img

স্বাধীনতার ঘোষক কে? ইতিহাসের চোখে—

প্রকাশিত :  ১৫:৪৯, ২৯ মার্চ ২০২৬

স্বাধীনতার ঘোষক কে? ইতিহাসের চোখে—
সারওয়ার-ই আলম
স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছর পরও আমরা আমাদের স্বাধীনতার ঘোষক বা স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষক কে— এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি। বিষয়টি জাতিকে বিভক্ত করে রেখেছে দুই ভাগে। কেউ বলেন শেখ মুজিবুর রহমান। আবার কেউ বলেন জিয়াউর রহমান। বছর জুড়ে এ বিতর্ক চালু থাকে।

বিএনপিপন্থীরা চান জিয়াকে ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তাঁকে মহান করতে। অপরদিকে মুজিবপন্থীরা চান মুজিবকে ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তাঁকে মহান করতে।

প্রশ্ন জাগে— মাত্র চুয়ান্ন বছর আগের একটি ঘটনা নিয়ে কেন আমরা এতটা দ্বিধাবিভক্ত। বিষয়টি যদি এমন হতো যে শত শত বছর আগের ঘটনা, সেরকম কোনো শক্ত সাক্ষী প্রমাণ নেই, তাই মানুষ দ্বিধাবিভক্ত তাহলে একটা কথা ছিল। তা কিন্তু নয়। এটি মাত্র চুয়ান্ন বছর আগের ঘটনা। সে সময়কার অনেকেই এখনো জীবিত আছেন। কিন্তু জাতির কী দুর্ভাগ‍্য যে তাঁদের একজনের কথা আরেকজনের সঙ্গে মেলে না। এ যদি হয় অবস্থা তাহলে এ জাতি তো ভবিষ‍্যতে কোনদিনই স্বাধীনতার ঘোষক প্রশ্নে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে আসতে পারবে না। তবে কি আমরা ভবিষ‍্যত প্রজন্মকে বিভক্ত করে রেখে যাচ্ছি না? আমরা কি এর দায় এড়াতে পারব?

ইতিহাস সাক্ষ‍্য দেয় আমাদের স্বাধীনতার স্থপতি হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। কারণ তিনি সে সময় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা ছিলেন। সত্তরের নির্বাচনে তাঁর দল সংখ‍্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে জয়লাভ করেছিল। সে কারণে পাকিস্তানী শাসকেরা ক্ষমতার বণ্টন বিষয়ে তাঁর সঙ্গেই আলাপ আলোচনা করতেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, যা আজকের বাংলাদেশ— একাত্তরে এ দেশটির মুক্তিযুদ্ধের সর্বপ্রথম ঘোষণাটি আসে শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে। যদিও সেটি কোনো \'অফিসিয়াল\' ঘোষণা ছিল না, ছিল রাজনৈতিক ভাষণে রাজনৈতিক ঘোষণা। তিনি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ৭ই মার্চে অনুষ্ঠিত জনসমাবেশে তাঁর ভাষণে ঘোষণা দিয়েছিলেন, \" এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম\"। ইতিহাস বলে স্বাধীনতা নিয়ে এটিই সর্বপ্রথম ঘোষণা। মূলত এ ঘোষণার মাধ‍্যমেই বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের জন‍্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করে। মুজিব সেদিন তাঁর ভাষণে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কৌশল হিসেবে জাতিকে \' ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার\' আহ্বানও জানিয়েছিলেন। সেদিন রাজনৈতিক প্রজ্ঞাদীপ্ত এ ভাষণটি জাতিকে নির্দেশনা দিয়েছিল সম্ভাব‍্য মুক্তিযুদ্ধে করণীয় বিষয়ে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কোনো সামরিক সিদ্ধান্ত নয়। তাই দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে মুজিবের ঐ ঘোষণাটি পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদেরকে চ‍্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ফলে তাঁরা মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বাঙালির স্বাধীনতার স্পৃহাকে দমন করার জন‍্য দমন পীড়নের পথ বেছে নেয়। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ২৫শে মার্চ রাতে ঢাকায় নৃশংস হত‍্যাযজ্ঞ ঘটায়। তারা হাজার হাজার নিরস্ত্র বাঙালিকে হত‍্যা করে। ২৫শে মার্চ দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে শেখ মুজিবুর রহমানকে আটক করে। তারিখের হিসেবে ততক্ষণে সেটি ২৬শে মার্চ।

ইতিহাস বলে ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানী বাহিনী ইপিআরসহ ঢাকায় বিভিন্ন স্থানে নৃশংস হামলা চালালে পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পেরে মুজিব ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে আটক হওয়ার আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন যা চট্টগ্রামে অবস্থিত তৎকালীন ই.পি.আর এর ট্রান্সমিটারে প্রচার করার জন্য পাঠানো হয়।
তার বার্তাটি ছিল এরকম—

