img

স্বাধীনতার ঘোষক কে? ইতিহাসের চোখে—

প্রকাশিত :  ১৫:৪৯, ২৯ মার্চ ২০২৬

স্বাধীনতার ঘোষক কে? ইতিহাসের চোখে—
সারওয়ার-ই আলম
স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছর পরও আমরা আমাদের স্বাধীনতার ঘোষক বা স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষক কে— এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি। বিষয়টি জাতিকে বিভক্ত করে রেখেছে দুই ভাগে। কেউ বলেন শেখ মুজিবুর রহমান। আবার কেউ বলেন জিয়াউর রহমান। বছর জুড়ে এ বিতর্ক চালু থাকে।

বিএনপিপন্থীরা চান জিয়াকে ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তাঁকে মহান করতে। অপরদিকে মুজিবপন্থীরা চান মুজিবকে ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তাঁকে মহান করতে।

প্রশ্ন জাগে— মাত্র চুয়ান্ন বছর আগের একটি ঘটনা নিয়ে কেন আমরা এতটা দ্বিধাবিভক্ত। বিষয়টি যদি এমন হতো যে শত শত বছর আগের ঘটনা, সেরকম কোনো শক্ত সাক্ষী প্রমাণ নেই, তাই মানুষ দ্বিধাবিভক্ত তাহলে একটা কথা ছিল। তা কিন্তু নয়। এটি মাত্র চুয়ান্ন বছর আগের ঘটনা। সে সময়কার অনেকেই এখনো জীবিত আছেন। কিন্তু জাতির কী দুর্ভাগ‍্য যে তাঁদের একজনের কথা আরেকজনের সঙ্গে মেলে না। এ যদি হয় অবস্থা তাহলে এ জাতি তো ভবিষ‍্যতে কোনদিনই স্বাধীনতার ঘোষক প্রশ্নে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে আসতে পারবে না। তবে কি আমরা ভবিষ‍্যত প্রজন্মকে বিভক্ত করে রেখে যাচ্ছি না? আমরা কি এর দায় এড়াতে পারব?

ইতিহাস সাক্ষ‍্য দেয় আমাদের স্বাধীনতার স্থপতি হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। কারণ তিনি সে সময় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা ছিলেন। সত্তরের নির্বাচনে তাঁর দল সংখ‍্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে জয়লাভ করেছিল। সে কারণে পাকিস্তানী শাসকেরা ক্ষমতার বণ্টন বিষয়ে তাঁর সঙ্গেই আলাপ আলোচনা করতেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, যা আজকের বাংলাদেশ— একাত্তরে এ দেশটির মুক্তিযুদ্ধের সর্বপ্রথম ঘোষণাটি আসে শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে। যদিও সেটি কোনো \'অফিসিয়াল\' ঘোষণা ছিল না, ছিল রাজনৈতিক ভাষণে রাজনৈতিক ঘোষণা। তিনি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ৭ই মার্চে অনুষ্ঠিত জনসমাবেশে তাঁর ভাষণে ঘোষণা দিয়েছিলেন, \" এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম\"। ইতিহাস বলে স্বাধীনতা নিয়ে এটিই সর্বপ্রথম ঘোষণা। মূলত এ ঘোষণার মাধ‍্যমেই বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের জন‍্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করে। মুজিব সেদিন তাঁর ভাষণে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কৌশল হিসেবে জাতিকে \' ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার\' আহ্বানও জানিয়েছিলেন। সেদিন রাজনৈতিক প্রজ্ঞাদীপ্ত এ ভাষণটি জাতিকে নির্দেশনা দিয়েছিল সম্ভাব‍্য মুক্তিযুদ্ধে করণীয় বিষয়ে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কোনো সামরিক সিদ্ধান্ত নয়। তাই দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে মুজিবের ঐ ঘোষণাটি পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদেরকে চ‍্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ফলে তাঁরা মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বাঙালির স্বাধীনতার স্পৃহাকে দমন করার জন‍্য দমন পীড়নের পথ বেছে নেয়। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ২৫শে মার্চ রাতে ঢাকায় নৃশংস হত‍্যাযজ্ঞ ঘটায়। তারা হাজার হাজার নিরস্ত্র বাঙালিকে হত‍্যা করে। ২৫শে মার্চ দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে শেখ মুজিবুর রহমানকে আটক করে। তারিখের হিসেবে ততক্ষণে সেটি ২৬শে মার্চ।

