বালানিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছেছে, যা দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক বিরাট স্বস্তি।

সামষ্টিক অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলো ২০২৬ সালের শুরুতেই ক্রমান্বয়ে উন্নতির শিখরে আরোহণ করছে। বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা অর্থনীতির অন্তর্নিহিত শক্তিরই পরিচায়ক। ৭ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৩৫ বিলিয়ন ডলারে। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (এসিইউ) ও অন্যান্য বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের পরেও রিজার্ভের এই অবস্থান অত্যন্ত সন্তোষজনক।

রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রেও চলতি বছর নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। মার্চ মাসে প্রবাসীরা রেকর্ড ৩.৭৭৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা একক মাস হিসেবে এ যাবতকালের সর্বোচ্চ। এপ্রিলের প্রথমার্ধেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ১ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে ১,৭৮৮ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২১.৫ শতাংশ বেশি। এই শক্তিশালী রিজার্ভ ও রেকর্ড রেমিট্যান্সের ফলে ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে ৩.৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। একইসাথে খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি (যা সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ১৪.২৪ শতাংশ) নাটকীয়ভাবে কমে ফেব্রুয়ারিতে ২.৩৯ শতাংশে নেমে আসায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বাজার স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

পুঁজিবাজারের গতিপ্রকৃতি ও রবিবারের পূর্বাভাস

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বিগত কয়েক সপ্তাহের সংশোধন প্রক্রিয়ার পর এখন একটি শক্তিশালী ঘুরে দাঁড়ানোর (রিবাউন্ড) উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ডিএসই সূচক ৫,৬০০ পয়েন্টের ঘর স্পর্শ করার পর মুনাফা শিকারিদের চাপে কিছুটা কমলেও গড় দৈনিক লেনদেন ১,০০০ কোটি টাকার ওপরে থাকা নির্দেশ করে যে বাজারে পর্যাপ্ত তারল্য ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ রয়েছে।

আগামী রবিবার পুঁজিবাজার ইতিবাচক থাকার পেছনে তিনটি প্রধান প্রভাবক কাজ করবে বলে আমি মনে করি:

প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় তালিকাভুক্ত উৎপাদনশীল ও বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় কমে আসবে, যা সরাসরি তাদের কর্পোরেট মুনাফায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে সিমেন্ট, সিরামিক ও ওষুধ খাতের কোম্পানিগুলো এই জ্বালানি স্বস্তির বড় সুবিধাভোগী হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্বজুড়ে শান্তি আলোচনার অগ্রগতি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে \'রিস্ক-অন\' মেজাজ ফিরিয়ে এনেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারগুলোতে ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তৃতীয়ত, দেশের শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি বিনিয়োগকারীদের মনে এই বিশ্বাস জন্মাবে যে দেশের অর্থনীতি বড় কোনো ঝুঁকির মুখে নেই।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এপ্রিলের এই সময়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক বিশেষ মাহেন্দ্রক্ষণ। একদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বস্তি, অন্যদিকে দেশীয় শক্তিশালী অর্থনৈতিক সূচক—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার জন্য প্রস্তুত। বিনিয়োগকারীদের ভয় কাটিয়ে যৌক্তিক ও তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাজারে অংশ নেওয়ার এখনই সময়। আশা করা যায়, আগামী রবিবারের লেনদেন বিনিয়োগকারীদের জন্য এক নতুন আশার আলো বয়ে আনবে এবং দেশের পুঁজিবাজার তার ইতিবাচক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবে।

মতামত এর আরও খবর