To-day Bangladesh is a sovereign and independent state. On Thursday night West Pakistani armed forces suddenly attacked the police barracks at Rajarbagh and the EPR Headquarters at Peelkhana in Dacca. Many innocent and unarmed people have been killed in Dacca city and other places of Bangladesh. Violent clashes between the East Pakistan Rifles and Police on the one hand and the armed forces off Pindi on the other, are going on. The Bengalis are fighting the enemy with great courage for an independent Bangladesh. Resist the treacherous enemy in every corner of Bangladesh. May God aid us in our fight for freedom.\" \"JOY BANGLA\"

শেখ মুজিবুর রহমানের তারবার্তাটি অনুবাদ করে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ ১৯৭১, সন্ধ্যা ৭.৪০মিনিটে পাঠ করা হয়। পাঠ করেন আওয়ামী লীগের নেতা এম এ হান্নান। যে কারণে ২৬শে মার্চকে আমরা আমাদের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করি। এই যে এম এ হান্নান ঘোষণাপত্রটি পাঠ করলেন, আমরা কেউ কি তাঁকে স্বাধীনতার ঘোষক বলছি? বলছি না।

পরবর্তিতে ২৭শে মার্চে সে সময়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে কর্মরত সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান কালুর ঘাটস্থ বেতার কেন্দ্র থেকে দুই দফায় ইংরেজিতে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। তাঁর ঘোষণাটি ছিল এরকম—

This is Swadhin Bangla Betar Kendra. I, Major Ziaur Rahman, on behalf of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, hereby declare that the independent People\'s Republic of Bangladesh has been established. I call upon all Bengalis to rise against the attack by the West Pakistani Army. We shall fight to the last to free our motherland. By the grace of Allah, victory is ours.

কারো কারো মতে জিয়াউর রহমানের প্রথম ঘোষণায় on behalf of Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman কথাটি ছিল না। ঘোষণার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ‍্যতার কথা বিবেচনা করে দ্বিতীয় ঘোষণায় এ কথাটি যুক্ত করা হয়।

ইতিহাসের এ জায়গায় এসে বিতর্কের সূত্রপাত। স্বাধীনতার এ ঘোষণাটি যেহেতু রেডিও তে দেওয়া হয়েছে এবং দিয়েছেন একজন সেনা কর্মকর্তা সেহেতু বিএনপি বা জিয়াপন্থীরা বলতে চায় এটিই হলো স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। এখন আমরা যদি তাঁদের কথা মানি তাহলে আমাদের স্বাধীনতা দিবস হয় ২৭শে মার্চ।
কিন্তু বিএনপিসহ জাতি তো স্বাধীনতা দিবস পালন করে ২৬শে মার্চ। জিয়াপন্থীরা যদি জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক মনে করেন তবে ২৬শে মার্চ কীভাবে স্বাধীনতা দিবস হয়— সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এখন দেখা যাক, জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার আদৌ কোনো এখতিয়ার বা প্রশাসনিক ক্ষমতা ছিল কি না!

একাত্তরের ওই সময়টাতে তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন মেজর। সেনাপ্রধান থেকে এ পদটি অনেক অনেক নিম্নে। এখানে জিয়া বলে নয়, এই পদে থাকা কোনো কর্মকর্তারই প্রশাসনিক কোনো এখতিয়ার বা ক্ষমতা থাকে না ওই পদে থেকে একটি জাতির স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার। রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের অনুপস্থিতিতে বা অপারগতায় জাতির স্বাধীনতার ঘোষণা যদি দিতেই হয় তাহলে তা দেবেন সেনাপ্রধান বা সশস্ত্র বাহিনী প্রধান। একজন মেজর কখনোই ঘোষণা দেওয়ার প্রশাসনিক অধিকার বা ক্ষমতা রাখেন না। শুধু মেজরই বা কেন, কর্ণেল, লেঃ কর্ণেল, ব্রিগেডিয়ার কারোরই পদাধিকার বলে সে ক্ষমতা নেই। তাদের পদই তাদেরকে সে ক্ষমতা দেয় না।

কোনো কারণে যদি তিনি ঘোষণা দেনও তাহলে সে ঘোষণার কোনো গ্রহণযোগ‍্যতা থাকে না, যদি না ঘোষণাটি হয় শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা বা সেনাপ্রধানের অপারগাতয় তাঁদের কারো পক্ষ থেকে। জিয়া ঠিকই তা বুঝতে পেরেছিলেন। পেরেছিলেন বলেই তিনি ঘোষণাটি সংশোধন করে মুজিবের নাম যুক্ত করে ঘোষণাটি আবার দেন। এটি তাঁর বিচক্ষণতা।