ইতিহাস বলে ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানী বাহিনী ইপিআরসহ ঢাকায় বিভিন্ন স্থানে নৃশংস হামলা চালালে পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পেরে মুজিব ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে আটক হওয়ার আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন যা চট্টগ্রামে অবস্থিত তৎকালীন ই.পি.আর এর ট্রান্সমিটারে প্রচার করার জন্য পাঠানো হয়।
তার বার্তাটি ছিল এরকম—

To-day Bangladesh is a sovereign and independent state. On Thursday night West Pakistani armed forces suddenly attacked the police barracks at Rajarbagh and the EPR Headquarters at Peelkhana in Dacca. Many innocent and unarmed people have been killed in Dacca city and other places of Bangladesh. Violent clashes between the East Pakistan Rifles and Police on the one hand and the armed forces off Pindi on the other, are going on. The Bengalis are fighting the enemy with great courage for an independent Bangladesh. Resist the treacherous enemy in every corner of Bangladesh. May God aid us in our fight for freedom.\" \"JOY BANGLA\"

শেখ মুজিবুর রহমানের তারবার্তাটি অনুবাদ করে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ ১৯৭১, সন্ধ্যা ৭.৪০মিনিটে পাঠ করা হয়। পাঠ করেন আওয়ামী লীগের নেতা এম এ হান্নান। যে কারণে ২৬শে মার্চকে আমরা আমাদের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করি। এই যে এম এ হান্নান ঘোষণাপত্রটি পাঠ করলেন, আমরা কেউ কি তাঁকে স্বাধীনতার ঘোষক বলছি? বলছি না।

পরবর্তিতে ২৭শে মার্চে সে সময়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে কর্মরত সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান কালুর ঘাটস্থ বেতার কেন্দ্র থেকে দুই দফায় ইংরেজিতে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। তাঁর ঘোষণাটি ছিল এরকম—

This is Swadhin Bangla Betar Kendra. I, Major Ziaur Rahman, on behalf of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, hereby declare that the independent People\'s Republic of Bangladesh has been established. I call upon all Bengalis to rise against the attack by the West Pakistani Army. We shall fight to the last to free our motherland. By the grace of Allah, victory is ours.

কারো কারো মতে জিয়াউর রহমানের প্রথম ঘোষণায় on behalf of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman কথাটি ছিল না। ঘোষণার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ‍্যতার কথা বিবেচনা করে দ্বিতীয় ঘোষণায় এ কথাটি যুক্ত করা হয়।

ইতিহাসের এ জায়গায় এসে বিতর্কের সূত্রপাত। স্বাধীনতার এ ঘোষণাটি যেহেতু রেডিও তে দেওয়া হয়েছে এবং দিয়েছেন একজন সেনা কর্মকর্তা সেহেতু বিএনপি বা জিয়াপন্থীরা বলতে চায় এটিই হলো স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। এখন আমরা যদি তাঁদের কথা মানি তাহলে আমাদের স্বাধীনতা দিবস হয় ২৭শে মার্চ।
কিন্তু বিএনপিসহ জাতি তো স্বাধীনতা দিবস পালন করে ২৬শে মার্চ। জিয়াপন্থীরা যদি জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক মনে করেন তবে ২৬শে মার্চ কীভাবে স্বাধীনতা দিবস হয়— সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এখন দেখা যাক, জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার আদৌ কোনো এখতিয়ার বা প্রশাসনিক ক্ষমতা ছিল কি না!