একটি জাতির স্বাধীনতার ঘোষণা তো অনেক দূরের কথা, মেজর পদ মর্যাদার একজন সেনা কর্মকর্তা তো সেনাবাহিনীর একটি ক‍্যান্টমেন্টের কোনো ঘোষণাই দেওয়ার অধিকার রাখেন না। ক‍্যান্টমেন্টের নীতি নির্ধারণী ঘোষণা আসে ক‍্যান্টমেন্ট প্রধানের দপ্তর থেকে যা মেজর পদমর্যাদার কয়েক ধাপ উপরে।

একাত্তরের ওই সময়টিতে জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম অঞ্চলে জেড ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে কর্মরত ছিলেন বলে ঘোষণাপত্রটি তিনি রেডিওতে পাঠ করেন। এখানে কার্যত তিনি পূর্বের ঘোষক এম এ হান্নানের ভূমিকায় অবতীর্ণ। জিয়া একজন সংবাদ পাঠক বা অনুষ্ঠান ঘোষকের মতো স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের একজন পাঠক মাত্র, কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষক বলতে যা বোঝায় তা নন। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের পাঠক আর স্বাধীনতার ঘোষক মোটেই এক কথা নয়। যদি হয় তাহলে যেহেতু বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল ২৬শে মার্চকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে মানেন এবং যেহেতু ২৬শে মার্চের ঘোষণাটি দিয়েছেন এম এ হান্নান, সেহেতু মুজিব ও জিয়াকে বাদ দিয়ে আমাদেরকে হান্নানকে স্বাধীনতার ঘোষক মানতে হবে। কিন্তু আমরা কি তা মানি? নিশ্চয় নয়! কিন্তু কেন মানছি না, হান্নানই তো রেডিওতে প্রথম ঘোষণা দিয়েছিলেন ২৬শে মার্চে, যে দিনটিকে আমরা পালন করছি স্বাধীনতা দিবস হিসেবে।

আমরা যদি মুজিব বা জিয়ার প্রতি কোনরূপ পক্ষপাতিত্ব না করে স্বাধীনতা ঘোষণার এ বিষয়টি বিশ্লেষণ করি তাহলে কী দেখতে পাই?

দেখতে পাই— স্বাধীনতার সর্বপ্রথম ঘোষণা দিয়েছিলেন ৭ই মার্চের জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান।

দ্বিতীয় ঘোষণাটি দিয়েছেন রেডিওতে শেখ মুজিবের পক্ষে এম এ হান্নান ২৬শে মার্চ ১৯৭১।

এবং তৃতীয় ঘোষণাটি দিয়েছেন রেডিওতে শেখ মুজিবের পক্ষে জিয়াউর রহমান ২৭শে মার্চ ১৯৭১।

এখানে যৌক্তিক বিচারে মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার এখতিয়ার ছিল কারণ তিনি ছিলেন তৎকালীন দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা, এবং তাঁর দলটি ছিল ৭০-এর নির্বাচনে সংখ‍্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা বিজয়ী দল।

কিন্তু কিছুতেই মেজর পদমর্যাদার একজন আর্মি অফিসারের সে প্রশাসনিক এখতিয়ার বা ক্ষমতা ছিল না। তাই জিয়াউর রহমান কিছুতেই স্বাধীনতার ঘোষক হতে পারেন না। তাঁকে আমরা সম্মানিত করতে পারি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে এবং একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে নয়। স্বাধীনতার ঘোষণার পাঠককে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জোর করে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে বিএনপিপন্থীরা জিয়ার মতো একজন বীর উত্তম উপাধীপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডারকে জাতির সামনে বছরের পর বছর খাটোই করছেন।

স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্ক এড়াতে আমরা সম্ভবত একটি সিদ্ধান্তে আসতে পারি। তাহলো আমরা স্বাধীনতার ঘোষক ধারণাটি জাতীয় জীবন থেকে একেবারে বাদ দিতে পারি। অর্থাৎ আমরা কাউকেই স্বাধীনতার ঘোষক বলব না। আসলে বলার দরকারও নেই। আমাদের একটি মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সে যুদ্ধের ঘোষণা এসেছিল সে সময়কার প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার কাছ থেকে এবং ঘোষণাটি বিভিন্নভাবে পঠিত হয়েছিল রেডিওতে— এটুকুই যথেষ্ট। কোন ঘোষক কখন ঘোষণাটি পাঠ করেছেন সে আলোচনা মোটেই প্রয়োজনীয় নয়। বিষয়টা অনেকটা সংবাদের মতো। সংবাদটি গুরুত্বপূর্ণ, সংবাদ পাঠক নন। তাই বিতর্ক এড়াতে জাতীয় জীবন থেকে \'স্বাধীনতার ঘোষক কে\' আলোচনাটি বাদ দেওয়াই সমীচীন। এতে জাতীয় জীবনে রাজনৈতিক ঐক‍্য প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।

সমাজে দেখা যায় অনেকে মুজিবকে মহান করতে গিয়ে জিয়াকে খুবই তুচ্ছ তাচ্ছিল‍্য করেন। মুক্তিযুদ্ধে জিয়ার অবদানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন‍্য বলেন যুদ্ধের সময় জিয়া ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের গুপ্তচর। এটা একজন সেক্টর কমান্ডারের প্রতি চরম অন‍্যায়।

আবার অনেকে জিয়াকে মহান করতে গিয়ে মুজিবকে তুচ্ছ তাচ্ছিল‍্য করেন। বলেন মুজিব তো রণাঙ্গনে যুদ্ধই করেননি, তিনি ছিলেন পাকিস্তানীদের হাতে বন্দী, তিনি আবার স্বাধীনতার স্থপতি হন কী করে? এঁরা জানেন না অথবা জানলেও স্বীকার করতে চান না যে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করে সশস্ত্র বাহিনীর সদস‍্যরা, মুক্তিযোদ্ধারা; দেশের নির্বাহী প্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান নন। তাঁরা থাকেন নীতি নির্ধারণী ভূমিকায়, জাতির পক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বিভিন্ন বাহিনীকে নির্দেশনা প্রদানের ভূমিকায়। মাঠ পর্যায়ে যুদ্ধ করা প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতির বা রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার কাজ নয়। করলে আমেরিকা-ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে আমরা ট্রাম্প, নেতানিয়াহু ও প্রয়াত খামেনিকে রণাঙ্গনে দেখতাম। তা কি আমরা দেখেছি বা দেখি?

আসলে আমরা নিজ নিজ পছন্দের দলের প্রতি এতটাই অন্ধ যে দলীয় মনোভাবের বাইরে বেরুতে পারি না। পারলে জিয়াপন্থীরা মুজিবকে আর মুজিবপন্থীরা জিয়াকে ছোট করতেন না। ইতিহাসে যাঁর যে মর্যাদা প্রাপ‍্য তাঁকে সে মর্যাদা দেওয়া উচিত। তা না হলে স্বাধীনতার ঘোষক প্রশ্নে আমরা কোনদিই সমাধানে আসতে পারব না। আমরা ক্রমশ আরো বিভাজিত হবো। এই একটি বিষয় সুরাহা হয়ে গেলে দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের দূরত্ব অনেক কমে যাবে। আর তাদের দূরত্ব কমা মানে জাতি ঐকবদ্ধ হওয়ার পথে আরো একধাপ এগিয়ে যাওয়া।

তাই আশা করি বিএনপিপন্থীরা ইতিহাসের সত‍্যকে অস্বীকার করে জোর করে জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা থেকে বিরত থাকবেন। এবং আওয়ামী লীগপন্থীরা মুক্তিযুদ্ধে জিয়ার অবদানকে অস্বীকার করার জন‍্য তাকে পশ্চিম পাকিস্তানের গুপ্তচর বলে যে অসম্মান করেন সে হীন মানসিকতা পরিহার কর‍বেন। এতে আমাদের রাজনীতি আরো সুন্দর হবে।

সারওয়ার-ই আলম
ইলফোর্ড, লণ্ডন
২৮শে মার্চ ২০২৬


img

জনতার নেতা, সন্তানের কাছে পরাজিত

প্রকাশিত :  ১৪:১৮, ০৭ অক্টোবর ২০২৬

সংগ্রাম দত্ত

বর্তমান সমাজে নতুন প্রজন্মের সন্তানরা কীভাবে বেড়ে উঠছে, তা নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। শিক্ষা, অর্থ-বিত্ত, সামাজিক মর্যাদা কিংবা প্রতিষ্ঠা—সবকিছু অর্জনের পরও একজন মানুষ জীবনের শেষ সময়ে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি প্রত্যাশা করেন, তা হলো আপনজনের একটু ভালোবাসা, যত্ন ও নিরাপদ আশ্রয়। অথচ বাস্তবতা কখনো কখনো এত নির্মম হয়ে ওঠে যে, যাঁরা সারাজীবন মানুষের জন্য কাজ করেছেন, জনগণের ভালোবাসায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁরাই শেষ বয়সে নিজের সন্তানদের কাছেই অবহেলার শিকার হন।

এই এলাকার এমন তিনজন দাপুটে রাজনৈতিক নেতার কথা মনে পড়ে, যাঁরা নিজ নিজ সময়ে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন। মানুষের প্রত্যাশা পূরণেও তাঁরা অনেকাংশে সফল হয়েছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তিনজনের পরিণতিই যেন আমাদের সমাজ ও পারিবারিক মূল্যবোধের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছে।

প্রথমজন ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে এলাকায় সংগঠক হিসেবে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর হাতে গড়া সেই সংগঠন পরবর্তীতে এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসায় ভোটের মাধ্যমে তিনিও জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

জীবনের শেষ সময়ে, মৃত্যুর মাত্র দুই-তিন মাস আগে, তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। সে সময় তাঁকে বলেছিলাম, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেছেন, আপনি আপিল করলে বা আপিল করতে গেলে স্বীকৃতি পাবেন।