একাত্তরের ওই সময়টাতে তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন মেজর। সেনাপ্রধান থেকে এ পদটি অনেক অনেক নিম্নে। এখানে জিয়া বলে নয়, এই পদে থাকা কোনো কর্মকর্তারই প্রশাসনিক কোনো এখতিয়ার বা ক্ষমতা থাকে না ওই পদে থেকে একটি জাতির স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার। রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের অনুপস্থিতিতে বা অপারগতায় জাতির স্বাধীনতার ঘোষণা যদি দিতেই হয় তাহলে তা দেবেন সেনাপ্রধান বা সশস্ত্র বাহিনী প্রধান। একজন মেজর কখনোই ঘোষণা দেওয়ার প্রশাসনিক অধিকার বা ক্ষমতা রাখেন না। শুধু মেজরই বা কেন, কর্ণেল, লেঃ কর্ণেল, ব্রিগেডিয়ার কারোরই পদাধিকার বলে সে ক্ষমতা নেই। তাদের পদই তাদেরকে সে ক্ষমতা দেয় না।

কোনো কারণে যদি তিনি ঘোষণা দেনও তাহলে সে ঘোষণার কোনো গ্রহণযোগ‍্যতা থাকে না, যদি না ঘোষণাটি হয় শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা বা সেনাপ্রধানের অপারগাতয় তাঁদের কারো পক্ষ থেকে। জিয়া ঠিকই তা বুঝতে পেরেছিলেন। পেরেছিলেন বলেই তিনি ঘোষণাটি সংশোধন করে মুজিবের নাম যুক্ত করে ঘোষণাটি আবার দেন। এটি তাঁর বিচক্ষণতা।

একটি জাতির স্বাধীনতার ঘোষণা তো অনেক দূরের কথা, মেজর পদ মর্যাদার একজন সেনা কর্মকর্তা তো সেনাবাহিনীর একটি ক‍্যান্টমেন্টের কোনো ঘোষণাই দেওয়ার অধিকার রাখেন না। ক‍্যান্টমেন্টের নীতি নির্ধারণী ঘোষণা আসে ক‍্যান্টমেন্ট প্রধানের দপ্তর থেকে যা মেজর পদমর্যাদার কয়েক ধাপ উপরে।

একাত্তরের ওই সময়টিতে জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম অঞ্চলে জেড ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে কর্মরত ছিলেন বলে ঘোষণাপত্রটি তিনি রেডিওতে পাঠ করেন। এখানে কার্যত তিনি পূর্বের ঘোষক এম এ হান্নানের ভূমিকায় অবতীর্ণ। জিয়া একজন সংবাদ পাঠক বা অনুষ্ঠান ঘোষকের মতো স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের একজন পাঠক মাত্র, কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষক বলতে যা বোঝায় তা নন। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের পাঠক আর স্বাধীনতার ঘোষক মোটেই এক কথা নয়। যদি হয় তাহলে যেহেতু বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল ২৬শে মার্চকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে মানেন এবং যেহেতু ২৬শে মার্চের ঘোষণাটি দিয়েছেন এম এ হান্নান, সেহেতু মুজিব ও জিয়াকে বাদ দিয়ে আমাদেরকে হান্নানকে স্বাধীনতার ঘোষক মানতে হবে। কিন্তু আমরা কি তা মানি? নিশ্চয় নয়! কিন্তু কেন মানছি না, হান্নানই তো রেডিওতে প্রথম ঘোষণা দিয়েছিলেন ২৬শে মার্চে, যে দিনটিকে আমরা পালন করছি স্বাধীনতা দিবস হিসেবে।

আমরা যদি মুজিব বা জিয়ার প্রতি কোনরূপ পক্ষপাতিত্ব না করে স্বাধীনতা ঘোষণার এ বিষয়টি বিশ্লেষণ করি তাহলে কী দেখতে পাই?

দেখতে পাই— স্বাধীনতার সর্বপ্রথম ঘোষণা দিয়েছিলেন ৭ই মার্চের জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান।

দ্বিতীয় ঘোষণাটি দিয়েছেন রেডিওতে শেখ মুজিবের পক্ষে এম এ হান্নান ২৬শে মার্চ ১৯৭১।

এবং তৃতীয় ঘোষণাটি দিয়েছেন রেডিওতে শেখ মুজিবের পক্ষে জিয়াউর রহমান ২৭শে মার্চ ১৯৭১।

এখানে যৌক্তিক বিচারে মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার এখতিয়ার ছিল কারণ তিনি ছিলেন তৎকালীন দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা, এবং তাঁর দলটি ছিল ৭০-এর নির্বাচনে সংখ‍্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা বিজয়ী দল।