আমার কথা শুনে তিনি শান্তভাবে বলেছিলেন, “আমার আর সময় নেই।”

এরপর তিনি আরেক নেতার নাম এবং সেই নেতার এক সন্তানের নাম উল্লেখ করে বলেছিলেন, তাঁর মতো সৃষ্টি করতে পারেননি এমন কেউ, যে সংগ্রাম করে, আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে আমার স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। বাকিটা উপরওয়ালা দেখবেন।

সেটিই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার জীবনের শেষ কথা।

দ্বিতীয়জন ছিলেন একজন দাপুটে জনপ্রতিনিধি। তাঁর সরকারের আমলে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী ও পথচারী এর সুফল ভোগ করছেন। মানুষের চলাচলে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পরবর্তীতেও তিনি সরাসরি ভোটে আবার জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, তিনি তাঁর পরিবারের সবাইকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন যে তা সত্যিই বিস্ময়কর। সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর আন্তরিকতারও অভাব ছিল না। অথচ শোনা যায়, জীবনের শেষ বয়সে তাঁকে অনেক কষ্ট পেয়ে পরপারে পাড়ি দিতে হয়েছে।

তৃতীয়জন ছিলেন দুর্দান্ত ও ডাকসাইটে এক নেতা। তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল এমন যে নির্বাচনী প্রচারে টাকা-পয়সা খরচ না করে শুধু পায়ে হেঁটে কয়েকজন মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রচার চালিয়েই তিনি শক্তিশালী এক প্রতিদ্বন্দ্বীকে নাকানিচোবানি খাইয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সমাজে তাঁর অবদানও কম নয়। একাধারে তিনি ছিলেন সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ এবং রাজনীতির মাঠে একজন ভালো বক্তা—একজন ওরাটার। মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ও জনপ্রিয়তা তাঁকে আলাদা অবস্থান দিয়েছিল।

রাজনীতির মাঠে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়েছিলেন, জনগণের ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে পরিবারের দুই-একজন সন্তানের কাছে যেন সেই মানুষটিই হেরে গেলেন। পরিবারের অবহেলিত অন্য নেতাদের মতো তাঁর অবস্থাও খুব একটা ভিন্ন ছিল না। এলাকায় কানাঘুষা আছে, শেষ বয়সে টাকা দিতে না পারার কারণে তাঁকে সন্তানদের হাতে নাজেহাল পর্যন্ত হতে হয়েছে।

তবে এই গল্পের একটি আশাব্যঞ্জক দিকও আছে। তাঁর স্বীকৃতির জন্য তাঁর অপর এক সন্তান হাইকোর্টে রিট করে আদেশ পর্যন্ত করিয়েছেন। হয়তো সেই স্বীকৃতি পাওয়ার বাস্তবায়ন এখন সময়ের অপেক্ষা।

তিনটি জীবনের গল্প, তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়—কিন্তু শেষ অধ্যায়ে এসে যেন একই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় আমাদের।

যাঁরা জীবনের সোনালি সময়টুকু মানুষের জন্য ব্যয় করেছেন, জনগণের ভালোবাসায় জনপ্রতিনিধি হয়েছেন, সমাজ ও এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন, তাঁরাই যদি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের সন্তানদের কাছ থেকে ভালোবাসা, সম্মান ও সামান্য যত্নটুকু না পান, তাহলে আমাদের শিক্ষা ও সভ্যতার সাফল্য কোথায়?

প্রশ্নটি শুধু এই তিনজন নেতাকে ঘিরে নয়। এটি আজকের সমাজের একটি বৃহত্তর বাস্তবতার দিকেও আমাদের দৃষ্টি ফেরায়।

আজকের অসুস্থ সামাজিক বাস্তবতার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো—নতুন প্রজন্মের একটি অংশ ক্রমেই সুস্থ শিক্ষা, নৈতিকতা ও পারিবারিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তারা অনেক সময় লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে এমন কিছু মানুষের পেছনে ঘুরছে, যাঁরা সমাজে প্রভাবশালী, ক্ষমতাবান কিংবা তথাকথিত সমাজপতি হিসেবে পরিচিত। তাঁদের কথাকে আদর্শ মনে করে, তাঁদের ইঙ্গিতকে নির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করে অনেক তরুণ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে।

কখনো রাজনীতি, কখনো ক্ষমতার ছায়া, কখনো অর্থের লোভ, আবার কখনো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়—সব মিলিয়ে একটি অংশের তরুণদের সামনে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে লেখাপড়া, চরিত্র, নৈতিকতা কিংবা ভবিষ্যৎ গড়ার চেয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা এবং প্রভাবশালী কারও অনুসারী হওয়াকেই তারা সাফল্যের পথ বলে মনে করছে।