কিন্তু কিছুতেই মেজর পদমর্যাদার একজন আর্মি অফিসারের সে প্রশাসনিক এখতিয়ার বা ক্ষমতা ছিল না। তাই জিয়াউর রহমান কিছুতেই স্বাধীনতার ঘোষক হতে পারেন না। তাঁকে আমরা সম্মানিত করতে পারি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে এবং একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে নয়। স্বাধীনতার ঘোষণার পাঠককে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জোর করে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে বিএনপিপন্থীরা জিয়ার মতো একজন বীর উত্তম উপাধীপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডারকে জাতির সামনে বছরের পর বছর খাটোই করছেন।

স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্ক এড়াতে আমরা সম্ভবত একটি সিদ্ধান্তে আসতে পারি। তাহলো আমরা স্বাধীনতার ঘোষক ধারণাটি জাতীয় জীবন থেকে একেবারে বাদ দিতে পারি। অর্থাৎ আমরা কাউকেই স্বাধীনতার ঘোষক বলব না। আসলে বলার দরকারও নেই। আমাদের একটি মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সে যুদ্ধের ঘোষণা এসেছিল সে সময়কার প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার কাছ থেকে এবং ঘোষণাটি বিভিন্নভাবে পঠিত হয়েছিল রেডিওতে— এটুকুই যথেষ্ট। কোন ঘোষক কখন ঘোষণাটি পাঠ করেছেন সে আলোচনা মোটেই প্রয়োজনীয় নয়। বিষয়টা অনেকটা সংবাদের মতো। সংবাদটি গুরুত্বপূর্ণ, সংবাদ পাঠক নন। তাই বিতর্ক এড়াতে জাতীয় জীবন থেকে \'স্বাধীনতার ঘোষক কে\' আলোচনাটি বাদ দেওয়াই সমীচীন। এতে জাতীয় জীবনে রাজনৈতিক ঐক‍্য প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।

সমাজে দেখা যায় অনেকে মুজিবকে মহান করতে গিয়ে জিয়াকে খুবই তুচ্ছ তাচ্ছিল‍্য করেন। মুক্তিযুদ্ধে জিয়ার অবদানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন‍্য বলেন যুদ্ধের সময় জিয়া ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের গুপ্তচর। এটা একজন সেক্টর কমান্ডারের প্রতি চরম অন‍্যায়।

আবার অনেকে জিয়াকে মহান করতে গিয়ে মুজিবকে তুচ্ছ তাচ্ছিল‍্য করেন। বলেন মুজিব তো রণাঙ্গনে যুদ্ধই করেননি, তিনি ছিলেন পাকিস্তানীদের হাতে বন্দী, তিনি আবার স্বাধীনতার স্থপতি হন কী করে? এঁরা জানেন না অথবা জানলেও স্বীকার করতে চান না যে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করে সশস্ত্র বাহিনীর সদস‍্যরা, মুক্তিযোদ্ধারা; দেশের নির্বাহী প্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান নন। তাঁরা থাকেন নীতি নির্ধারণী ভূমিকায়, জাতির পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বিভিন্ন বাহিনীকে নির্দেশনা প্রদানের ভূমিকায়। মাঠ পর্যায়ে যুদ্ধ করা প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতির বা রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার কাজ নয়। করলে আমেরিকা-ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে আমরা ট্রাম্প, নেতানিয়াহু ও প্রয়াত খামেনিকে রণাঙ্গনে দেখতাম। তা কি আমরা দেখেছি বা দেখি?

আসলে আমরা নিজ নিজ পছন্দের দলের প্রতি এতটাই অন্ধ যে দলীয় মনোভাবের বাইরে বেরুতে পারি না। পারলে জিয়াপন্থীরা মুজিবকে আর মুজিবপন্থীরা জিয়াকে ছোট করতেন না। ইতিহাসে যাঁর যে মর্যাদা প্রাপ‍্য তাঁকে সে মর্যাদা দেওয়া উচিত। তা না হলে স্বাধীনতার ঘোষক প্রশ্নে আমরা কোনদিই সমাধানে আসতে পারব না। আমরা ক্রমশ আরো বিভাজিত হবো। এই একটি বিষয় সুরাহা হয়ে গেলে দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের দূরত্ব অনেক কমে যাবে। আর তাদের দূরত্ব কমা মানে জাতি ঐকবদ্ধ হওয়ার পথে আরো একধাপ এগিয়ে যাওয়া।

তাই আশা করি বিএনপিপন্থীরা ইতিহাসের সত‍্যকে অস্বীকার করে জোর করে জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা থেকে বিরত থাকবেন। এবং আওয়ামী লীগপন্থীরা মুক্তিযুদ্ধে জিয়ার অবদানকে অস্বীকার করার জন‍্য তাকে পশ্চিম পাকিস্তানের গুপ্তচর বলে যে অসম্মান করেন সে হীন মানসিকতা পরিহার কর‍বেন। এতে আমাদের রাজনীতি আরো সুন্দর হবে।

সারওয়ার-ই আলম
ইলফোর্ড, লণ্ডন
২৮শে মার্চ ২০২৬


img

বৈশাখে পান্তা-ইলিশ যেভাবে এলো

প্রকাশিত :  ১৪:৫৬, ২১ এপ্রিল ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৫:০১, ২১ এপ্রিল ২০২৬

আবদুল হামিদ মাহবুব

বাংলা নববর্ষের (পহেলা বৈশাখ) প্রথম দিনে সকল বাঙালির ঘরেই যার যার সাধ্যমত ভালো-মন্দ খাওয়ার একটা রেওয়াজ চালু ছিল। কিন্তু সেই রেওয়াজ পান্তা-ইলিশে গড়ালো কিভাবে? প্রশ্নটা অনেকের মাথায় আসে। কিন্তু ঘটনা ক্রমে আমি ‘আবদুল হামিদ মাহবুব’ সেই কাহিনী কিছুটা জানি।

পান্তা-ইলিশের প্রচলনটা শুরু হয়েছে, ঢাকার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। আমি তখন পত্রিকার কাজে ঢাকায় ছিলাম। মাসটা ছিল এপ্রিল। সম্ভবত ১৯৮২ অথবা ১৯৮৩ সাল। দৈনিক দেশ-এ আমি কাজ করতাম ‘মৌলভীবাজারের নিজস্ব সংবাদদাতা’ হিসেবে। আমার সাথে সখ্যতা ছিল দৈনিক দেশ-এর মফস্বলের দায়িত্বে থাকা আবু সাঈদ জুবেরীর। মফস্বলে আরেকজন কাজ করতেন। উনার নামের সাথে নজরুল ছিল। এতো বছর পর উনার পুরো নামটা ভুলে গেছি। সম্ভবত: সানাউল্লাহ নূরী ছিলেন পত্রিকার সম্পাদক। বার্তা সম্পাদক বোরহান আহমেদ। সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি হেলাল হাফিজ।

পত্রিকার মালিক ছিলেন এরশাদের মন্ত্রী মাইদুল ইসলাম। বোরহান আহমদ, হেলাল হাফিজ ও রোজী ফেরদৌসী একটা রুমে বসতেন। রোজী ফেরদৌসী পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করতেন। সম্ভবত শিশু পাতাটাও তিনি দেখতে। আমার অনেক ছড়া শিশু পাতায় ছাপা হয়েছে।

এই তিনজন বসতেন সেই সেগুনবাগিচার বাসার মতো বানানো পুরনো বিল্ডিংয়ে ঢোকার হাতের বাম পাশের প্রথম রুমটায়। সেগুনবাগিচার সেই ভবন ও ভূমি ছিল  সরকারের পরিত্যক্ত সম্পত্তি। কাঠের সিঁড়ি ভেঙ্গে দোতালায় উঠতে হতো। ওখানে একটি রুমে সম্পাদক বসতেন। সাপ্তাহিক বিপ্লব নামে একটি ম্যাগাজিন বের হতো। ওইটার সম্পাদক ছিলেন কবি সিকদার আমিনুল হক। তিনিও দোতলার একটি রুমে বসতেন। ক্ষমতার জোরে মাইদুল ইসলাম সে বাড়ি ও ভূমি দখল করে রেখেছিলেন। ‘দৈনিক দেশ’ প্রকাশনা বন্ধ হওয়ার বেশ পরে সেই সম্পত্তিতেই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কার্যক্রম শুরু হয়েছিলো। জাদুঘর দেখতে আমি কয়েকবার ওখানে গিয়েছি।