মানুষের মান-সম্মান, পারিবারিক মর্যাদা কিংবা নিজের ভবিষ্যৎ—এসব নিয়েও অনেকের মধ্যে আর আগের মতো ভাবনা নেই। কে সম্মানিত মানুষ, কার কাছ থেকে কী শেখা উচিত, কোন কাজটি সমাজের জন্য ভালো আর কোনটি অপরাধ—এই বোধটুকুও অনেকের মধ্যে ক্রমেই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই বিপথগামিতার ফল শুধু ওই তরুণকেই ভোগ করতে হয় না; এর খেসারত দিতে হয় তার পরিবারকেও। একজন সন্তান যখন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, রাজনীতির নামে বিশৃঙ্খলায় যুক্ত হয় কিংবা ভুল মানুষের অনুসরণ করতে করতে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে, তখন তার বাবা-মায়ের ঘুম হারাম হয়। সন্তানের অপকর্মের কারণে পরিবারকে সামাজিকভাবে লজ্জিত হতে হয়, কখনো আইনি জটিলতায় পড়তে হয়, কখনো অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়।

অথচ অনেক বাবা-মা হয়তো সেই সন্তানকেই মানুষ করার জন্য জীবনের সর্বস্ব দিয়েছেন।

কেউ হয়তো নিজের জমি বিক্রি করেছেন, কেউ ধার-দেনা করেছেন, কেউ নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন। কেউ সন্তানকে উচ্চশিক্ষা দিয়েছেন, কেউ বিদেশে পাঠিয়েছেন। সন্তান যেন প্রতিষ্ঠিত হয়, ভালো মানুষ হয়—এই স্বপ্নেই বাবা-মা জীবনের সেরা সময়টুকু কাটিয়েছেন। কিন্তু সেই সন্তানই যখন ভুল পথে পা বাড়ায়, তখন বাবা-মায়ের সেই ত্যাগ, স্বপ্ন ও ভালোবাসা যেন এক মুহূর্তে প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এখানেই আমাদের সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।

বর্তমানে এমন অনেক ঘটনা শোনা যায়, যেখানে বাবা-মা জীবনের সমস্ত কষ্ট, ত্যাগ ও সঞ্চয় দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া করান, উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেন, বড় ডিগ্রি অর্জনের পথ তৈরি করে দেন। এমনকি অনেকে সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশেও পাঠান। সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত হয়, ভালো চাকরি পায়, অর্থ-বিত্ত অর্জন করে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে দেওয়া বাবা-মায়ের অনেকের খোঁজখবর নেওয়ার সময়টুকুও তারা আর পায় না।

কখনো কখনো পরিস্থিতি আরও নির্মম হয়ে ওঠে। পত্র-পত্রিকায় এমন ঘটনাও জানা গেছে, কোনো কোনো বাবা বা মা এক সপ্তাহ কিংবা তারও আগে মারা যাওয়ার পর প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পেয়ে বিষয়টি জানতে পেরেছেন এবং পুলিশকে খবর দিয়েছেন। পরে পুলিশ এসে দেখতে পেয়েছে, ঘরের ভেতরেই পড়ে আছে মৃতদেহ। অথচ সন্তানরা জানেন না, কিংবা জানলেও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো খোঁজ নেননি যে তাঁদের বাবা বা মা মারা গেছেন।

এমন ঘটনা অত্যন্ত করুণ, মর্মান্তিক এবং একই সঙ্গে আমাদের সামাজিক বিবেকের জন্য গভীর লজ্জার। যে সন্তানকে বাবা-মা এত কষ্ট করে মানুষ করলেন, যে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য তাঁরা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিলেন, সেই সন্তান যদি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁদের খোঁজটুকুও না রাখে, তাহলে সেই উচ্চশিক্ষা, সেই ডিগ্রি, সেই সামাজিক প্রতিষ্ঠার অর্থ কী?

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শুধু অবহেলাই নয়—কোনো কোনো পরিবারে সন্তানদের হাতে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নাজেহাল বা নির্যাতনের ঘটনাও শোনা যায়। বিশেষ করে টাকা-পয়সা দিতে না পারলে কিংবা সন্তানের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে কোনো কোনো বাবা-মা নিজেদের সন্তানদের কাছেই অপমান, দুর্ব্যবহার এমনকি নির্যাতনের শিকার হন।

একজন বৃদ্ধ বাবা, যিনি একদিন সন্তানের হাত ধরে তাকে হাঁটতে শিখিয়েছেন, জীবনের শেষ বয়সে সেই সন্তানের কাছেই যদি অর্থের জন্য অপমানিত হন—এর চেয়ে বেদনাদায়ক পরিণতি আর কী হতে পারে?