তো যে কথা বলছিলাম, সম্ভবত হেলাল হাফিজের সাথে কথা বলতেই আমি বোরহান আহমেদের ওই রুমে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম বোরহান ভাই কথা বলছেন রোজী ফেরদৌসীর সাথে। বিষয় সামনে পহেলা বৈশাখ। সেই বৈশাখের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রমনা পার্কের অনুষ্ঠান স্থলের বটতলে হাজার হাজার মানুষ সমাগম হয়। বোরহান আহমেদ প্রস্তাব করলেন ওখানে একটি পান্তা ভাতের দোকান দিলে ভালো ব্যবসা হবে। বিষয়টি লুফে নিলেন রোজী ফেরদৌসী। জিন্সের টাইট প্যান্ট পরা গায়েও জিন্সের শার্ট কবি হেলাল হাফিজ সবসময়ই একটু গম্ভীর থাকতেন। খুব একটা কথা বলতেন না। তার টান থাকতো প্রেসক্লাবের প্রতি। তিনি হাতের কাজ সেরেই কিভাবে প্রেসক্লাবে চলে যাবেন সেই চিন্তায় যেনো একটা ঘোরের মধ্যে থাকতেন। প্রেসক্লাবর প্রতি টান থাকার কারণ, ওখানে গিয়ে তিনি জুয়া খেলতেন। কিন্তু তিনিও ওই আলোচনায় ঢুকে গেলেন। তিনি বললেন পান্তা ভাতের সাথে ইলিশ ভাজি রাখলে আরো ভালো হবে। একজন হাবাগোবা মফস্বলের মানুষ হিসেবে তাদের সকল কথা শুনেই গেছি।  হেলাল হাফিজের টেবিলের সামনে একটিভ চেয়ারে বসে থেকে তাদের পরিকল্পনাগুলো শুনছিলাম, আর শুনছিলাম। পেয়াজ, কাঁচা মরিচ, ভর্তা আরো কি কি তারা বলছিলেন!

কথা বাড়তে বাড়তে এক সময় সিদ্ধান্ত হয়ে গেলো।  পান্তাভাতের একটি দোকান দেওয়াই হবে। সাথে থাকবে ইলিশ ভাজা। পান্তাভাত বানানোর দায়িত্ব পড়লো রোজী ফেরদৌসীর উপর। ইলিশ কেনার দায়িত্ব নিলেন বোরহান আহমেদ। সেই ঘটনার সাক্ষী থেকে গেলাম আমি, মফস্বলের একজন সাংবাদিক। শেষ পর্যন্ত রোজী ফেরদৌসী এই কর্মের সাথে যুক্ত ছিলেন কিনা আমি বলতে পারব না।

আমি এই পর্যন্ত তাদের কথাবার্তা শুনে ওখান থেকে চলে এসেছিলাম। মফস্বল বিভাগে এসে জুবেরী ভাইয়ের সাথে টুকটাক কথা সেরে চলে আসলাম। সেই বৈশাখে পান্তা স্টলের ছবিসহ রিপোর্টও এক দুটি পত্রিকায় বেরিয়েছিলো।

নোট: পুরোটাই স্মৃতি থেকে লিখেছি। একটু এদিক-সেদিক হতে পারে। তবে নিশ্চিত করছি, কাহিনী ঠিক আছে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক। সাবেক সভাপতি: মৌলভীবাজার প্রেসক্লাব। সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রকাশিত গ্রন্থ: ‘গণমাধ্যম সাংবাদিকতা দেশ দশের আমার কথা’।


আবদুল হামিদ মাহবুব: ‘কমলকুঞ্জ’. মৌলভীবাজার-৩২০০ ।
মোবাইল: ০১৭১১১৭৮৭৮৪

মতামত এর আরও খবর