আর এই বাস্তবতার সঙ্গে যখন অসুস্থ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ যুক্ত হয়, তখন সমস্যাটি আরও গভীর হয়। রাজনীতি মানুষের কল্যাণ, অধিকার ও নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু রাজনীতির নামে যদি তরুণদের একটি অংশকে শুধু মিছিল, ক্ষমতার প্রদর্শন, প্রতিপক্ষ দমন, অর্থের লেনদেন কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রচ্ছায়ায় থাকার সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, তাহলে তার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি শুধু রাজনীতির নয়—সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।

যে তরুণের হাতে বই থাকার কথা, তার হাতে যদি অপরাধের হাতিয়ার উঠে আসে; যে তরুণের চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন থাকার কথা, সে যদি কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তির নির্দেশের অপেক্ষায় দিন কাটায়; যে তরুণের বাবা-মা তাকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছেন, সে যদি তাদের কথাই শুনতে না চায়—তাহলে এই অবক্ষয়ের দায় শুধু ব্যক্তির নয়, আমাদের সামগ্রিক সামাজিক পরিবেশেরও।

তবে এর অর্থ এই নয় যে রাজনীতি নিজেই তরুণদের নষ্ট করে। বরং রাজনীতির নামে যখন অনৈতিকতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অপরাধপ্রবণতা ও অন্ধ আনুগত্যকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তখনই তা তরুণদের বিপথে নেওয়ার একটি বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে।

একটি সুস্থ রাজনীতি তরুণদের মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখায়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখায়। দেশ, সমাজ ও মানুষের জন্য কাজ করতে শেখায়। কিন্তু অসুস্থ রাজনীতি তরুণদের ক্ষমতার পেছনে ছুটতে শেখায়, অন্যায়কে স্বাভাবিক করে তোলে এবং কখনো কখনো অপরাধকেও সাহসের পরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করে।

এই পার্থক্যটি না বুঝলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।

শুধু সন্তানদের দোষ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। সন্তানকে যদি ছোটবেলা থেকেই শুধু ভালো ফলাফল, ভালো চাকরি, অর্থ-বিত্ত ও প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু তাকে মানবিকতা, নৈতিকতা, পারিবারিক দায়িত্ব ও কৃতজ্ঞতার শিক্ষা দেওয়া না হয়, তাহলে তার শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে শুধু নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে শেখায় না; অন্যের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখায়। বিশেষ করে বাবা-মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা, সম্মান ও দায়িত্ববোধ একজন মানুষের নৈতিক শিক্ষার অন্যতম ভিত্তি হওয়া উচিত।

আজকের প্রজন্মের অনেক সন্তান উচ্চশিক্ষিত হচ্ছে। বড় বড় ডিগ্রি অর্জন করছে, ভালো চাকরি করছে, অর্থ-বিত্ত ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা অর্জন করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই শিক্ষার কতটুকু তাদের মানুষ করে তুলছে?

একজন সন্তান যদি শিক্ষিত হয়েও বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে না দাঁড়ায়, তাঁদের অসহায়ত্ব না বোঝে, তাঁদের শেষ বয়সের প্রয়োজনকে বোঝা মনে করে, তাহলে সেই শিক্ষা কতটা অর্থবহ—এ প্রশ্ন আমাদের নিজেদের কাছেই রাখতে হবে।

রাষ্ট্রের আইন আছে, আদালত আছে, প্রশাসন আছে। কিন্তু আইন তো প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে দেখে না—কোনো বৃদ্ধ বাবা আজ ওষুধ পেলেন কি না, কোনো মা একাকী বসে আছেন কি না, তাঁদের সঙ্গে সন্তানরা কেমন আচরণ করছে। আইনেরও একটি সীমা আছে। একটি পরিবারের ভেতরের ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা কোনো আইন দিয়ে পুরোপুরি তৈরি করা যায় না।

তাই সন্তানকে শুধু শিক্ষিত নয়, মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব পরিবারকেই নিতে হবে। তাকে শেখাতে হবে—বাবা-মা শুধু শৈশবে সন্তানের আশ্রয় নন; একদিন সন্তানেরও বাবা-মায়ের আশ্রয় হতে হয়।

কারণ জীবনের নির্মম সত্য হলো, আজ যে বাবা সন্তানের হাত ধরে হাঁটতে শেখান, কাল সেই বাবারই হয়তো হাঁটার জন্য সন্তানের হাতের প্রয়োজন হবে। যে মা সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেন, একদিন সেই মায়ের খাবারের প্লেটটিও হয়তো সন্তানের হাতে তুলে দিতে হবে।

আর যেসব বাবা-মা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে সন্তানদের উচ্চশিক্ষা দিয়েছেন, বিদেশে পাঠিয়েছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন—তাঁদের কথা তো আরও বেশি করে মনে রাখা উচিত। সন্তানের সাফল্যের পেছনে বাবা-মায়ের ত্যাগ যদি থাকে, তবে সেই সাফল্যের প্রথম ঋণও তাঁদের প্রতিই।

রাজনীতির মাঠে জয়ী হওয়া যায় ভোটে। প্রতিপক্ষকে হারানো যায় সংগঠন ও জনপ্রিয়তার শক্তিতে। কিন্তু জীবনের শেষ বিচারে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় জয় হলো—তার সন্তানরা তাকে ভালোবাসে, সম্মান করে এবং শেষ দিন পর্যন্ত পাশে থাকে।

এই তিনজন নেতার জীবন আমাদের সেই কথাটিই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা বড় কথা, কিন্তু নিজের সন্তানদের হৃদয়ে একজন ভালো বাবা-মা হয়ে বেঁচে থাকা তার চেয়েও বড় অর্জন।

আজ যারা তরুণ, যারা উচ্চশিক্ষিত হচ্ছে, যারা দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তাদের প্রত্যেকের কাছে তাই একটি প্রশ্ন রেখে যেতে হয়—আপনার সাফল্যের পেছনে যে বাবা-মা নিজেদের জীবন, স্বপ্ন ও স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন, তাঁদের শেষ জীবনে আপনার অবস্থান কোথায়?

মনে রাখতে হবে, বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা কোনো দয়া নয়, কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। তাঁদের জীবনের শেষ দিনগুলো যেন একাকিত্ব, অবহেলা, অপমান কিংবা অনিশ্চয়তায় না কাটে—এ দায়িত্ব শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি একটি সুস্থ সমাজ গড়ারও অন্যতম শর্ত।

কারণ একটি সমাজ কতটা শিক্ষিত, তা শুধু তার ডিগ্রির সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি সমাজ কতটা সভ্য, তা বোঝা যায় সে সমাজ তার বৃদ্ধ বাবা-মা, অসহায় মানুষ এবং আপনজনদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তা দেখেই।

জনতার নেতা হয়েও যদি কেউ সন্তানের কাছে পরাজিত হন, আর একজন সাধারণ বাবা-মা সারাজীবন সন্তানকে মানুষ করে শেষ বয়সে যদি সন্তানের কাছেই অবহেলিত হন—তাহলে সেই পরাজয় শুধু একজন মানুষের নয়; কোথাও না কোথাও সেটি আমাদের পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং মানবিকতারও পরাজয়।

তাই এখনই সময়, সন্তানদের শুধু সফল নয়—মানুষ করে গড়ে তোলার। তাদের শুধু পৃথিবী জয় করার শিক্ষা নয়, নিজের ঘর, নিজের শিকড় এবং নিজের বাবা-মাকে ভালোবাসার শিক্ষাও দিতে হবে।

নইলে একদিন হয়তো আমরা দেখব—সন্তানরা পৃথিবীর নানা প্রান্তে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু তাঁদের বৃদ্ধ বাবা-মা পড়ে আছেন একাকী ঘরে। আর সেই ঘরের দরজা খুলে প্রতিবেশীরাই হয়তো আবিষ্কার করছেন, যাঁদের সন্তান পৃথিবীর কাছে সফল, তাঁদের শেষ জীবনে পাশে থাকার মতো একজন মানুষও ছিল না।

এমন সমাজ আমরা চাই না।

আমরা এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা শিক্ষিত হবে, কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে মানবিকতাও ধারণ করবে; যারা রাজনীতি করবে, কিন্তু অপরাধ ও অন্ধ আনুগত্যের রাজনীতি নয়—মানুষের কল্যাণের রাজনীতি করবে; যারা সমাজের প্রভাবশালী মানুষের কাছ থেকে শুধু ক্ষমতার কৌশল নয়, নীতি ও আদর্শ শেখার চেষ্টা করবে; যারা বাবা-মায়ের ত্যাগকে কখনো ভুলবে না।

কারণ সমাজের অধঃপতন একদিনে ঘটে না। ছোট ছোট অবহেলা, ভুল আদর্শ, অন্ধ অনুসরণ, নৈতিকতার অবক্ষয় এবং পারিবারিক মূল্যবোধের ক্ষয় একসময় একটি অসুস্থ সমাজের জন্ম দেয়। আর সেই সমাজের প্রথম ও সবচেয়ে বড় শিকার হয় আমাদের সন্তানরাই—তারপর তাঁদের বাবা-মা, পরিবার এবং শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজ।

জনতার ভালোবাসায় নেতা হওয়া যায়, ভোটে জয়ী হওয়া যায়, ক্ষমতা অর্জন করা যায়। কিন্তু মানুষের জীবনের শেষ বিচারে সবচেয়ে বড় পরিচয় কোনো পদ, ক্ষমতা কিংবা জনপ্রিয়তা নয়। সবচেয়ে বড় পরিচয়—সে কেমন মানুষ ছিল, কেমন বাবা বা মা ছিল এবং তার সন্তানরা তাকে কতটা ভালোবেসে শেষ পর্যন্ত পাশে দাঁড়িয়েছিল।

সেই বিচারে জয়ী হওয়াই জীবনের সবচেয়ে বড় জয়।